অনুবাদ: সাগুফতা শারমীন তানিয়া

অদ্ভুত একটা খবর ছাপা হয়েছে কাগজে, সমুদ্রসৈকতের কাছের একটা স্টল থেকে খবরের কাগজটা কিনেছিলাম। খবরে লেখা এক বুড়িকে কয়েকটি বেড়াল মিলে খেয়ে ফেলেছে। এথেন্সের উপকণ্ঠে ছোট্ট একটি এক বেডরুমের ফ্ল্যাটে সত্তরোর্ধ্ব এ বুড়ি একা থাকত। নিরিবিলি জীবন, বুড়ি আর তার পোষা তিনটি বেড়াল। সম্ভবত হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বিকল হয়ে একদিন সোফায় মুখ থুবড়ে বুড়ি মরে রইল। পড়ে যাওয়ার কতক্ষণ পরে বুড়ি মরেছে, তা কেউ বলতে পারে না। বুড়ির তেমন কোনো আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবও ছিল না, যারা তার কাছে বেড়াতে আসত, ফলে সপ্তাহখানেক বুড়ির এ মৃত্যু অনাবিষ্কৃত রইল। ঘরের জানালা-দরজা ভেতর থেকে আটকানো, ফলে বেড়ালগুলোও গৃহবন্দি হয়ে রইল। ফ্ল্যাটে কোনো খাবারদাবার ছিল না, ফ্রিজে হয়তো কিছু না কিছু পড়ে থাকবে, কিন্তু বেড়ালের বিবর্তন এমন জায়গায় পৌঁছায়নি, যাতে তারা ফ্রিজ খুলে খাবার বের করতে পারে। অসহনীয় ক্ষুধার জ্বালায় একপর্যায়ে বেড়ালগুলো মনিবের মাংস খেতে বাধ্য হয়।

ইজুমি আমার মুখোমুখি বসে ছিল, ওকে এ খবরটা পড়ে শোনালাম। রৌদ্রের দিনে আমরা দুজন হেঁটে হেঁটে সৈকতে যেতাম, এথেন্সের এক কপি ইংরেজি খবরের কাগজ কিনতাম, কর বিভাগের অফিসের পাশের ক্যাফেতে বসে কফির অর্ডার দিতাম আর কাগজটা থেকে কৌতূহলোদ্দীপক খবরগুলো জাপানিতে তাকে শোনাতাম। এ ছিল দ্বীপটিতে আসার পর আমাদের রুটিন। কাগজের কোনো খবর যদি আমাদের টানত, দুজন তা নিয়ে মতামত দিতাম কিছুক্ষণ। ইজুমির ইংরেজি কিন্তু বেশ ভালো, চাইলে সে নিজেই আর্টিক্যালগুলো পড়ে নিতে পারে। কিন্তু একবারের জন্যও কখনো আমি তাকে খবরের কাগজ স্পর্শ করতে দেখিনি।

‘কেউ আমাকে পড়ে শোনালে আমার ভালো লাগে’— বলত সে। ‘আমার ছোট্টবেলার স্বপ্ন হচ্ছে রোদেলা একটা জায়গায় বসে থাকব। আকাশের দিকে বা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আর কেউ আমাকে জোরে জোরে পড়ে শোনাবে। কী পড়বে তাতে কিছু যায়-আসে না— খবরের কাগজ, পাঠ্যপুস্তক, উপন্যাস, যা খুশি। অথচ এর আগে কেউ আমাকে পড়ে শোনায়নি জানো। অতএব, ধরেই নাও যে তুমি আমায় সেই সব হারানো মুহূর্তের জন্য ক্ষতিপূরণ দিচ্ছ। আর, জানোই তো তোমার গলার আওয়াজ আমার ভালো লাগে।’

আমাদের সামনে ছিল আকাশ এবং অবশ্যই সমুদ্র। আর জোরে জোরে পড়তে আমার ভালোই লাগত। যখন জাপানে ছিলাম, আমার ছেলেকে ছবির বই থেকে পড়ে শোনাতাম। নিঃসাড়ে চোখ দিয়ে কেবলই বাক্য অনুসরণের চেয়ে জোরে পড়ার ব্যাপারটা কতই না আলাদা, কী একটা অপ্রত্যাশিত বস্তু এসে তোমার মনকে ভরে ফেলে, ভাষায় বর্ণনার অযোগ্য এক রকমের অনুরণন তৈরি হয়, যার টানকে বোঝা মুশকিল।

তেতো কফিতে মাঝে মাঝে চুমুক দিতে দিতে ধীরে ধীরে আমি ওকে পুরো খবরটা পড়ে শোনালাম। প্রথমে আমি নিজে ক’লাইন পড়তাম, মাথার ভেতর সেটাকে জাপানিজে ছকে নিতাম, তারপর ওকে অনুবাদটুকু শোনাতাম। টেবিলের ওপর আগের খদ্দেরের ফেলে যাওয়া জ্যাম চাটার জন্য ক’টা মৌমাছি ভনভন করছিল। জ্যাম চেটে নেয়ার জন্য কয়েক মুহূর্ত— তারপর কী একটা মনে পড়েছে এমনি ভাব করে বাতাসে ভোঁকাট্টা হয়ে গেল সেগুলো, চলে যাওয়ার আগে অবশ্য টেবিলটা কয়েক চক্কর দিয়ে গেল। তারপর কী মনে করে আবার টেবিলের ওপর এসে বসল। আমি পুরোটা খবর পড়ে শেষ করার পর ইজুমি সেভাবেই বসে রইল। অনড়। টেবিলে দুই কনুইয়ে ভর দিয়ে, ডান হাতের আঙুলের ডগাগুলো দিয়ে বাঁ হাতের আঙুলের ডগা ছুঁয়ে এক রকম তাম্বু রচনা করে। কাগজটা কোলের ওপর রেখে আমি ওর সরু সরু আঙুল দেখছিলাম। আঙুলের ফাঁক দিয়ে ইজুমি আমার দিকে তাকাল।

-‘তারপর কী হলো?’— সে জিজ্ঞেস করে।

-‘ওই অতটুকুই’— আমি কাগজটা ভাঁজ করতে করতে জবাব দেই। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখের চারপাশের কফির গুঁড়ো মুছি, ‘অন্তত খবরে ওইটুকুই দিয়েছে।’

-‘কিন্তু ওই বেড়ালগুলোর কী হলো?’

-আমি রুমালটা পকেটে পুরি, ‘জানি না, কিছু তো বলেনি।’

ইজুমি ওর অভ্যাসমতো ঠোঁটের কোণ টেনে কাঁমড়াল। যখনি ছোটখাটো একখানা ঘোষণার মতো করে ও ওর মতামত জানাতে চায়, তখন ওই রকম ঠোঁট কামড়ায়। যেন বিছানার চাদরের ওপর থেকে একটা কুঁচিকে টান করছে। প্রথম প্রথম আমার  ওর এ অভ্যাসটা চমত্কার লেগেছিল।

-‘পত্রিকাগুলো বুঝলে, যেখানেই যাও সব জায়গায় সবসময় একই রকম’— সে অবশেষে ঘোষণা দেয়— ‘এগুলো কখনো তোমাকে যা জানতে চাও, তা জানাবে না।’

প্যাকেট থেকে একটা সালেম বের করে সে, ঠোঁটে চেপে ধরে আর দিয়াশলাই জ্বালায়। প্রতিদিন সে এক প্যাকেট সালেম শেষ করে। এর বেশিও না, কমও না। সকালবেলা একটা নতুন প্যাকেট খুলবে, সারা দিনে তা শেষ করবে। আমি ধূমপান করি না। পাঁচ বছর আগে আমার স্ত্রী তার গর্ভাবস্থায় আমার তামাক সেবন বন্ধ করেছিল।

ইজুমি বাতাসে ধোঁয়ার কুণ্ডলী নিঃশব্দে ছেড়ে দিয়ে বলে, ‘‘আমি আসলে যা জানতে চাই, তা হচ্ছে, বেড়ালগুলোর এরপর কী হলো। কর্তৃপক্ষ কি মানুষের মাংস খেয়েছে বলে বেড়ালগুলোকে মেরে ফেলল? নাকি তারা বেড়ালগুলোর মাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে বলল ‘তোরা বড় কষ্টের সময় পার করেছিস সোনামণিরা’। তোমার কী মনে হয়?’’

আমি টেবিলে হুমড়ি খেয়ে পড়া মৌমাছিগুলো দেখতে দেখতে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবি। কিছু সময়ের জন্য আমার মাথার ভেতরে ওই বুড়ির মাংস খাওয়া বেড়ালগুলো আর চঞ্চল মৌমাছিগুলো এক হয়ে যায়। একটা দূরবর্তী গাঙচিলের তীক্ষ চিত্কার মৌমাছিগুলোর গুনগুন ঢেকে দেয়। দুয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার চেতনা স্বপ্ন আর বাস্তবের কোনো এক স্থানে বিক্ষিপ্ত থাকে— আমি কোথায়? এখানে কী করছি? ধাতস্থ হতে পারছিলাম না। একটা বড় শ্বাস নিলাম, আকাশে তাকালাম, এরপর ইজুমির দিকে ফিরলাম।

-‘জানি না তো।’

-‘ভেবে দ্যাখো, তুমি যদি ওই শহরের মেয়র হতে বা পুলিশের বড় কর্তা, কী করতে তুমি বেড়ালগুলোকে?’

-‘ওগুলোকে সংশোধনাগারে দিলে কেমন হয়, ধরো শুধু নিরামিষভোজী বানিয়ে ফেলা হলো সেগুলো?”

ইজুমি হাসল না। তার সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে খুব ধীরে একটা ধোঁয়ার স্রোত গলগলিয়ে বের করে দিল।

-গল্পটা আমাকে একটা লেকচারের কথা মনে করিয়ে দিল, তখন আমি কেবল ক্যাথলিক হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছি। তোমাকে কি বলেছি যে, ‘আমি একটা ক্যাথলিক স্কুলে গেছিলাম? খুব কড়াকড়ি, নবীনবরণের পরপরই আমাদের লেকচার থিয়েটারে একত্র করে হেড নানদের একজন স্টেজে উঠে ক্যাথলিক বিধিমালা নিয়ে কিছু কথা বললেন। অনেক কিছুই তিনি বলেছিলেন সেদিন, কিন্তু আমার যেটা সবচেয়ে বেশি মনে আছে, সেটা হলো তার বলা জাহাজডুবির পরে একটা জনমানবশূন্য দ্বীপে একটা বেড়ালের সঙ্গে থাকার গল্প।’

-‘হুম, ইন্টারেস্টিং।’

-‘বুঝলে, ওই নান বলছিলেন, তুমি একটা জাহাজডুবির পরে বেঁচে আছ- তুমি আর একটা বেড়াল শুধু লাইফবোটে করে একটা নামহীন জনমানবহীন দ্বীপে এসে পৌঁছেছে। খাওয়ার মতো কিছু নেই সেখানে, তোমার কাছে সাকল্যে যা আছে, তা হচ্ছে খানিকটা খাওয়ার পানি আর শুকনো বিসু্কট, একটা মানুষের ১০ দিন যাওয়ার মতো। এরপর তিনি বললেন, তোমরা সব্বাই ধরে নাও তোমরা প্রত্যেকে ওই অবস্থায় পড়েছ। চোখ বন্ধ করো আর ভাবো। তুমি একদম একলা একটা দ্বীপে, তুমি আর একটা বেড়াল। তেমন কোনো খাদ্যই নেই তোমার সঙ্গে, বুঝলে? তুমি ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত এবং একসময় তুমি মরবে। কী করবে তুমি? তুমি কি তোমার ওই-অতটুকুন খাবার বেড়ালটার সঙ্গে ভাগাভাগি করবে? না সেটা ঠিক হবে না। সেটা ভুল হবে। তোমরা ঈশ্বরের মনোনীত, তোমাদের প্রত্যেকে মূল্যবান, বেড়ালটা তা নয়। সেজন্যই তোমার খাদ্যের সরবরাহ যা আছে, সেটা তোমারই খেতে হবে, পুরোটা। এই গল্প বলে নান আমাদের একটা ভয়ানক সিরিয়াস চাহুনি দিলেন, আমি একটু ধাক্কা খেলাম। এই গল্প মাত্র হাইস্কুল শুরু করা শিশুদের শোনানোর মানে কী? ভাবছিলাম কিসের মধ্যে এসে পড়লাম!’

ইজুমি আর আমি একটা ছোট্ট গ্রিক দ্বীপে স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে থাকি। পর্যটনের মৌসুম ছিল না তখন, এমনিতেও দ্বীপটা পর্যটকদের কাছে তেমন আকর্ষণীয় নয়, সেজন্য ভাড়াটা কমই। এখানে আসার আগ পর্যন্ত আমরা এ দ্বীপের নামও শুনিনি। দ্বীপটা তুরস্কের সীমানার কাছাকাছি, রৌদ্রের দিনে ঠাহর করে দেখলে দিগন্তে তুর্কি পর্বতমালার সবুজ রেখা দেখা যায়। এলাকার স্থানীয়রা ঠাট্টা করে বলে, বাতাসের দিনে তুমি শিক-কাবাবের গন্ধ পাবে! সে যা-ই হোক, দ্বীপটা অন্য গ্রিক দ্বীপের চেয়ে বরং তুর্কি উপকূলের কাছে ছিল, দৃষ্টিসীমার ডানে নিবিড় করে ঘনিয়ে ছিল এশিয়া মাইনর।

টাউন স্কয়ারে গ্রিক স্বাধীনতাযুদ্ধের এক বীরের মূর্তি, তিনি গ্রিক মূল ভূখণ্ডে তুর্কিদের বিরুদ্ধে একটি বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তুর্কিরা তখন দ্বীপটির শাসক। তিনি তুর্কিদের হাতে ধরা পড়েন এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। সৈকতের কাছে একখানা কাঠের শূলে নগ্ন করে তাকে চড়ানো হয়, শরীরের ওজনের চাপে শূল তার পশ্চাদ্দেশ ভেদ করে সারা শরীর ফুঁড়ে মুখ দিয়ে বের হয়ে আসে— একটা অবিশ্বাস্য যন্ত্রণাদায়ক এবং ধীর মারণ-প্রক্রিয়া। সম্ভবত মূর্তিটি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই এ ঘটনা ঘটে। প্রথম যখন এটা দাঁড় করানো হয়, নিশ্চয়ই সেটা বেশ দেখার মতো ছিল। এখন নোনা বাতাস-ধুলা-গাঙচিলের মল মিলে বীরের চেহারাই বদলে গেছে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পথিকরা কেউ পারতপক্ষে নোংরা মূর্তিটার দিকে ফিরে তাকায় না, বীরকেও মনে হয় যেন এই জনতা-এই দ্বীপ-এই পৃথিবী থেকে মুখ ফিরিয়ে আছে।

আমি আর ইজুমি যখন খোলা ক্যাফেতে বসে কফি আর বিয়র খাচ্ছিলাম, আর বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে দেখছিলাম কূলের নৌকাগুলো, গাঙচিলগুলো আর দূরের তুর্কি পর্বতমালা, তখন আমরা আসলে ইউরোপের এক কিনারায় বসে ছিলাম। বাতাসটা ছিল পৃথিবীর কিনারার বাতাস। এক রকমের বিগত দিনের রঙে সবটা ঢেকে ফেলা, মাঝে মাঝে আমার মনে হতো একটা আজব বাস্তবতা আমাকে একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে; অচেনা বিচিত্র কিছু, অধরা, অস্পষ্ট কিন্তু আশ্চর্য কোমল। সেটারই ছায়া মুখগুলোয়, চোখগুলোয়, কূলে জটলা করে থাকা মানুষের চামড়ায়।

মাঝে মাঝে আমার নিজেরই বিশ্বাস হতো না যে আমিও এই দৃশ্যের অন্তর্গত। যতই আমি আশপাশের দৃশ্যাবলি শুষে নিতাম, যতই আমি প্রাণভরে এ বাতাসে শ্বাস নিতাম, ততই মনে হতো এসবের সঙ্গে আমার কোনো শরীরী যোগাযোগ নেই।

দুই মাস আগে আমি আমার স্ত্রী আর চার বছর বয়সী ছেলের সঙ্গে টোকিওর উনোকিতে একটা তিন কামরার অ্যাপার্টমেন্টে ছিলাম। খুব আহামরি কিছু না, নেহাত মাথা গোঁজার একটা জায়গা। আমার আর আমার স্ত্রীর শোয়ার ঘর ছিল, আলাদা শোয়ার ঘর ছিল ছেলেটার আর অন্য ঘরটা ছিল আমার স্টাডি। শান্ত একটা অ্যাপার্টমেন্ট, সামনে সুন্দর জায়গা। ছুটির দিনে আমরা তিনজন তামা নদীর পাড়ে হাঁটতে যেতাম। বসন্তকালে তামা নদীর দুই তীরের চেরিফুল গাছগুলোয় বিস্তর ফুল আসত, ছেলেকে আমার বাইকের পেছনে বসিয়ে আমরা ‘জায়েন্ট ট্রিপল এ’ টিমের বসন্তকালীন কসরত দেখতে যেতাম।

একটা মাঝারি মানের ডিজাইন কোম্পানিতে আমি চাকরি করতাম। কোম্পানিটির কাজ ছিল বই-ম্যাগাজিন, এসবের লে-আউট ডিজাইন করা। আমাকে ‘ডিজাইনার’ বললে একটু বেশিই বলা হবে, কাজটাতে তেমন মাথা খেলানোর সুযোগ ছিল না। অভিনব কিছু না, স্বাপ্নিক কিছু না। বেশির ভাগ সময় আমাদের শিডিউলে কাজের সময়টা খুব ধরাবাঁধা ছিল। মাসের বেশকিছু দিন আমাকে সারা রাত অফিসে কাজ করতে হতো। কাজ করতে গিয়ে ক্লান্তিতে-বিরক্তিতে রীতিমতো কান্না পেত আমার। যা হোক, কাজটা করতাম। কোম্পানির পরিবেশ একটু ঢিমে-তেতালা, আমার সিনিয়র জন ছিল বলে আমি আমার অ্যাসাইনমেন্টগুলো বাছাই করতে পারতাম। প্রায় সময়েই আমি কী করতে চাই, সেটা নির্ধারণ করে নিতে পারতাম। আমার বস খারাপ ছিল না, সহকর্মীদের সঙ্গে বাধত না আমার। বেতনও খারাপ না। তেমন কিছু না হলে এ কোম্পানিতেই আমি ভবিষ্যতেও রয়ে যেতাম, আর আমার জীবন মলদ্যু নদীর মতো বা বলা ভালো মলদ্যু নদীর প্রবহমান জলের মতন বইতেই থাকত, ঝরঝরিয়ে, সমুদ্রের দিকে।

কিন্তু এর ভেতরে একদিন ইজুমির সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল।

***

ইজুমি আমার চেয়ে ১০ বছরের ছোট। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয় একটা বিজনেস মিটিংয়ে। প্রথম দৃষ্টি বিনিময়ের পর থেকেই আমাদের ভেতরে কী যেন একটা কাজ করতে থাকে। এমনটা সচরাচর হয় না। আমাদের জয়েন্ট প্রজেক্ট নিয়ে আলাপ করার জন্য আমরা আরো দুয়েকবার মিলিত হই। আমি ওর অফিসে যেতাম অথবা ও আমার অফিসে আসত। আমাদের মিটিংগুলো অল্প সময়ের হতো, অন্য লোক উপস্থিত থাকত এবং পুরোটাই ছিল ব্যবসায়-সংক্রান্ত। অথচ আমাদের প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর অদ্ভুত এক রকমের শূন্যতা আমাকে ভর করল, যেন আমার জন্য অসম্ভব আবশ্যক কিছু আমার থেকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়েছে কেউ। বহু বহু বছর আমি এই রকম বোধ করিনি। আর আমার ধারণা, ইজুমিও না।

এক সপ্তাহ পর ইজুমি আমার অফিসে ফোন দিল, টুকটাক কাজের কথা সেরে আমরা কিছুক্ষণ গল্প করলাম। আমি একটা কৌতুক বললাম, ও হাসল। বললাম, ‘চলো ড্রিংক হয়ে যাক।’ আমরা একটা ছোট্ট বারে গেলাম, কয়েক দফা পান করলাম। আমার ঠিক মনে নেই কী নিয়ে কথা বলেছিলাম, কিন্তু মনে আছে লক্ষ লক্ষ বিষয় জুটে গেল কথা বলার মতো, মনে হলো অনন্তকাল কথা বলে যেতে পারি আমরা। ও যা বলতে চায়, সেটা আমি লেজাররশ্মির মতন ষ্পষ্ট বুঝতে পারি, আর যেটা আমি অন্য লোককে বোঝাতে জেরবার হই, সেটা সে এমন নিখুঁত করে বুঝতে পারে যে আমি চমকে যাই। আমরা দুজনই বিবাহিত। তবে বিবাহিত জীবন নিয়ে তেমন বড়সড় অভিযোগ করার কিছু ছিল না আমাদের। যার যার স্বামী-স্ত্রীকে আমরা ভালোই বাসতাম, শ্রদ্ধা করতাম। তার পরও এ দৈবের নির্দেশ ছিল— এমন কাউকে পাওয়া, যার কাছে এমন করে নিজেকে মেলে ধরা যায়, এমন সম্পূর্ণতায়। অনেক লোক সারা জীবন কাটিয়ে দেয় এমন মানুষের খোঁজে। এটাকে ঠিক ‘ভালোবাসা’র লেবেল দেয়া ঠিক হবে না। এটা বরং পরিপূর্ণ সহমর্মিতা।

আমরা মদ্যপান করার জন্য প্রায়ই দেখা করতে লাগলাম। ইজুমির স্বামী অনেক রাত অব্দি কাজ করত, ফলে ওর যাওয়া-আসার স্বাধীনতা ছিল। যখন আমরা দেখা করতাম, যখন সময় যেন উড়ে যেত। হাতঘড়ির দিকে একসময় চোখ যেত, আবিষ্কার করতাম কোনোমতে এখন শেষ ট্রেনটা ধরতে পারি আমরা। ওকে বিদায় দেয়াটা আমার জন্য ছিল দুর্বিষহ, কত কী যে বলার বাকি থাকত আমাদের, প্রতিবার।

দুজনের কেউই আমরা একে অন্যকে বিছানায় হাতছানি দিইনি, কিন্তু আমরা শারীরিকভাবে মিলিত হতে শুরু করেছিলাম। দুজনেই এর আগ পর্যন্ত যে যার সংসারে বিশ্বস্ত ছিলাম। অথচ আমাদের একটুও গ্লানি হতো না, মনে হতো যেন এটা চিরনির্ধারিত। ইজুমিকে কাপড়চোপড়ের আবরণ থেকে বের করে আনা- তার শরীরে আদরের হাত রাখা- তাকে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরা- তার ভেতরে পিছলে ঢুকে যাওয়া- বের হয়ে আসা... এর সবটুকুই ছিল আমাদের কথোপকথনের প্রাকৃতিক বিস্তারমাত্র। এত সহজতায় যে, আমাদের ভালোবাসাবাসিটায় হূদয় নিংড়ানো শরীরী উত্তেজনা ছিল না, ছিল এক রকমের শান্ত-সমাহিত-প্রসন্ন মুদ্রা, নির্ভান। শরীরের খেলা ফুরালে বিছানায় শুয়ে আমাদের নিঃশব্দে বলা কথাগুলো ছিল সবচেয়ে মধুর, ওর নিরাবরণ শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে থাকতাম আমি। ও আমার দুই হাতের মাঝখানে কুণ্ডুলী পাকিয়ে থাকত, আমরা আমাদের নিজস্ব ভাষা সংকেতে যার যার গোপন কথা বলে যেতাম।

যখনই ফুরসত পেতাম, আমরা দেখা করতাম। কী অদ্ভুতভাবেই (অথবা স্বাভাবিকভাবেই) না আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে এ সম্পর্ক চিরকাল চলতে পারে। ইকোয়েশনের একদিকে আমাদের বিবাহিত জীবন, অন্য দিকে আমরা দুজন, কোনো গোলযোগবিহীন। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম আমাদের প্রেম কখনো প্রকাশ হয়ে পড়বে না। হ্যাঁ, আমরা শারীরিকভাবে মিলিত হতাম, কিন্তু সেটাই বা কাকে আঘাত করছিল? যেসব রাতে আমি ইজুমির সঙ্গে মিলিত হতাম, সেসব রাতে দেরিতে বাড়ি ফিরে বউকে কিছু না কিছু অজুহাত দিতাম, আমার বিবেকে একটু বিঁধত, কিন্তু কেন জানি নিজেকে ঠিক প্রবঞ্চক মনে হতো না। ইজুমি আর আমার সম্পর্কটা একেবারে বাক্সবন্দি বস্তু ছিল, যদিও গভীর অন্তরঙ্গতার, তবু।

হয়তো যদি কিছু না ঘটত, আমরা এভাবেই চিরকাল কাটিয়ে দিতাম, ভোদকা আর টনিক খেয়ে, চাদরের ভেতরে দুজন ঢুকে গিয়ে, দিনের পর দিন। অথবা হয়তো আমাদের সঙ্গীদের কাছে মিথ্যা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়তাম, সিদ্ধান্ত নিতাম এ সম্পর্কের প্রাকৃতিক মৃত্যু হোক, যেন ফিরে যেতে পারি যার যার ছোট্ট-সুনিবিড় জীবনযাত্রায়। যা-ই হোক, মনে হয় সেটা খারাপ হতো না। এখন সেটা আর বলা যায় না, খালি মনে হয়। কিন্তু ভাগ্যদেবীর মোচড় (এখন পিছু ফিরে দেখলে সেটা অবশ্যম্ভাবী মনে হয়) এল, ইজুমির স্বামী আমাদের সম্পর্কের কথা টের পেয়ে গেল। ইজুমিকে আচ্ছামতো জেরা করে সব বের করে সেই লোকটা ঝড়ের মতন আমার ঘরে এল। ভাগ্যের লিখন এই, আমার স্ত্রী তখন বাড়িতে একা ছিল, ফলে ব্যাপারটা একটা জঘন্য মাত্রা নিল। যতক্ষণে আমি ফিরেছি, ততক্ষণে আমার স্ত্রী তৈরি আমাকে প্রশ্ন করার জন্য। ইজুমি সবকিছু স্বীকার করে নেয়ায় আমার পক্ষে নতুন কোনো গল্প ফাঁদা সম্ভব ছিল না। আমি আমার স্ত্রীর কাছে সব স্বীকার করে নিলাম, শুধু বললাম, ‘এটা ঠিক প্রেম না, একটা বিশেষ সম্পর্ক, তোমার সঙ্গে আমার যা সম্পর্ক, তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটা জিনিস। একদম দিবা-রাত্রির মতো আলাদা। তুমি কিছু টের পাওনি এত দিনে, পেয়েছ? তাহলেই বোঝো এটা ঠিক তুমি যা ভাবছ, তা নয়।’

আমার স্ত্রী কিছুই শুনতে নারাজ, অসম্ভব আঘাতে সে হিম হয়ে গেছিল, আক্ষরিক অর্থেই আর কোনো শব্দ সে উচ্চারণ করেনি। পরদিন সে তার সবকিছু বাঁধাছাঁদা করে গাড়িতে তুলল এবং গাড়ি চালিয়ে চিগাসাকিতে বাপের বাড়ি চলে গেল, সঙ্গে নিয়ে গেল আমাদের ছেলেকে। আমি কয়েকবার ফোন করলাম, সে ধরল না। তার বাবা ফোন ধরলেন। বললেন, ‘তোমার খোঁড়া অজুহাতগুলো আমি শুনতে চাই না। আমি আমার মেয়েকে তোমার মতো বেজন্মার সঙ্গে সংসার করতে দিতে পারি না।’ তিনি শুরু থেকেই বিয়েটার বিপক্ষে ছিলেন, ফোনে তার গলা শোনাল সত্যদ্রষ্টার মতো ভারিক্কি।

হতবুদ্ধি হয়ে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে বাসায় বসে রইলাম, একা শুয়ে রইলাম বিছানায়। ইজুমি ফোন দিল আমাকে। সেও একাকী, স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে, যাওয়ার আগে দু’চার ঘা চড়চাপড় দিতে ভোলেনি। আর একটা কাঁচি নিয়ে ইজুমির সব কাপড় টুকরো টুকরো করে দিয়ে গেছে সে, ইজুমির ওভারকোট থেকে শুরু করে তার অন্তর্বাস অব্দি সব। ইজুমির ধারণা নেই সে কোথায় গেছে। সে বলল, ‘আমার খুব ক্লান্ত লাগছে, সব কিছু ভেঙেচুরে গেল, আর কিছুই আগের মতো থাকবে না, ও আর আসবে না’— ফুঁপিয়ে উঠল সে ফোনের ভেতরে। সেই হাইস্কুল থেকে ওদের প্রেম, আমার ওকে সান্ত্বনা দিতে ইচ্ছা হলো, কিন্তু আমিই বা কী বলতে পারি?

ইজুমি কান্না থামলে বলল, ‘চলো কোথাও যাই, গিয়ে খুব মদ খাই।’ আমরা শিবায়াতে একটা নৈশবারে গিয়ে সারা রাত খুব টানলাম। আমি ভোদকা গিমলেট খেলাম, ও খেল ডেকারি। কতটা খেলাম, তার হিসাব রাখতে পারিনি। এ প্রথম আমরা যখন দেখা করছি, তখন আমাদের পরস্পরকে কিছু বলার নেই। সকালে হারাজুকু পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে আমরা মদের ঘোরটা কাটালাম, ডেনিজে গিয়ে কফি খেলাম আর প্রাতরাশ সারলাম। তখনই সে গ্রিস যাওয়ার কথাটা বলল।

-‘গ্রিস?’ আমি প্রশ্ন করি।

-‘জাপানে আমরা থাকতে পারি না, কী বলো!’ ইজুমি গভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল।

আমি গ্রিস নিয়ে মাথার ভেতরে নাড়াচাড়া করতে থাকি, আমার অ্যালকোহলস্নাত মস্তিষ্ক গ্রিস যাওয়ার লজিকটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।

-‘আমি সবসময়ই গ্রিস যেতে চেয়েছি’— ইজুমি বলে, ‘এটা আমার স্বপ্ন বলতে পারো। আমাদের মধুচন্দ্রিমায় আমি গ্রিস যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের যথেষ্ট পয়সা ছিল না। তো এখন চলো দুজন গ্রিস যাই আর ধরো, ওইখানেই থাকি, কোনোকিছু নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। জাপানে থাকলে তিলে তিলে শুধুই বিমর্ষ হতে থাকব, আর কিছু হবে না।’

গ্রিস নিয়ে আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। কিন্তু ইজুমির সঙ্গে সম্মত হতে হলো। আমরা দুজন বসে হিসাব করলাম কার কাছে কত আছে। ইজুমির সেভিংসে আছে আড়াই মিলিয়ন ইয়েন আর আমার কুড়িয়ে বাড়িয়ে হবে দেড় মিলিয়ন। ৪ মিলিয়ন ইয়েন মানে প্রায় ২৫ হাজার পাউন্ড।

-‘২৫ হাজার পাউন্ড দিয়ে গ্রিসের কোনো গাঁওগেরামে কয়েক বছর দিব্যি কাটিয়ে দেয়া যাবে নিশ্চয়ই’— ইজুমি বলে, ‘সস্তা ফ্লাইটে আমাদের আড়াই হাজার যাবে। তো সেটা বাদ দিলে ধরো গে ২৩ হাজার। ধরো যদি মাসে আমরা ৬৫০ খরচ করি, আমাদের তিন বছর চলে যাবে। না হলেও আড়াই বছর? কী বলো তুমি? যাই চলো, তারপর আমরা ধীরে ধীরে সবকিছু সামলে উঠব।’

আমি চারদিকে তাকাই। সাতসকালের ডেনিজ গমগম করছে কমবয়স্ক যুগলে, আমরাই কেবল ত্রিশোর্ধ্ব। এবং হয়তো কেবল আমরাই সেই যুগল, যারা একটা ঝোড়ো সম্পর্কের পরে নিজেদের সব টাকা নিয়ে গ্রিসে পালানোর কথা ভাবছি। কী কেলো! নিজের হাতের তালুর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকি। এই অব্দি তাহলে আমার জীবন এসে পৌঁছেছে?

-‘আচ্ছা চলো তবে তাই হোক’— বলি আমি।

 

বাকি অংশ পরবর্তী সংখ্যায়