পুকুরে ডুবে যাওয়া পাঁচ বছর বয়সী ছোট সত্ ভাই বাদলের নিথর, ঠাণ্ডা, ভেজা, ন্যাংটা শরীরটা তার বড় মায়ের মেজ ছেলে বাবলু তার হালকা লোম গজানো বুকে জড়িয়ে ধরে ‘মা মা’ আর্তনাদ করতে করতে যখন দৌড়ে বাড়িতে ঢুকছিল, তাদের ৬১ বছর বয়সী বলিষ্ঠ শরীরের কর্মঠ বাপ মুহম্মদ জিয়াউদ্দিন শেখ তখন দুটি বাচ্চা কুকুরের নরম লেজ কাটবার জন্য গভীর মনোযোগে ইঞ্চি সাতেক লম্বা একটি কালো পাথরের পিঠের ওপর ধূসর বালি রেখে এক হাত লম্বা কাটারি ধার দিচ্ছিলেন।

কিছুক্ষণ আগে পড়েছে আসরের আজান। গ্রীষ্মের সূর্য দিনের বিকাল ভাগে আকাশের পশ্চিমে যতটুকু হেলে যাবার গেছে। বড় উঠোনের পশ্চিম কোনায় ছোট শরিকের লাল পেয়ারা গাছের ছায়ার নিচে গোলাকার, ছোটখাটো একটি ভিড়। বাড়ির ছোট বড় এবং গ্রামের অন্য শিশুদের বিপুল উত্সাহ ও কৌতূহল— কাটা হবে দু’মাস আগে জন্ম নেয়া দুটি বাচ্চা কুকুরের লেজ। উদ্দেশ্য, রাগী ও শিকারি হবে। বড় হয়ে রাত্রে বাড়ি পাহারা দেবে। অচেনা কেউ রাতে ঢুকলেই শুরু করবে ঘেউ ঘেউ। দুটিই মর্দ, একটির রঙ সাদা-কালো, অন্যটির খয়েরি ও সাদা। দুটি শাবক একসঙ্গে শুয়ে থাকলে বা ছোট ছোট আটটি পা ফেলে দৌড়ালে যে মানুষ তাদের দেখবে, সে-জন পশুপ্রেমিক না হলেও তার মনে হতে পারে শুয়ে আছে সুন্দর, দৌড়াচ্ছে প্রসন্নতা। জিয়াউদ্দিন নিজের কাজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মহাব্যস্ত থাকায় বাচ্চা দুটির ভয়ার্ত কুঁইকুঁই কান্না, পাথরে কাটারি ধার দেবার ঘষঘষ শব্দ এবং সমবেত শিশুদের কথা ও হাসির মধ্যে শুনতে পাননি বাবলুর ভয় পাওয়া গলার ‘মা মা’ আর্তনাদ।

জিয়াউদ্দিন নিজে একজন তুখোড় শিকারি বলে কুকুরের বাচ্চা দুটিকেও তার মতো শিকারি করে তুলতে হবে। ধার দেবার সময় ধার কতটুক হলো, এক পোচে বা কোপে লেজ কাটবে কিনা, বাচ্চা দুটি কম কষ্ট পাবে কিনা, মাঝে মধ্যে ডান হাতের খসখসে তর্জনী দিয়ে কাটারির ধার কতটুকু হলো, তিনি দেখছিলেন। এবং যে তর্জনী দিয়ে ধারের মসৃণতা পরীক্ষা করছিলেন, সেই তর্জনীর সঙ্গে মধ্যমা আর অনামিকা এক করে মাঝে মধ্যে নেড়ে দিচ্ছিলেন যেকোনো একটি শাবকের মাথা বা পিঠ। নরম লোম তার স্পর্শের অনুভূতিকে আনন্দ দেয়। তিনি স্মিত হাসেন। 

দোহারপাড়া গ্রামের বুড়ো মানুষরা এখনো শিকারের গল্প বলা শুরু করলে কেউ জিয়াউদ্দিনের নিশানার কথা বলবেই। ‘দেখিছিলেম, সন্ধে হয় হয়, একটা সরখেল পক্ষী একা, মনে হয় সাথীটারে কেউ মারেছে বা হারায়ছে সাথীটাক, উড়ে যাচ্ছিল, জিয়া উড়ে যাওয়া সরখেলরে গুলি করলো, গুলির পর পক্ষীটা আরো উপরে উইঠে গেল, আমরা ক্যলেম, জিয়া পারলু না, জিয়া ক্যলে বুকে গুলি লাগেছে সেজন্যি উপরে উঠতেছে, এখনি পড়বিনি, আমরা দেখলেম, পক্ষীডা খাড়া হ্যয়ে সুজা নামতেছে, আমারে সামনে ধপাস করে প্যড়লে, জিয়া উয়ের ছাওয়ালেক ক্যলে, বাড়িত লিয়ে যা।’

আট/নয় বছর বয়সী মেজ শরিকের যে দুটি শিশু— কামাল আর বিপুল গর্ব করবার মতো মহান দায়িত্ব পেয়েছিল দড়িতে বাঁধা দুটি কুকুরের দড়ি ধরে রাখবার, তারা পরে দড়ি ধরার এবং হাত থেকে দড়ি ছুটে যাবার গল্প কয়েকবার বলবে। বলবার সময় তারা ভুল করবে, কার হাতের দড়িতে বাঁধা ছিল কোন রঙের কুকুরশাবক। তাদের মধ্যে প্রথমে কামালের এবং তারপর মহূর্তেই বিপুলের চোখে পড়ে চাচাতো ভাই বাবলুর দৌড়ে আসা। কুকুরের দড়ি ধরা শিশু দুটির একজনও বুঝতে পারেনি, কেন একটি ন্যাংটা বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে তাদের বাবলু ভাই দৌড়ে আসছে আর জোরে জোরে ডাকছে তার মাকে। বাবলুর বুকের ওপর শিশুর মুখটা দেখতে পেলে কামাল বা বিপুলের যেকোনো একজন বুঝতে পারত, নিঃসাড় শিশুটি তাদের দুধভাত খেলার অতিরিক্ত সঙ্গী, সাঁতার না-জানা বাদল। খয়েরি ও সাদা রঙের কুকুরের গলায় বাঁধা দড়িটি ছিল কামালের হাতে, সে ভয় পাওয়া স্বরে বলে, ‘বড় আব্বা বাবলু ভাইর জানি কী হয়ছে।’ এবং কথাটি বলবার সঙ্গে সঙ্গে তার অজান্তেই হাত থেকে দড়িটা ছুটে যায়। সাদা-কালো কুকুরের দড়িটি ধরা ছিল বিপুলের হাতে। সে টের পায়, তার নরম হাতের মুঠিতে দড়ির টান লাগল, হাত থেকে ছুটে গেল দড়িটা এবং মুক্তি পাওয়া কুকুরের বাচ্চাটি তার অন্য সঙ্গীর মতো লেজ কাটা দেখতে আসা শিশুদের পায়ের ভেতর ও পাশ দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল।

বাবলুর পেছনে ছিল বিভিন্ন বয়সের, বাবলুর থেকে ছোট দোহারপাড়া গ্রামের আরো তিন তরুণ— সাদেক, টিপু ও মানিক। তারাও পুকুরে সাঁতার কাটছিল, ডুব দিয়ে বুড়ি ছোঁয়া খেলছিল, কারো পরনে ছিল ফিতে বাঁধা হাফ প্যান্ট, কারো লুঙ্গি কাছা মারা। সবার শরীর ভেজা, পুকুরে অনেকক্ষণ থাকবার ফলে চোখগুলো হয়েছিল লাল জবাবর্ণ, মাথার চুল ও পরনের কাপড় থেকে নিঃশব্দে টোপে টোপে শরীর ও ঊরু বেয়ে পড়ছিল পানি। চুল থেকে পড়া পানি তাদের কপাল ও চোয়াল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল কিন্তু তাদের কেউই তখন ফোঁটা ফোঁটা পড়ন্ত পানি থেকে সৃষ্ট আরামদায়ক সুড়সুড়ি টের পায়নি।

উঠোনের মাঝখানে বাবলু। বুকের ওপর নিথর বাদল। তাদের ঘিরে আছে গ্রামের তিন কিশোর। বাবলুর ডাকতে থাকা ‘মা মা’ আর্তনাদ শুনে বাড়ির রান্নাঘর, শোবার ঘর ও কুয়োতলা থেকে বিভিন্ন বয়সের মানুষরা, যাদের ভেতর আছে মা, চাচি, চাচা, কাজের লোক এবং আপন ও চাচাতো ভাইবোন, কেন এইভাবে বাবলু ডাকে, তার কী বিপদ, না বুঝেই সবাই প্রায় দৌড়ে আসে উঠোনের মাঝখানে। বাড়ির পুব কোনার ৫০ ফুট লম্বা নারকেল গাছের ডালে বসা একটি চিল শান্ত বাড়িটার মানুষদের হুড়োহুড়ি দেখে উড়ে যায়। তখনো জিয়াউদ্দিন কাটারির ধার পরীক্ষা করছিলেন ডান হাতের বুড়ো আঙুলে। আর্তনাদের শব্দের দিকে যখন মাথা ঘোরান, তখন তার তর্জনী ছিল কাটারির বুকের দিকে, ধারের ওপর। হঠাত্ তার খেয়ালে আসে, তাকে ঘিরে থাকা শিশুরা একদিকে দৌড় দিচ্ছে, বাচ্চা কুকুর দুটিও নেই। মুহূর্তের জন্য একটি বিরক্তি-কম্পন তার কপালে ঢেউ তোলে। এই বিরক্তি-ভাব আমরা দেখব ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরে যখন মুক্তিবাহিনীর শেল পড়ছিল দোহারপাড়া গ্রামের পশ্চিমে, পাবনার বড় গোরস্তানের পাশে বড় খালে, তিনি তখন দেখছিলেন মাছের গতিবিধি এবং মাছগুলো যখন চাড়োর ভেতর ঢুকবে ঢুকবে করছে, তখনি একটি শেল খালের দক্ষিণ দিকে শান্ত পানির ওপর পড়ে। কানে তালা লাগবার মতো প্রচণ্ড শব্দ হয়। শেলের আঘাতে সৃষ্ট বিশাল ঢেউ, যা কোনো দিন দোহারপাড়ার কেউ এই খালে আগে কখনো দেখেনি, উঠে আসলে জিয়াউদ্দিনের পা, পাছা ও অণ্ডকোষ ভিজে যায়। শেল ফাটার শব্দে আর আচমকা ঢেউয়ের তোড়ে চাড়োর দিকে আসা মাছগুলো ভয়ে পালায় দিগ্বিদিক। তিনি ১৬ ডিসেম্বরের শেষ দুপুরে কেন দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে শেল আসছে বোঝেন এবং তার মনে হয়, মাছগুলো চাড়োর ভেতর ঢোকার পর শেলটা পড়লে দেশের স্বাধীনতা পাওয়ার কী এমন ক্ষতি হতো। 

প্রায় দৌড়ে জিয়াউদ্দিন চলে আসেন উঠোনের ভিড়ের পাশে। কেউ কেউ দেখে, তার হাতে কাটারি। এক অভাবনীয় ঘোরের মধ্যে কুকুরের লেজ কাটবার জায়গা থেকে উঠে আসবার সময় তার মনে থাকে না কাটারিটা কাজের জায়গায় রেখে আসবার কথা। এবং মাটির যে মালসায় হলুদ আর নতুন কাপড় পোড়ানো ছাইয়ের মিশ্রণ ছিল, যা কুকুর দুটির লেজ কাটবার পর কাটা লেজের রক্তাক্ত অংশে মলম হিসেবে লাগাবার কথা, সেই পাত্রটি জিয়াউদ্দিনের পায়ের ধাক্কায় উল্টে যায়। ঘন, আঠালো কালচে-হলুদ ঠাণ্ডা মিশ্রণটির কিছু তার ডান পায়ের বুড়ো ও মধ্য আঙুলের নখে লাগে; মনে হয় হলুদ নেল পালিশ, যদিও তখন ওই বিশেষ মলমের শীতলতা তিনি টেরই পাননি।

ভিড়ের ভেতরে কে একজন বাবলুকে বলে, ‘বাবলু মাথার উপেরে বাদলরে তুলে নাচ, প্যাটের তেন পানি বাড়াবিনি।’

বাবলু মাথার ওপর বাদলকে তুলে ঘোরে, ঘুরতে থাকে। এক মৃত্যুমুখী মানুষকে বাঁচাবার জন্য এক জীবিত মানুষ নাচছে। বাদলের মুখ দিয়ে সামান্য পানি বমির মতো বের হয়। বাবলু ঘোরা বন্ধ করে না। আবার একটু পানি বের হয়। অচেতন শিশু হাত-পা-মুখসহ একখণ্ড নিথর মাংসপিণ্ড। বাড়ি ও পাড়ার মানুষদের চোখে আশা ও নিরাশার ভয় দুলতে থাকে। 

বিকালের রৌদ্র চিকন সোনালি তারের মতো সমবেত মানুষের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে কাটারির সাদা লোহার ওপর পড়ে ছিটকে যাচ্ছিল এদিক-ওদিক, কারো চোখের ওপর পড়লে চোখ ঝলসে যেত। কেউ একজন তার হাত থেকে কাটারি নিয়ে নেয়। কে নিল, জিয়াউদ্দিন দেখেনও না। তখন কামাল কী ভেবে পশ্চিম দিকে তাকায়, দেখে, গলায় দড়ি দেয়া বাচ্চা কুকুর দুটি কুয়োর পাশে তাদের মার দুধ খাচ্ছে, দোলাচ্ছে লেজ।