সাহেদ সালমান প্রফেসর কাম গবেষক। প্রচুর কনসালটেন্সি ও করেছে; তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে। বাসার সুপ্রশস্ত ড্রয়িং রুমের তিন পাশে সুসজ্জিত সোফা সেট; এক পাশে একটা দোলনা; কাচের জানালায় তাকালে দেখা যায়, অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে মানুষ যাচ্ছে যে যার জায়গায়। মেহমান থাকুক আর না থাকুক, দোলনায় দুলে কথা বলা কিংবা বই পড়া তার খুব পছন্দ। ঠিক এ মুহূর্তে আলো-আঁধারি পরিবেশে দোলায়মান চেয়ারে বসে চিন্তায় মগ্ন। অবসরপ্রাপ্ত মানুষের মাথায় কাম-অকাম অনেক কিছু ভর করে; শিক্ষক বা গবেষক হলে তো কথাই নেই। সন্তান দুটোর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর থেকে ভুতুড়ে বাড়িটা যেন ঝিম ধরে আছে; হইচই নেই। বাড়িতে এখন শুধু সে ও স্ত্রী সেলিনা।

বাইরে ঝুম বৃষ্টি। আকাশ ভাঙা বজ পাত।

সাহেদ ভাবছে, শরত্কালে প্রবল বৃষ্টি নিশ্চয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। দেশে এখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। একে তো সদ্য বিদায়ী বন্যার ধকল সামলাতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে, তার ওপর লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ অনেকটা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা। বাংলাদেশ দরিদ্র কিন্তু দিল অনেক বড়; মানবতার জয় হোক। এমন অনেক বিষয় যখন মনের বাঁকে বাঁকে, ঠিক তখন হুড়কো স্ত্রী সেলিনা হুড়ুম করে ঢুকে করোটির চিন্তায় ছেদ ঘটাল; অন্ধকার রুমের সুইচটা অন করে একটা খোঁচাও মারল।

: অন্ধকারে বিড় বিড় করে কী যেন বলছিলে মেলিজার বাপ। কোন দোয়াদরুদ না ব্যাংক ব্যাল্যান্সের হিসাব?

: দিলে তো মুডটা অফ করে। তোমাকে বাতি জ্বালাতে কে বলেছে; কতবার বলেছি না যে, গভীর ভাবনার সময় আমার কাছে এসে ভ্যান ভ্যান করবে না। শাস্ত্র ঠিকই বলে, স্বভাব যায় না মলে; তুমি আর ঠিক হলে না সেলিনা।

দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে সাহেদ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে যে, অন্তত ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণকল্পে দাম্পত্য জীবন নিয়ে গভীর গবেষণা থাকা উচিত। শান্তি-অশান্তির প্রকার, প্রকোপ, পরিবর্তন, সার্বিক ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস দরকার। তার ধারণা, বাঙালি দাম্পত্য জীবনে শুধু হইচই করে ঠাণ্ডা মাথায় বিশ্লেষণ করে না না বলে সব বিপত্তি। তার প্রায়োগিক গবেষণায় দেখা যায়— ক. মাপের চেয়ে ছোট জুতা পরে দীর্ঘ পথ হাঁটা যেমন বিপদ, দুজনের বনিবনা না হলেও তেমন বিপদ; খ. ক্ষুদ্র আলপিনের খোঁচা যেমন টিটেনাসে মৃত্যু ঘটায়, তেমনি নামকাওয়াস্তে সমস্যা বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে; গ. এক হাতে এক হাত নেয়া যায়, কিন্তু একযোগ হওয়ার জন্য দুই হাত প্রয়োজন ও এক হাতে তালি বাজে না এবং ঘ. দাম্পত্য জীবনে নারী, বাড়ি ও গাড়ির কারণে যেমন অশান্তি থাকে (মারামারি, বাসন-গ্লাস ছোড়াছুড়ি, এমনকি খুন), তেমনি সামান্য কারণেও অনেক অশান্তি হতে পারে। এ ধাপে সামান্য বকাবকি, খুব বেশি হলে গো টু হেল বা গেট লস্ট-জাতীয় কিছু বলা। মোটকথা, শাউট অ্যান্ড আউট।

সাহেদ তার দাম্পত্য জীবনের স্মৃতির ঝাঁপি খোলে— গবেষণার বেজ লাইন ও এন্ড লাইন ডাটার পার্থক্য প্রায় চার দশক!

বিয়ের প্রথম দু-এক মাস তাদের খুব ভালো কেটেছিল। এক-আধটু মান-অভিমান যে হয়নি তা নয়। তবে পাশাপাশি রাখা পাতিলের মতো— বাতাসেও ঠোকা খায়। যেমন বাসর রাতে সেলিনার ছোড়া প্রথম বাক্য, ‘কবে যাব, মা-বাবার জন্য মনটা কাঁদে’ শুনে সাহেদের বড্ড রাগ ধরেছিল। এ আবার কেমন কথা। বাসর রাত হবে ক্যাবিনেট বা সিন্ডিকেটের বিশেষ সভার মতো। শুধু একটা এজেন্ডা থাকবে— শুধু দুজন দুজনার। অথচ সে কিনা টানছে মা-বাবা। প্রথম রাতে বিড়াল মারতেই হয় বিধায় মৃদুমন্দ দু-এক কথা শুনিয়েছিল সেলিনাকে।

প্রফেসর আর গবেষকদের কাজ লেখাপড়া, কিন্তু যেই না সাহেদ বই-খাতা-কলম নিয়ে বসত রাতবিরাতে, অমনি ঘটত ‘আজরাইলের’ আগমন—

: বিয়ে বাড়িতে লম্বা চুল, টানা চোখের মহিলা তোমার দিকে বারবার তাকিয়ে ছিল কেন?

 : (চোখ না তুলে) সেটা বরং ওই মহিলাকে জিজ্ঞেস করলে ভালো হয় না?

: কেন, তুমি বললে দোষ কোথায়। সুন্দরী মহিলা দেখলেই তো হাঁ করে তাকাও আর আগ বাড়িয়ে কথা বলো, আমি দেখি না ভেবেছ?

: আল্লাহতায়ালা চোখ দিয়েছেন দেখতে আর মুখ দিয়েছেন বলতে, দোষ কোথায়?

: না, আমার স্বামী এমন বেহায়া হোক, তা আমি চাই না।

: তাহলে তো তোমার ‘কলুর বলদ’ বিয়ে করা উচিত ছিল। যে বলদ কথা কয় না আর চোখে পট্টি বাঁধা থাকে, যাতে দেখতে না পায়।

: গো টু হেল...

: গেট লস্ট।

এমনিভাবে এ-যাবত্কালের ঝগড়াঝাঁটি মোটামুটি ‘বৈজ্ঞানিক’ সূত্র ধরে এগিয়েছে। প্রথম দিকে সে বলেছে বউ শুনেছে, তারপর বউ বলত সে শুনত এবং একসময় এসে গেল যখন তারা দুজন বলত পাড়ার সবাই শুনত। সাহেদ এর নাম দিয়েছেন ‘থিওরি অব কঞ্জুগাল কনফ্লিক্ট’।

বিদেশে গিয়ে একটা চিঠিকে কেন্দ্র করে তাদের দাম্পত্য জীবনে প্রথম ‘মহাযুদ্ধ’ বাধল। সেলিনা বিদেশে আসার আগে শ্বশুরকে সাহেদ অনুরোধ করেছিলেন বিমানের টিকিট কেটে দিতে। কিন্তু সেটা না করে শ্বশুর মশায় সাহেদের বাপকে লিখেছেন খরচ শেয়ার করতে। কফি বানাতে বানাতে সাহেদ নিম্নস্বরে বলল, ‘আসলে শ্বশুরের উচিত হয়নি আমার আব্বাকে টিকিটের খরচ শেয়ার করতে লেখা। কথাটা শোনামাত্র সেলিনা ফোঁস করে উঠল। অক্ষীকোটর স্ফীত হয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘বিস্মিত চাহনিখানি বস্ফািরিত কালো দুটি চোখে’, চিত্কার করে বলল, ‘ভুল করেছেন তোমার বাবা; সামান্য কিছু টাকা দিতে পারল না, ছিঃ ছিঃ।‘ বলা বাহুল্য, সেদিন মাথায় রক্ত উঠলে যা হয় তা-ই হয়েছিল।

এরপর মাঝেসাঝে শপিং নিয়েও ঝগড়াঝাঁটি হতো। সবাই বউ নিয়ে কেনাকাটা করতে বেরোয়, কিন্তু সাহেদ যেত কদাচিত্। তাও গলায় দড়ি পরিয়ে অনিচ্ছুক ঘোড়াকে পানি খাওয়ানোর মতো। অভিযোগের অন্ত নেই। ‘নিজের বউ খুব কাছে তো, তাই মর্যাদা বুঝলা না; ভাবিদের দেখলেই খুব সুন্দর লাগে তাই না...। আমি সব দেখি, তোমার চোখ কই কই যায়...?’ সেলিনার সন্দেহবাতিক সাহেদের সংসারে শুধু হুল ফুটিয়ে চলে। তৃতীয় ‘মহাযুদ্ধে’র সূত্র বিয়ে-শাদিতে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে। সেলিনা এগুলোকে সমাজ রক্ষায় ‘ফরজ’ কাজ হিসেবে ভাবে। সাহেদ মনে করে, এসব আনুষ্ঠানিকতা মূল্যবান সময়ের অপচয়মাত্র। তাই ফরজ তো দূরে থাক, এগুলো নফলও না।

এমনি করে কাটে বহু বছর। কাহাতক। আজ এটা তো কাল ওটা; সকাল নয়তো সন্ধ্যায়; দিনে নয়তো রাতে, ড্রয়িং রুমে নয়তো শোয়ার ঘরে, বাড়িতে নয়তো গাড়িতে। একবার সাহেদ ভেবেছিল, সন্তান আসার পর পরিস্থিতি পালটাবে, কিন্তু বিধি বাম। যে লাউ সেই কদু। এবার বরং মহিলার যুদ্ধংদেহী ভাবটা প্রকট আকার ধারণ করে। যেন বলতে চাইল, ‘বারে বারে সাহেদ তুমি খেয়ে যাও ধান... এবার তিনজনে মিলে বধিব পরান।’ তবে আশার কথা এই যে, সন্তানরা বড় হয়ে ‘বর’ হয়ে ধরা দেয়; রেফারির বা আম্পায়ারের ভূমিকায় নামে; লাল কার্ড, হলুদ কার্ড দেখায়, এমনকি সিজফায়ার ঘোষণা করে। ঝগড়াঝাঁটির আপতন নিম্নমুখী করে।

হঠাত্ খসখস আওয়াজ, দরজায় আলতো শব্দ কানে ভাসে। ‘কে ওখানে’ বলতেই দেখে, ওষুধ হাতে সেলিনা। মেয়েরা নেই তুমিও দেখছি চুপচাপ, আমি কী করে সময় কাটাই বলো। সাহেদের চোখে ওষুধের ড্রপ দিতে দিতে বলল, ‘সেই কখন থেকে আলো নিভিয়ে কী যেন ভাবছ; চলো খাবে না; আজ সকালে নাশতা খাওয়ার আগে এক মিলিগ্রামের এমিরিল ট্যাবলেটটা খেয়েছিলে তো?’

বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে আর সাহেদ গুন গুন করে গাইছে, ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী, উড়ে চলে দিগিদগন্তের পানে/।’ সেলিনা সাহেদের বাঁ হাতটা আলতো কোমরে রেখে কণ্ঠ মেলায়, ‘নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণবরর্ষণসঙ্গীতে/ রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম।’

অবাক সাহেদ অপলক নেত্রে সেলিনার দিকে তাকায়।

: আচ্ছা সেলিনা, তুমি আজকাল এত বদলে গেলে কী করে?

: তুমিও তো কম বদলাওনি সাহেদ।

: যেমন?

চশমাটা খুলে শাড়ির আঁচলে চোখের কোণে জমা জল মুছতে মুছতে সেলিনা কারণ ব্যাখ্যা করে—

: এই ধরো আজকাল আমাকে বিদেশ নিয়ে যাও, মাঝে মধ্যে র্যাডিসন, রিজেন্ট, লা মেরিডিয়ানে ট্রিট দাও; আমার যাতে কষ্ট না হয়, সেজন্য সকালে নিজে নাশতা বানিয়ে খাও, রাতে আমার ইনসুলিন আর খাবারের ব্যবস্থা করো— বলতেই সাহেদ সেলিনার মুখ আলতো চেপে ধরে।

: অর্থাত্ রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে চাইছে, ‘রাত্রিদিন ধুক ধুক তরঙ্গিত দুঃখসুখ, সব গেছে চুকে।’

: না, বলতে চাইছি, ‘দিবে আরে নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে।’ আগে মোটেও আমাকে নিয়ে ভাবতে না, পাত্তা দিতে না, সম্মান দিতে না। আর এখন সেই তুমি আমাকে নিয়ে ভাবো। তাই তো পড়ন্ত এই কালে তোমার আমার ভালোবাসা পড়ন্ত বিকালের মোলায়েম রৌদ্রের মতো। যৌবনে নাই বা দিয়েছ, ক্ষয়িষ্ণু হোক, জীবন তো পড়ে আছে। বেটার লেট দ্যান নেভার।

হঠাত্ আকাশ ফাটা বজ্রপাতে বিদ্যুত্ চলে যায়। আশ্লিষ্ট হয়ে সেলিনা সাহেদের বুকে মুখ লুকায়। এক ঘোর প্রেম অন্ধের মতো দুজনকে অন্ধকারে গ্রাস করে।

সাহেদ: ভালোবাসার বয়স আছে?

সেলিনা: ওম শান্তি, শান্তি ওম।