ট্যুরিস্টের মতো ঘোরাঘুরি মনে টানে না, হতে চাই ট্রাভেলার। একটু দীর্ঘ সময় কাটানো, সংশ্লিষ্ট এলাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য জানা, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মেশা, তাদের চিন্তাভাবনা ও বিশ্বাসকে বোঝার চেষ্টা করা— এসবে ভালো লাগাটা বেশি কাজ করে। কিন্তু সময়ের স্বল্পতা সেটা সবসময় সহজ করে তোলে না।
ফেনী আমার জন্মভূমি বটে, আর বাবার সরকারি চাকরির কারণে এই জেলার বাইরেই বেড়ে ওঠা। সেখানে যাই যাই করে যাওয়া হয়ে ওঠেনি খুব একটা। এবার মেলা পরিকল্পনা নিয়ে হাজির হলাম নানার বাড়িতে।
পরদিন বের হলাম শহর ও আশপাশ ঘুরে দেখতে। ফেনীকে এখনো মফস্বল শহর বলা যায়। গলি-ঘুপচি, পাড়া-মহল্লা ঘুরে ফেরার পথে ফেনী পাইলট বা কলেজের পশ্চিমে চোখ পড়ল ‘নবীন চন্দ্র সেন পাঠাগার’। বছর চারেক আগে যখন পাগলা মিয়া ও শাহ পীর চিশতীর মাজার জিয়ারতের জন্য এসেছিলাম, তখনো চোখে পড়েনি।
বাইরে থেকে দেখেই বোঝা যায় ছোটখাটো এ পাঠাগার নতুন কোনো উদ্যোগ। বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত পাড়া-মহল্লায় যেসব পাঠাগার ছিল, সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে মোটামুটি। সেখানে এ রকম নতুন পাঠাগারের জন্ম, এটা দেখে বেশ ভালো লাগা কাজ করল। তার ওপর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল ‘নবীন চন্দ্র সেন পাঠাগার’ কেন! এ লোক তো চট্টগ্রামের রাউজানের বাসিন্দা। খোদ চট্টগ্রামেই তার নামে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। তাহলে ফেনীতে কেন!
এসব চিন্তাভাবনা করতে করতে পাঠাগারে ঢুকে পড়লাম। চারদিকে চোখ বোলালাম। চিরচেনা পরিবেশ, বাংলাদেশের অন্য আট-দশটা পাঠাগারের মতো। একজন পাঠক পত্রিকা পড়ছেন। আর লাইব্রেরিয়ান গোছের লোকটা কম্পিউটারে কী যেন করছেন। এক দিক হতে বইগুলো দেখা শুরু করলাম। পুরনো, ছেঁড়া প্রায় সব বই। পাকিস্তান আমলে সংগৃহীত দু-একটা বিষয়ের দু-চারটা বই কাজের মনে হলো। বাকিগুলো সব অর্থে রদ্দিমাল, কোনো আপডেট নেই; বিষয়ভিত্তিক ব্যাপক সংগ্রহ নেই, সব যেন ছক পূরণের স্বার্থে বই সংগ্রহ। তবে মাঝে মাঝে এ রকম জায়গায়ও দু-একটা দুর্লভ বইয়ের দেখা মেলে। তাই মনোযোগ দিয়ে দেখেই যাচ্ছিলাম। যে জিনিস চোখে পড়ল বইগুলোয়, ফেনী পাবলিক লাইব্রেরির সিল। বিভ্রান্ত হলাম, কী ব্যাপার! সাইনবোর্ডে কী দেখলাম আর এখানে কী লেখা। দেখার ভুল হলো তো! এসব চিন্তা করতে করতে দু-একটা জরুরি বইয়ের ছবি তুলে নিচ্ছিলাম।
লাইব্রেরিয়ানের কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে বিষয়টা জানতে চাইলাম। তিনি চোখ তুলে তাকালেন, তারপর খানিক উৎসাহ নিয়ে জানালেন এটা ফেনী পাবলিক লাইব্রেরি নয়, এটা ব্যক্তিসমষ্টির উদ্যোগ। ফেনী পাবলিক লাইব্রেরির কিছু বই এখানে দান করা হয়েছে। কিন্তু আমি যা দেখলাম, তার ৯৯ শতাংশই পাবলিক লাইব্রেরির সিল মারা। ব্যক্তি-উদ্যোগে পরিচালিত কিছু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হয় বলে ভদ্রলোক জানালেন।
পরবর্তী প্রশ্নে একগাদা বিরক্তি প্রকাশ করে জানালেন, তিনি এখানে বসেছেন মাত্র, লাইব্রেরিয়ান নন। যেন ‘লাইব্রেরিয়ান’ এক দারোয়ান! পাঠাগার হতে পশ্চিম দিকে বের হয়ে দেয়ালে টাঙানো একটি কবিতা পড়ে বুঝলাম এটা ফেনীর জেলা প্রশাসকের কাজ। নবীন চন্দ্র সেনের হাতেই ফেনী মহকুমার গোড়াপত্তন। তিনিই এখানকার প্রথম কালেক্টর ছিলেন। স্থানীয় পাইলট হাইস্কুলও তার অবদান। বেশ, এভাবে স্মরণ রাখা জরুরি; তবে সমাজের সবাই যেহেতু কালেক্টর হন না, তাই জেলা প্রশাসকরাও সবাইকে এভাবে হয়তো স্মরণের সুযোগ পান না। তার পরও একদম না পাওয়ার চেয়ে কিছুটা পাওয়া তো ভালো!
পরদিন বের হলাম সদর উপজেলার শর্শদী গ্রামের উদ্দেশে। বহুবছর আগে একবার কোথাও চোখ পড়েছিল একটি মসজিদের ছবি, যার স্থাপত্য রীতি সুলতানি আমলের মসজিদের মতো। গুগল করে জানলাম এ মসজিদ ফখরউদ্দীন মোবারক শাহর সময় করা। পথঘাটের যে ঠিকানা ইন্টারনেটে মেলে, সে মোতাবেক গন্তব্যে যেতে বেশ বেগ পেতে হয়।
ফেনীর পুরাতন ট্রাংক রোড হয়ে শর্শদী গেলাম। মসজিদটা উত্তর শর্শদীতে বা শর্শদী রেলস্টেশন থেকে ১০ মিনিটের হাঁটাপথে। স্টেশনের কাছে চা পানরত ষাটোর্ধ্ব একজনকে জিজ্ঞাসা করলে বললেন, ‘তাইয়া মসজিদে নি যাইবেন?’ ইন্টারনেটে কোথাও এ রকম তথ্য পাইনি। তাইয়া-তাকিয়া-মাজার; ফেনীর আঞ্চলিক ভাষায় মাজারকে তাইয়া বলে।
ভরদুপুরে রাস্তাঘাট খাঁ খাঁ করছে, তার ওপর ঈদের পাঁচ-ছয় দিন কেটে গেছে। ভেবেছিলাম রাস্তায় লোকজন গিজ গিজ করবে, কিন্তু হলো উল্টো। আরো দু’দফা ইচ্ছা করে পথের হদিস জিজ্ঞেস করলাম। এতে ঠিক পথে যাচ্ছি কিনা, সেটা নিশ্চিত হওয়া যায় এবং নতুন তথ্য যোগ হওয়ার সুযোগ থাকে।
মসজিদের কাছাকাছি পৌঁছে চোখ পড়ল প্রায় আয়তাকার ছোট লাল ইটের ঘর। মসজিদ প্রাঙ্গণে রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাইনবোর্ড। মানে এ মসজিদ তাদের সংরক্ষণ তালিকায় আছে। আশপাশ ঘুরে ভেতরে প্রবেশ করলাম। একজন নামাজ পড়ছিলেন। নামাজ শেষে হওয়ার পর তার সঙ্গে আলাপ শুরু করি। কথা বেশি দূর এগোল না, কারণ তিনি স্থানীয় নন। তবে তাইয়ার কথা জিজ্ঞেস করলে বললেন, ওই যে সামনে চারকোনা ঘরটি মাজার। খুব ছোট, শুধু মাথাটা আছে। আর বিস্তারিত বলতে পারলেন না।
মসজিদের মেহরাবের সূক্ষ্ম কারুকাজগুলো সংস্কারের নামে ধ্বংস হয়নি; যা দেখে খুব আনন্দ হলো। সুলতানি আমলের মসজিদগুলোর যেসব কারুকাজ আছে, তা অক্ষত অবস্থায় নেই বলা চলে। এ মসজিদের পোড়ামাটির কারুকাজগুলো বহাল তবিয়তে আছে এবং এর কাজের ধরনও আলাদা। ভেতরে তিন কাতার ও পিলারগুলোর ছাদের সংযোগস্থলে কালো পাথর, যার দুটো সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দেয়া। এ রকম পুরনো স্থাপনায় বায়ু, আলো এবং শব্দের যথাযথ প্রবাহ হওয়ার অসাধারণ ব্যবস্থায় গড়ে ওঠে। কিন্তু সংস্কারে নামে অপূরণীয় ক্ষতি করা হয় এসবের।
ইতিহাসবিদ-প্রত্নবিদ-স্থপতি-প্রকৌশলী তথা যথাযথ বিশেষজ্ঞের মতামত না নিয়ে কাজ করলে যা হয় আর কি। বাতাসের ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে না করার জন্য এসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখেছি। আশপাশে যত দূর পর্যন্ত নতুন স্থাপনা, হোক সেটা পায়খানা বা অজুখানা করা যাবে না। সেসব বিধিনিষেধ মানা-বোঝার বিকার থাকে না বলেই শত শত বছর আগের বাতাস-আলোতে ভরপুর স্থাপনায় নতুন করে বা বল প্রয়োগ করে উত্কটভাবে আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করে স্থাপনার বুকে শেল বিঁধিয়ে দেয়া হয়। তাইয়ার সমাধিস্থ ব্যক্তির কোনো হদিস করতে না পেরে ফিরে আসি, এর পাশে বিখ্যাত শর্শদী দীঘিটাও দেখার কথা ভুলে যাই।
সেখান হতে চলে গেলাম দাগনভূঁঞা উপজেলার প্রতাপপুর গ্রামে। সরু পিচঢালা আঁকাবাঁকা পথ। নতুন এলাকা দেখব বলে শহরে ফিরে না এসে গ্রামের ভেতর দিয়ে ভেঙে ভেঙে হাজির হলাম। আর একা ভ্রমণের মজা হলো বিষয়গুলো নিয়ে ভাবনায় ডুবে থাকা যায়।
গ্রামের রাস্তা পিচঢালা হওয়ায় সব জায়গায় সিএনজি বা অটো পাওয়া যায় এবং লোকালে যাওয়ার সুবিধা অনেক, খরচ বাঁচায়, দ্রুত গন্তব্যেও পৌঁছা যায়। কক্সবাজার হতে সিলেট তথা বাংলাদেশের বৃহৎ পূর্বাঞ্চলে গ্রামে রিকশা ভাড়া খুবই বেশি হয় এবং সহজলভ্যও নয়।
রাস্তার পাশে লাগোয়া প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি। এক পর্যটকের বর্ণনায় পড়লাম এটাই বাংলাদেশের একমাত্র জমিদার বাড়ি, যাতে ১৩টি পুকুর আছে। এজন্য আমার কাছে আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে যায়। যে-ই বাড়িটার সামনে গেলাম, ফেনীর আঞ্চলিক ভাষায় বাড়ির সামনের রাস্তাটুকুকে ঘাঁডা বলে। ঘাঁডায় বাঁশ পুঁতে পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কাদাপানিতে নেমে পাশের জমি মাড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। বাঁ পাশে মাঝারি আকারের একটি পুকুর ভাঙা পাকা ঘাটসহ।
কালের জবুথবু সাক্ষী। জমিদার রামনাথ কৃষ্ণ সাহার এ বাড়ি ১৩ একর জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মূল কম্পাউন্ডে দুজন লোক ছিলেন, তারাও মিনিট পাঁচেক পরে চলে গেলেন। শুরু হলো সুনসান নীরবতা। বাড়ির পলেস্তারা-ইট ঝরে ঝরে পড়ছে, বটগাছ প্রকট হয়ে স্থাপনার গায়ে ইতিহাস হয়ে যাওয়ার সত্যায়নে প্রতীক হয়ে আছে। ঢোকার পথে কাদাপানি বলে বাম পাশের ঘরে প্রবেশ করলাম। টপ টপ করে চুয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে ভেতরে, পাখি-কাঠবিড়ালির ডাক গভীর নৈঃশব্দকে আরো বাঙময় করে তুলেছে। উঠানে এসে বুঝলাম কাচারি দু’দিকে দ্বিতলবিশিষ্ট। ছাদে মোটা লোহার বিমগুলো দৃশ্যমান। মূল ঘরটি ছিল তিনতলা, এখন দোতলা পর্যন্ত আছে, ভূমিকম্পে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বড় ফাটলগুলো দৃশ্যমান। ভেতরের শেওলা ঘরের দরজা কার্নিশের সূক্ষ্ম কারুকাজগুলো ঢেকে রেখেছে। হাত দিয়ে টোকা মেরে, বাড়ি দিয়ে ইট, দেয়ালের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করলাম।
বাড়ির পেছনের দিকটা ঘন জঙ্গল বলা যায়। পুকুরও চোখে পড়ল, গুনে গুনে আট। কাছে গিয়ে দেখলাম, বাকিগুলো দূর হতে। তবে খুব ছোট ছোট পুকুর। এ রকমটা বাংলাদেশের অন্য কোথাও দেখিনি। পেছনের দক্ষিণে রান্নাঘরও বিলুপ্ত প্রায়। মূল ঘরের দক্ষিণে বড় আরো একটি দ্বিতল স্থাপনা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় আছে। ভেতরে হাঁটতে গিয়ে দরজায় ওপর কিছু বাংলা লেখা পেলাম তারিখসহ।
বাড়ির গঠনে বোঝা যায় এ জমিদার যথেষ্ট সম্পদশালী ছিলেন। ব্রিটিশ ভারত ভাগের সময় তার পরিবারের এক অংশ ভারত চলে যায়, অন্য অংশের উত্তরসূরিরা ঢাকা-চট্টগ্রাম-নোয়াখালীতে আছেন। তাদের কেউ কেউ বছরে একবার এসে এলাকার লোকজনকে নিমন্ত্রণ করেন, পূজা দেন। কিন্তু এ স্থাপনা হয়তো ব্যক্তি-উদ্যোগে সংরক্ষণ সম্ভব নয়। সরকারিভাবে সংরক্ষণ-সংস্কার করা যেতে পারে।
পরের সকালে যাত্রা করলাম ছাগলনাইয়া উপজেলায়। ফেনীর বা বলা যায় বাংলাদেশের অন্যতম পুরনো জনপদ এটি। এখানে ১৯৬৫ সালে পুকুর খননকালে একটি কুঠার পাওয়া যায়, যার বয়স নির্ধারণ করা হয় কমপক্ষে পাঁচ হাজার বছর। জাতীয় জাদুঘরে এটি সংরক্ষিত আছে। ছাগলনাইয়া সদরের কাছেই শিলুয়া গ্রাম।
এ গ্রাম আমার অন্যতম আকর্ষণ। এখানে ১৯০৮ সালে কিছু শিলা-শিলালিপি উদ্ধার করা হয়, যা খ্রিস্টপূর্ব ২ অব্দের। ধারণা করা হয়, বৌদ্ধ যুগের। ব্রিটিশ সরকার শিলাগুলো সংরক্ষণের জন্য চারদিকে বেড়া দেয় এবং সরকারিভাবে দারোয়ান নিয়োগ করেছিল। কালক্রমে তা বাংলাদেশের হয়। সেখানে পূজা শুরু হয়, স্থানীয়রা জিন্দা পাথর বলে ডাকেন। হাফ-ওয়ালে ঘেরা জায়গাটুকু নিচে পাকা করা আর শিলাগুলোর ওপর টিনের ছাউনি, পাশে দেয়াল ঘেঁষে সোলার লাইটের খুঁটি। নামফলকে লেখা জেলা পরিষদের উদ্যোগে ২ লাখ টাকা ব্যয় করে এ উন্নয়ন করা হয়েছে। আর কোনো কিছু নেই। সেখানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের হাজিরার চিহ্ন বা ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে কোনো লেখা নেই। বসার স্থান নেই। হয়তো দু-চারটা বড় পাথর কিইবা এমন মূল্য— এসব ভেবে কেউ আর খরচ বা অপচয় করেনি। তাই পরবর্তী গবেষণা নামক বাতুলতার আশা করছি না। বিষণ্ন হয়ে মেঘকাটা টাটানো রোদে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম দুই হাজার বছর আগে এখানে কী হয়েছিল বা কেমন ছিল সে জনপদ-মানুষ-সংস্কৃতি, কতটা ঋদ্ধ ছিলেন তারা।
তার পরের গন্তব্য বাঁশপাড়া গ্রামে। এখানে পুরনো সাতটি মন্দির আছে একসঙ্গে, যার ছবি অনেক আগে ভ্রমণ বইতে দেখেছি। এলাকায় ঢুকতেই হাতের বামে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু দ্বিতল মন্দির। দোতলায় ওঠার সিঁড়ি গোলাকার, যথারীতি ইট-পলেস্তারা খসে পড়ছে।
এর বিম ও লোহার আকৃতি ছাগলনাইয়ার সেই জমিদার বাড়ির মতো। হয়তো নির্মাণকাল একই। কিছু দূর এগোনোর পর সেই ‘সাত মন্দির’। ইংরেজি এল প্যাটার্নে প্রথমে চারটি পরপর, পরের তিনটি বাঁক নিয়ে আবার পরপর। প্রথম চারটির অবস্থা দূর থেকে দেখেই বোঝা যায় এগুলো বেশি পুরনো। পরের তিনটির নির্মাণ, নকশাও আলাদা। যদিও সবগুলোর উচ্চতা ৩৫ ফুট প্রায়। পুকুরপাড়ে এগুলো অবস্থিত। পাশেই পাকা সড়ক। প্রশান্ত পুকুরপাড়ে কিছু ছেলেপুলে ফুটবল খেলায় মত্ত। আমি মন্দিরের কাছে গিয়ে হেসে উঠলাম মনে মনে। কতটা খামখেয়ালি আমরা! ভ্রমণ গাইড বা ব্লগে সবাই এগুলোকে মন্দির বলে চিহ্নিত করেছেন। অথচ মন্দির নয়! এক সময় চিতাখোলা তথা শ্মশান ছিল। মরদেহ সত্কারের পর সেখানে এ স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে, একে সনাতন শাস্ত্রীয় ভাষায় বলে সমাধিকরণ। বাংলাদেশে বিভিন্ন জায়গায় শ্মশান দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। এ রকম বৃহৎ স্থাপনা কোথাও দেখিনি। বোঝা যায়, জমিদার বিনোদ বিহারী যথেষ্ট ধনী ছিলেন। দেশ ভাগের সময় তিনিও অঞ্চল ছেড়ে চলে যান। কিছু ছবি তুলে চলে এলাম ছাগলনাইয়া বাজারে।
চা-নাশতা পর্ব শেষ করে আবার ছুটলাম চাঁদগাজী বাজারে, চাঁদগাজী মসজিদ দেখতে। প্রায় ৩২০ বছরের পুরনো এ মসজিদ চট্টগ্রাম বিভাগের অক্ষত থাকা দ্বিতীয় মসজিদ। স্থানীয় সম্পদশালী চাঁদগাজী ‘গাজী’ উপাধি পেয়েছেন এ জনপদকে মগদস্যুদের উৎপাতমুক্ত করে। মসজিদ কম্পাউন্ডে প্রবেশের সময় ঘড়ি দেখলাম সোয়া ১টা; মানে জোহরের নামাজের সময়। মনে মনে খুশি হলাম স্থানীয় বয়স্ক লোকজন পাব, যাদের কাছে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে, যারা লোক উপকথার ধারক-বাহক।
উপরের দিকে নজর দিতেই বুকটা খচ করে উঠল। চুন-সুরকির ছাদের পানি পড়ার জন্য মোটা পাইপ লাগানো হয়েছে, হাতখানেক জায়গা ইট-সিমেন্ট দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। মসজিদ প্রাঙ্গণ পাকা করা। চারদিকে ঘেরা ৪ ফুটের দেয়ালে সংযুক্ত বসার জায়গা। এটা আর কোথাও দেখিনি। চাঁদগাজী তার মসজিদকে জনসমাগমের জায়গা হিসেবেই গড়ে তুলেছিলেন। এক সময় পূর্ব দিকে প্রবেশপথ থাকলেও সময়ের সঙ্গে জনপদের চিত্র বদলে যায়, পশ্চিম দিক হয়ে যায় পথঘাট আর পূর্বদিক বন্ধ। এদিকে জামাতের সময় পার হয়ে যাচ্ছে ইমাম সাহেবের দেখা নেই। মসজিদ খোলা যাচ্ছে না, চাবি ইমাম সাহেবের কাছে। প্রমাদ গুনলাম, হায় হায় ভেতরটা না দেখেই চলে যেতে হবে। এর মাঝে জনা ১২ মুসল্লি এলেন। যাদের অধিকাংশের বয়সই পঞ্চাশের ওপরে। সবাই জড়ো হয়ে কথা বলছি; মূলত আমার আগ্রহের জবাব দিয়ে যাচ্ছিলেন আন্তরিকভাবে। কথার ফাঁকে দরজার নিচে মেঝেতে টাইলস দেখে হায় হায় করে উঠলাম। জিজ্ঞেস করলাম, পুরোটা কি টাইলস করা হয়েছে? বললেন, হ্যাঁ। তাদের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করল; বললাম, করছেন কী? হাতে ধরে এর মজা নষ্ট করলেন। কীভাবে? সেটা বললাম; এক হলো মসজিদের ভেতরে যে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এটা নষ্ট হবে, আগে যে প্রতিধ্বনি হতো হয় সেটা হবে না, নয়তো একদম কমে যাবে।
উপস্থিত মুসল্লিরা যেন গণকের সঠিক বয়ান শুনলেন। তারা জানালেন গত ১০-১২ বছর ধরে অর্থাৎ টাইলস লাগানোর পর হতে প্রতিধ্বনি আর নেই। আফসোস সামনে আর্দ্রতা এবং ঠাণ্ডা-গরম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ধীরে ধীরে লোপ পাবে। এর মাঝে ইমাম সাহেব এলেন, সবাই ভেতরে ঢুকলাম। সংস্কারের নামে এর মেহরাব অংশের সব কারুকাজ নষ্ট করা হয়েছে। সিলিং ফ্যান লাগানোর জন্য প্রায় ৩ ইঞ্চি মোটা এসএস পাইপ দেয়াল ছিদ্র করে লাগানো হয়েছে। যত্রতত্র পেরেক ঠোকানো! তিন কাতারবিশিষ্ট এ মসজিদে গম্বুজ ও মিনার বেশি। ছোট-বড় মিলিয়ে ১২টি। অবশ্য প্রবেশদ্বারের উপরেরগুলো ঠিক মিনার কিনা প্রশ্ন থাকে। মসজিদের উত্তরে টিনশেডের বড় একটি স্থাপনা, যা এ ধরনের পুরাকীর্তির জন্য মৃত্যু পরোয়ানার শামিল। মসজিদ দেখে রওনা দিলাম ছাগলনাইয়ার এক প্রান্তে, একদম আক্ষরিকভাবে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দিকে। শমসের গাজীর দীঘি দেখতে।
পুরনো দীঘি মানে অনেক ইতিহাস-গল্প-বীরত্ব-পুণ্য বা বিজয়ের স্মারক। অজানা গুপ্তধনের পুলকও পাই। ফেনীতে শমসের গাজীর সাতটি দীঘি। ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তবর্তী ছোট ছোট পাহাড়ের কূলে বীর শমসের গাজীর বসত ছিল। প্রথমে যে পুকুরের পাড়ে নীরবে তাকে স্মরণ করছিলাম, সেটা নিয়ে এলাকায় চালু কাহিনী হলো একসঙ্গে পাঁচটি দীঘি খনন করার পর শ্রমিকরা যে পাহাড়ে কোদালসহ যাবতীয় জিনিসপত্র রাখেন, সেখানে রাতের আঁধারে আরেকটি ছোট পুকুর হয়। পাহাড় হতে পানির দূরত্ব ২০ ফুট প্রায়। অর্ধেক পথ নেমে গেলাম, কারণ পানি দেখতে ভারী মনে হচ্ছে।
অর্থাৎ এ পানিতে অক্সিজেন স্বাভাবিকের চেয়ে কম। এ ধরনের জলাশয়ে মানুষের মৃত্যু বেশি হয় মূলত অক্সিজেন স্বল্পতা এবং তজ্জনিত কার্বন মনোঅক্সাইড দেহে তৈরি হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। খাঁড়া পাড় জনমানবশূন্য, বৃষ্টিস্নাত। আর না নেমে উঠে এলাম। পাড়ে এসে অজান্তে চোখ ভিজে গেল বীর শমসের গাজীর জন্য। আমরা হরহামেশা অনুযোগ করি যে এ বাংলায় কোনো বীরের জন্ম হয়নি। অথচ শমসের গাজী ১৭৪২ হতে ১৭৬০ পর্যন্ত ফেনীর কাজীরবাগ হতে ত্রিপুরা পর্যন্ত তার রাজত্ব বিস্তার করেন। প্রজাহিতৈষী এ শাসক নবাব সিরাজউদ্দৌলার পর ইংরেজদের হাতে নিহত দ্বিতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব। অথচ আমরা জাতীয়ভাবে তাকে ভুলে গেছি।
যে জনপদ জ্ঞানী বা বীরের রক্ত ধারণ করতে চায়, তাদের অবশ্যই বীরদের স্মরণ ও পাঠ করা জরুরি। সবচেয়ে দুঃখের কথা সেখানে কিছুই পাবেন না অর্থাৎ পর্যটন স্পট আকারেও কিছু করা হয়নি। তার ওপর ১৯৪৭ সালে পর বাংলাদেশ অংশে যা বা যেভাবে পড়ছে দেখলে কান্না আসে। পাঁচটি দীঘির দুটির দুই পাড় ভারতে। ছোটটি স্থানীয় ভাষায় এক কুইল্লা দীঘি বলে পরিচিত এবং এখানে আসতে হলে এক কুইল্লা দীঘি বললে সহজে যাওয়া যাবে। বড় দুটি দীঘি মজে গেছে, ঘাস-লতা-পাতা ভরা; কেউ না বললে বোঝার উপায় নেই। ঢুকতে প্রথম দীঘির এক পাশে মুড়ার মতো জায়গা, হয়তো মূল বসত ওখানে ছিল। একটা দীঘির পাড়ে পাকা সুড়ঙ্গ আছে; দুই মাথা পরিষ্কার দৃশ্যমান। আর দুটো দীঘি যা আমি দেখতে পারিনি, তা আরেকটু দূরে। এর মাঝে কৈয়ারা দীঘি হলো বীর গাজীর মাতার নামে।
ভ্রমণে বিশ্রাম নেয়াটা খুব গুরুত্বপুর্ণ। হুমায়ূন আহমেদের কোনো একটা উপন্যাসে পড়েছিলাম যে বাঙালিরা কোথাও গেলে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ায় দ্রুত সিলেবাস শেষ করার মতো। আসলেই ভ্রমণে দীর্ঘ বিশ্রাম ক্লান্তি দূর তো করেই পাশাপাশি নতুন জায়গা দেখার উদ্দীপনাও বাড়ে এবং চিন্তার ফুসরত মিলে। দীর্ঘ ঘুম দিয়ে বেশ বেলা করে পরদিন বের হই ফুলগাজী পরশুরামের উদ্দেশে।
ছোটবেলার আদিগন্তবিস্তৃত ধানী জমিনের মাঝে গরুর গাড়ি যেতে পারার মতো মোটা সে রাস্তা আজ পিচঢালা, আদিগন্ত ধানী জমিতে ইট-সিমেন্টের জঙ্গল যেন। সবচেয়ে বাজে লাগল ইটভাটা। ছোট একটি ইউনিয়ন আনন্দপুরে নাকি ৯টি ইটভাটা! যার ফলে আম বড় হচ্ছে না, ফসল উৎপাদন কমে গেছে, শীতকালে কালো ধোঁয়া-ধুলাবালির রামরাজত্ব হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ইটভাটার চিমনির দৈর্ঘ্য হতে হয় ১২০ ফুট অথচ যা দেখলাম কোনোটাই ৫০ ফুটের বেশি না, কোনো কোনোটা তো মাত্র ৩০ ফুট। ৮-১০ বছরে বিশেষ সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে এসব ইটভাটা। দেখার কেউ নেই!
ফুলগাজীর বাশুড়া গ্রামে জমিদার কীর্তি নারায়ণ চৌধুরী ৪৫০ বছর আগে সাত একর জায়গাজুড়ে দুটি দীঘি খনন করেন, মাঝে শিব মন্দির। দোতলা এ মন্দিরের চূড়ার অংশ ভেঙে গেছে। মূল অংশ চুন-সুড়কিতে করা। ইটের উচ্চতা দেড় ইঞ্চি, দৈর্ঘ্য ৪, প্রস্থ ৬ ইঞ্চি।
তবে প্রায় ১০০ বছর আগে এটি সংস্কার হয়। প্রবেশপথে প্রায় ক্ষয়ে যাওয়া নামফলকে সেটা খোদিত। শ্রী মোহম্মদ আলী সংস্কার করেন। কে এ মোহম্মদ আলী সেটা স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে জানতে পারিনি। বয়স্ক সচেতন মানুষ না পেলে তথ্য উদ্ধার করা বেশ কঠিন। দ্বিতল এ মন্দিরের গঠন বিশেষ করে ভেতরের দিকটা ছাগলনাইয়ার মন্দিরের মতো। যেহেতু এটি অধিক পুরনো তাই এর স্থাপত্য নকশা ছাগলনাইয়ার মন্দিরে অনুকরণ হতে পারে। মন্দিরটি এখন এমন অবস্থায় যে, সেখানে যাওয়ার কোনো পথ নেই। ঘন জঙ্গল ও পাশে স্থাপিত একটি কলেজের পেছনের অংশ।
গত বছর ফেনীর জেলা প্রশাসক ঘোষণা দিয়েছিলেন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবেন, এ খবর কোনো একটি দৈনিকের অনলাইন সংস্করণে পড়েছি। কিন্তু কাজ আর শুরু হয়নি। মন্দিরের সঙ্গে মজে যাওয়া দীঘি দুটিও সংস্কার ও সংরক্ষণ করা জরুরি। কলেজ ভবনটি এখানে না হলেই ভালো হতো। ৪৫০ বছরের পুরনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কত বড় সম্পদ, আমরা সচেতন নই বলে বিকার হচ্ছে না। সংস্কার করলে এখানে ইতিহাস-ঐতিহ্যের পাশাপাশি পর্যটনের শতভাগ সম্ভাবনা তৈরি হবে। কিন্তু পর্যটনের নামে কিছু অসৎ লোকের পকেট ভারী করার জন্য যেন নতুন স্থাপনা নির্মাণ না হয়, সেটাও দেখতে হবে। যেমনটা সিলেটের রাতারগুলে করার তোড়জোড় দেখা গিয়েছিল।
মন্দির দীঘি দেখে আবার সিএনজিতে উঠলাম, উদ্দেশ্য পরশুরামের বিলোনিয়া সীমান্ত দেখা। স্থলবন্দরও। সীমান্তে পৌঁছে চা দোকানে বসলাম জিরিয়ে নিতে। গ্রামের চা দোকান হলো অনেক কিছুর হদিসের ক্ষেত্র। চা-নাশতার ফাঁকে লোকজনের কথা চুপচাপ শুনে যাই। দোকান হতে ১০০ গজ উত্তরে সীমান্ত পিলার ও স্থলবন্দর অফিস। এক সময়ের ফেনী বিলোনিয়া রেললাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিত্যক্ত রেলস্টেশনের পশ্চিমে বিজিবির বিওপি। বাংলাদেশের পিলার হতে অন্তত ১০০ গজ ভেতরে বিজিপি বিওপি।
পক্ষান্তরে ভারতেরটার ২০ গজের বেশি হবে না, বিজিবির কোনো টহল নেই, আমাদের লোহার গেট নেই ইত্যাদি; ভারতের কাঁটাতার ভারী লোহার গেট, বিএসএফের মারমুখী দেহভঙ্গিসহ সতর্ক টহল চলছেই। এটা চোখে পড়ার মতো বিষয়। ত্রিপুরা সীমান্ত তথা বাংলাদেশে সীমান্ত পিলারে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। পাশেই বাঘামামার মাজার। ১৯৮৮ সালে তার ওফাত হয়; কেন ‘বাঘামামা’ বলে, এটা জানতে চাইলে খাদেম জানান, তাকে ছোটবেলায় বাঘ ধরে নিয়ে যায় আবার অনেকে বলে তাকে বাঘের পিঠে চড়তে দেখা যায়। অবিবাহিত এসব সুফি সাধকদের মুজাররদ বলা হয়। খাদেম অনেক ‘অলৌকিকতার’ কাহিনী বললেন। সমাজের মানুষের আস্থা-বিশ্বাস ও ভালোবাসার আস্থাভাজন হন এসব সর্বত্যাগীরা। যথারীতি এখানেও ফেনী জেলা পরিষদের নামলিপি খোদাই করা, ১ লাখ টাকা ব্যয়ে এ মাজারের উন্নয়ন করা হয়েছে।
ঢোকার জায়গা পুরোটাতেই বৃষ্টির পানিতে সয়লাব। উন্নয়নের মাঝে ফুটোটা হয়তো একটু বড়ই ছিল। সেখান হতে চলে গেলাম উত্তরগুথুমা তথা আরেক সীমান্তবর্তী এলাকায়। জংলী শাহ নামের আরেক মুজাররদ সুফির মাজারে। লোক প্রবাদ হচ্ছে এখানে তিনি ধ্যানমগ্ন থাকতে থাকতে তার গয়েও গাছ বা ছন গজায়, আবার কেউ বলছেন, তিনি অদূরে অবস্থিত আবদুল্লাহ শাহ, যিনি হযরত শাহজালালের সঙ্গে আসেন, তার শিষ্য বা ভাগিনা। বেলা শেষের দিকে, তাই সময়ও বেশি ক্ষেপণ করলাম না।
আশেপাশের বসত বলে দিচ্ছে এসব সাত-আট বছরের বেশি পুরনো হবে না। আগে এ স্থান ঘন জঙ্গল ছিল, এখনো তার চিহ্ন পুরো মাত্রায় বহাল। আব্দুল্লাহ শাহর মাজার জিয়ারত শেষ করে বের হব, তখনই চোখে পড়ল আবদুল্লাহ শাহর নামে কাদেরিয়া খানকা। স্থানীয় হুজুরকে এর উৎস, সিলসিলা বা হযরত শাহজালালের সঙ্গে সম্পর্ক হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে যথার্থতা নিশ্চিত করতে পারেননি। ধর্মের যে ভীতির দিক আধ্যাত্মিকতার নামে মাজার সংস্কৃতি চালু রাখে, এ ভদ্রলোকও আমাকে সে দিকেই নিয়ে যেতে চাইলেন।
কথা আর না বাড়িয়ে সাতকুচিয়া শমসের গাজীর দীঘিটা দেখতে চলে এলাম। এর পানি খুব পাতলা, বোঝা যায় অক্সিজেন মাত্রা পর্যাপ্ত। এ দীঘি নিয়ে যে কথা চালু আছে, তা হলো এর পানি কখনো শুকায় না। দুই বছর আগে বড় বড় চারটি দমকল দিয়ে রাতভর পানি সেচার পরও সকালবেলায় দেখা গেল পানির স্তর একই জায়গায়। এ রকম ঘটনা আরো অনেক জায়গায় শুনেছি। এ দীঘির ৩০০ মিটার দূরে আরো একটি দীঘি ছিল, কিন্তু সময় ক্লান্তিতে ফিরতে বাধ্য হলাম।
ওই দীঘির কাহিনী হলো সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য বড় পাতিল-জগ-গ্লাস-চামচ এসব উঠত। অনুষ্ঠান শেষে ঘাটে রেখে এলে রাতে সেসব পানিতে তলিয়ে যেত। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সব জায়গাতেই যখনই কেউ একজন থালা, বাটি বা জগ, প্লেট কিছুটা জমা না দিলে বা চুরি করলে পরবর্তীতে সেসব আর ওঠেনি। পদ্ধতিগতভাবে বিশ্লেষণ করলে সবগুলো ঘটনার কাঠামো এক। এ দীঘির এমন সেবা বছর ৩০ আগে পেয়েছেন, এমন অনেক পরিবার এখনো আছে! এটা আমার জন্য ব্যাপক আগ্রহ ও বিস্ময়জাগানিয়া। ভবিষ্যতে এ নিয়ে আবার কোনো সফরে নামব।






