এক শতাব্দী পূর্বে লর্ড মেকলে আমাদের লক্ষ্য করিয়া এক অতি সাধু সঙ্কল্প প্রকাশ করিয়াছিলেন— ‘এমন এক শ্রেণীর লোক প্রস্তুত করিয়া যাইতে হইবে যাহাদের কৃষ্ণচর্মের নিম্নে ভারতীয় শোণিত প্রবাহিত হইবে সত্য, কিন্তু রুচি, মতামত ও চিন্তার ধারায় তাহারা হইবে সম্পূর্ণ ইংরেজভাবাপন্ন।’ মেকলের দূরদৃষ্টির প্রশংসা করিতে হয়, নতুবা ১৮৩৩ সালের সেই সঙ্কল্প আজ ভারতবর্ষে বিশেষ করিয়া বাঙ্গলা দেশে এমন করিয়া মূর্তি পরিগ্রহ করিবে কেন? আমরা যে শুধু অর্থনীতি ক্ষেত্রেই নিজস্ব অধিকার হইতে বঞ্চিত হইয়াছি তাহা নহে, কর্মদোষে সকল বিষয়েই পরমুখাপেক্ষী ও পরানুচিকীর্ষা আমাদের শিরোভূষা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। শাসকজাতির আচার-ব্যবহার ও বেশ-ভূষার অনুকরণে আমরা যেরূপ পটুতার পরিচয় দিয়াছি তাহাতে অপর প্রদেশের লোক এখনও বহু বত্সর ধরিয়া আমাদের নিকট শিক্ষানবিশি করিতে পারিবে। প্রথম বাঙ্গালী ব্যারিস্টার যখন হাইকোর্টে প্র্যাকটিসে (ব্যবসায়) বসিলেন, তখন তিনি বাসা লইলেন চৌরঙ্গী অঞ্চলে যাহাকে কলিকাতার ওয়েন্ট এণ্ড * West End বলা চলে। সাহেবী কেতায় বৈঠকখানা সজ্জিত হইল, আচার-ব্যবহারে বেশ-ভূষায় দেখিতে দেখিতে তিনি একজন পুরা সাহেব হইয়া পড়িলেন। বার লাইব্রেরি হইল এই সকল নূতন নূতন হালচালের আদিপীঠ, তথা হইতে উহা সংক্রামক ব্যাধির ন্যায় শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত সমাজের বরাবর নিম্নতম স্তর পর্যন্ত পৌঁছায়। তথাকথিত ভদ্রসমাজে যাহা কিছু নূতন চাল আজ প্রচলিত হইবে, দুই দিন পরে জনসাধারণ্যে তাহাই অতি আগ্রহে গৃহীত হইবে। বাঙ্গলাদেশ তামাকের আকর বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। রংপুর ও কুচবিহার অঞ্চলে উত্কৃষ্ট শ্রেণীর তামাকের আবাদ হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে বিদেশী সিগারেটে বাজার ছাইয়া যাইতেছে এবং দেশী তামাক ছাড়িয়া লোকে ঐ সকলের প্রতি ঝুঁকিয়া পড়িতেছে। পথের ভিক্ষুক হইতে মাঠের চাষী পর্যন্ত কেহই আর সনাতন হুঁকা হইতে তামাক সেবন করিতে নারাজ। ফলে দেশী তামাকের চাষ ধীরে ধীরে উঠিয়া যাইতেছে।
ঠিক ইহারই সঙ্গে সঙ্গে আর একটি কু-অভ্যাস একে একে সমাজের উচ্চস্তর ও মধ্যস্তরকে প্লাবিত করিয়া সম্প্রতি সর্বনিম্নস্তরে অর্থাত্ জনসাধারণ্যে নামিতেছে। পূর্বে চা-পান ব্যাপারটি এদেশে একরূপ অজ্ঞাত ছিল। কুক্ষণে সাম্রাজ্যবাদসুলভ শাসন ও শোষণনীতির প্রধান পুরোহিত লর্ড কার্জন ইউরোপীয়ান টী অ্যাসোসিয়েশনকে (European Tea Association) এই মর্মে উপদেশ দিলেন— ‘তোমরা ইউরোপ ও আমেরিকায় অর্থব্যয় করিয়া ভারতীয় চা-এর প্রচারকার্যে ব্রতী হইয়াছ, কিন্তু তোমাদের চক্ষের সম্মুখে প্রশস্ত ক্ষেত্র পড়িয়া আছে। ভাল করিয়া চাষ-আবাদ করিলে ঐ ক্ষেত্রেই অপর্যাপ্ত ফসল ফলিতে পারে— দূরান্তরে যাইবার প্রয়োজন নাই।’
কেবল উপদেশদানে টী অ্যাসোসিয়েশনের চক্ষুরুন্মীলন করিয়াই তিনি ক্ষান্ত রহিলেন না, অধিকন্তু এই উদ্দেশ্য সফল করিবার জন্য তিনি চা-এর রপ্তানির উপর এক শুল্ক বসাইলেন, তাহা হইতে প্রায় ১২-১৪ লক্ষ টাকা উঠিল, ইহার অধিকাংশই তিনি টী অ্যাসোসিয়েশনের হস্তে দিলেন, অতঃপর ঐ অর্থে চা-এর সপক্ষে ভীষণ প্রচারকার্য আরম্ভ হইল এবং উক্ত প্রচারকার্য যে এখনও পুরামাত্রায় চলিতেছে তাহা সংবাদপত্রের স্তম্ভে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেই বুঝিতে পারা যাইবে। নমুনাস্বরূপ একটি বিজ্ঞাপন হইতে কিঞ্চিত্ উদ্ধৃত করিয়া দিতেছি—
‘প্রাণশক্তি ও উত্সাহের উত্স এবং ম্যালেরিয়া নাশক— ভারতীয় চা’
‘দরকার হলেই, ভারতীয় চা ব্যবহার করে অচিরে শরীর মন সতেজ করে তোলা যায়, এ যে কত বড় সান্ত্বনা তা বলা যায় না, সারাদিনের কঠিন শারীরিক পরিশ্রম বা মাথার কাজের পর এক পেয়ালা ভালো ভাবে তৈরি দেশী চা খেলেই শরীর সজীব ও মন প্রসন্ন হয়ে উঠবে। সত্যই চা জাগ্রত জীবনীশক্তির ভাণ্ডার। সকাল বেলা নিয়ম করে অন্তত দু-পেয়ালা ভালো দেশী চা রোজ পান করুন জড়তা দূর হয়ে যাবে, সমস্তদিন শরীর মজবুত থাকবে আবার দিনের শেষে দু-পেয়ালা চা পান করবেন— সারাদিনের খাটুনির পর মধুর বিশ্রামের কোন ব্যাঘাত ঘটবে না’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
উক্ত শুল্কলব্ধ অর্থে প্রথমত কলিকাতার বড় বড় চৌরাস্তার যেমন বৌবাজার ও ঠনঠনিয়ার মোড়ে চা-এর দোকন খোলা হইল, সেখান হইতে পেয়ালা পেয়ালা চা এবং ছোট ছোট মোড়কে করিয়া এক পয়সা মূল্যের পাতা চা মুক্তহস্তে বিতরিত হইতে লাগিল। এইরূপে চার ফেলিয়া যখন লোকের মন চা-এর প্রতি বেশ আকৃষ্ট হইয়া পড়িল, তখনই আসিল টোপ ফেলিবার পালা। টোপ গিলিতেও অধিক বিলম্ব হইল না, শিক্ষিত সমাজ ত গিলিলই, এমন-কি কুলি, মজুর, গাড়োয়ান— কেহই বাদ পড়িল না। শুধু কলিকাতায় নহে, সারা ভারতবর্ষের বড় বড় রেল স্টেশনে, মেলায়, হাটবাজারে চা-এর ভাটি খুলিয়া অজ্ঞ জনসাধারণকে প্রলুব্ধ করা হইতে লাগিল। সম্প্রতি নদীবহুল পূর্ববঙ্গে টী অ্যাসোসিয়েশনের নৌবহর অবতীর্ণ হইয়াছে, বাঙ্গলার পল্লীগগন ইহারা চা-এর জয়গানে মুখরিত করিয়া তুলিয়াছে।
শীতপ্রধান দেশের চা-পানের কিছু প্রয়োজন থাকিতে পারে সত্য, কিন্তু আমাদের উষ্ণ দেশে উহার কোনই সার্থকতা নাই। সাহেবেরা যখন চা-পান করে তখন তাহার সঙ্গে অনেক কিছু পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী পেটে পড়ে, কিন্তু কলিকাতা, বোম্বাই প্রভৃতি নগরের স্বল্প বেতনভুক, শীর্ণ কেরানী আহার্য ও পানীয়ের উভয়বিধ প্রয়োজন চা-পান দ্বারাই মিটাইয়া থাকেন। আপিসে আসিয়া ২/১ ঘণ্টা কাজে বসিতে না বসিতেই ইহারা চা-এর তৃষ্ণায় কাতর হন। কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে চা-পান করিয়া ইহারা ক্ষণিকের জন্য কিঞ্চিত্ আরাম ও উত্তেজনা এবং স্ফূর্তি অনুভব করেন। আবার সেই একঘেয়ে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি— মধ্যে মধ্যে চা-এর পেয়ালায় চুমুক— ইহাই হইল কেরানীর দৈনন্দিন জীবন। এই প্রকারে সারা দিনরাতে প্রায় পাঁচ ছয় পেয়ালা চা। এই বদ অভ্যাসের সপক্ষে তিনি এই যুক্তি দেখাইয়া থাকেন যে, ইহাতে ক্ষুধা নষ্ট হয়, সুতরাং ব্যয়সাধ্য পুষ্টিকর আহার্যের আর প্রয়োজন থাকে না।
কেবল চিকিত্সা-বিজ্ঞান ও শরীর-বিজ্ঞানের দিক দিয়াই নহে, পরন্তু অর্থনীতির দিক দিয়াও চা-পান যে কতদূর অনিষ্টকর তাহাও দেখাইব। বাঙ্গলা দেশে যত চা উত্পন্ন হয়, তাহার শতকরা ৯৬ ভাগ আসে সাহেবদের বাগান হইতে। অবশিষ্ট মাত্র ৪ ভাগ জন্মে বাঙ্গালী ও আসামী মালিকের বাগানে, চা-পানের অভ্যাস যদি এখনকার ন্যায় দ্রুতগতিতে জনসাধারণের মধ্যে বদ্ধমূল হইতে থাকে, তাহা হইলে বত্সরে মাথাপিছু ন্যূনপক্ষে এক টাকা করিয়া ধরিলেও বাঙ্গলা দেশের পাঁচ কোটি লোকের চায়ের ভোগে বত্সরে পাঁচ কোটি টাকা বিদেশীয়গণের করতলগত হইবে। কুলি-মজুরের পারিশ্রমিক হিসাবে এই পাঁচ কোটি টাকার কিয়দংশ দেশের লোক পাইবে সত্য, কিন্তু হায়, এই শ্রমিকের দলও আবাঙ্গালী।
চায়ের কাটতি বাড়াইবার জন্য টী অ্যাসোসিয়েশনের প্রচেষ্টার কথা পূর্বে উল্লেখ করিয়াছি। প্রচার ব্যপদেশে যে সকল হেয় উপায় অবলম্বন করা হয়, উহা নীতিধর্মের দিক দিয়া কোনক্রমেই সমর্থন করা চলে না। অজ্ঞ ও সরলমতি কৃষকরাই হইল এই মৃগয়ার প্রধান শিকার। তাঁহাদের মনে একটা কৃত্রিম ও অস্বাস্থ্যকর রুচি তথা অভাববোধ জাগাইয়া তুলিবার প্রয়াসে অশেষ চেষ্টা চলিতেছে এবং স্থানবিশেষে ছায়াচিত্রের সাহায্যও লওয়া হয়। অতিরঞ্জন, অতিভাষণ ও মিথ্যাভাষণ উক্ত প্রচারকার্যের মূলমন্ত্র। ইউরোপে চা-এর বাজারে মন্দা যাইতেছে তাই সেখানকার মন্দা এতদ্দেশে উশুল করিবার জন্য টী অ্যাসোসিয়েশন জনসাধারণের মুখে চা-এর বিষপাত্র তুলিয়া ধরিতে মরিয়া হইয়া লাগিয়াছেন। ৫/৬ কোটি ভূখারী, দারিদ্র্য ও উপবাস তাহাদের নিত্য সঙ্গী, পেট ভরিয়া আহার কাহাকে বলে জানে না, কিন্তু তাহাতে কি যায় আসে? অর্থলোলুপ
স্বার্থান্বেষী ধনিক ও বণিক সমাজ স্বকার্যসাধনে কোন হীন উপায় বা চাতুরীর আশ্রয় লইতে কুণ্ঠিত হয় না। মিথ্যা প্ররোচনায় মুগ্ধ করিয়া হতভাগ্যদিগকে ঊর্ণনাভের জালে জড়িত করিতে ইহাদের উত্সাহের অন্ত নাই; উচ্চকণ্ঠে চা-এর স্তুতিগান চলিতে থাকে— ‘ম্যালেরিয়া প্রতিষেধক কাশরোগের অমোঘ ঔষধ’— আরও কত কি! পাঁচ বত্সর পূর্বে জার্মানিতে পর্যটনকালে তথাকার একটা ঔষধের কারখানায় গিয়াছিলাম; দেখিলাম রাশি রাশি কোকেন প্রস্তুত হইতেছে। জাপানে এবং অন্যত্র এইরূপ কোকেনের ভিয়ান চলিতেছে, কিন্তু এই কোকেনের রাশি যায় কোথায়, কি কাজে লাগে? পৃথিবীতে যত কোকেন প্রস্তুত হয় তাহার অতি অকিঞ্চিত্কর অংশই রোগ নিরাময়ে ঔষধরূপে ব্যবহূত হয়; অবশিষ্ট যায় নেশার খোরাকে। এই সর্বনাশা মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার নিবারণকল্পে সম্প্রতি রাষ্ট্রসঙ্ঘের (League of Nations) উদ্যোগে যে সকল প্রচেষ্টা চলিতেছে তাহা প্রশংসনীয় সন্দেহ নাই, কিন্তু সঙ্ঘের সকল বিধি-নির্দেশের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন করিয়া কোকেনের বেআইনী প্রস্তুতকরণ এবং কারবারের গুপ্তলীলা অবাধে চলিতেছে। চা-এর প্রসঙ্গে কোকেনের উল্লেখ অবান্তর হইলেও উভয় ব্যাপারে একটা সাদৃশ্য আছে, উভয়েরই মূলে একই কলঙ্কের কাহিনী— মুষ্টিমেয় নির্মম ধনিকের লালসা-বহ্নি, তাহাতে পতঙ্গের ন্যায় আত্মাহুতি দিতেছে— মূর্খ ও মূক জনসাধারণ।
চা ও কফি স্বাস্থ্যের পক্ষে যে কতদূর অনিষ্টকর, সে বিষয়ে বিজ্ঞ চিকিত্সকগণের মতামত সুস্পষ্ট। একে একে কয়েকজনের উক্তি উদ্ধৃত করিয়া দিতেছি, তন্মধ্যে ভিষক্ শিরোমণি নলিনীরঞ্জন সেনগুপ্ত এম ডি মহাশয়ের মন্তব্য বিশেষরূপে প্রণিধানের যোগ্য। তিনি বলিতেছেন— ‘সনাতন কাল হইতে বাঙ্গলা দেশের ধনী, নির্ধন নির্বিশেষে প্রত্যেক গৃহস্থের বাড়িতে গুড়-ছোলা, আদা-ছোলা, ছোলা-মুড়ি, ফেনভাত কিংবা দুগ্ধ— যাহার যেমন সঙ্গতি— প্রাতরাশরূপে ব্যবহূত হইত। কি পুষ্টিকারক শক্তির সামঞ্জস্যে, কি ভাইটামিন সম্পদে এ-সকল খাদ্যের তুলনা হয় না। ইহার কিঞ্চিত্ মাখন-মিছরি কিংবা ছানাসংযোগ করিলে সোনায় সোহাগা হইয়া যাইবে।’
ত্রিশ বত্সর পূর্বেও ইণ্ডিয়ান টী অ্যাসোসিয়েশন আপনাদের কার্যসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ভারতবাসীদের মধ্যে চা-পান প্রথা প্রচলন করিবার জন্য এক বিরাট অভিযান আরম্ভ করেন। দরিদ্র দেশবাসীর ভাগ্যে দৈনন্দিন আহার্য যদিবা জুটিত, চা-এর বাহুল্য তাহাদের সাধ্যাতীত ছিল, সুতরাং হয় চা, নয় আহার— দুইটার একটা তাহাকে বাছিয়া লইতে হয়; ইহাই হইল পানীয়ের পর্যায় হইতে খাদ্যের পর্যায়ে চা-এর ক্রমপরিণতি। দেশবাসীগণকে চিরাচরিত অভ্যাস ও প্রথা হইতে স্খলিত করিবার জন্য যখন এইরূপ ষড়যন্ত্র ও প্রচার চলিতেছিল, তখন তাহাদিগকে সতর্ক করিবার জন্য কেহই ছিল না, দেশের স্বাস্থ্য বিভাগও এ বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন, চা-এর মধ্যে খাদ্য হিসাবে যদি কিছু গুণ থাকে তবে তাহা উহার দুগ্ধে; কিন্তু এই দুগ্ধের বিশুদ্ধতা সম্বন্ধে গভীর সন্দেহ রহিয়াছে। পূর্ণ ত্রিশ বত্সর ধরিয়া টী অ্যাসোসিয়েশন দেশের চিরন্তন খাদ্য-নির্বাচন রীতির বিরুদ্ধে অবাধে আপনাদের স্বার্থ-দুষ্ট অভিযান চালাইতেছেন এবং তাহাদের প্রলোভনে মুগ্ধ হইয়া নিরীহ দেশবাসী সংশয়লেশহীন চিত্তে নিঃসংশয়ে এই বিষাক্ত পানীয় সেবন করিয়া স্বাস্থ্যসুখে জলাঞ্জলি দিতেছে।
ডাঃ এল ওয়ালটার কার, এম ডি, এফ আর সি এস, লণ্ডন, বলিতেছেন— ‘চা ও কফি হূদযন্ত্র এবং স্নায়ুমণ্ডলকে উত্তেজিত করে, উত্কৃষ্ট প্রণালীতে প্রস্তুত চা-ও যদি অতিমাত্রায় পান করা যায় তাহা হইলে বদহজম স্নায়ুবিকার হূত্স্পন্দন শিরোঘূর্ণন অনিদ্রা প্রভৃতি নানা উপদ্রবের সৃষ্টি করে, খাদ্যের পরিবর্তে চা-এর ব্যবহার করা কিংবা অত্যধিক পরিশ্রমজনক গ্লানি নষ্ট করিবার জন্য চা ও কফি পান করা অথবা মস্তিষ্ক যখন বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করে তখন চা ও কফি পানে তাহাকে কৃত্রিমভাবে উত্তেজিত করা— এ-সকলই অতি সর্বনেশে অভ্যাস।’
কিছুদিন পূর্বে উইনিপেগে ব্রিটিশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের এক অধিবেশন হয়, তদুপলক্ষে ক্রেম্বরিজের ডাঃ ডবলিউ এফ ডিক্সন ‘মাদকদ্রব্যে আসক্তি’ বিষয়ে বক্তৃতা দেন। যত প্রকার উত্তেজক আছে তাহাদের তুলনামূলক বিবরণ দিবার ছলে তিনি বলিয়াছিলেন— ‘স্নায়ুবিকারের যতগুলি কারণ বিদ্যমান আছে, তন্মধ্যে ক্যাফিন নামক মাদকদ্রব্যের নিয়মিত ব্যবহার অন্যতম। চা ও কফিতে এই ক্যাফিন রহিয়াছে। এক পেয়ালা চায়ে এক গ্রেণেরও অধিক ক্যাফিন থাকে, সুতরাং প্রত্যেক চা-পায়ী ব্যক্তি দিনে পাঁচ হইতে আট গ্রেণ ক্যাফিন গ্রহণ করেন; ইহা নিতান্ত অবহেলা করিবার কথা নহে। চা-পানের ফলে পরিপাকশক্তি নিস্তেজ হইয়া পড়ে— ইহাকেই ‘টী ডিসপেপসিয়া’ বলে। বেশি চা-পান করিলে অম্ল, পেট-কামড়ানি, কোষ্ঠকাঠিন্য, অনিদ্রা, ক্ষুদামান্দ্য ও হূদ-যন্ত্রের নানারূপ বৈলক্ষণ্য ঘটে।’
ডাঃ জন ফিসারের মত এই যে, প্রথমে উত্তেজনা আনয়ন করিলেও চা পানের পরিণামে একটা অবসাদের ভাব আসিবেই; তখন সেই অবসাদ দূর করিতে পুনরায় চা-পানের প্রয়োজন হয়, এইরূপ পুনঃপুনঃ উত্তেজনা ও অবসাদের ফলে চা-পানীর অবস্থা ক্রমশ শোচনীয় হইয়া পড়ে। অজীর্ণ, অনিদ্রা, রক্তাল্পতা, কোষ্ঠবদ্ধতা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে মদ্যপানের অভ্যাস, এমন কি মস্তিষ্কবিকৃতি পর্যন্ত ঘটিতে পারে। ডাঃ জে বেটিটিউক বলেন যে, হুইস্কির বোতল কিংবা চায়ের পাত্র ইহাদের কোনিট যে অধিকতর মারাত্মক, তাহা নিশ্চিতরূপে বলা কঠিন।
১৯৩৫ সালের ৭ ডিসেম্বর দেশ পত্রিকার বর্ষ ৩, সংখ্যা ৩-এ প্রকাশিত






