ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর বুনো আগুনের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। উত্তাল হয়ে ওঠে দিল্লি ও রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন অংশ।
এজাজ আশরাফ ও অমিত প্রকাশ রাস্তায় নামলেন। তারা জানেন বস্তুনিষ্ঠ খবর কেমন করে পরিবেশন করতে হয়। খবর তৈরিতে তারা নিজেদের সার্বক্ষণিক অভিজ্ঞতাকে তো কাজে লাগালেনই, সাহায্য নিলেন পাঁচজন বিশিষ্ট শিখ ব্যক্তিত্বের— এদের মধ্যে দুজন ১৯৭১ যুদ্ধের নায়ক— একজন বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান আরজান সিং (দেশের একমাত্র মার্শাল)। অন্যজন ইস্টার্ন কমান্ডপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা। অন্য তিনজনের একজন লেখক পতবন্ত সিং, একজন কূটনৈতিক গুরবচন সিং এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সুখজিত্ সিং, কাপুরথালা রাজপরিবারের সদস্য। দুজন সাংবাদিক সঙ্গে আরো যোগ করলেন ইন্দর কুমার গুজরালের ডায়েরি, ডায়েরি থেকে গুজরালই পরে শুনিয়েছেন। পেছনে রয়েছে স্বর্ণমন্দির আক্রমণের ভয়ঙ্কর রেশ। সাংবাদিক দুজনের রচনা ‘১৯৮৪: নিষ্ক্রিয়তার মূল্য’-এর পুনর্লিখনের সংক্ষিপ্ত নির্বাচিত অংশ অনূদিত হলো। অনুলিখনটি ২০১৬ সালের। তারা মিলান কুন্ডেরার একটি উদ্ধৃতি স্মরণ করলেন:
ক্ষমতার জন্য লড়াই আসলে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।
৩১ অক্টোবর সকাল ৯টা ১৮ মিনিট: ইন্দিরা গান্ধী গুলিবিদ্ধ
সকাল ঠিক ১০টায় লেখক পতবন্ত সিং শুনলেন নিজের শিখ প্রহরীদের হাতে ইন্দিরা গান্ধী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তিনি তার সেক্রেটারিকে বললেন, টেলিফোনে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা, এয়ার মার্শাল আরজান সিং, কূটনীতিবিদ গুরবচন সিং ও ব্রিগেডিয়ার সুখজিত্ সিং (অব)-কে ধরুন। তারা সবাই দিল্লির নামকরা বিশিষ্টজন।
পতবন্ত আরজান সিংকে বললেন, ‘আমাদের অবস্থান অবশ্যই স্পষ্ট করা দরকার। হত্যা কখনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান নয়, কখনো তা হতে পারে না।’
আরজান সিং প্রেসকে দেয়ার জন্য একটি বিবৃতির খসড়া তৈরি করতে পতবন্ত সিংকে অনুরোধ করলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন বেলা সাড়ে ৩টায় ১১ নম্বর অমৃতা শেরগিল মার্গে পতবন্তের বাসায় সবাই মিলিত হবেন। তাদের কর্মচাঞ্চল্য বলে দিচ্ছে সামনে কী আছে। আরজান সিং বললেন, তিনি আই কে গুজরালকে ধরতে চেষ্টা করবেন এবং তাকে পেলে এ বৈঠকে আসতে বলবেন।
গুজরাল দম্পতি তখন বাড়িতে নেই। আরজান সিং জানতেন না, গুজরাল ও তার স্ত্রী তখন অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স হাসপাতালের দিকে এগোচ্ছেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ইন্দিরা গান্ধীকে এখানে আনা হয়েছে। একসময় আই কে গুজরাল ইন্দিরার যাকে বলা হতো কিচেন কেবিনেট, তার সদস্য ছিলেন, কিন্তু জরুরি অবস্থার সময় সঞ্জয় গান্ধী প্রেস সেন্সরশিপ আরোপ করতে চাইল, তিনি তার বিরোধিতা করে ইন্দিরার শোভাযাত্রা থেকে বাদ পড়ে গেছেন।
অল ইন্ডিয়া ইনস্টিউট অব মেডিকেল সায়েন্সে উপস্থিতি নিয়ে আই কে গুজরাল তার ডায়েরিতে লিখেছেন:
“সাড়ে ১২টায় এআইআইএমএস-এ পৌঁছলাম। আমাদের আটতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তিনি শায়িত। একটি কক্ষ থেকে ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী আবির্ভূত হয়ে মালেকার কানে কানে বললেন, ‘তিনি আর নেই।’ পরে নিচতলার বহির্গমন অংশ (ইউনিয়ন মিনিস্টার) শিব শঙ্কর সংবাদটি নিশ্চিত করলেন।”
তার মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করা হলো না, কারণ তার একমাত্র জীবিত সন্তান রাজীব গান্ধী তখন পশ্চিমবঙ্গে আর রাষ্ট্রপতি জৈল সিং বিদেশে। এরপর কে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন, সে বিষয়টি তো নির্ধারণ করতে হবে।
বেলা সাড়ে ৩টায় বিশিষ্ট কয়েকজন শিখ পতবন্ত সিংয়ের লেখা বিবৃতির খসড়া নিয়ে আলাপ করতে বসলেন। একটি বিষয়ে কেবল মতানৈক্য দেখা দিল— শিখ সম্প্রদায়ের ওপর প্রত্যাঘাতের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে সতর্কীকরণজাতীয় কিছু ঢুকিয়ে দেয়া হবে কিনা। একমাত্র অরোরাই বিরুদ্ধ মত, তিনি মনে করেন, শিখদের ওপর আক্রমণের আশঙ্কা করার মতো কোনো লক্ষণ তিনি দেখছেন না। অন্যদের তিনি তার সহমত করালেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সম্পাদক জর্জ ভার্গিসকে ফোন করে বলা হলো, ইন্দিরা গান্ধী হত্যা নিয়ে তাদের বিবৃতি যেন চোখে পড়ার মতো জায়গায় ছাপা হয়। ১১ নম্বর অমৃতা শেরগিল মার্গের বাড়িতে অরোরা হয়তো ভিন্ন মত পোষণ করতেন না, যদি তিনি জানতেন তখন অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সের সামনে কী ঘটছে। সেখানে বড় জমায়েত হয়ে গেছে। একজন শিখের পাগড়ি টেনে নিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে, অন্য একজন শিখকে তার বাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে বেদম পেটানো হয়েছে।
রাজীব গান্ধী দিল্লি পৌঁছলেন বিকাল ৪টায়, ১ ঘণ্টা পর ফিরলেন জৈল সিং। ততক্ষণে দিল্লির সবাই ইন্দিরার নিহত হওয়ার খবর পেয়ে গেছেন। আর গুজব হিসেবে এ খবর তো ভারতের সামাজিক মাধ্যমে ছিলই।
৩১ অক্টোবর, সন্ধ্যা: উপদ্রব ছড়িয়ে পড়েছে
প্রেসিডেন্ট জৈল সিং যখন অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সে এলেন, তার গাড়িবহরের ওপর পাথর নিক্ষেপ করা হয়। পুলিশের সূত্র জানায়, কাজটা করেছে কংগ্রেস দলের একজন মেট্রোপলিটন কাউন্সিলরের এক সমর্থক, যিনি পরে নিজেও নিহত হন। এরপর স্থানীয় কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। শিখদের ওপর এবং শিখ-মালিকানাধীন আইএসএ মার্কেট, সরোজিনী নগর মার্কেট ও দক্ষিণ দিল্লির সাউথ এক্সটেনশনে আক্রমণ চালানো হয়।
তখন যারা ১১ নম্বর অমৃতা শেরগিল মার্গে বৈঠক করেছেন, দিল্লির রাস্তায় কী ঘটছে, তা বিস্মৃত ছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পতবন্ত সিংয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আরজান সিং যখন লোধি রোডের দিকে যাচ্ছেন, তিনি যখন রাস্তা সংযোগ টি-জংশনে, দুজন মানুষ তার দিকে ছুটে আসে। একজন তাকে সতর্ক করে দেয়, সর্দারজি এ পথে যাবেন না। দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে। ঠিক ২৫ মিনিট পর ৬টা ৫৫-তে প্রেসিডেন্ট জৈল সিং রাজীব গান্ধীর শপথ পরিচালনা করলেন, রাজীব প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মায়ের স্থলাভিষিক্ত হলেন।
সূর্যাস্তেও ১ কি ২ ঘণ্টা পর ডেপুটি কমিশনার (সাউথ দিল্লি) চন্দ্র প্রকাশ অনুভব করলেন, দিল্লির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি নয়াদিল্লি রেঞ্জের অতিরিক্ত কমিশনার গৌতম কাউলকে বললেন, কারফিউ ঘোষণা করতে হবে এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। প্রকাশ এর পর পরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লেখেন:
‘কাউল আমার সুপারিশ নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, কিছু সময় আগে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে নাকি একটি বৈঠক হয়েছে, যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিত ছিলেন আর সেখানে কারফিউ জারি না করার এবং এ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী না ডাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।’
তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিভি নরসীমা রাও, যিনি সাত বছর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন, দিল্লি পুলিশ তার কাছে রিপোর্ট করে। নিয়তির পরিহাস ১৯৮৪ সালের দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য তদন্ত কমিশন চন্দ্র প্রকাশকে দায়ী করে। রাতে দাঙ্গা নর্থ দিল্লিতে ছড়িয়ে পড়ে। একটি শুকনো ফলের দোকান ভেঙে ফেলে এবং লুটপাট করে। পুলিশ জনতাকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয় এবং দোকানের ক্যাশবাক্স নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেয়। কিছুক্ষণ পর সেন্ট্রাল দিল্লির পিলি কুঠি এলাকায় একটি কাঠের দোকানে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ শনাক্ত করে যে, স্থানীয় কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টির নেতারা দাঙ্গায় উসকানি দিচ্ছে।
১ নভেম্বর অপরাহ্ন: পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড
সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে দিল্লির আবাসিক এলাকাগুলোর শিখ অধ্যুষিত অংশে জনতার অবরোধ চলে। খুন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ চলতে থাকে। দিল্লি পুলিশ কার্যত সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে দানবীয় আত্মা গত রাত থেকে জেগে থেকে মৃত্যু-নৃত্য করে চলেছে আর অসহায়ের মতো দিল্লি তা দেখছে; সেই নৃত্য কোথাও কোথাও চলছে নরমাংস ভোজনের উদ্দীপনা নিয়ে।
হত্যাযজ্ঞের খবর শুনে আই কে গুজরাল রাষ্ট্রপতি ভবনে ফোন করলেন। খুব দ্রুতই জৈল সিং ফোন ধরলেন। তাদের কথোপকথন নিয়ে গুজরাল তার ডায়েরিতে লিখেছেন:
‘তাকে খুব বিপন্ন মনে হলো, তিনি তার অসহায়ত্বের দোহাই দিলেন। আমাকে অনুরোধ করলেন যেন আমি দিল্লির বিভিন্ন স্থানে যাই এবং সরকারের সাহায্য-সহযোগিতার দাবি জানাই।’
বেলা ১১টায় গুজরাল দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর পিজি গাভালকে ফোন করেন। সে সম্পর্কে তিনি লিখেছেন:
‘আমি সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব করি। গাভাল বললেন, তাতে আতঙ্ক সৃষ্টি হবে। আমি জবাব দিই, আপনি আতঙ্ক না ছড়ানোর কথা বলছেন কিন্তু সারা শহর যে আগুনে জ্বলছে।’
যাহোক, অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, আসলে গাভাল আগের দিন সন্ধ্যাবেলায়ই সেনাবাহিনী নামিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। চন্দ্র প্রকাশের সাম্প্রতিক একটি স্মারক থেকে এর সত্যতা পাওয়া যায়, যদিও পিভি নরসীমা রাও আতঙ্ক নগরীর আতঙ্ক নিরসনের দায়িত্বে ছিলেন, সব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে।
এর মধ্যে কূটনীতিবিদ গুরবচন সিং ১২টা ৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি জৈল সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি পেলেন। ঠিক হলো সবাই ১১টায় অমৃতা শেরগিল মার্গে একত্রিত হবেন। নিউ ফ্রেন্ডস কলোনিতে নিজের বাড়ির বাইরে জগজিত্ সিং অরোরা যখন বেরোনোর জন্য গাড়িতে উঠলেন, তার ড্রাইভার তাকে সতর্ক করল, বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না।
কিন্তু যে মানুষটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে হাঁটু গাড়তে বাধ্য করেছেন, তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল। সেখানকার গুরুদোয়ারা যে জনতা ঘেরাও করে রেখেছে, তা তো জেনারেলের জানা নেই, গাড়ি ঘুরিয়ে কলোনি থেকে বেরোনোর ভিন্ন পথ ধরে গতি বাড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছলেন।
মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে পুরনো দিল্লি সিস গঞ্জ গুরুদোয়ারায় শত শত শিখ আশ্রয় নিয়েছিল, জনতা তা ঘেরাও করে ফেলেছে। চাঁদনি চক থেকে গুরুদোয়ারার রেড ফোর্ট প্রান্ত পর্যন্ত জনতা (শিখদের বিরুদ্ধে) আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। গুরুদোয়ারার জাঠদার (স্থানীয় সম্প্রদায়ের নেতা) সবাই প্রতিহত করার জন্য অবস্থান নিচ্ছে। ডেপুটি কমিশনার ম্যাক্সওয়েল গ্যারেরার নেতৃত্বে এই দুই দলের মাঝখানে ছোট এ বাহিনী পুলিশ। তিনি পুলিশকে গুলি চালাতে নির্দেশ দিলেন, জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। একজনের মৃত্যু হলো, কিন্তু বেঁচে গেল শত শত জীবন। ঠিক এর উল্টোটা ঘটল ইস্ট দিল্লির ত্রিকোণপুর পুনর্বাসন কলোনিতে— ৫০০ জঙ্গি জনতাকে যজ্ঞ চালিয়ে যেতে দেয়া হলো— তারা একজন স্কুটারচালককে জীবন্ত পুড়িয়ে মারল। ২৬ নম্বর ব্লকের গুরুদোয়ারার সামনে দুজন পুলিশ মোতায়েন ছিল। একজন কলেজশিক্ষক তাদের কাছে সাহায্যের অনুরোধ করছিলেন। তারা সেখান থেকে চলে যায়। তখনই গুরুদোয়ারা আক্রমণ শুরু হয়।
১ নভেম্বর দুপুর ১২টা ৫: রাষ্ট্রপতির কাঁধ ঝাঁকি
নির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুযায়ী পাঁচ বিশিষ্ট শিখ রাষ্ট্রপতি ভবনে পৌঁছলেন। তারা উত্তেজিত। দিল্লির রাস্তায় যে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটছে, তারা তা রাষ্ট্রপতিকে বললেন। জৈল সিং তা নীরবে শুনে গেলেন। অরোরা পরামর্শ দিলেন— প্রেসিডেন্টের এখন জাতির উদ্দেশে রেডিও ও টেলিভিশনে বক্তৃতা দেয়া উচিত। পতবন্ত সিং অভিযোগ করলেন, তিন মূর্তি ভবনের সামনে যে প্ররোচনামূলক স্লোগান দেয়া হচ্ছে, দূরদর্শন তা প্রচার করে যাচ্ছে। শোধনের জন্য ইন্দিরা গান্ধীর মরদেহ সেখানে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মুখে খিল এঁটে রইলেন।
অরোরা বললেন, ‘আপনি সেনাবাহিনী নামাচ্ছেন না কেন?’ রাষ্ট্রপতি বললেন, তার সে ক্ষমতা নেই। ক্ষুব্ধ পতবন্ত সিং মন্তব্য করলেন, ‘জাতি যখন আগুনে জ্বলছে, প্রেসিডেন্টকে তো হস্তক্ষেপ করতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে কথা বলার জন্য আরজান সিং রাষ্ট্রপতিকে প্রলুব্ধ করতে চাইলেন। তিনি তাদের হতবাক করে দিয়ে বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ব্যস্ত। আমি যখন তিন মূর্তি ভবনে যাব, তার সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করব।’
রাষ্ট্রপতি তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাওয়ের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিলেন। রাষ্ট্রপতির একজন এডিসিকে ডাকা হলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোনে ধরার জন্য। কিন্তু জানানো হলো, তিনি মিটিংয়ে আছেন।
কেবিনেট সেক্রেটারিকে টেলিফোন করা হলো। একজন কর্মকর্তা লাইনে এলে অরোরা নিজের পরিচয় দিলেন। কর্মকর্তা বললেন, ‘জেনারেল একজন শিখের এ সময় বের হওয়াটা খুব বিপজ্জনক। কেবিনেট সেক্রেটারি কোথায় আমি জানি না। তারা ক্ষুব্ধ, সহানুভূতির লেশমাত্রও পাচ্ছেন না, তারা জৈল সিংয়ের সঙ্গে বসে ভাবছেন, তাহলে কী করা যায়। সোয়া ১টার সময় রাষ্ট্রপতির প্রেস সেক্রেটারি অরলোচন সিং হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকে খবর দিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেনাবাহিনী নামনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু জনতা তো খুনের নেশায় মেতে উঠেছে। নর্থ দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরীর আবাসিক ব্লকে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে, শত শত শিখকে হত্যা করা হয়েছে, অভিজাত সাউথ দিল্লির কলোনিও ছাড় পায়নি। ইস্ট দিল্লিতে জনতা ৩৬ নম্বর ব্লক থেকে ত্রিলোকপুরীর ৩২ নম্বর ব্লকে এসেছে। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ফেরার পর পতবন্ত সিং ও অরোরার সঙ্গে ১১ অমৃতা শেরগিল মার্গে এসে যোগ দিলেন আই কে গুজরাল। তিনজন সিদ্ধান্ত নিলেন তারা ৯ নম্বর মতিলাল নেহরু মার্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের বাড়িতে বলা-কওয়া ছাড়াই চলে যাবেন।
১ নভেম্বর অপরাহ্ন: রাওয়ের শীতল ভূমিকা
নরসীমা রাওকে দুশ্চিন্তাহীন দেখে তিনজনই অবাক হলেন। তিনি তাদের বললেন, ‘সন্ধ্যায় সেখানে সেনাবাহিনী থাকবে।’ লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীভাবে সৈন্য মোতায়েন করা হবে?’
অবিচলিত রাও জবাব দিলেন, ‘সেনা কমান্ডার এ উদ্দেশ্যে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা করবেন।’
ক্ষুব্ধকণ্ঠে অরোরা বললেন, ‘৩০ ঘণ্টা দেরি করে আপনারা আর্মি তলব করলেন!’
তিনি তারপর রাওকে পরামর্শ দিলেন, ‘আপনার প্রথম কাজ হবে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় করার জন্য একটি যৌথ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা।’
তার কথায় এতটুক বিচলিত না হয়ে রাও বললেন, ‘আমি ব্যাপারটা দেখব।’
বৈঠক শেষ হয়ে গেল। যে মানুষটি এত বছর ধরে মন্ত্রী, এটা বিস্ময়করই ঠেকল যে, যখন বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সহায়তার জন্য সেনাবাহিনী তলব করতে হবে, সে প্রক্রিয়াটি তিনি জানবেন না।
রাওয়ের এ নীরবতাকালীন ত্রিলোকপুরীর ৩২ নম্বর ব্লকের ১৯০টি বাড়ি পুড়িয়ে ভস্মীভূত করা হলো। মৃতের সংখ্যা ৪৫০। নারীদের ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে। কয়েকজনকে অপহরণ করে কাছাকাছি গ্রামে নিয়ে গেছে। সন্ধ্যায় সেনা ইউনিট দিল্লির রাস্তায় নামে। অরোরার অজান্তে দুজন সৈনিককে তার ফ্রেন্স কলোনির বাড়ি পাহারায় মোতায়েন করা হয়। তাদের কোনো অফিসার জেনেছেন যে, বাংলদেশে যুদ্ধের একজন নায়ক এখানে বসবাস করেন।
যাহোক, অরোরা বাড়ি ফিরে গেলেন না, গুজরাল ও তার স্ত্রীর কথায় তাদের বাড়িতেই রয়ে গেলেন। গুজরাল তার ডায়েরিতে লিখেছেন:
‘দিল্লি জ্বলছে। খবর পাচ্ছি লাশ নিয়ে ট্রেন আসছে। এটা ১৯৪৭ সালের মতো ঘটনা। জেনারেল অরোরা আমাদের সঙ্গে রাত কাটালেন। একাত্তরের এই বীর আর নিজের বাড়িতে ঘুমোতে গেলেন না।’
২ নভেম্বর সকাল: সেনাবাহিনী সব নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে
দিল্লির রাস্তায় সেনাবাহিনী দেখার পর লুটেরা ও বিশৃঙ্খলাকারীরা সাউথ দিল্লিতে বেরোনোর সাহস করেনি, যদিও ত্রিলোকপুরী, মঙ্গলপুরী ও যমুনার ধারে অন্যান্য আলোচিত হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত থাকল। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্টার পুলিশ কন্ট্রোল রুমে গিয়ে তাদের ত্রিলোকপুরীর হত্যাযজ্ঞের কথা বললে তারা হেসে ওঠে।
দিল্লিতে তুলনামূলক শান্ত অবস্থা বিরাজ করায় মানুষ তাদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের ভালো-মন্দ খোঁজখবর নিতে বেরিয়ে পড়ে। পতবন্ত সিং অবাক হয়ে দেখলেন, তার বাড়ির দরজায় ভাষ্যকার রমেশ থাপার ও সুইডেনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার রোল্ক গফিন। গফিন তাকে বললেন, ‘দিল্লি নিরাপদ নয়। আমরা আপনাকে আমাদের দূতাবাসে নিয়ে যেতে এসেছি।’
পতবন্ত সিং তাদের অনুরোধ আমলে নিলেন না। পরের কয়েক দিন নারী, পুরুষ এবং ছাত্রছাত্রীরা শরণার্থী শিবিরে কাজ করতে শুরু করেন। নাগরিক অধিকার গ্রুপের সদস্যরা তাদের প্রতিবেদন তৈরির জন্য প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষাত্কার নিতে শুরু করে, শেষ পর্যন্ত নেতাদের নামই বেরিয়ে আসে, যারা শিখদের আক্রমণ করার জন্য জনতাকে প্ররোচনা দিয়েছেন। ৩২ বছর পেরিয়ে গেলেও এই নারকীয় যজ্ঞ ও আক্রমণের পরিকল্পনাকারীরা রয়ে গেল বিচারের বাইরে, শাস্তির ঊর্ধ্বে।
পুনশ্চ
১০ দিন পর অরোরা, আরজান সিং ও গুজরাল রাজীব গান্ধীর সঙ্গে একটি সাক্ষাত্কার আয়োজনের জন্য কংগ্রেস মন্ত্রী রাজেশ পাইলটকে অনুরোধ করলেন। ২ ঘণ্টা রাজেশ পাইলটের বাড়িতে অপেক্ষা করার পর তারা একটি বার্তা পেলেন, ‘যদি রাজীব গান্ধীর সঙ্গে শোক প্রকাশে একাত্ম হতে চান, তাহলে শিগগিরই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা যাবে।’
বার্তাবাহককে অরোরা বললেন, ‘অবশ্যই আমরা শোক প্রকাশ করতে চাই। কিন্তু শিখদের কতটা যাতনা ও বিপন্নতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, আমরা তাকে এটাও জানাতে চাই এবং অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের কথাও বলতে চাই।’
বৈঠকটি বাতিল হয়। ক্ষমতাবানরা মানুষের যন্ত্রণার কথা শুনতে আগ্রহী নন। এটা ১৯৯২-৯৩ সালের মুম্বাই দাঙ্গা ও ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার বেলায়ও সত্য।






