আমি বড় হয়ে উঠছিলাম সাধু মিষ্টি ভাণ্ডারের ওপরের এক ঘরে, কোতোয়ালি থানার পাশ দিয়ে একটু এগিয়ে গেলেই রঙ্গম সিনেমার গায়ে লাগোয়া আবদুর রহমান স্মৃতি পাঠাগার, তার উল্টোদিকের ফুটপাতে বইয়ের পসরা— তখন ক্লাস থ্রি কি ফোরে পড়ি; আর তখন থেকেই বইয়ের প্রেম। বিশেষ করে পুরনো বই। কেননা নতুন বই টাকা হলেই আপনি কিনতে পারেন, তাতে আবিষ্কারের কোনো ‘থ্রিল’ নেই।

২৫-২৬ বছর ধরে সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, সুপারমল আর কাপড়ের কারখানা হয়ে যাচ্ছে, হচ্ছে হোটেল, একজন দিদিকে এক দাদার হাত ধরে রঙ্গম সিনেমায় সিনেমা দেখতে দেখতাম নিয়মিত। একদিন দেখলাম হল ভেঙে তৈরি হওয়া হোটেলে যাচ্ছেন, একা। এসব নগরায়ণের ফল, হয়তোবা।

তা কম বই কিনিনি এমদাদ ভাইয়ের কাছ থেকে। পুরনো বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে বসে থাকা ক্ষয়াটে তরুণটি আদতে দার্শনিক। বলছিলেন একদিন, বোত দিন বড় মানুষ ন মরের (অনেকদিন বড় মানুষ মরছেন না)। বিস্মিত হয়ে কারণ জিজ্ঞেস করলে আরো করুণ মুখে বললেন, বড় মানুষ ছেলেমেয়ে মানুষ করতে পারে না, আর তার সংগ্রহের জিনিস ভাঙারির দোকানে চলে আসে। হাসি ছাড়া উপায় কি।

****

সূর্যাবর্ত। একটি সংকলন। হার্ড কভার বাঁধাই। প্রকাশ হয়েছিল রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের বছর, ‘নতুন সাহিত্য ভবন’ থেকে অনিলকুমার সিংহের সম্পাদনায়। প্রচ্ছদ: পূর্ণেন্দুশেখর পত্রী। তখন ‘কথোপকথন’-এর কবি ও ‘ছেঁড়া তমসুক’-এর (ইউটিউবে আছে) অসামান্য নির্মাতা ‘শেখর’ শব্দটি ব্যবহার করতেন। ২৪টি প্রবন্ধ আছে এবং লেখক তালিকায় কে আছেন জিজ্ঞেস করার আগে কে নেই বলাটা সহজতর। শুরু হচ্ছে বুদ্ধদেব বসুকে (রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক) দিয়ে আর শেষ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত (উপন্যাসের চরিত্র ও রবীন্দ্রনাথ)। রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত কবিতা লিখেছেন: অমিয় চক্রবর্তী, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, জীবনানন্দ দাশ, প্রেমেন্দ্র মিত্র। উপরি পাওনা বেশ কয়েকটা পূর্ণ পৃষ্ঠা বহু বর্ণে পেন্টিং। গোটা তিরিশেক টাকায় এ ২০০ পৃষ্ঠার আকর গ্রন্থ আমার হাতে আসে।

***

দ্য বেল জার। সিলভিয়া প্লাথের আত্মজীবনীমূলক একমাত্র উপন্যাসটির ব্যান্টাম বুক (১৯৭১) পেপারব্যাক সংস্করণ কিনেছিলাম ১০ টাকায়। সিলভিয়ার আঁকা কয়েকটি স্কেচ বইটির সম্পদ। আমার ইহজীবনে পড়া একমাত্র ইংরেজি ভাষার বই, যা আমি উন্মাদ দশায়ও ভুলব না।

***

দ্য পোয়েটস কর্নার। বইটা প্রকাশ হয়েছিল ১৯২৯ সালে গ্রেট ব্রিটেন থেকে। ১০০টা অতিজনপ্রিয় ইংরেজি কবিতার সংকলন এ বই। কারো কারো জনপ্রিয়তা এ শতাব্দীপ্রাচীনতায় ঝরে গেছে। তবু এর সম্পাদনা ও মুদ্রণ অন্য রকম।

***

রামকিঙ্কর বেইজ। এ মহত্ শিল্পী অসংখ্য গ্রন্থের উপাদান হয়েছেন। যেমন দুটি মহাগ্রন্থ: দেখি নাই ফিরে (সমরেশ বসু) ও রঙ কাঁকর রামকিংকর (মণীন্দ্র গুপ্ত)। এ দুটির বাইরে একটি দুষ্প্রাপ্য মহাগ্রন্থ ফুটপাতের দেবতা আমাকে দিয়েছেন। এ মুখার্জী অ্যান্ড কোং প্রাইভেট লিমিটেড থেকে প্রকাশ দাসের সম্পাদনায় রামকিঙ্কর বেইজ বইটি প্রকাশ হয় ১৯৮৯-এর জানুয়ারিতে। ৩৬৮ পাতার এ বইয়ের প্রচ্ছদ পূর্ণেন্দু পত্রীর। নানা ভাগে লেখাগুলো সাজানো। যেমন: শিল্পীর কয়েকটি রচনা, সাক্ষাত্কারগুচ্ছ, শিল্প ও নিজের সম্পর্কে শিল্পীর উক্তি, নিকটজনের চোখে রামকিঙ্কর, বিশিষ্ট শিল্পী ও শিল্প আলোচকদের নির্বাচিত প্রবন্ধ (যেমন জয়া আপ্পাস্বামী, কে জি সুব্রামনিয়াম, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় প্রমুখ) এ সময়ের চিত্রী ও ভাস্করদের চোখে এ অংশে আলোচনা করছেন সত্যজিত্ রায়, চিন্তামণি কর সোমনাথ হোর প্রমুখ। রামকিঙ্কর রচিত ভাস্কর্য ও চিত্রপ্রতিলিপি ও চিঠি— এসব তো আছেই।

বলুন, শিল্প আগ্রহীর পক্ষে মহাভোজ নয়?

***

সব্যসাচী। প্রকাশক সৈয়দ রাজা হুসাইন। ১৯৮৪ সালে সৈয়দ শামসুল হক রচিত ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ গ্রন্থটি প্রকাশ হয়েছিল। প্রচ্ছদ লেখকের নিজের। আলোচিত এ বইটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ‘মিশ্রগদ্য’ নামে লেখকের অন্য এক বইয়ের সূত্রে জানা যায়, বইটি লেখকের প্রথম কম্পিউটার কম্পোজ করা বই এবং বাংলাদেশের কোনো লেখকের পক্ষেও প্রথম ওইভাবে লিপিবদ্ধ বই। প্রকাশনা মান এ ৩৩ বছর পরও ঈর্ষাজাগানিয়া। আমরা এখনো এ মানে নিয়মিতভাবে পৌঁছা প্রকাশনা খুব কম দেখি।

***

এখন আমাদের নগরপিতা নগরের রাস্তার সৌন্দর্যবিধান করছেন— ফুটপাতে ফুলের দল উধাও। অল্প পয়সায় বই কেনার স্বর্গীয় আনন্দ উধাও। নইলে ধরুন, জামালখান মোড়ে ডাস্টবিনটার পাশেই খাস্তগীর স্কুলের উল্টো দিকে যে শ্যামলা কিশোর বসত, তাকে আর দেখি না কেন! তার কাছ থেকেই তো কিনেছিলাম মেকিং অব শিন্ডলার’স লিস্ট নামে একটি বহু ছবিওয়ালা বই, যাতে ওই ক্ল্যাসিক ফিল্মের আদ্যোপান্ত আছে। কিংবা আখতারুজ্জামান টাওয়ারের সামনের ফুটপাতেও পাশাপাশি দুটি বইয়ের পসরা দেখি না। দেখি না এখন নিউমার্কেটে হোটেল জামানের সামনের ছোট্ট ছেলেটাকে। সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্র গল্প সংকলন বুধবার রাতে তো তার কাছ থেকেই কেনা। এমন গল্প সংকলন তো অজগ্র হয় না। হয় না আনোয়ার পাশার ক্ল্যাসিক এবং ততটা অনালোচিত উপন্যাস নীড় সন্ধানী তো তার কাছ থেকেই নেয়া।

***

একদিন এক পুরনো কাগজের দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। স্তূপের ভেতর নিচের দিকে একটি কালো কোনা খুব সন্দেহজনক মনে হলো। এগিয়ে গিয়েছিলাম, পিছিয়ে এসে টান দিয়ে দেখি, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত সম্পাদিত বিভাব পত্রিকার টুকরো কথা সংকলন। আমি আনন্দে আরেকটু হলেই ধড়াম করে শয়ান হতাম। একটু বলি, টুকরো কথার গল্প। দিলীপকুমার গুপ্ত যখন সিগনেট প্রেস প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার চারপাশে সব তরুণ বটের চারা। সত্যজিত্ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। মাথার ওপর কমলকুমার। উনি ডিসপ্লে সাজাতেন সিগনেটের শোরুমের। দিলীপকুমার বা ডিকে হচ্ছেন এমন একজন মানুষ, যার কথা বাংলাদেশের বেশি মানুষ জানেন না। যেমন জানেন না চট্টগ্রামের অধুনাবিলুপ্ত ‘দি আর্ট প্রেস’-এর শফি সাহেবের কথা। শফি সাহেবের ভূমিকা ও নিউমার্কেটে তার ছোট বইয়ের দোকান ‘বইঘর’-এর মতো উজ্জ্বল দোকান আমি দেখিনি। অসীম রায়ের আবহমান, শামসুর রাহমানের স্মৃতির শহর এসবের কী দুর্দান্ত প্রকাশনা ছিল, হাতে না নিলে বোঝা যাবে না। উচ্চমানের একটি শিশুকিশোর মাসিক প্রকাশ হতো এ প্রকাশনা থেকে। চট্টগ্রাম কি ছিল আর কি হলো!!! সে যাক, ছিলাম ডিকের কথায়। এ ভদ্রলোক করলেন কি, সিগনেট প্রেস থেকে বইয়ের খবর দিয়েই শুধু প্রকাশ করলেন টুকরো কথা, সম্পাদক হলেন নরেশ গুহ (আহা! ‘দুরন্ত দুপুর’-এর এ কবির লেখা কি এখন আমাদের প্রজন্ম পড়ে!), পত্রিকাটি বিনামূল্যে বিতাড়িত (বিতরিত) হতো। থাকত সাহিত্যসংক্রান্ত ধাঁধা। পুরস্কার: বই। এখন এত বছর পেরিয়ে এসে কোনো প্রকাশক এভাবে ভাবতে পারেন ভাবুন তো!! অনুবাদ সাহিত্যের কথা যদি বলেন, একটি মাত্র উদাহরণ দিই। এরিখ মারিয়া রেমার্কের থি কমরেডস অনুবাদের সিগনেটের ১৩৬৪ বঙ্গাব্দের তৃতীয় সংস্করণ হাতে নিন। অনুবাদক: হীরেন্দ্রনাথ দত্ত। নামপত্র: সত্যজিত্ রায়। মলাট: অভিজিত্ বড়ুয়া। ৪৯৪ পৃষ্ঠার এ হার্ড কভার বইয়ের দাম ছিল ৫ টাকা, যা সে আমলের তুলনায়ও কম। কেননা প্রকাশক বই প্রকাশ করাটা নিছক ব্যবসা ভাবতেন না। বিভাব পত্রিকার টুকরো কথা সংকলনটি সমগ্র বাংলা সাহিত্যের সম্পদ।

***

নগরায়ণ হোক। ফুটপাতে ফুলের দলও বিকশিত হোক। বাঁচুক বহু স্বর। এসি রুমে ক্রেডিট কার্ডে ঝট করে বই কেনার কোনো আনন্দই পাই না আমি। বয়স কম হলেও একটু পুরনো ঘরানার মানুষ। যেমন: নলিনীকান্ত ভট্টশালীর Iconography of Buddhist and Brahmanical Sculptures in the Dacca Museum বইয়ের ১৯২৯ প্রথম সংস্করণ সংগ্রহের আনন্দের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা তো আমি খুঁজে পাইনি।