[বহুদিন কিছু লেখা হচ্ছিল না। অথচ চারপাশের পৃথিবী খুব কাতর করে তুলেছিল। ব্রহ্মদেশের রাখাইন (আরাকান) রাজ্যে পিশাচের রক্ত-জয়োল্লাস, সু চি নামের এক নোবেলজয়ীর ক্রূর-দানব রূপ আর রোহিঙ্গাদের জীবন ঘিরে মর্মন্তুদ ঘটনাবলি আমাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিল। অন্যদিকে নিজের দেশে শিশু হত্যা, ধর্ষণের মতো মন খারাপ করা কত ঘটনা! এসবের অভিঘাতে মন বিষণ্ন, অস্থির। আর নিজের জীবনের স্বর্গ-নরক! সখা রূপের আড়ালে মানুষের শঠতা ও খল রূপ! বুকে বেঁধা তীর ও ছোবল; নানারূপ বেদনা ও বিস্ময়। এসবের উল্টো পিঠে অপ্রত্যাশিত আনন্দের নানা উপলক্ষও ছিল। সখ্য-সংরাগ-প্রেম-হাসি-চুম্বন আর কত কত তীব্র মধুর লীলালাস্য! পথে যেতে যেতে ভালো-মন্দ কত দৃশ্য, মনতলদেশে কত চোরা ফল্গুস্রোত। সবই অবচেতনে জমা হয়ে প্রকাশের পথ খুঁজছিল। মন হয়ে উঠেছিল তপ্ত লাভার আগ্নেয়গিরি। সদা প্রকাশ ব্যাকুল, বিস্ফোরণোন্মুখ। কিন্তু ভাষা পাচ্ছিল না। অবশেষে তা চড়ে বসল এক অশ্বের পিঠে— শব্দ, বাক্য আর ভাষার চাবুক হাতে। পাঠকদের আমন্ত্রণ জানাই এই মনো-আলেখ্যর, এই ভ্রমণের সঙ্গী হতে।]
ঘুঘুদের স্বর চুরি করে
১.
আমি যাব তোমার সমীপে
ঘুঘুদের স্বর চুরি করে
ধু-ধু পথ, গন্ধকের নদী
সীমান্তের কাঁটা ও দেয়াল
তপ্ত লাল লাভা পাড়ি দিয়ে
২.
পোড়ামুখ, অধোমুখ আমি
বহুতর মুখ ও মুখোশে
তোমাকে দেখতে আর
নিজেকে দেখাতে আসি চুপে
৩.
পথে ফাঁদ, ভয়াল পরিখা আর রক্তসরোবর
মর্মে গাঁথা ছুরি ও ছোবল;
কই যাব কিছুই জানি না। —শুধু জানি,
মরণ অবধি এই চলা থামবে না!
৪.
আপন প্রভুর নামে দেশে দেশে ‘সত্য’ লয়ে রণলিপ্ত মহাশয়গণ!
হাতে তসবি, জপমালা, গলায় রুদ্রাক্ষ-মালা, কপালে তিলক
শিরে হ্যাট, কিপ্পা, টুপি, গায়ে পৈতা তারা এসেছেন!
আমরা তাদের ফুঁয়ে, ‘আত্মঘাতী পবিত্র বোমায়,
কর্পূরের মতো উবে যাই
তারা যত জঙ্গপটু আমরা তত পথে-পথে লাশ।
৫.
ব্রহ্মদেশে মানচিত্র রক্তে ডুবিয়ে এক ‘জলপাই রাজা’ বসে রয়!
ডানে-বাঁয়ে ইনফার্নো, পারগাতোরি, নরক গুলজার!
সমুদ্র-পরিখাজুড়ে কাটা দেহ, পোড়া দেহ, ফুলে ওঠা লাশ
মানুষ পালায় আর অন্ধকারে নৌকা ছোটে ঢেউ পাড়ি দিয়ে
৬.
নেপিদোর রক্ত-সিংহাসনে
সোমের পেয়ালা-হাতে শকুনি-গৃধিনী ক্রূর হাসে
বারুদের আণ্ডা পাড়ে। আর বলে ‘ওম শান্তি, ওম!’
বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি!
নোবেলং শরণং গচ্ছামি
তুমি কি শুনছ তথাগত?
তাহারা বাজায় সুখে বীণা!
৭.
বিভিন্ন স্বরূপে আমি ঢুকে পড়ি আয়নায়— দূর অতীতের। দেখি:
স্বজনই শকুনি, খল, দুর্যোধন, ক্রূর আততায়ী!
খেলা শেষে দ্রৌপদীর বস্ত্র ধরে টানে!
স্বামীরূপী পাঁচজন ভাঁড় শুধু চেয়ে চেয়ে দ্যাখে!
একমাত্র ত্রাতা কৃষ্ণ! দ্রৌপদীর প্রাণের স্বামীন!
৮.
এ-ঘোর কলিতে, দেখো, আরাকানে লাখো দ্রৌপদীর
কৃষ্ণ নেই, ত্রাতা নেই কোনো!
৯.
মৃত্যু থেকে যে শিশুটি ফিরবে না আর
ভবনদী পার হয়ে তাকেও শোনাব আমি গান!
১০.
ভুলে গেলে বাঁচা যায়। অন্য বিষয়ে চলো যাই।
বাঘ নিয়ে কথা বলি চলো!
সব দেশে পুরুষ বাঘেরা
ডোরা খুলে, ঘুমের ভেতরে চুপে, নিজেকে শোনায়:
একদিন আয়না ভেঙে বের হয়ে ঘাড় মটকে নিজেকেই খাব!
১১.
যত বাঘ তত ডোরা!
যত ডোরা তত রক্তপাত!
বাঘ ডাকে। বাঘের হুঙ্কার
ভিন গ্রহে বসে কেউ আঁকে
১২.
ছবি থেকে বেরিয়ে হঠাত্
লোকালয়ে ছুটে আসবে বাঘ
তীব্র, গাঢ়, অবিকল অন্য গ্রহে আছে বাঘস্বর?
১৩.
গাছের কোটরে, দেখি, ক্ষুধাতুর
হাঁ-মুখ চেঁচায় দুটি ছানা
বলা তো যায় না তারা যদি
আমাকেই পোকা ভেবে খায়!
ভয়ে তাই পালিয়ে এসেছি!
১৪.
সমুখে লাঠিতে বাঁধা মুলা
পেতে চেয়ে যেমতি গর্দভ
বোঝা বয়ে চলে নিরবধি
অপরের প্রযোজিত দেহ
বয়ে চলি মরণ অবধি
১৫.
প্রত্যেকে বহন করে চলে
অন্যদের দেয়া ‘নিজ নাম’
অপরের দেয়া ভুয়া নামে
বয়ে চলে ভুয়া পরিচয়
অপরের রক্তে, হাড়-মাঁসে
রেডিমেড এ-দেহ পেয়েছি
১৬.
মলমাসে ভরা উত্কট
এই পুঁতি গন্ধময় শব
এই দেহ, এই বোঝা ছেড়ে
হেসে-কেঁদে দৌড়ে-লাফিয়ে
তোমার সমীপে আমি একদিন যাব
নগ্নদেহে, শিশু হেন, উপনীত হব!
১৭.
অন্ধদের রঙের ধারণা
অন্ধদের পুরো বিপ্রতীপ
ঈর্ষাতুর আমি চেয়ে দেখি:
বাষ্পের ভেতরে তেনজিং
জমা করে মেঘের তারানা
১৮.
দুনিয়ার বহু দেশে লোকে
ঘুঘুদের দিল কত নাম
সেসব নামের মানে ঘুঘু
জানবে কি, জানবে কখনো?
১৯.
বাবেল মিনারে বহু ভাষা
ছিঁড়ে ফেলে সূত্র, যোগাযোগ
সৌধ টলে। ভেঙে পড়ে। আমি-তুমি সবাই অচেনা!
২০.
ছুঁয়ো না, ছুঁলেই হুড়মুড়
ভেঙে যাবে কৃশ দেহালয়
কাস্তকার, করো চাষ জমি!
—উই ঢিবি ঘিরে উলিরাজ!
২১.
পেটে ভাত নেই। ভুখ লাগে!
স্বপ্নে দেখি, মগরা নদীতে এক নায়ে
ভাপ ওঠে ভাতের হাঁড়িতে!
২২.
দিও না আমাকে কোনো ফুল
উদরে কুকুর কুঁই-কুঁই
খেতে দাও! পরে গান দিও!
ভাত দাও। দিও না বকুল!
আমার হূদয় থেকে আমি
তোমার হূদয়ে ভেসে যাব!






