রান্ধিল পুতিকা শাক দিয়া ফুলবড়ি।
চুঁয়া চুঁয়া ঘৃতে ভাজা করে পলা কড়ি
—রূপরাম চক্রবর্তী, গোলাহাট পালা, ধর্মমঙ্গল
শীতের রোদে পিঠ পেতে বড়ি দেয়া, আশ্বিনে পূজা শেষ হতেই বাতাসে লেগেছে হিমের পরশ। আর তার সঙ্গে বাঙালির হেঁসেল সংস্কৃতি ঘিরে শুরু হয়েছে বড়ি দেয়ার কাজ। শীতকালে গরম ভাতের পাতে বড়ি খুবই উপাদেয়। গয়না বড়ি, ঝোলের বড়ি আরো হরেক বড়ির সম্ভার নিয়ে বাঙালির ঘরে এখন শীতদিনের মৌসুমি ব্যস্ততা।
ঝোলের বড়ি সহজলভ্য হলেও গয়না বড়ি তৈরি করতে লাগে নিপুণ হাত আর সৃষ্টিশীল মনন। আর সেখানেই বাঙালি ও বাংলার মা-বোনরা হয়ে ওঠেন সাধারণ থেকে অসাধারণ। তাই বড়ি দেয়ার কাজ বাড়ির আর পাঁচটা কাজের মতো নয়। গয়না বড়ি রীতিমতো শিল্পের তকমা পেয়েছে।
‘ওরে ভোলা ঝুলিয়ে ঝোলা চললি কোথায় দৌড়ে আয়,
রাজার পিসি ছাদে বসি দিচ্ছে বড়ি দেখবি আয়।’
—তপন কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, আবোলে তাবোল
পিঠে ছাড়াও শীতকালে একটা ঘটনা দেখা যায় বাংলার বাড়ি বাড়ি, সেটা হলো ‘বড়ি হাত’, যা বাড়ির নারীদের জন্য ছোটখাটো একটি উত্সব। সারা রাত ডাল ভিজিয়ে রেখে পরের দিন সকালে সেই ডাল বেটে নানা রকম বড়ি দেয়া। ছোট্ট ছোট্ট ভাজা খাওয়ার বড়ি, মসলা দেয়া ঝোলের বড়ি আর গয়না বড়ি। রকমারি তার নকশা। হাতের চুড়ি, চূড়, সীতাহার দুল— কী নেই তাতে! শুনেছি, যে মেয়ের নতুন বিয়ে হতো, তার শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো গয়না বড়ির ডালা শীতের তত্ত্বের মান বাড়াত।
নদীয়ার সেই অষ্টাদশ শতাব্দীর কৃষ্ণ চন্দ্রীয় যুগের গণ্ঠাম কপেপুর, শিবনিবাসে আজো প্রচলিত হোলুই গান। পৌষ মাসের সন্ধ্যায় গরু চরিয়ে বাড়ি ফেরার পর শ্রী খোল, করতাল নিয়ে রাখাল বালকরা দলবলসহ গৃহস্থ বাড়িতে প্রবেশ করেই সমস্বরে বলে ওঠে— হোল বোল, হোল বোল। এর পরেই শুরু হয় চাল, বড়ি আর কড়ি চেয়ে গান—
‘.........................
হোল বোল, হোল বোল।
এক কাঠা চাল নটা বড়ি
তার সঙ্গে তিনটা কড়ি,
যে দেবে কাঠা কাঠা
তার হবে সাত বেটা,
............................’
পাতের অলঙ্কার টোপা বড়ি, মসলা বড়ি, সাদা বড়ি, সবার সেরা গয়না বড়ি। গোলাপি রঙের মসুর ডালের বড়ি, কমলা রঙের মটর ডালের, মুগেরটা হলুদ, মাষকলাই বা বিউলির সাদা বড়ি। রাতভর ডাল ভিজিয়ে রাখো, শিলনোড়ায় মিহি করে বাটো। মিক্সি চলবে না, আঁট হবে না ভালো। বাটা ডাল একবেলা রেখে ফের শিলনোড়ায় বাটো। যত বাটবে আর যত ফেটাবে, বড়ি হালকা হবে। ডাল বাটায় আদা বাটা, জিরে গুঁড়ো দিয়ে মসলা বড়ি করা যায়। আবার বাঁধাকপি, মুলো কুরেও দেয়া যায় ডাল বাটা মাখায়। বুড়ো চালকুমড়ো দিতে হলে জল ঝরিয়ে নিতে হবে ভালো করে। কুমড়োর শুকনো বিচি গুঁড়িয়েও মেশানো যেতে পারে। টোপা টোপা করে পরিষ্কার কাপড়ের ওপর শুকোতে দিতে হবে। কেউ দেয় মশারির চালে, কেউ থালায় হালকা তেল মাখিয়ে। শুকিয়ে গেলে বয়ামে। তবে সবার সেরা গয়না বড়ির মেহনত আরো বেশি। বাজার থেকে খোসা ছাড়ানো বিউলির ডালে এ জিনিস হয় না। লাগে খোসাসহ গোটা দেশী বিউলি, যাকে বলে মাষকলাই। জাঁতায় ভেঙে ভিজিয়ে রাখতে হয় রাতভর। সকালে খোসা ছাড়িয়ে পরিষ্কার করে দফায় দফায় শিলনোড়ায় বাটতে হয়। ফেটাতে হয় বারবার। সেসব মিটলে পোস্তদানার ওপর গয়নার অলঙ্করণে কারিকুরি, যেভাবে জিলিপি ভাজে। শুকিয়ে যাবে যখন, পালকের মতো হালকা। ছাঁকা তেলে ভেজে গোটা গোটা পড়বে পাতে।
‘সুবি বললে- আমাদের বাড়ি দুটি ভাত খাবি আশা?
-দূর, তোরা জেলে। জেলের বাড়ি বুঝি বামুনের মেয়ে খায়?
সুবি হাসলে। ওর বড্ড বন্ধু সুবি। কষ্ট হয় সুবির মনে দুঃখু দিতে। তবু সে বললে— না ভাই সুবি, কিছু মনে করিস নি। আমার বাড়িতে ভাত তো হয়েইচে—
- বড়ি- ভাতে তাত খাবিনি আমার সঙ্গে? মা নতুন বড়ি দিয়েছে—
- দূর বড়ি বুঝি এখন দেয়? বড়ি দেয় সেই মাঘ মাসে। নতুন কুমড়ো নতুন কলাইয়ের ডাল উঠলে। মিথ্যে কথা বলিসনে সুবি।
- মিথ্যে বলিনি। পুরনো ডালের বুঝি বড়ি হয় না? চল আমার সঙ্গে—’
- দেবযান, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
অগ্রহায়ণের এক শুভ দিনে ‘বড়ি হাত’ করে মায়েরা। ছোটরা দারুণ উত্তেজিত, উত্সাহিত। রাত্রিবেলা বিউলির ডাল ভিজবে। সকালে সেই ডাল বাটা হবে। মা-জেঠি-দিদিমারা সকালে স্নান করে, পরিষ্কার কাচা কাপড় পরে, শুদ্ধ হয়ে এবার শীতের সকালের ওম গায়ে মেখে সেই মিহি করে বাটা ডাল ফেটাতে বসবেন। বাটা ডাল কাঁসার ঝকঝকে গামলায় ফেটাবেন ফটাফট করে। ফেটিয়ে ফেটিয়ে ডালটা ফুলে ডবল। সত্যি সত্যি কয়েক ঘণ্টা ধরে ফেটানো হতো সেই বিউলির ডাল। ফেটানোর কাজ যত ভালো হবে, বড়ি তত হালকা, নরম, ভাজলে কুড়কুড়ে হবে।
মেয়েরা বসত পিতলের গামলাভরা কলাই বাটা নিয়ে। টিপে টিপে টপটপ করে বড়ি দিত চুল শুকোতে শুকোতে।
বড়ির ‘বুড়োবুড়ি’
এবার গামলা, নতুন কুলো, নতুন কাপড়ের টুকরো, তেল মাখানো থালা— সব নিয়ে ছাদে, উঠানে তারা। ধান-দূর্বা-সিঁদুর রেকাবিতে নিয়ে, শাঁখ হাতে ছোটরা পেছন পেছন। আগের দিন ছাদ-উঠোন ঝেঁটিয়ে ধুয়ে দুরস্ত করে রাখা হয়েছে। চড়া রোদ লুটোপুটি খাচ্ছে। কোণে কোণে ছোটরা নিযুক্ত পাখি তাড়াতে। ন্যাকড়ায় তেল নিয়ে, সেই তেল মিহি করে বিশাল কাঁসার থালায় বুলিয়ে নেয়া হতো এমনভাবে, যাতে থালায় সেই বুলানো তেলের রেখা চোখে না পড়ে। আর একদল প্রায় অদক্ষ, কাজ শেখার জন্য গোল গোল চোখে মা-দিদিমা-পিসিমার কাজ দেখা কচিকাঁচাদের কাজ ছিল, সেই থালায় পোস্ত ছড়িয়ে বুলিয়ে দেয়া। তবে সেই পোস্ত সমানভাবে ছড়াতে হবে, যাতে থালাটি না দেখা যায়। কুলোর ওপর কাপড় বিছিয়ে পাঁচ আঙুলের কায়দায় টুপ্পুস করে পরপর দুটি ডালের দলা পড়বে, তার ওপর দিকটা ছুঁচলো করে দেয়া হলো যত্নে। তাদের ওই উঁচু নাকে ধান-দূর্বা, একটির ওপর সামান্য সিঁদুরও পড়ল। এরা হলেন ‘বুড়োবুড়ি’। বিশেষ অতিথি।
‘শীতকালে আমাদের ছোট্ট ছাদে বিউলি ডালের বড়ির বিয়ে দিত পিসি, তেল-হলুদ মাখিয়ে, সিঁদুর পরিয়ে।’
- শংকর লাহিড়ি
এরপর টপাটপ বড়ি পড়বে কুলোর কাপড়ে, থালায়। আর তাদের নাক টেনে টেনে লম্বা করা হবে। ক্রমে হবে পেঁপে বড়ি, কুমড়ো বড়ি, মুলো বড়ি, কপি বড়ি। মানে সামান্য পেঁপে বা ছাঁচি কুমড়ো, মুলো বা কপি কুরে বড়ির ডালে মিশিয়ে দেয়া হবে। অপূর্ব স্বাদ এগুলোর।
ডাল মাহাত্ম্য ও প্রাক-বিবাহ ট্রেনিং
আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে শ্রীরামপুরের একটি মেয়ের বিয়ে হয়েছিল সাঁওতাল পরগনার মলুটী গাঁয়ে। যেহেতু মেয়েটি কলাই ডাল খেতে একেবারেই পছন্দ করত না, তাই তার মা গান গেয়ে গেয়ে কন্যাকে ডাল খাওয়া শেখাতেন, তার উজ্জ্বল উদাহরণ বীনা দের লেখা ‘হারিয়ে যাওয়া দিন’-এর পাতায়—
‘বাড়ি গিয়েই ফর্দ পাঠালেন, বাবাও কলকাতায় যাওয়া-আসা করে কেনাকাটা শুরু করলেন। মায়ের নানাবিধ উপদেশ চলতে লাগলো আমার উপর, এটা খাই না-ওটা খাই না করবি না শ্বশুরবাড়ি গিয়ে। তুই তো কলাইয়ের ডাল পাতে নিস না, রাঢ় দেশ আবার কলাইয়ের ডাল খাওয়ারই দেশ, এখন থেকে অভ্যেস কর।’ দুপুরে খাওয়ার সময় মা আমার পাতের কাছে ডালের বাটি দিয়ে এর গুণকীর্তন করতেন সুর করে—
‘যত রকম ডাল আছে এ সংসারে
কলাইয়ের কাছে সব ব্যাটা হারে,
আদা লঙ্কা মৌরি হিং ফোড়ন দিলে
সে সৌরভে কে রবে ঘরে?
বাঁকুড়া বীরভূম জেলার যত লোক
কলাই মন্ত্রে তারা কালী উপাসক
বলে— এ ডাল খেলে পরে ছাড়ে মহারোগ
শিব লিখেছেন তন্ত্রসারে।
শিলে বেটে যদি গড়ে বড়া বড়ি
কালিয়া কাবাব যায় গড়াগড়ি,
ব্রহ্মা বিষ্ণু ইন্দ্র স্বর্গপুর ছাড়ি
হাঁড়ি হাতে করে দাঁড়ান দ্বারে।’
বড়ি দিলে আকাশ মেঘলা হয়— এমন কথা প্রচলিত! বড়ি বিশেষত গয়না বড়ি পাতে ওঠার আগে সে এক ঝকমারি আয়োজন। সঙ্গে থাকতে হবে সূর্যি মামার সখ্য। কথায় আছে—
‘আকাশের ছিল এক মেয়ে! সে তার মায়ের কাছে বড়ি খেতে চেয়েছিল। মা বড়ি অবশ্য দিয়েছিল কিন্তু তার আগেই আকাশের আদরের মেয়েটি মারা যায়। সেজন্যই কাউকে বড়ি দিতে দেখলে আকাশ তার মরা মেয়ের শোকে কাঁদতে থাকে। ফলে চারদিকটা মেঘলা মনে হয়।’
ডাল বড়ি, পোস্ত বড়ি, তিল বড়ি, গয়না বড়ি দেয়ার জন্য আগে থেকেই রুমালের আকারের একটি শুকনো ন্যাকড়ায় ছোট্ট ফুটো করে সেই ফুটোর চারপাশে হাতে সেলাই করে নেয়া হতো। সেই ন্যাকড়ায় ফেটানো ডাল নিয়ে মা-দিদিমা-পিসিমা-মাসিমারা গোল হয়ে বসে রোদের দিকে পিঠ করে নিজের নিজের থালায় গয়না বড়ি দিতেন। এ সময় ছোটদের হাতে থাকত পরিষ্কার নারকেল পাতার কাঠি। গয়না বড়ি আবার দেয়া-নেয়া হবে। চিক্কন বড়ির প্যাঁচ শেষ হয়ে গেলে সেই ন্যাকড়া থেকে বেরিয়ে আসা ডালের মিশ্রণকে কেটে দিয়ে সেই বাকি অংশটিকে দক্ষ হাতে মিলিয়ে দিতে হতো সেই প্যাঁচের সঙ্গে, যাতে কোথায় বড়ি দেয়া শুরু হয়েছে আর কোথায়ই বা শেষ হয়েছে, সেটি বোঝা না যায়। তবে বড়িগুলো রোদ পাওয়া ভীষণ জরুরি। কয়েক দিন মেঘলা হলেই চিত্তির। বড়ি আর নরম হবে না, ছাতা ধরে যেতে পারে।
মুশকিল হলো গয়না বড়ি, অন্যান্য গ্রাম শিল্পের মতোই খুব বেশি বানানো যায় না। বাঙালির রান্নাঘরের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে থাকা খাবারের শব্দ-কল্প-দ্রুম যত আছে, তার এক ছোট দাবিদার আমাদের ডালের বড়ি। এমন এক উপকরণ, থিওরিটিক্যালি না হলেও চলে কিন্তু প্র্যাক্টিক্যালি একবার পাতে পড়লে এর পরেরবার থেকে না হলে আর চলবে না।
‘ডালের বড়ি যত্ন করি
কে বানাও, ও সুন্দরী
সময় মত পাতে দিও
বড়ির তরকারি
ডালের বড়ি দেখি আমার
জিবায় আইলো পানি
আবার কনু যাসনা ভুলি
তুই মোর সই, জানি’
—নবি মণ্ডল, রংপুর
বড়ি পোড়া হেস্টিংস ও সিরাজ ভীতি
সিরাজের ভয়ে পলায়ন করে ওয়ারেন হেস্টিংস তখন কাশিমবাজারে কান্ত বাবুর আশ্রয়ে তার বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। দোকানে হাতের কাছে তেমন কিছু না পেয়ে কান্ত বাবু হেস্টিংসকে আপ্যায়ন করেছিলেন পান্তাভাত, বড়ি আর চিংড়ি মাছ দিয়ে। হেস্টিংসের পলায়ন পর্বের খবরটা ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। আর তখনই মানুষের মুখে মুখে জন্ম নিল এই ছড়া, বেচারা হেস্টিংসের এই পলায়নকে অমর করে রাখতে—
‘হেস্টিংস সিরাজভয়ে হয়ে মহাভীত
কাশিমবাজারে গিয়া হন উপনীত।
কোন স্থানে গিয়া আজ লইব আশ্রয়
হেস্টিংসের মনে এই নিদারুণ ভয়।
কান্তমুদী ছিল তার পূর্ব পরিচিত
তাহারি দোকানে গিয়া হন উপনীত।
মুস্কিলে পড়িয়া কান্ত করে হায় হায়
হেস্টিংসকে কি খেতে দিয়া প্রাণ রাখা যায়?
ঘরে ছিল পান্তাভাত আর চিংড়ি মাছ
কাঁচা লঙ্কা, বড়ি পোড়া, আছে কলাগাছ।
সূর্যোদয় হল আজি পশ্চিম গগনে
হেস্টিংস ডিনার খান কান্তের ভবনে।’
গয়না বড়ি কী?
বড়িগুলো আকৃতিতে সাধারণত বৃত্ত, বর্গক্ষেত্র, ত্রিভুজ ও উপবৃত্তের মতো হয়। তবে জেলাভিত্তিক বড়ির রূপ বদল হয়। যেমন প্রসিদ্ধ গয়না বড়ির জন্য মেদিনীপুরের নাম উল্লেখযোগ্য। কোনো মডেল দেখে নয়, পরম্পরাগতভাবে চলে আসা গহনার নকশার আদলে বাড়ির নারীরা বড়ি তুলতেন। এ বড়িগুলোকেই গয়না বড়ি বলা হয়। মুকুট, নেকলেস, দুল, টায়রা, বাজুবন্ধ, লকেট, কানপাশা, মাকড়ির আদলে যেমন বড়ি তৈরি হতো, তেমনি নানা জ্যামিতিক নকশা, কল্কা, শাঁখ, পদ্ম ফুলের পাশাপাশি বিড়াল, টিয়া, কাকাতুয়া, ময়ূূর, পেঁচা, হাঁস ও প্রজাপতির আদলে তৈরি গয়না বড়ি বেশ প্রসিদ্ধ।
গয়না বড়ির সাকিন
শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে গয়না বড়িকে ঘিরে। দেশে ব্রিটিশরা আসার আগে গয়না বড়ি প্রস্তুতিতে পোস্তর প্রচলন ছিল না। পলাশীর যুদ্ধের পরে ব্রিটিশরা বেআইনি আফিমের এক বড় বাজার আবিষ্কার করে চীনে। মুনাফা করতে ব্রিটিশরা তখন বাংলার রাঢ় অঞ্চলের চাষীদের পোস্ত চাষে বাধ্য করেছিল। এরপর চাষ হওয়া পোস্ত থেকে বিপুল পরিমাণ আফিম বের করে তা চীনে পাচার শুরু হয়। আফিম বের করার পর পোস্তর বীজগুলো সাধারণত ফেলে দেয়া হতো। এর থেকেই একসময় পোস্তর বীজ বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমান ও মেদিনীপুর জেলার রান্নার উপাদান হয়ে ওঠে। সেই থেকেই মেদিনীপুরের গয়না বড়িতে পোস্ত দানার ব্যবহার শুরু হয়।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম, সুতাহাটা, মহিষাদল, ময়না, পাঁশকুড়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাসপুর, ঘাটাল ইত্যাদি থানায় প্রধানত মাহিষ্যগোষ্ঠীর নারীরা শীতের মৌসুমে বহু যত্নে ও ধৈর্যে তৈরি করেন পরিশ্রমসাপেক্ষ গয়না বড়ি। তাদের দক্ষ আঙুলের ছোঁয়ায় অবলীলায় ফুটে ওঠে ঐতিহ্যবাহী কারুকৃতি। সেই গয়না বড়িই বিশ শতকের ত্রিশ-চল্লিশের দশকে আরো পরিশীলিত চারুকলায় নকশি বড়ি হয়ে উঠেছিল লক্ষ্যার মাইতি পরিবার ও বিশ্বভারতীর মেলবন্ধনে। আজকের মমতা মাইতি হলেন সেই কলার যোগ্য ধারক ও বাহক।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ মিউজিয়াম অব ইন্ডিয়ান আর্টের অধ্যক্ষ এবং মুজিয়লজির বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক দেবপ্রসাদ ঘোষ ১৯৬৪ সালে তমলুক শহরের সুধীর মণ্ডলের স্ত্রী রেনুকা দেবীকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন—
‘তমলুকের শ্রীমতি রেনুকা মণ্ডলের তৈরি চমত্কার বড়িগুলো দেখে আমি খুবই অনুপ্রাণিত হয়েছি। এগুলির নানান রকমের নকশা ফুল, পাতা, পশু, পাখি ও অন্যান্য বিমূর্ত নকশা অপূর্ব দক্ষতা ও নৈপুণ্যের পরিচায়ক। বাস্তবিক কোন শিল্পীও তাঁর তুলির দ্বারা একে চড়িয়ে যেতে পারতেন না। এইসব শঙ্খ, ময়ূর আরো নানান আলঙ্কারিক নকশায় ছন্দিত লাবণ্য ফোটানো হয়েছে ডালবাটার মত দুরূহ এক মাধ্যমের সাহায্যে।’
-অনিমেষকান্তি পাল, লোকশিল্প গয়না বড়ি
কমলকুমার কুণ্ডু নামের একজন লেখকের মত, ‘এহেন নিখুঁত বড়ি দেওয়ার চল আজ সারা পশ্চিম বাংলার মধ্যে শুধুমাত্র মেদিনীপুর জেলার তমলুক মহকুমার হাতে গোনা কয়েকটি মাহিষ্য পরিবারের বউ-ঝিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তার মধ্যে বিশেষ দক্ষতার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট পরিবারের মেয়েদের নাম করতেই হয়।’
গয়না বড়ি এল শান্তিনিকেতনে
সেটা ছিল ১৯৩৪ সালের ডিসেম্বর মাস। লক্ষ্যার মমতার কাকু স্বদেশ নারায়ণ মাইতির ভাইপো আশীষ এবং ভাইঝি সেবা বিশ্বভারতীর কলাভবন ও সংগীতভবনের শিক্ষার্থী তখন। কাকু তাদের জন্য বাড়ি থেকে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে গিয়েছিলেন। তারই সঙ্গে ছিল শ-খানেক গয়না বড়ি। তখনকার শান্তিনিকেতনের চোখে তা ছিল অভিনব। রবীন্দ্রনাথ, আচার্য্য নন্দলালের কানে গেল সে কথা। ওই বড়ির শিল্পনৈপুণ্যে বিস্মিত তারা। আশীষ ও সেবার ঠাকুরমা শরত্কুমারী দেবী ও মা হিরন্ময়ী দেবীকে রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে লিখলেন—
‘তোমাদের হাতের প্রস্তুত বড়িগুলি পাইয়া বিশেষ আনন্দলাভ করিয়াছি। ইহার শিল্পনৈপুণ্য বিস্ময়জনক। আমরা ইহার ছবি কলাভবনে রক্ষা করিতে সংকল্প করিয়াছি। তোমরা আমার আশীর্ব্বাদ জানিবে। ইতি শুভাকাঙ্খী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২১শে মাঘ, ১৩৪১।’
নন্দলাল বসু লিখলেন—
‘আশীষের মায়ের হাতে তৈয়ারি বড়ির নক্সাগুলি সত্যই শিল্পের একটি উত্কৃষ্ট নিদর্শন। বঙ্গমাতার ভাঙা ঝাঁপিতে এই অমূল্য রত্নের সন্ধান পাইয়া আমরা মুগ্ধ হইলাম। এইরূপ শিল্পসৃষ্টির আনন্দ কবে আবার বাঙলাদেশ ফিরে পাবে।’
পরের বছর ১৯৩৫ থেকে নন্দলালের উপস্থিতিতে হিরণ্ময়ী দেবী কলাভবনে চারটি শীত গয়না বড়ি দেয়া শেখাতে শুরু করেন। গুটিকতক শিক্ষার্থীর অন্যতম হলেন— রানী চন্দ, নন্দলালের ছোট মেয়ে গৌরী ভঞ্জ। কিন্তু তারপর সে শিক্ষাদান পর্ব হঠাত্ই বন্ধ হয়ে যায় হিরন্ময়ী দেবীর পারিবারিক ব্যস্ততা আর কিছুটা শিক্ষার্থীদের অক্ষমতায়। বিশ্বভারতীর কলাভবনে হিরণ্ময়ী দেবীর অবস্থানকালের ও পুরনো দিনের চারুকৃতির নিদর্শনগুলোকে প্লাস্টার অব প্যারিস, আলোকচিত্র ও স্লাইডের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথের চোখে ও পরামর্শে ততদিনে এ চারুকৃতির নাম হয়ে উঠল নকশি বড়ি। সেকালের প্রখ্যাত সাংবাদিক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, জলধর সেনসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রশংসাধন্য এই শিল্প তখন শীতের মৌসুমে উল্লেখযোগ্য নানা জায়গাতে প্রদর্শনের ডাক পেয়েছে, যেমন বিখ্যাত কল্যাণী-কংগ্রেস। পরিবেশিত হয়েছে ক্রুশ্চেভ-বুলগানিনের ভোজসভাতেও। গুরুদেব আশীর্বাদের বঙ্গ-সংস্কৃতির এই অমূল্য শিল্পকর্ম বড় দক্ষতাতেই হাতে তুলে নিয়েছেন তার কাকিমা হিরণ্ময়ী দেবীর কাছ থেকে রবীন্দ্রসংগীতের নিবিষ্ট শিল্পী মমতা মাইতি।
আদি থেকে আধুনিক, বিভিন্ন পর্বের বাংলা সাহিত্যেই বড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া স্থানীয় লোকাচার, গাথা, ছড়ায় বড়ির উল্লেখ চোখে পড়ে। যেমন—
“খুকুমণি কেন ভারি
পাতে নেই যে গয়না বড়ি।’
বাংলার বৈষ্ণবদের কাছে বড়ি সহজলভ্য ও বিকল্প প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য হওয়ার দরুন বহুকাল থেকেই সমাদৃত। শোনা যায়, শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু বড়ির গুণে বিশেষ মুগ্ধ ছিলেন।
ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছেন কোনো এক মা
ভাষাসৈনিক কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকা অবস্থাতেই ভাষা শহীদদের নিয়ে লেখেন তার প্রথম ও বিখ্যাত কবিতা ‘কোন এক মাকে’। অশ্রুসিক্ত আবেগ, হূদয়মথিত সংলাপ আর সময়প্রসূত চিত্রকল্পের দ্বারা মাতৃময় বাংলার এক অনিন্দ্য রূপায়ণ ঘটান এ কবিতায়।
কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর এ কবিতায় ছেলে ফেরার অপেক্ষায় এক ব্যাকুল মা তার জন্য ডালের বড়ি শুকিয়ে রাখেন। এতে বোঝা যায় গ্রামীণ জীবনে ডালের বড়ির কদরটা। শিশির-ভোরে মায়ের চোখে স্নেহের রোদে ভিটে ভরেছে—
‘কুমড়ো ফুলে ফুলে
নুয়ে পড়েছে লতাটা,
সজনে ডাঁটায়
ভরে গেছে গাছটা;
আর আমি
ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি।
খোকা তুই কবে আসবি?
কবে ছুটি?’
আপাতত গয়না বড়ির আদ্যন্ত এখানেই হলো সমাপন।






