রামনাথ বিশ্বাস বোর্নিও থেকে চীন যাত্রা করেন। চীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন লাল চীন নামের একটি গ্রন্থ। লাল চীন গ্রন্থের ভূমিকামূলক অংশটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—

আমাদের দেশে অনেকেই কী করে সাইকেলে পৃথিবী ভ্রমণ করতে হয়, তা জানে না। আমিও জানতাম না। কিন্তু কতকগুলো বৈদেশিক পর্যটকের সংশ্রবে এসে আমি অনেক কিছু জেনেছিলাম। সাইকেলে যারা ভ্রমণ করতে চান, তারা যেন সাদাসিধেভাবে চলেন। বহুরূপী সাজলেই বিপদ-আপদ তো আছেই, উপরন্তু কিছু না জানারই আশঙ্কা বেশি। আমি বহুরূপী সাজতাম না, এমন কি আমার রিস্টওয়াচও অনেক সময় বুক পকেটেই রাখতাম। সিঙ্গাপুর হতে যে ঘড়িটা আমার সঙ্গে ছিল, সেটা সময় ঠিক দিত না। ঠিক সময় রাখার আমার দরকার হয়ে উঠল। শীতের সময় চীন দেশের আকাশে সূর্য কমই দেখতে পাওয়া যায়। কখনো কুয়াশা, কখনো শিলাবৃষ্টি আবার কখনো আকাশ ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। হংকংয়ে কয়েক দিন থাকার পরই অনুভব করলাম ঘড়িটা বদলাতে হবে, নতুবা কখন সকাল হলো আর কখন বিকাল জানতে পারব না। অর্থাভাব আমার খুবই ছিল, তবুও কয়েকটা বড় বড় ঘড়ির দোকান ঘুরলাম। বড় দোকানে দাম শুনে ঘড়ি কেনার ইচ্ছা একদম লোপ পেল, তাই পুরনো ঘড়ির দোকানগুলোয় ভালো ঘড়ি কম দামে পাওয়া যায় কিনা দেখতে লাগলাম। কিন্তু ঘড়ি কেনা আমার হলো না। পরের দিনও আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস প্রবল বেগে বইছিল। হোটেল থেকে বের হতে মোটেই ইচ্ছা করছিল না। সকালের সংবাদপত্র পাঠ করেই সময় কাটাচ্ছিলাম। নির্জনতাও বেশ অনুভব করছিলাম। ভাবছিলাম যদি কেউ আসত, তবে কথা বলে সময় কাটানো যেত। এমনি সময় একজন লোক আমার রুমে প্রবেশ করে কাছের চেয়ারটা আগুনের কাছে টেনে নিয়ে আমার দিকে না চেয়েই বললেন— নমস্কার মি. লিমনাথ, আপনার ঘড়ি কেনা হয়নি জেনে বড়ই দুঃখিত হলাম, ঘড়ি কেনা নিয়ে মাথা ঘামাবেন না, আপনার ঘড়ি কেনার দরকার হবে না। সময়ের সঠিকতা জানার জন্যই আপনি ঘড়ি কিনতে চান, তা আমরা বেশ ভালো করেই বুঝি। আপনাকে সময় ঠিক রাখার জন্য ব্যস্ত হতে হবে না। ভালো কথা, আপনি কোন পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন, জানতে পারি কি? প্রশ্নটা শুনেই আমার ভয়ানক রাগ হয়েছিল। যার যথায় অভাব, সেই অভাবের পরিমাণ জিজ্ঞাসা করলে বড়ই লাগে, আমারও লেগেছিল। রাগ সংবরণ করে জিজ্ঞাসা করলাম— আমি কোন পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি, তা জানা আপনার কি দরকার? লোকটি আগুনের দিকে মুখ রেখেই বললে— দরকার বৈকি! আপনি আমাদের দেশে ভ্রমণ করতে যাবেন, আমরা আপনাকে সাহায্য করব, তাই আপনার বিদ্যাবুদ্ধির সন্ধান পেলে সুবিধা হবে না কি?

আমি পল্টনে বড় বাবুর কাজ করেছি। সিঙ্গাপুরে বড় একটা চাকরি ছেড়ে দিয়ে পৃথিবী ভ্রমণে বের হয়েছি বিশ্বরূপ দেখতে আর ভাবপ্রবণতার চরমত্ব অনুভব করতে এর বেশি আমার আর কোনো মতলব তখন এই ভ্রমণে ছিল না। সুতরাং আমার বিদ্যাবুদ্ধি কতটুকু, সে প্রশ্ন এখানে উঠতেই পারে না। লেখাপড়া মানে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপ? লোকটা কি বলতে চায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপ না হলে চীন ভ্রমণ আমার হবে না? এসব চিন্তা করে আমার ভয়ানক রাগ হলো। আমি চুপ করে থাকলাম কতক্ষণ। তারপর বললাম— বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপ আমার নেই। লেখাপড়া আমি অতি অল্পই করেছি। আমার মতো নামগোত্রহীন লোক কি আপনাদের দেশে গিয়ে কোনো পাত্তাই পাবে না? যদি আপনাদের মতো বিদ্বান লোকের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ না পাই অথবা সাহায্য আমার পক্ষে পাওয়া সম্ভব না হয়, তবে চীন দেশে অনেক গরিব ও অশিক্ষিত লোক আছে, তাদের সঙ্গেই থাকব। আমি আর মাত্রা ঠিক রাখতে পারছিলাম না, কারণ চীনও আমাদের মতোই পরোক্ষভাবে ‘কলোনিয়াল’ দেশ তখনকার দিনে ছিল। ভাবছিলাম এদের ভেতরেও পরাধীনতার দোষ এসে পড়েছে, তাই একদম বলে ফেললাম— এখান হতে বের হয়ে গেলে বাধিত হব, আমি আমার বিদ্যাবুদ্ধির পরীক্ষা আপনার কাছে দেব না।

আমি যখন চিত্কার করে কথা বলছিলাম, তখন বয় ও ম্যানেজার উভয়ই আমার ঘরে একই সঙ্গে প্রবেশ করলেন। বয় এসেছিল চা ও ফল নিয়ে এবং ম্যানেজার আসছিলেন হাসতে হাসতে দুপাটি দাঁত বের করে। বয় চা ও ফলের ট্রে টেবিলে রেখে বের হয়ে গেল। ম্যানেজার আর একখানা চেয়ারে বসে আগন্তুক লোকটিকে নমস্কার করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন— কী হয়েছে মি. লিমনাথ? আমি বললাম— কী আর হবে, ইনি এসেছেন আমার বিদ্যা কতটুকু ওজন করে দেখতে। বলুন তো আপনি কী পাস করেছেন?

ম্যানেজার বললেন— এখানে পাস অথবা ডিগ্রির কথা হচ্ছে না, আপনি বিদেশে ভ্রমণ করতে এসেছেন, আপনাকে অনেক কথা জানতে হবে এবং সেই কথা দেশ-বিদেশের লোককে জানাতে হবে। জানাতে হলেই জানার ক্ষমতা অর্জন করা দরকার। আপনার জানার ক্ষমতা আছে কিনা, তা-ই ভদ্রলোক জানতে চান। তিনি আপনার বন্ধু, শত্রু নন। আমিও আপনার বন্ধু। আপনাকে আমরাই হোটেলে থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছি। ওই যে শিখ ভদ্রলোক আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছিল, সে আমাদেরই লোক। সে আপনাকে চেনে না বলেই ভান করেছিল। সে আপনার জন্য বেলা ৩টা হতে অপেক্ষা করেছিল। আপনি জাহাজ হতে নামলেন রাত ১১টায়। ওয়ারলেস অপারেটর আপনাকে শিখ লোকটির সঙ্গে যেতে বলেছিল। অপরেটর আমাদের লোক ও আমাদের বন্ধু। আপনার প্রতি সে সদ্ব্যবহার করেছে নিশ্চয়ই। ছাইফং হতে সে আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে। পথে পাঁখয়ে যখন কতগুলো সেপাই জাহাজে উঠল, তখন আপনি সেপাইদের দুরবস্থা দেখে কিছু মন্তব্য করেছিলেন। অপারেটর তার প্রতিবাদ করেছিল এবং বলেছিল চীনের সেপাইকে সে মোটেই ভালোবাসে না। এরা যদি জাহাজ ডুবে মরে, তবে সুখীই হবে, এসব কথা নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে। এতেই তো বুঝতে পারছেন আপনার সম্পর্কে আমরা কত সংবাদ রাখি।

ম্যানেজারের কথা শুনে আমার হুঁশ ফিরলে আমি লজ্জিত হয়ে চুপ করে রইলাম। ম্যানেজার বলতে লাগলেন— যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পায়নি, তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিকে তুচ্ছজ্ঞান করে। আপনার যদি কোনো ডিগ্রি থাকত, তবে বুক ফুলিয়ে বলতেন আপনার অমুক ডিগ্রি আছে। এসব কথা এখন থাক, আপনাকে এখন থেকে কিছু লেখাপড়া নতুন করে করতে হবে এই হলো আমাদের ইচ্ছা। কোথায়, কী করে আপনার শিক্ষার ব্যবস্থা হবে, তা আপনার জানা দরকার নেই। এখন আপনি এই অপরিচিত ভদ্রলোকটির সঙ্গে যান। তিনি আপনাকে একটি বড় ক্লাবে নিয়ে যাবেন, সেখানে অনেক লোক আপনার লেকচার শোনার জন্য অপেক্ষা করছে।

আমি বক্তৃতা দেয়া তখনো শুরু করিনি। বক্তৃতা দেয়ার মতো আমার কিছুই ছিল না। মালয়, শ্যাম, ইন্দোচীন— এই তিনটি মাত্র দেশ ভ্রমণ করেছি। এই তিন দেশের লোক সম্পর্কে যা কিছু জেনেছি, তা গুছিয়ে বলা আমার পক্ষে অসম্ভব। তাই চিন্তিত হয়ে পড়লাম কী বলতে কী বলে ফেলি। চা খেয়ে অপরিচিত লোকটির সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। অপরিচিত লোকটির পরনে পুরনো ধরনের ছাতার কাপড়ের মতো জামা ও পাজামা, মাথায় ফেল্ট হেট, পায়ে চীনা জুতা। ভেতরে লেপের কোট। আমি পথ চলতে চলতে লোকটির পোশাকই বেশ করে লক্ষ করছিলাম। কুইন স্ট্রিট পার হয়ে সিঁড়ি বেয়ে অনেক দূর গিয়ে আমরা একটি বইয়ের দোকানে প্রবেশ করলাম। বইয়ের দোকানে যেতে আমার মোটেই ইচ্ছা হচ্ছিল না। দোকানটি নিচতলায়। ওপরে আরো কয়েকটি তলা ছিল। দোকানে প্রবেশের পরই দোকানি আমার হাতে একখানা বই দিয়ে বলল— এই বইখানা আপনাকে আমি উপহার দিলাম। বইটির দুচার পাতা উল্টিয়ে মুখে বললাম— বেশ ভালো বই, অন্তরে গোপনীয় ধারণা ছিল এটা একটা বাজে বই। অর্থশাস্ত্র নিয়ে বইখানাতে নানা কথা লেখা ছিল। বইখানা হাতে করেই আমরা উপরে উঠতে লাগলাম। উপরে উঠতে আমার মোটেই ইচ্ছা হচ্ছিল না, কারণ সিঁড়িগুলো ছিল ছোট এবং সিঁড়িতে বাইরের আলো কমই পৌঁচ্ছিল। অতিকষ্টে সিঁড়ি বেয়ে আমরা একটা রুমে প্রবেশ করলাম। সেখানে মাত্র কয়েকজন লোক বসা ছিলেন। এদের ছবি ও নাম অনেক স্থানেই দেখা যায় এবং এদের নাম আজকাল অনেকেই উচ্চারণ করে গর্বও অনুভব করে। তাদের একজন জিজ্ঞাসা করলেন— চীন দেশে গিয়ে আমি কী দেখব। আমি বললাম— চীন দেশে আগে তো যাই, তারপর যা চোখে পড়বে, তাই দেখব। তারপর আর একজন বললেন— আপনাদের দেশের বাড়িঘর, গরিব লোকের পোশাক এসব কি হংকংয়ের মতোই? আমি তাদের বললাম— হংকংয়ের গরিব লোকের সঙ্গে আমাদের দেশের গরিব লোকের মোটেই মিল নেই। ভারতের গরিবে ও চীনের গরিবে কোথায় প্রভেদ, তার কতকটা আভাস আমার কাছ থেকে প্রশ্নকর্তা পেয়েছিলেন। কী করে লোক দরিদ্র হয়, তার যেসব কারণ আমি তাদের কাছে বলেছিলাম, তা এখন মনে হলে আমারই হাসি পায়। আমার কথা যারা তখন শুনেছিলেন, তারাও আজ আমি যেমন করে আমারই কথা মনে করে হাসছি, তেমনি হেসেছিলেন। লেকচার মোটেই হয়নি, এসব বাজে কথা বলেই সময় কাটিয়ে হোটেলে ফিরেছিলাম।

সেদিনই বিকাল বেলা আমি একজন পরিচিত পাঠানের কাছে সকালের ঘটনা বলি, এতে পাঠান বলেছিলেন— বাবু আপনি এখন পর্যটক ছাড়া কিছুই নন। দেখেশুনে পথ চলুন, তবে ভয় করবেন না মোটেই। কাউকে অনর্থক রাগাবেনও না। দিক না কিছু লেখাপড়া শিখিয়ে, তাতে লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই তো। যারা পৃথিবী পর্যটনে বের হয়, তারা কোনো বিষয়কেই বড় করে চিন্তা করে না। এগিয়ে যান স্বাধীন চীনে, অনেক কিছু দেখতে পাবেন। দেখেশুনে শিক্ষাও হবে। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেই, সেজন্য আপনি দুঃখিত। যদি দেশ পর্যটন চোখ-কান সজাগ রেখে করতে পারেন, তবে বহু শিক্ষিত লোক আপনার কাছে অনেক কথা শিখতে আসবে। পাঠানের কথায় অনেকটা শাস্তি পেয়েছিলাম। রাত্রে উভয়ে মিলে একটা রেস্টুরেন্টে খেয়ে আমি হোটেলে ফিরে গিয়েছিলাম।