মৌর্য সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটেছিল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সে সাম্রাজ্যের সম্রাট, কিন্তু যে মানুষটি এ চন্দ্রগুপ্তের পেছনে থেকে যাবতীয় কর্ম সম্পাদন করেছিলেন, তিনি কৌটিল্য। কৌটিল্য ছিলেন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের শিক্ষক। কৌটিল্য আর চন্দ্রগুপ্ত মিলে তৈরি করেছিলেন ভারতবর্ষের ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত সাম্রাজ্য। একই সঙ্গে কৌটিল্য রচনা করেছিলেন অর্থশাস্ত্র। রাজনীতি, কূটনীতি ও কূটকৌশলে দুনিয়ায় পাশ্চাত্য মনীষারই প্রাধান্য দেখা যায়। সেখানে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ব্যতিক্রম। রাষ্ট্র পরিচালনায় এ গ্রন্থকে পশ্চিমে এখনো প্রাসঙ্গিক ও জরুরি বলে গণ্য করা হয়।

অর্থশাস্ত্র নাম শুনে মনে হতে পারে, এটি একটি অর্থনীতিবিষয়ক গ্রন্থ। হ্যাঁ, তা এ বইয়ে আছে, তবে সেটাই সব নয়, বরং একটি অংশমাত্র। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র তাহলে কী? এক কথায় রাজ্য বা রাষ্ট্র পরিচালনার বিজ্ঞান। সম্পদ এখানে রাজ্য শাসনের দায়িত্বের সঙ্গে সমার্থক। অর্থ মানে সম্পদ অর্থাত্ জাগতিক সম্পদ। এ সম্পদের বিস্তৃত অর্থে এর মধ্যে যুক্ত হয় রাজনৈতিক ক্ষমতা। আধুনিক যুগে অর্থনীতি ও রাজনীতিকে ভিন্ন শাস্ত্র হিসেবে আলোচনা করা হয়। কিন্তু অর্থ বলতে রাজনীতি ও অর্থনীতিকে পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত একটি বিষয় বলেই বিবেচনা করা হয়। অর্থশাস্ত্রের কিছু অংশে অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তার বাইরে অনেক অংশে আলোচিত হয়েছে রাজনৈতিক কলাকৌশল। কিন্তু এর সত্যিকার পাঠকদের কাছে অর্থশাস্ত্র মানে অর্থনীতি।

অর্থশাস্ত্রকে বর্ণনা করতে গিয়ে পণ্ডিতরাও নানা বিশেষণ ব্যবহার করেছেন। আরপি কাংলে অর্থশাস্ত্রকে বলেছেন, ‘সায়েন্স অব পলিটিকস’; এএল ব্যাশাম বলেছেন, ‘ট্রিটিজ অন পোলাইটি’; বিশিষ্ট ভারতীয় ইতিহাসবিদ ডিডি কোসাম্বী বলেছেন, ‘সায়েন্স অব ম্যাটারিয়াল গেইন’; জিপি সিং লিখেছেন, ‘সায়েন্স অব পোলাইটি’ আর রজার বোয়েশে বলেছেন, ‘সায়েন্স অব পলিটিক্যাল ইকোনমি’।

আধুনিক পাটনার কাছে পাটালিপুত্রে ছিল মৌর্যদের রাজধানী। দিল্লি তখনো ভারতবর্ষের ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠেনি। চন্দ্রগুপ্ত আলেকজান্ডারের উত্তরসূরি সেলুকাস নিকাতরকে পরাজিত করে ভারতবর্ষকে গ্রিকদের আধিপত্য থেকে রক্ষা করেন। আফগানিস্তানও তখন মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীন। মৌর্য সাম্রাজ্য গড়ে ওঠার পেছনের ইতিহাস খুঁজলে শুধু একটি নামই পাওয়া যাবে, তিনি কৌটিল্য। সহজ ভাষায় তিনি ছিলেন কিং মেকার। বাল্যকালেই তার প্রতিভা, জেদ ও অহঙ্কার— সব বৈশিষ্ট্যই প্রকাশ হয়েছিল আর এ তিন বৈশিষ্ট্যের পরিণামই মৌর্য সাম্রাজ্য। তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তক্ষশীলায়। মা মারা যাওয়ার পর উপার্জনের উদ্দেশ্যে তিনি রাজধানী পাটালিপুত্রে যাত্রা করেন। ভারত শাসন করছিলেন শিশু নাগবংশীয় রাজা ধনানন্দ। কৌটিল্য বিনা আমন্ত্রণে ধনানন্দের দরবারে পণ্ডিতদের সঙ্গে বিতর্ক করতে হাজির হন। তিনি নিজেকে শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত বলে দাবি করে অন্যদের তার সঙ্গে বিতর্ক করতে আহ্বান করেন। কিন্তু রাজা তার এ অহমে ক্রুদ্ধ হন এবং তাকে দরবার থেকে অপমান করে বহিষ্কার করেন। কৌটিল্য তখন শপথ করেন, ‘আমি যদি ব্রাহ্মণ হই, তবে এ শিখা আমি উন্মোচন করলাম। নন্দ বংশের ধ্বংস না করা পর্যন্ত আমি শিখা বন্ধ করব না।’ নন্দরাজ কর্তৃক কৌটিল্যের অপমান হওয়ার আরেকটি কাহিনী আছে, যেখানে কুিসত দর্শন কৌটিল্যকে রাজার নির্দেশে টিকি ধরে অপমান করা হয় এবং অপমানের বদলা নিতে কৌটিল্য প্রতিজ্ঞা করেন। প্রচলিত একটি মত অনুসারে, কৌটিল্য অর্থশাস্ত্র রচনা করেছিলেন নন্দ বংশকে উত্খাত করার হাতিয়ার হিসেবে। অর্থাত্ মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই অর্থশাস্ত্র রচিত হয়েছিল। চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসন আরোহণ নিয়ে বিশাখা দত্ত রচিত মুদ্রারাক্ষসে এমন অনেক বিষয় পাওয়া যায়, যা মূলত কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকেই নেয়া হয়েছিল।

 &dquote;আধুনিক

এমনকি বাংলাভাষী অনেক সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা রয়েছে যে, কৌটিল্যের এবং নেতিবাচক অর্থে ‘কূট’ শব্দটি সমার্থক। যদিও এর কোনো বাস্তবিক ভিত্তি নেই। কৌটিল্য নামটি মোটেই ‘কূট’ থেকে আসেনি, বরং কৌটিল্য ছিল তার গোত্রনাম এবং এ নামই সামান্য পরিবর্তিত রূপে তার পরিচয় হয়ে ওঠে। টমাস আর ট্রটম্যান দেখিয়েছেন, শুরুর দিকে কৌটাল্য নামটিই প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে বানান পরিবর্তিত হয়ে আর্যসুর, বিশাখদত্ত ও বাণের রচনায় কৌটিল্য বানানটি হাজির হয়। কৌটিল্যের আরেক নাম চাণক্য। অর্থশাস্ত্র ছাড়াও কৌটিল্যের আরো একটি জগদ্বিখ্যাত কাজ আছে, যার নাম কামসূত্র। সচরাচর বাত্সায়নের কামসূত্র নামে পরিচিত। এছাড়া তিনি বিষ্ণুগুপ্ত নামেও পরিচত। কৌটিল্য ও চাণক্য একই ব্যক্তি কিনা, তা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিতর্ক হয়েছে, এখনো আছে অনেকের মধ্যে। তবে প্রাচীন উত্সগুলো জানায়, তারা একই ব্যক্তি ছিলেন। খোদ অর্থশাস্ত্রের একটি অংশ দিয়েই এ বিতর্কের অবসান করা যায়। অর্থশাস্ত্রে উল্লেখ আছে: ‘এ বিজ্ঞানের লেখক অপমানবোধ থেকে নন্দ রাজার নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূমি, অস্ত্র ও বিজ্ঞান দখল করেছিলেন।’ অনেকে অবশ্য যুক্তি তোলেন, এত বড় পরাক্রমশালী মৌর্য সাম্রাজ্যের কথা কিংবা সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত বা রাজধানী পাটালিপুত্রের কথা কেন একবারও এল না কৌটিল্যের লেখায়? এর উত্তরে বলা যায়, সেকালে আর্থশাস্ত্র কোনো নির্দিষ্ট রাজা বা রাজ্যকে উদ্দেশ্য করে লেখা হতো না। বরং লেখা হতো একজন আদর্শ রাজার কল্পনা থেকে।

মৌর্য সাম্রাজে একটি সংগঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও প্রশাসন গড়ে উঠেছিল, যার মাস্টারমাইন্ড কৌটিল্য। রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে তিনি রচনা করেছিলেন বিখ্যাত অর্থশাস্ত্র। একটি রাষ্ট্র কীভাবে গড়ে উঠবে, তার প্রায় সব বিষয়ে কৌটিল্য তার মনীষার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। আজ থেকে প্রায় ২ হাজার ৩০০ বছর আগেই তিনি রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বাণিজ্যের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। বন্দর ও মহাসড়কে তদারকির জন্য কর্মকর্তা নিয়োগের বিধান রেখেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্য বিস্তার। এমনকি নিজের দেশে কোনো পণ্য দক্ষতার সঙ্গে উত্পাদন করা না গেলে সেগুলো তিনি বিদেশ থেকে আমদানির নীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। সবই লিপিবদ্ধ আছে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে। অনেকে কৌটিল্যকে ম্যাকিয়াভেলির সঙ্গে তুলনা করেন। অর্থাত্ কৌটিল্য ভারতের ম্যাকিয়াভেলি। কিন্তু সম্প্রতি এ তুলনার অসারতা নিয়ে কথা বলছেন অনেকে। সঞ্জীব স্যানাল লিখেছেন, ‘ঔপনিবেশেক আমলের এ বিশেষণ ভুল। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন ফ্লোরেন্সের একজন রাজনৈতিক উপদেষ্টা। অন্যদিকে কৌটিল্য ছিলেন প্রাচীন দুনিয়ার অন্যতম বৃহত্ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। ম্যাকিয়াভেলির লেখা সীমাবদ্ধ ছিল বিবেকহীন, এবং যেকোনো উপায়ে ক্ষমতা দখল ও বজায় রাখা। এর বিপরীতে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের মূল মনোযোগ ছিল প্রশাসনের ওপর। চক্রান্ত ও গুপ্তচরদের কথা এসেছে ক্ষেত্রবিশেষে, কিন্তু সেটা এসেছে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার বৃহত্তর স্বার্থে। পুরো বইটি মূলত কর ব্যবস্থা, পৌর আইন, আইন ব্যবস্থা, সম্পত্তির অধিকার, শ্রম আইনসহ আরো অসংখ্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে।’

মার্কিন কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হেনরি কিসিঞ্জার তার ওয়ার্ল্ড অর্ডার গ্রন্থে অর্থশাস্ত্রের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, অর্থশাস্ত্রে ক্ষমতার প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে, যা রাজনীতির ‘মুখ্য সত্য’। কিসিঞ্জারের মতে, ম্যাকিয়াভেলির প্রিন্সের বহু বছর আগেই অর্থশাস্ত্রে রাজনীতি নিয়ে বাস্তববাদী রূপকল্প উপস্থাপন করা হয়েছিল। কৌটিল্যকে কিসিঞ্জার ‘ম্যাকিয়াভেলি ও ক্লজউইটজ’-এর সমন্বয় হিসেবে দেখেছেন। আর জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার বলেছেন, অর্থশাস্ত্রের তুলনায় ম্যাকিয়াভেলির প্রিন্স নিতান্ত নখদন্তহীন।

&dquote;অর্থশাস্ত্রে কৌটিল্য অর্থকে বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাখ্যা করেছেন ব্যক্তিসম্পদ থেকে রাজার কোষাগার পর্যন্ত। মৌলিক ধারণাটি হচ্ছে ব্রত্ত— অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে সমার্থক সংস্কৃত শব্দ। আরো নির্দিষ্ট করে বললে এ হচ্ছে জীবিকা (বৃত্তি) নির্বাহ অথবা পণ্য উত্পাদন। কৌটিল্য এ উত্পাদনের তিনটি শাখার কথা বলেছেন— কৃষি, খামার ও বাণিজ্য। এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই উত্পাদন করে শস্য, পশু, নগদ অর্থ, কাঁচামাল ও শ্রম। অর্থশাস্ত্রে অর্থের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তার প্রথম বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে জীবিকা:

মানুষের জীবিকার (বৃত্তি) উত্স হচ্ছে অর্থ, অন্য কথায় এ পৃথিবী যেখানে মানুষ বসবাস করে। এ পৃথিবীকে ভোগ ও রক্ষার বিজ্ঞানই হচ্ছে অর্থশাস্ত্র।

সূত্রটিতে অর্থকে তিনটি ধাপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে— প্রথমত. জীবিকার তাগিদে মানুষের করা উত্পাদন, দ্বিতীয়ত. মানুষের আবাস এ পৃথিবী যেখানে তারা জীবিকা নির্বাহ করে এবং তারপর এ উত্পাদনক্ষম পৃথিবী রাজা কর্তৃক শাসন ও সুরক্ষা। এভাবে সম্পদ রাজার শাসনে তার চূড়ান্ত অর্থ খুঁজে পায়, কারণ একজন রাজার শাসনেই উত্পাদনক্ষম, মানুষের আবাস সুরক্ষিত হয়। অর্থের ধারণায় রাজার গুরুত্ব এইখানে যে, তিনি তার অধীনস্থ রাজ্যের উত্পাদনের ওপর কর ধার্য করার ক্ষমতা রাখেন।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যেমন রাজনৈতিক চরিত্র আছে, তেমনি রাজার কাজেরও অর্থনৈতিক চরিত্র আছে এবং তার কাজও সম্পদ তৈরির একটি পথ হিসেবে গণ্য হয়। অর্থশাস্ত্রের আমলে ভারতবর্ষে অনেক ধনী বণিক ছিলেন। এ বণিকরা রোম, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করতেন। তখন এ বণিজ্য ছিল মূলত বিলাসদ্রব্যের। তখন ভারতে অর্থনীতি বিজ্ঞানের শীর্ষে অবস্থান করতেন রাজা।

সম্পদকে কৌটিল্য রাজার শাসনের সমার্থক করে তোলার পেছনে কিছু কারণ আছে। রাজা তার কর আদায়ের ক্ষমতার মাধ্যমে বড় পুঁজি জমা করতে পারেন, যার মাধ্যমে বড় স্থাপনা, যুদ্ধে রাজ্য জয় কিংবা নিজ রাজ্যে শান্তি নিশ্চিত করতে পারেন। রাজা সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়ার শীর্ষে অবস্থান করতেন। কারণ তিনি সমাজেরও শীর্ষে অবস্থান করতেন। এভাবে সম্পদ একটি রাজনৈতিক মাত্রা পায়।

সম্পদের বিজ্ঞান হচ্ছে রাজনীতির বিজ্ঞান। উল্টোভাবে অর্থ হচ্ছে রাজ্য, আর অর্থশাস্ত্র হচ্ছে এ রাজ্য পরিচালনার বিজ্ঞান। কৌটিল্য অর্থনীতি ও রাজনীতিকে সমার্থক দেখিয়ে সেই আমলেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এ দুটি বিষয় হচ্ছে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায় আধুনিক দুনিয়ার অন্যতম রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও রুশ বিপ্লবের নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের কথা, যিনি বলেছিলেন, রাজনীতি হচ্ছে অর্থনীতির ঘনীভূত রূপ।

অর্থশাস্ত্রের বক্তব্য ও উদ্দেশ্য পরিষ্কার— রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হচ্ছে মাত্স্যন্যায় এড়ানোর ব্যবস্থা করা। অর্থাত্ মত্স্যজগতের নিয়ম যেখানে বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে, এ রীতিকে বন্ধ করা। অর্থাত্ অন্য যেকোনো কিছু করার আগে রাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের মধ্যে সহিংসতা প্রয়োগের একক ক্ষমতাও থাকতে হবে রাষ্ট্রের হাতে।

সহিংসতার একক অধিকার রাষ্ট্রের হাতে থাকাসহ আরো অনেক কঠোর বিধিবিধানের কারণে অনেকে কৌটিল্যকে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমর্থক বলে মনে করেন। তবে, কৌটিল্যকে উদারনৈতিক রাষ্ট্রচিন্তক মনে না করলেও বরং শেষ বিচারে তিনি রাষ্ট্রে নাগরিকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছেন বলে মনে করেন সঞ্জীব স্যানাল। “এটা বলার উপায় নেই যে, কৌটিল্য উদারবাদী বা তিনি কম শাসনের পক্ষে ছিলেন। বরং এসব থেকে অনেক দূরে ছিলেন তিনি। তিনি এমন একটি সরকারের কথা বলেছেন, যে সরকার জনগণকে বিভিন্ন সাধারণ পণ্য সরবরাহ করবে, বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে, খনির মতো খাতগুলো পাবলিক সেক্টরের হাতে রাখবে। কৌটিল্য সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন সরকার পরিচালনার একটি ব্যবস্থার ওপর, তিনি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেননি। অর্থশাস্ত্রে বারবার বলা হয়েছে, রাজার সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে আত্মসংযম। সহজ কথায় কৌটিল্যের আদর্শ ছিল ‘শক্তিশালী’ কিন্তু ‘সীমিত’ রাষ্ট্র।” কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে বিচার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

বিচার বিভাগের সঙ্গে প্রশাসনকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রের শুরুতেই নির্দেশনা দিয়েছেন। তার মতে, একজন মন্ত্রীর মোট ২৫টি গুণ থাকা প্রয়োজন। তাকেই মন্ত্রী হিসেবে বাছাই করতে হবে যিনি তীক্ষ ধীসম্পন্ন, বাগ্মী, কার্যসম্পাদনে দক্ষ, তীব্র স্মরণশক্তিযুক্ত, প্রত্যুত্পন্নমতি, যুক্তিতর্কের দ্বারা নিজ মত প্রতিষ্ঠায় কুশলী। তাকে হতে হবে পুরুষকারের প্রতীক, বলশালী, প্রভুত্ব করার যোগ্যতাসম্পন্ন, কষ্টসহিষ্ণু, মৈত্রীভাবাপন্ন। রাজার প্রতি দৃঢ়ভক্তি, শুটিশুদ্ধ, সদাচারণকারী, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, ধৈর্যশীল, চাপলবর্জিত, আত্মগর্বরহিত সৌম্যাকৃতি ও শত্রুতার অনুত্পাদক ব্যক্তিই মন্ত্রী পদে নিয়োগের উপযুক্ত। সব মিলিয়ে এ রকম ২৫টি গুণসম্পন্ন যিনি, তাকেই সেরা মন্ত্রী বলা যাবে, যার সিকি ভাগ কম আছে তিনি মধ্যমশ্রেণীর ও অর্ধপরিমাণে থাকলে তাকে অবরশ্রেণীর মধ্যে বিবেচনা করা হবে। কৌটিল্যের এ নির্দেশনা থেকে প্রশাসন চালানোর জন্য দক্ষ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্য প্রকাশ পায়। তবে কৌটিল্যের এ পর্যবেক্ষণ থেকে আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট হয় যে, তিনি মানুষের মনোজগেকও গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন। মন্ত্রী ও অমাত্যদের নিয়োগের জন্য শুধু তাদের গুণের তালিকা করেই কৌটিল্য ক্ষান্ত হননি, বরং কর্মক্ষেত্রে তারা সততা ও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারছেন কিনা, তা নির্ণয় করতেও তিনি সচেষ্ট। তিনি বিভিন্ন ধরনের ছল-চাতুরী ও গুপ্তচর নিয়োগের মাধ্যমে মন্ত্রী ও অমাত্যদের বিভিন্ন গুণের পরীক্ষা নেয়ার জন্য রাজাকে বিশদ নির্দেশনা দিয়েছেন। একটি উদাহরণ দেখা যাক, অমাত্যদের অর্থলোভ আছে কিনা, সেটা পরীক্ষার জন্য কৌটিল্য একটি পদ্ধতির বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি রাজাকে নির্দেশনা দিয়েছেন যেন তিনি তার সেনাপতিকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিনয় করার নির্দেশ দেন। সেই সেনাপতি রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যোগ দিতে অমাত্যদের অর্থলোভ দেখাবে। এতে যদি অমাত্যরা সাড়া না দেন তাহলে তাকে অর্থোপধায় উত্তীর্ণ বলে গণ্য করা হবে। এভাবে কৌটিল্য অমাত্যদের বিশ্বাস, কামপ্রবৃত্তি প্রভৃতি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরীক্ষা নেয়ার বিশদ বিবরণী দিয়েছেন। অর্থোপধায় উত্তীর্ণ বলে গণ্য করা হবে। এভাবে কৌটিল্য অমাত্যদের বিশ্বাস, কামপ্রবৃত্তি প্রভৃতি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরীক্ষা নেয়ার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন।

 &dquote;অর্থশাস্ত্রের

অর্থশাস্ত্র কৌটিল্য লিখেছিলেন মূলত রাজ্য পরিচালনার জন্য রাজার গাইডবুক হিসেবে। এখানে তাহলে কৌটিল্য কেমন রাজা চেয়েছিলেন, সেটা একবার দেখে নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। তিনি রাজা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘প্রজার সুখ উপস্থিত হইলেই রাজার সুখ হয় এবং প্রজার হিত হইলেই তাহা রাজার হিত বলে বিবেচ্য। যাহা রাজার নিজের প্রিয় বলে বিবেচ্য, তাহা তাঁহার হিত নহে, কিন্তু প্রজাবর্গের যাহা প্রিয়, সেটাই রাজার হিত।’ এ থেকে স্পষ্ট হয় নানা ধরনের কূটকৌশল প্রয়োগের বিধিবিধান রাখলেও কৌটিল্যের উদ্দেশ্য ছিল প্রজার কল্যাণ। রাজার জন্য কৌটিল্য দিনে মাত্র ৪ ঘণ্টার ঘুম নির্ধারণ করেছিলেন, বাকি ২০ ঘণ্টাই তাকে নানা কাজে যুক্ত থাকতে হবে। কৌটিল্যের চোখ এড়িয়ে গেছে এমন বিষয় খুব কম। ঘরের চারপাশে কোনো গাছগাছড়া রাখলে সাপের উত্পাত হবে না, সেটাও তিনি লিখে রেখে গেছেন। কর ব্যবস্থা, কৃষি, বিয়ে, পশুপালন ও প্রশিক্ষণ, দুর্যোগ মোকাবেলা, দণ্ডবিধিসহ হেন কোনো বিষয় নেই, যা নিয়ে কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে নির্দেশনা দেননি!

 

অর্থশাস্ত্র খ্রিস্টের জন্মের কয়েকশ বছর আগে রচিত। তাই গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপি এত দীর্ঘ সময় টিকে থাকাটাও একটি আলোচনার বিষয়। প্রাচীন ভারতে বই লেখা ও প্রতিলিপি তৈরি করা হতো তালপাতা বা অন্য কোনো পচনশীল দ্রব্যের গায়ে। সময় পার হলে কখনো বয়সের ভারে বা কখনো পোকামাকড়ের আক্রমণে কিংবা অন্য কোনো কারণে স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো নষ্ট হয়ে যেত। তাই কোনো গ্রন্থ যদি বারবার অনুলিপি না করা হয়, তাহলে সেটার ধ্বংস হয়ে যাওয়াটা প্রায় নিশ্চিত ছিল। তাছাড়া কোনো বই যদি সমগোত্রীয় অন্য গ্রন্থগুলোর চেয়ে উঁচুমানের হতো, তাহলে সেই গ্রন্থের প্রভাবে অন্য গ্রন্থগুলো কদর হারাত। সেগুলোর আর অনুলিপি হতো না। ফলে একসময় সেগুলো হারিয়ে যেত। অর্থশাস্ত্র এমনই এক প্রভাবশালী গ্রন্থ, যার প্রভাবে অন্য অনেক গ্রন্থ হারিয়ে গেছে। কৌটিল্যের আগেও অনেক পণ্ডিত অর্থশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু কৌটিল্যের গ্রন্থের সাফল্য অন্য সব গ্রন্থকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। সেসব পূর্ববর্তী পণ্ডিতের মধ্যে ছিলেন আচার্য ভরদ্বাজ, বিশালক্ষা, পিশুনা, কণাপদন্ত প্রমুখ। অর্থশাস্ত্রের শুরুতেই কৌটিল্য তার পূর্ববর্তী পণ্ডিতদের অবদান স্বীকার করেছেন এবং অর্থশাস্ত্র রচনায় তাদের রচিত জ্ঞান ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘অপ্রাপ্ত ভূমি (অর্থাত্ রাজ্য) প্রাপ্তির জন্য এবং প্রাপ্ত রাজ্য রক্ষণের জন্য পুবাচার্যদের প্রণীত যতসব গ্রন্থ প্রচলিত আছে, তার অধিকাংশই সংগ্রহ করে এ অর্থশাস্ত্র রচনা করলাম।’

বিনয় চন্দ্র সেন অর্থশাস্ত্রে একটি বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কৌটিল্য যে আদর্শ রাজা ও প্রশাসনের ধারণা উপস্থাপন করেছেন, তা নির্ভর করেছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনার ওপর। এক্ষেত্রে তিনি কোনো ধর্মরাজার প্রতিষ্ঠা করেননি। শাসনের ক্ষেত্রে তিনি ধর্ম ও জাতির ভিত্তিতে কোনো ভেদ করেননি।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের পরও অনেক অর্থশাস্ত্র রচিত হয়েছে, যেমন— কামানদকের নীতিসারা, এটা ছিল মূলত কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ। কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই কৌটিল্যের গ্রন্থের জায়গা নিতে পারেনি। আর তাই কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র হারিয়ে যায়নি। অনুলিপি তৈরি হতে হতে কালের যাত্রায় টিকে গেছে। আধুনিককালে অবশ্য ধারণা করা হয়েছিল যে, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি আর কোথাও টিকে নেই। এরপর ১৯০৪ সালে অজ্ঞাত এক পণ্ডিত মহীশূর গভর্নমেন্ট ওরিয়েন্টাল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান আর শ্যামশাস্ত্রীর কাছে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের একটি পাণ্ডুলিপি নিয়ে আসেন। এরপর শ্যামশাস্ত্রী ১৯০৯ সালে এর একটি অনুবাদ প্রকাশ করেন। তবে বিষয়টি নিয়ে সামান্য বিতর্ক আছে। প্রতিষ্ঠিত মত হচ্ছে, শ্যামশাস্ত্রীই লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত তালপাতার দুর্লভ পাণ্ডুলিপিগুলো ঘাঁটতে গিয়ে অর্থশাস্ত্রের পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করেন। ১৮৯১ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে মহীশূরের মহারাজা ভিক্টোরিয়া জুবিলি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। এই সুদৃশ্য ভবনে হাজারখানেক দুর্লভ তালপাতার পাণ্ডুলিটি সংরক্ষণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এ ইনস্টিটিউট মহীশূর ওরিয়েন্টাল লাইব্রেরি নামে পরিচিতি পায়। বর্তমানে এটি ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত। লাইব্রেরির দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল রুদ্রপত্নাম শ্যামশাস্ত্রীকে। তিনি সাংকেতি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের সন্তান। ৩৭ বছর বয়সেই তিনি সংস্কৃত, প্রাকৃত, ইংরেজি, ফরাসিসহ আরো কয়েকটি ভাষা এবং বেদ ও অন্যান্য প্রাচীন শাস্ত্রে পণ্ডিত হয়ে উঠেছিলেন। ১৯০৫ সালের এক সকালে সংরক্ষিত প্রাচীন পাণ্ডুলিপি পরীক্ষা করতে করতে তিনি পেয়ে যান কৌটিল্যের লেখা অর্থশাস্ত্র। সে সময় অনেকেই এর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। এরপর শ্যামশাস্ত্রী ১৯০৯ সালে কৌটিল্যের জীবনী ও অর্থশাস্ত্রের একটি অনুবাদ প্রকাশ করেন এবং পাণ্ডুলিপি নিয়ে সন্দেহের অবসান ঘটে। এ ঘটনা গবেষক, বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আলোড়ন তোলে। লন্ডন, জার্মানি, ফ্রান্স থেকে পণ্ডিতরা শ্যামশাস্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। ভারতীয় পণ্ডিতরাও শ্যামশাস্ত্রীকে অভিনন্দিত করেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নিজে এ বিষয়ে তার দারুণ খুশি হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।

গ্রন্থটির আর কোনো পাণ্ডুলিপি টিকে আছে কিনা, তার সন্ধান শুরু হয় এবং আরো কয়েকটি পাণ্ডুলিপি উদ্ধার হয়। বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে কিছু কিছু ভুল দেখা যায়। এবার শুরু হয় এসব পাণ্ডুলিপির যাচাই-বাছাই, সেকালের আরো অনেক টেক্সটের সঙ্গে তুলনা। ১৯৬০ সালে অধ্যাপক আরপি ক্যাঙ্গলে এসব যাচাই-বছাইয়ের পর অর্থশাস্ত্রের একটি সংস্করণ প্রকাশ করেন। সে সময় ক্যাঙ্গলে সাতটি পাণ্ডুলিপি ও আটটি ধারাভাষ্য পেয়েছিলেন কাজ করার জন্য। মনুস্মৃতি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের কাছাকাছি সময়ে রচিত। মনুস্মৃতির ক্ষেত্রে কিন্তু পাণ্ডুলিপির অভাব ছিল না। এ গ্রন্থের হাজার হাজার পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে। আগের ধর্মশাস্ত্রগুলোর তুলনায় মনুস্মৃতিতে দুটি নতুন উপাদান দেখা যায়, একটি হচ্ছে রাজার কর্তব্য বা রাজধর্ম এবং বিনিময়ের আইনের ১৮টি ধারা বা ব্যবহার। মনুস্মৃতির এ সংযোজনগুলো খুব সম্ভবত কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকেই এসেছিল। তবে রাজার কর্তব্যে ক্ষেত্রে মনু কৌটিল্যের মতো বাস্তববাদিতা দেখাতে পারেননি, বরং তিনি ঝুঁকেছিলেন ধর্মের দিকে। মনুস্মৃতি বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। হতে পারে, এ জনপ্রিয়তা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের মতো গভীর, বিস্তৃত রাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত গ্রন্থকে আড়াল করে দিয়েছিল। মনুস্মৃতির তুলনায় অর্থশাস্ত্রের
পাণ্ডুলিপির সংখ্যা অনেক কম হওয়ার এটা একটা কারণ হতে পারে।

ট্রটম্যান মনে করেন, আজকের দিনের প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা অর্থশাস্ত্রের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ প্রাচীন ভারতের রাজার জন্য যে নির্দেশনা কৌটিল্য দিয়েছিলেন, তা আজকের দিনের কোনো প্রজাতন্ত্রের জন্য সবসময় প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু তিনি মনে করেন, আজকের দুনিয়ায় ও নিকট ভবিষ্যতেও আমরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি, সেগুলোকে বুঝতে এবং একটি বিস্তৃত রূপকল্পের মধ্যে দেখতে অর্থশাস্ত্র অধ্যয়ন প্রয়োজন। অর্থশাস্ত্র আমাদের শেখায় যে, অর্থনীতি ও রাজনীতি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, প্রকৃতপক্ষে এদের আলাদা করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের বাইরে অর্থনীতির কোনো অবস্থান থাকতে পারে না। অর্থনীতির জন্য রাষ্ট্র প্রয়োজন। আর তাই রাষ্ট্রে বিভিন্নজনের চাহিদার মধ্যে সামাঞ্জস্য বিধান করে অর্থনীতিকে সবার কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। এভাবেই ট্রটম্যান তার অর্থশাস্ত্র: দ্য সায়েন্স অব ওয়েলথ গ্রন্থের উপসংহার টেনেছেন।

তবে ট্রটম্যান অর্থনীতি নিয়ে যা-ই বলুন না কেন, পররাষ্ট্রনীতি, রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা প্রভৃতি বিষয়ে অর্থশাস্ত্র এখনো গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিদ্যায়ও অর্থশাস্ত্রকে স্মরণ করা হচ্ছে। করপোরেট চাণক্য অন ম্যানেজমেন্ট, করপোরেট চাণক্য অন লিডারশিপ, করপোরেট চাণক্য অন ট্রেইনিং, চাণক্য’জ সেভেন সিক্রেট অব লিডারশিপ, চাণক্য ইন ইউ, চাণক্য স্ট্র্যাটেজি প্রভৃতি গ্রন্থের জনপ্রিয়তা দুই হাজার বছর পরও কৌটিল্যের প্রাসঙ্গিকতাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সুকুমার শিকদার লিখেছেন, ‘কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বলেই দেশ-বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে এ গ্রন্থ (অর্থশাস্ত্র) অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, এ গ্রন্থ ব্যবসার গতিতত্ত্ব ও কেন্দ্রীয় বিষয়ের ওপর আলোকপাত করতে সাহায্য করে, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে। এবং ব্যবসার রণকৌশল নির্ধারণ করতে সাহায্য করে। যুগ যুগ ধরে ব্যবসার ধরন বদলে গেলেও ব্যবসার মূলনীতি অপরিবর্তিত রয়েছে বলেই অর্থশাস্ত্রের গুরুত্ব কমেনি। এ শাস্ত্র পাঠ করে তাই শিল্পোদ্যোগী, ব্যবসায়ী, ম্যানেজার, ম্যানেজমেন্ট শিক্ষক, ছাত্র ও পরামর্শদাতা, রাজনীতিবিদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের কর্মী, সরকারি প্রশাসক, সামরিক দপ্তরের অফিসার এবং সামগ্রিকভাবে সব শিক্ষক ও ছাত্রসমাজ উপকৃত হবেন।’

চীনা পণ্ডিত সান জু’র আর্ট অব ওয়ার যেমন হাজার বছর পর আজো দুনিয়ার সব মিলিটারি স্কুলের মৌলিক পাঠ, তেমনি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রও রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বিষয়ে প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।

তথ্যসূত্র :

অর্থশাস্ত্র : দ্য সায়েন্স অব ওয়েলথ, টমাস আর. ট্রটম্যান

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র : সংক্ষিপ্ত অনুবাদ, সুকুমার শিকদার

চাণক্য শ্লোক,  প্রবীরকুমার চট্টোপাধ্যায়