ট্রাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডান দিকে কেটে সিএনজিটা নিয়ে এগিয়ে যায় শামীম। সিগনাল পড়লে মুশকিল। অন্তত আধা ঘণ্টার জন্য আটকে যেতে হবে। রাস্তাঘাটগুলো একই রকম। গ্রামের রাস্তাই হোক আর শহরের, গাড়ি চালিয়ে আর শান্তি নেই। কোথাও গর্ত, আবার কোথাও জট। আর মানুষ তো আছেই। কেউ যন্ত্রের ভেতরে আর কেউ নিজেই যন্ত্র। শামীমের সবার আগে আগে থাকা চাই রাস্তায়। ওর ছোট বোন নীপা বলত, ‘আগে গেলে বাঘে খায়, পিছে গেলে স্বর্গ পায়।’ এটা বলত আর মিটিমিটি হাসত। নাহ্, পারা গেল না। সিগনাল পড়ে গেছে। এবার দাঁড়িয়ে থাকো। স্টার্টটা বন্ধ করে দেয় শামীম।

চাকরিটা হয়তো করতই শামীম। হুট করে চাকরি ছাড়ার মতো অবস্থা তার না। কিন্তু না ছেড়ে কী করবে? প্যান্ট-শার্টের ঠাঁটবাট হয়তো ছিল, কিন্তু অপমান সহ্য করে তো আর চাকরি করা যায় না। চুরি করবে একজন আর দোষ চাপাবে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার ওপর। ওই অফিসে ড্রাইভারের চাকরি করতে গিয়ে মানুষের নানা রূপ দেখেছে সে। এখানে কেউ কারো নয়। তেল চুরি করে ওর ওপর চাপিয়েছিল একজন। সুপারভাইজার বুঝতে পেরেছিল শামীম যে ওই কাজ করার নয়। তবে দোষ চাপানো বজ্জাত লোকটি পুরনো হওয়ায় তাকেও কিছু বলতে পারেনি সুপারভাইজর। চাকরি যায়নি। শামীম নিজেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। কিছুদিন বেকার ছিল, কই যাবে কী করবে বুঝে উঠতে পারত না। মসজিদে গিয়ে বসে থাকত। দাড়ি রেখেছিল তখনই। কাটতেও আলসেমি লাগত, আর দাড়ি ছাড়া নিজেকে কেমন যেন বেপর্দা লাগত শামীমের। মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়ত সে। জুমার দিন অনেক ধনী লোকজন নামাজে আসত। কেউ কেউ সামনের কাতারে দাঁড়ানোর জন্য অস্থির থাকত। যেন সামনের কাতারে দাঁড়ালেই নামাজ হয়ে যাবে। এদের কারো কারো নাম ইমাম সাহেব খুতবায় নিতেন। অমুক সাহেব এত টাকা দিয়েছেন মসজিদের উন্নয়নের জন্য। তমুক সাহেব এত হাজার ইট দিচ্ছেন দোতলা মসজিদকে তিনতলা করার জন্য।

শামীমের তখন পকেটে টাকা নেই বললেই চলে। ভেবেছিল, একটা সিএনজি কিনে চালাবে। প্রায় ৫ লাখ টাকা দাম; ঘুষসহ ৬-৭ লাখে হয়ে যাবে। এ ইনভেস্টটা করতে পারলে ঢাকা শহরে রোজ মিনিমাম ৩ হাজার টাকা কামাই করা যাবে। বাবার অল্প জমি যা আছে, তা থেকে একটা ছেড়ে দিলেই হবে। মানুষ জমি বিক্রি করে উপার্জনের জন্য বিদেশ চলে যেতে পারলে শামীম কেন পারবে না সিএনজি কিনে নিজস্বভাবে চালাতে? কিন্তু পরিবহনের হাওয়া অন্য রকম। পরিবহনের পথে হাঁটলেও ট্যাক্স দিয়ে হাঁটা লাগে। এক দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, ১৬ লাখ টাকার হিসাব ধরিয়ে দিয়ে সেই ব্যক্তি বলল, তুমি গাজীপুরের বইলা ১৬তে নতুন সিএনজি, কাগজপত্র সব পাইতেছ। অন্য কেউ হলে ১৯ লাগত। শামীমের আর সিএনজি কেনার সাহস হয়নি। এত বড় বুকের পাটা ওর নেই, বাপের জমি বিক্রি করে রাস্তায় সে সিএনজি নামাতে পারবে না, এত বড় অংক সে কষতে পারবে না। তার ওপর বিক্রিযোগ্য জমিও বেশি নেই তাদের। এখনো শামীম মা-বাবাকে বলতে পারেনি যে, চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। সিএনজি চালাচ্ছে এ কথাও কাউকে বলেনি। আগেও গাড়ি চালিয়ে খেত, এখনো গাড়ি চালিয়ে খাচ্ছে। তাই এটাকে খুব বেশি বড় সত্য গোপন মনে করছে না সে।

মা-বাবাকে প্রতি মাসেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হচ্ছে। অনেক খরচ। তার ওপর ছোট বোন সংসারে ফেরত এসেছে। শামীমের ছোট বোন নীপা। ক্লাস ফাইভ পাস করেছিল গ্রামের স্কুল থেকে, দেখতে ভালো বলে বিয়ের প্রস্তাব আসত অনেক। শামীমের কৃষক বাপের মেয়েকে নিয়ে আলাদা কোনো স্বপ্ন ছিল না। একবার গ্রামের মেম্বর প্রস্তাব নিয়ে এল, না করার অপশন ছিল না। মেম্বরের আশপাশে সব ছাল নাই কুত্তা টাইপ ছেলেপিলে থাকে। মেয়ে বিয়ে না দিলে কোনদিন দেখা যাবে মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছে। নীপার বাবা কন্যাদান করে দেন। বাল্যবিবাহ হলেও কেউ টের পায়নি। জায়গামতো টাকাপয়সা দিয়ে ম্যানেজ করা হয়েছিল। নীপার ১৫ বছর বয়স হলেও স্কুলে তা ১২ ছিল, আর ম্যারেজ সার্টিফিকেটে তা ১৮ হয়ে গেল। ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি লম্বা নীপা। শাড়ি ঘোমটা পরিয়ে দেয়ায় বড় বড়ই লাগছিল। বিয়েতে নীপাকে কানের দুল কিনে দিয়েছিল শামীম। তখন সে একটা ওয়ার্কশপে কাজ করত। উপার্জন কম হলেও সে টাকা জমিয়ে রাখত। তা দিয়ে আট আনা স্বর্ণ দিয়ে একজোড়া কানের দুল কিনেছিল। বিয়ের সাতদিন পর নীপা বাবার বাড়ি নাইয়র যাওয়ার সময় ওর একটা কানে দুল ছিল; অন্য কানটা খালি। একটু ফুলেও ছিল কানটা।

২.

নীপা আর জামাইয়ের বাড়ি যায়নি। অনেক বুঝিয়েও তাকে সে বাড়িতে পাঠানো যায়নি। ওর একটাই কথা; ওই ব্যাটা একটা পশু। শিয়াল-কুত্তাও ওর চেয়ে ভালো আছে। আমি এ জামাইয়ের ভাত খামু না। এইটাই ফাইনাল। মাত্র ১৫ বছর বয়সে এত সাহস কীভাবে হলো নীপার, তা আজো শামীম বুঝতে পারে না।

তবে নীপার মারমুখী রূপ দেখেও কিন্তু পশু জামাইটা হাল ছাড়েনি। মেম্বরও দুই কেজি মিষ্টি নিয়ে সে বউকে বাড়ি নিয়ে যেতে উপস্থিত হলো। কম বয়সী নীপার সব কথাকে পাগলামি, দুষ্টামি বলে উড়িয়ে দিল সেই লোক। মেম্বর বললেন, এসব নিয়ে এত কথাও ঠিক না। বিয়ে হয়েছে আবার এত নাটক কেন? মেয়ে স্বামীর বাড়ি থেকেছেও। তাই কথাবার্তা বুঝেশুনে বলা উচিত। শামীমের বাবা নীপার পশু জামাইয়ের পায়ে ধরাটা শুধু বাকি রাখল। মাফ চেয়ে নিল নিজের মেয়ের পাগলামির জন্য। এও বলল, একমাত্র মেয়ে, আবার বয়সও কম, তাই বুঝতে পারছে না। আস্তে ধীরে অবশ্যই বুঝবে সংসার। নীপার মা ভাত-তরকারি খাওয়াল পশুটিকে। কিন্তু ওরা যাওয়ার সময় নীপাকে কেউ খুঁজে পাচ্ছিল না। দেখা গেল, সে মাছ কাটার একটা বঁটি নিয়ে বাড়ির আমগাছের বেশ উঁচু একটা ডালে বসে আছে। নীপা খুব ভালো গাছ বাইতে পারত।

নীপাকে সবাই পাগলীই বলে দিল। নির্ঘাত মাথায় দোষ আছে। নাহলে কি আর স্বামী বাড়িতে থাকতে এভাবে কোনো মেয়ে গাছে উঠে বসে থাকতে পারে? লাভের মধ্যে লাভ যা হলো, পশু জামাইয়ের ষণ্ডা শরীরের নিচে নীপাকে আর পিষ্ট হতে হলো না। শামীম খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল, ওই লোকটা যে পিশাচ গোছের। কিছু লোক গ্রামের বাজারে বসে ন্যাংটা ছবি দেখে আর বাড়ি গিয়ে বউকে নির্যাতন করে। এ ব্যাটাও ওই ছন্দের লোক। শামীম ছোটবেলা থেকেই বাজারে এমন কিছু লোক দেখে আসছে। আর তার বোনেরই কিনা এমন একটা স্বামী জুটল? বোনের বিয়েতে শামীমের মোটেও মত ছিল না। কিন্তু এও বুঝে উঠতে পারেনি, করবেটা কী? বিয়ে না দিলে যে ঝামেলাগুলো হতো, তা সামলানোর ক্ষমতা তো শামীমের নেই। এজন্যই বাবাকে বলতে পারেনি তার অসম্মতির কথা। এলাকাভর্তি বুড়োরা পর্যন্ত নীপার দিকে তাকানো শুরু করেছিল। এসব লক্ষ করেছে শামীম। ওদের এত টাকাপয়সা নেই, জমিজিরাত নেই, কারো সঙ্গে লাগার শক্তি নেই। কীভাবে রক্ষা করবে মেয়েকে? কিন্তু বিয়ে দিয়ে এটা কী হলো? এমন একটা প্রস্তাবই এনে দেয়া লাগল মেম্বরের? ফুলের মতো মেয়েটা। আহা রে।

শামীম চাকরি ছেড়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত হয়েছিল নীপার জন্যই। ওকে তো আর বিয়ে দেয়া যায়নি। পাগলী বিয়ে করবে কে? তাও আবার তালাক হওয়া মেয়ে। ওর স্বামীর বাড়ির এলাকায় প্রচার করা হয়েছিল, নীপা শুধু পাগলীই নয়, সে হিংস্রও। রাতের বেলা নাকি নিজের স্বামীকে লাথি ও খামচি দিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। এ কেমন মেয়ে, স্বামীর সোহাগ বোঝে না? নীপা একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে মায়ের কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। গ্রামের এক খালার সুবাদে চাকরি নিল গার্মেন্টে। প্রায় তিন বছর নিজের মতো করে মিরপুরে থেকেছে নীপা। বেশকিছু টাকাও জমিয়েছে। মাঝে মাঝে বাড়ি আসত। ওদের বাবা রাগ করে ছিল। মা বেশ শক্ত ছিল। নীপাকে বলত, নিজে ভালো থাকলে দুনিয়া ভালো। নীপা বাবাকেও বুঝিয়ে ফেলেছিল বেশ। আর ওর বাবা নিজেও কি বুঝত না? নীপাকে আসলে পাশবিক নির্যাতনই করেছে ওই লোক। খবর পাওয়া গেছে, আবার বিয়ে করেছে পশুটা। এবারো স্কুলপড়ুয়া এক মেয়েকেই। নীপার বাবা মুখ বুজে সহ্য করে যায়। তার মতের কোনো মূল্য নেই কোথাও। সামান্য কৃষকের কথা কে শোনে?

সবাই মেনেই নিয়েছিল, যা হওয়ার হয়েছে। এবার যদি একটু বেঁচে থাকার চেষ্টা করা যায়। নীপা চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে এসেছে। এখন দেশের অবস্থা আরো খারাপ। শামীম নিজে চাকরিতে টিকতে পারল না। নীপা তিন বছর চাকরি করে এখন বাড়ি এসে গেছে। শামীম নীপাকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি, কেন চাকরি ছাড়ল, বাড়ি কেন ফিরল; অপেক্ষা করছে হয়তো নীপাই কিছু বলবে। প্রায় দুই মাস হলো নীপা বাড়িতে। আশপাশের উঠতি ছেলেদের ভাবভঙ্গি ভালো লাগছে না শামীমের।

আজকে ঢাকায় কেউ মারা গেছে সম্ভবত, না হলে এতক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে কেন গাড়ি? ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে যাত্রী হেঁটে রওনা হয়েছে। শামীম কিছুক্ষণ সিএনজির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। অনেক মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। ১০ টাকা দিয়ে দুটো আমড়া কিনে খেল শামীম। এক পঙ্গু ভিক্ষুককে ৫ টাকা দানও করল। ফোনটা বাজছে। শামীমের বাবা কল করেছে, নীপা চলে যাচ্ছে। এবার নারায়ণগঞ্জ। শামীম ওর বাবাকে চিন্তা করতে না করে। বলে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে। শামীমের বাবা বলে, আল্লাহর ওপর ভরসা কইরাই তো আছি বাপ। শামীমের হেঁটে কোনদিকে চলে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে। যাবে কোথায়? রাস্তা আছে কোনো? এখনো ট্রাফিক জ্যাম ছাড়েনি। দূরে রেললাইন দেখা যাচ্ছে। একটা ট্রেন গেল। শামীম বাদাম কিনে খায়। আজকে দুপুরে ভাত খাওয়া হয়নি।