সত্যি বলতে কি, আন্না মারিয়ার জন্যই আরেকবার লামায় যেতে চেয়েছিলাম। আন্না মারিয়া রক্তলাল জবা গাছ থেকে ছিঁড়ে আমার কানে গুঁজে দিয়ে বলেছিল— আই লাভ ইউ! বলার সময় ওর চোখ-মুখ লজ্জায় কেমন রক্তিম হয়ে উঠেছিল। আমি ওর চোখের দিকে চোখ রেখে ফিসফিস করে বলে উঠেছিলাম— আন্না মারিয়া, আমি আবার তোমার জন্য লামায় আসব, শুধুই তোমার জন্য! আমার বলার ভঙ্গি দেখে পাশে বসা আমার ভ্রমণসঙ্গী শাহ মাহফুজুল হক সৈকত, মাহমুদুল হাসান সেলিম আর ফাবিয়ান বি গোমেজ হো হো করে হেসে উঠেছিল। ওদের উচ্চকিত হাসির শব্দ রেইনট্রি থেকে বাতাসে ঝাপটানি খেয়ে দূর পাহাড়ে মিলিয়ে গিয়েছিল। আন্না মারিয়াও দাঁড়ায়নি আর। দৌড়াতে দৌড়াতে ছুটে গিয়েছিল ওদের বাড়ির দিকের জঙ্গুলে নামা পথে, তার পরও অবশ্য ওর সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছে— পরদিন বিকালবেলা। যখন আমরা নাজিরাম ত্রিপুরাপাড়া ছেড়ে হ্লাথোহাই মার্মাপাড়া যাওয়ার উদ্দেশে জড়ো হয়েছিলাম পথের ধারের এক রাস্তায়। অদূরেই আন্না মারিয়া দাঁড়িয়েছিল কয়েকটা মেষ নিয়ে। মেষ চরিয়েই যে ওর দিন কাটে, আর এক সন্তানের দেখভাল করে— নাম যার যিশুয়া। যিশুয়ার বাবা সেই কবেই মারা গেছে অসুখে ভোগে ভোগে।
আন্না মারিয়ার কথা তো বলা হলো, কিন্তু ওর কাছে আমরা কীভাবে পৌঁছেছিলাম— তা না বললে বোধহয় বিষয়টা ধোঁয়াশাই থেকে যাবে। আমার ভ্রমণবন্ধু মাহমুদুল হাসান সেলিমের সঙ্গে ফেসবুক-সূত্রে নেত্রকোনার লেঙুরায় আকস্মিক ভ্রমণটা দারুণভাবে সফল হওয়ার পর দুজনই অনুভব করছিলাম যে— আমরা লামা যাব, লামার আদিবাসীদের সঙ্গে কাটিয়ে আসব ক’টা দিনের পাহাড়ি জীবন। কিন্তু ভাবা যত সহজ, পরিকল্পনাটা বাস্তবায়ন ততটাই দুরূহ। আমাজন বনের আদিবাসীদের কাছে সহজেই হয়তো পৌঁছানো যায়, কিন্তু বান্দরবানের আদিবাসীদের কাছে বাঙালি হয়ে যাওয়াটা একটু কঠিনই। পাহাড়ি-বাঙালি সমাজের মধ্যে এমনসব ভাঙাগড়া আর চড়াই-উতরাইয়ের সম্পর্ক ঘটে গেছে যে, পরস্পরের সম্পর্কের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে অবিশ্বাসের জটিল ঘূর্ণাবর্ত। তবু বাস্তবতার সব দঙ্গল সরিয়ে আমাদের লামা ভ্রমণটা হয়ে উঠল অত্যন্ত জামাই আদুরে— শুধু একজন ফাবিয়ান বি গোমেজের মতো সহূদয়বান মানুষের সঙ্গে সাক্ষাত্ লাভ ও পরিচয়ের সূত্রে। ত্রিপুরা সমাজের এক প্রভাবশালী পরিবারের আদরের জামাই ফাবিয়ানদা ঢাকা শহরে পড়ে থাকলে কী হবে, তার হূদয় সবসময় ঘূর্ণায়মান নিজের রাজ্যপাটে। তাকে যখন লামা যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলাম, আমাদের সঙ্গে নিতে সানন্দেই রাজি হয়ে গেলেন।
কাঁধে রুকস্যাক ঝুলিয়ে এক সন্ধ্যাবেলা কমলাপুর থেকে ফাবিয়ানদার সঙ্গে বান্দরবানের বাসে উঠে বসলাম। সাতসকালে নামা হলো চকরিয়ার আগের স্টেশন আজিজ নগরে। সেখানে নাশতা সেরে উঠে বসা গেল দুটো ভাড়া করা হোন্ডায়। কখনো শুধু আইলপথ, কখনো সরু রাস্তা, কখনোবা সমান পথ দিয়ে আমরা ক্রমে উঁচু থেকে উঁচুতে আর জঙ্গলবেষ্টিত পথে উঠতে লাগলাম। ঘণ্টাখানেক পর যখন নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়ার সন্নিকটে পৌঁছলাম, তখনই জানা গেল যে— ও পাড়ায় আজ ওঠা যাবে না। গতকাল কোনো এক প্রবীণ মানুষ মারা যাওয়ায় আজ সত্কার কার্যক্রম চলবে। ত্রিপুরা সমাজের সত্কার কর্ম মানে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। ওরা নিজেরা যে মদ তৈরি করে ঘরের চুল্লিতে, সবাই তা ভরপেট পানের পর মেতে উঠবে আহাজারিতে আর মরদেহ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে চলবে কাড়াকাড়ির তাণ্ডবলীলা। এক পক্ষ চাইবে মরদেহ সত্কারের ব্যবস্থা করতে, আরেক পক্ষ তাতে প্রাণপণে বাধা দেবে— কোনোভাবেই নিতে দেবে না মরদেহ। এই টানাপড়েন কতক্ষণ চলবে কেউ জানে না। কথা ছিল আজ আমরা নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়ায় থাকব ফাবিয়ান বি গোমেজের শ্বশুরবাড়িতে। কিন্তু সে সমাজের একজন প্রবীণের মৃত্যু সব হিসাব উল্টে দিল। তখনই স্থির হলো, প্রথম দুটো দিন আমরা কাটাব মুরুং পাড়ায়।
ক্ষেতের আইল ধরে আমরা হাঁটতে লাগলাম বার্মা সীমান্তবর্তী গ্রামের দিকে। সমান মসৃণ পথ শেষে একটু পরেই শুরু হলো বাঁক ঘুরে ঘুরে পাহাড়ি জঙ্গুলে পথে চলা। প্রথমে বেশ উপভোগ্য মনে হলেও একটু পরই যখন বেশ উঁচু আরেকটি পাহাড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা হলো, তখনই বোঝা গেল— অত সহজ নয় আমাদের যাত্রা।
খুব উঁচুতে না হলেও খাড়া পথ উঠতে গিয়ে আমাদের প্রায় দমবন্ধ হওয়ার অবস্থা। পাহাড়ি পথে চলার যাদের অভ্যেস নেই, তাদের জন্য এ পথে হাঁটাটা শুধু কষ্টকরই নয়, কঠিনও বটে। বেশ কিছুটা সমান পথ হাঁটার পর আবার ওঠো আরেকটা প্রায় খাড়া পাহাড়ে। আবার সেটায় ওঠার সময় শ্বাস বন্ধ হওয়ার জো। তবে এভাবে একটার পর একটা পাহাড় ভাঙার পর যতই উঁচুতে আরোহণ করা যাচ্ছিল, চারপাশের নিসর্গ হয়ে উঠছিল আরো অপরূপ, অপূর্ব সুন্দর! মনে হচ্ছিল, এসব দৃশ্যপট দেখার জন্য যেকোনো কষ্টই স্বীকার করা যায়। বার্মার পাহাড়গুলোও যেন এগিয়ে আসছিল আরো কাছে।
অবশেষে আমরা প্রায় দুপুরে ক্রাচং ম্রো পাড়ায় পৌঁছি। একটা তেঁতুল গাছের ছায়াতলার মাচায় নানা বয়সী মুরুং নারী ও শিশুরা বসেছিল। আমাদের আগমন টের পেয়ে প্রায় সবাই দৌড়ে নিমেষেই হাওয়া। নারীরা ছিলেন অর্ধনগ্ন। তারা এখন ভিন জাতির সামনে অন্তত অর্ধনগ্ন থাকতে চান না। বিষয়টা যে লজ্জার, সে অনুধাবন এসেছে।
আমাদের এ মাচাতেই বসতে হলো। কারণ আমরা যে বাড়িতে উঠব এবং যার মাধ্যমে, সেই কারবারির ছেলে ইয়েংরি নেই; সে দূর কোনো পাহাড়ে জুম চাষে ব্যস্ত। আমাদের সাড়া পেয়ে প্রকৃতিসংলগ্না স্বল্পবসনা মুরুং নারীরা দ্রুত পালিয়েছেন ঠিকই কিন্তু সোত্সাহে ঘিরে ধরেছে শিশু-কিশোর-যুবা ও প্রৌঢ় মুরুং সমাজ। মুরুংদের আছে এক আত্মভাষা। তবে বাংলায়ও কথা বলে স্বচ্ছন্দে। আমাদের জেনে ভালো লাগে যে, আধুনিক শিক্ষার আলো এসে স্পর্শ করেছে এই আরণ্যক পাহাড়ে। চট্টগ্রামসহ দেশের নানাপ্রান্তে শিক্ষাগ্রহণে ছড়িয়ে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের সন্তানরা। তবে এর ফলে যে নিজেদের সংস্কৃতিও হারাতে বসেছে, এটাও স্বীকার করতে কারোর দ্বিধা নেই।
জুমচাষ থেকে সহসা ফেরা হয় না কারবারির বড় ছেলে ইয়েংরির। কিন্তু এক কিশোরের মাধ্যমে সে খবর পাঠায় আমরা যেন কারবারির বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নেই, যেখানে সে আমাদের জন্য থাকার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে রেখেছে। তেঁতুলতলার মাচা থেকে আমরা এগোই মুরুং পাড়ার গভীরে।
কারবারির বাড়ির দিকে যেতে যেতে লক্ষ করি, বিভিন্ন বাড়ির জানালা থেকে উঁকি দিচ্ছে নানা বয়সী কৌতূহলী মুখ। আর চোখে পড়ে মুরুং সমাজের ঘরবাড়ির বিশেষত্ব। ছন বা খড় কিংবা কাঠের যে বাড়িই দেখছিলাম, প্রতিটির নিচে খুঁটি। মাটিঘেঁষা কোনো বাড়ি চোখে
পড়ল না। অনেকটা টং-ঘরের মতো। আর ঘরের সেই নিচে নিজেদের মতো বিচরণ করে চলেছে শূকরের দল।
কারবারির ঘরের ভেতর আতিথ্য পেয়ে আমরা সত্যিই স্বস্তি অনুভব করি। আহ! কী প্রশান্তি! রাতভর বাসযাত্রা, সকালে বৃষ্টিস্নাত হোন্ডা পরিভ্রমণ, তার পর পাহাড়ি চড়াই-উতরাইয়ের হাঁটা পথ পেরিয়ে আসার পর ঘরের এই আশ্রয়ের ছায়াটুকু বড় আপন মনে হলো। বিশালায়তনের ঘরটির কাঠের পাটাতনময় মেঝেটি মসৃণ, চারপাশ খোলামেলা— অরণ্য আর পাহাড়ের বিস্তার দূর থেকে দূরে ছড়িয়ে পড়েছে। খোলা জানালা দিয়ে শুধু হাওয়া নয়, পুরো পাহাড় অরণ্য যেন ঢুকে পড়বে! আর কারবারির ফ্যামিলির নিবিড় আন্তরিকতা তো আছেই। এখানে বোধহয় কারবারির পরিচয়টুকু দেয়া দরকার। পাড়ার প্রধানকে বলে কারবারি। যিনি পুরো পাড়ার দেখভাল করেন। ক্রাচং ম্রো পাড়ার কারবারি হলেন ক্রাচং দেওয়াই ম্রো। মজার ব্যাপার হলো, যিনি কারবারি হন, তার নামেই পরিচিত হয় পাড়া। কারবারির নাম ক্রাচং বলে এই পাড়ার নাম ক্রাচং ম্রো পাড়া। আদিবাসী সমাজে এটাই রীতি। কারবারির ওপর রয়েছেন হেডম্যান। কয়েকটি পাড়ার প্রধান তিনি। তার ওপরও রয়েছেন আরেকজন। সবার ওপরে রাজা। বান্দরবানের আদিবাসী সমাজ এভাবেই পরিচালিত হয়। জাতীয় পর্যায়ে কোনো ঘটনা ঘটলে অথবা বিচারাচারের ব্যাপারগুলোয় থানা-পুলিশ-প্রশাসনের যোগাযোগ হয় হেডম্যানের সঙ্গে।
ঘরে আশ্রয় দিয়েই নয়, একটু পরে নিজে এসে খোঁজখবর নিলেন কারবারি। জমিয়ে তুললেন গল্প, সব গল্পই পাড়ার মানুষ নিয়ে, পাড়ার মানুষের সুখ-দুঃখ। তবে পাড়ার প্রধান হলে কী হবে, সাত সকালে ঘুম থেকে উঠেই ছুটে যান পাহাড়ে জুম চাষ করতে! ধান তোলার কথা মনে পড়তেই তড়িঘড়ি আড্ডা ছেড়ে ছুট লাগালেন।
একটু দেরি হলেও পাহাড়ি চালের ভাত খেলাম, জুমের বেগুন দিয়ে রান্না ঝিরির মাছের শুঁটকির স্বাদ ভোলা যাবে না। আর যে জায়গার যে রীতি, ঘরের এক কোণে চুলোয় এক বড় পাতিলে জ্বাল দিয়ে তৈরি হচ্ছিল মদ। বলা বাহুল্য যে, তা দিয়ে আতিথ্যও জমিয়ে তোলা হচ্ছিল ভালোই। পড়ন্ত বিকালে পাহাড়ি অরণ্য পথ আর ঝিরি দেখে কেটে গেল সময়টুকু!
অর্ধেক রাত পাহাড়ের সঙ্গে আর অর্ধেক রাত প্রকৃতিসংলগ্ন ঘরে তুমুল তুফান আড্ডা মেরে সকালে যখন ঘুম ভাঙল, তখন রোদ অনেক চড়ে গেছে। আমার তিন সঙ্গী ঘুমে চুর, কারবারির ছেলে ইয়েংরি চলে গেছে কখন, চলে গেছে এ বাড়ির প্রতিটি মানুষ; কারবারি, তার স্ত্রী, ছেলের বউ, নাতি-পুতি সবাই— কেউ জুমচাষে আর কেউ পাহাড়ের গলিঘুপচিতে ফল বা শস্য কোনো একটা কিছু সংগ্রহ করতে— অনিবার্যভাবেই সবার হাতে একটা দা। এ সুযোগে আমি কারবারির ঘরে হাঁটি, পায়চারি করি, দেখি দেয়ালে জিসাস, কৃষ্ণ, সিনেমার সাকিব খান-অপু বিশ্বাস! ভালো লাগে দেখে যে, ভিনদেশী কেউ নয়, আমাদের দেশের স্টাররাই সেঁটে আছে তাদের মনোদেয়ালে! পরে জানতে পারি, এ অঞ্চলের মধ্যে আজিজ নগরে একটাই মাত্র সিনেমা হল রয়েছে, সেখানে বছরে এক কি দুবার এ বাড়ির মানুষগুলো একসঙ্গে সিনেমা দেখতে যায় উত্সবের আমেজ নিয়ে।
পড়ন্ত বিকালে আমরা ক্রাচং ম্রো পাড়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়ার উদ্দেশে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। যাওয়ার পথে হঠাত্ পড়ো প্রান্তর আর জংলাভূমির কাছে দেখা মিলল গুল্মঢাকা এক পুকুরের। আমাদের চারজনের মনই আনন্দে নেচে উঠল। নাচবে না? আজ দুদিন হলো কারোরই গোসল হয়নি। কীভাবে হবে? ক্রাচং ম্রো পাড়ার মেয়েরা পানি আনে অনেক দূরের পাহাড়ি ঝোরা থেকে। পেরিয়ে আসে চড়াই-উতরাই পথ। কোলের একপাশে কাপড়ে বাঁধা থাকে সন্তান। পিঠে থাকে বিশেষ ধরনের পাত্রে পানির ঘড়া। তাদের সেই অবর্ণনীয় কষ্ট দেখে মন কিছুতেই সায় দেয়নি গোসল করে সে পানি নিঃশেষ করার! পুকুরের সেই টলটলা জলে অনেক অনেকক্ষণ ডুবে ডুবে হূদয়-মন-শরীর প্রশান্তিতে শীতল করা গেল!
নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়ায় পৌঁছে আমরা মাতৃগহ্বরের অন্ধকার পেয়ে যাই। অনুভব করি, কালোই সেই প্রকৃত রঙ, যেখান থেকে আমাদের আসতে হয় এবং গন্তব্যও! আমরা স্থির হয়ে থাকি। অভিভূত হয়ে দেখি যে, সেই অন্ধকারের অসীম স্পন্দনে লক্ষ লক্ষ জোনাকির মিছিল! জোনাকির আলো সেই মনসিজে নাচছে, ভাসছে, ঘুরছে আবার কোথায় হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে... যেন মার্স থেকে জুপিটার... জুপিটার থেকে ভেনাস... মারকিউরি... গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে অলস পথ পরিক্রমণ, আর তাকে যোগ্য সঙ্গত দিচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ঝিঁঝি পোকার অনন্ত স্বর! সেই স্বরের সঙ্গে আরো কত হূত্স্বর— পাখোয়াজ অথবা সান্তোর অথবা হাওয়াইন গিটারের অপূর্ব মেলবন্ধন, অযুত বাজিয়ের সমবেত অংশগ্রহণে অন্ধকার ক্রমশ মাতৃগহ্বরকে ক্লাসিক্যাল পূর্ণতা দিতে থাকে; আমাদের বিমুগ্ধতা সহজে কাটতেই চায় না। জোনাকির আলোর সঙ্গে ঝিঁঝিঁ পোকার ধ্রুপদী কনসার্টের সুরোল্লাসে আমরা সেই অলৌকিক মাতৃগহ্বরে হেটমুণ্ডু ঊর্ধ্বপদ হয়ে ভাসতে থাকি যেন কোনো সৌরমণ্ডল পৌঁছে যেতে... সেই সংবর্ধনা নিয়ে রাতের বেলা মেইন রোড থেকে আমরা পাহাড়ি পথ ধরে ক্রমে ঘুরে ঘুরে যখন উচ্চতা থেকে আরো উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছিলাম, তখনই অনুমান করা যাচ্ছিল— আমাদের ঠাঁই হতে যাচ্ছে মনোরম কোনো ভুবনমোহনে! ফাবিয়ান বি গোমেজের শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে দেখলাম আমাদের অনুমান মিথ্যে নয়। অনেক অনেকক্ষণ আমি এবং আমরা রাতের ভোজন শেষে বাড়ির উঠোনের কাঠের বেঞ্চিতে বসে রইলাম। নিটোল হাওয়া গায়ে আরাম বুলিয়ে দিচ্ছিল। অন্ধকারে দূরের পাহাড়গুলোকে মনে হচ্ছিল কল্পলোকের সব ছায়ামূর্তি!
প্রশান্তির এক ঘুমের রাজ্য পেরিয়ে সাতসকালে ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়িটা দেখে রীতিমতো মন্ত্রমুগ্ধ হলাম। চারদিক গাছে ভরা, নানা পদের গাছ— ফুলের, ফলের, সবুজাভ আলো! ছায়াঘেরা বাড়িটায় লেগে রয়েছে জীবনানন্দীয় নির্জনতা! নাশতা সেরেই আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়া দেখতে! আর পাড়ার ভেতর যখন হাঁটছি, তখনই আন্না মারিয়া এসে আমাদের সামনে দাঁড়ায়। আকস্মিকভাবেই বলে ওঠেন, ‘আমি মা। আমার সন্তান যিশুয়া!’ এইটুকু বলেই জোড়হাত মুখ অবধি তুলে ধরেন। বলেন না যে নমস্তে, অথবা অন্য কোনো সম্ভাষণ, নাকি বলেন কিছু, ঠিক বোঝা যায় না, কণ্ঠ তার এত অনুচ্চ, অতি সাধারণ কথাও শোনায় ঘন পাইনবনের অস্পষ্ট ঝিরিঝিরির মতো, তা এমনই ফিসফিসানো যেন পৃথিবী পর্যন্ত না শুনতে পায় তার স্বর, আর যত না বলেন, তার চেয়ে বেশি ইশারাই প্রধান হয়ে ওঠে, সবটা মিলিয়ে মনে হয় নির্মল শিশুর উদ্ভাস, সরলার্থে যার আরেক অবয়ব— মা, এবং এই মা ছাড়া যেন তার আর কোনো পরিচয় নেই, যেন অন্য কোনো পরিচয় থাকাটাই বাহুল্য, দ্রষ্টব্যহীন কিংবা অগৌরবেয়। তাই এক মুহূর্তে তিনি সারা পৃথিবীর সব মায়ের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন, পাহাড় থেকে আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে তার উচ্চারণ— আমি মা, আমার সন্তান যিশুয়া। নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়ার এক বিশাল বৃক্ষ ছায়াতলে এমন এক মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আমার বোধ স্বভাবতই নতুন আলোক স্পর্শ করে। সহসাই আমার হাত জোড় বাঁধে না বটে, পায় না নমস্তে জানানোর আকৃতি, কিন্তু টের পাই, সমস্ত মন সারা পৃথিবীর মাকে শ্রদ্ধা জানাতে অধো হয়ে যাচ্ছে।
তারপর আন্না মারিয়ার সঙ্গে আমাদের আলাপ জমে ওঠে। আমরা যখন পাহাড়ের প্রান্তঘেঁষা একটা কাঠের বেঞ্চিতে বসি, সে এসে আমাদের হাতের মুঠোয় রক্তিম জবা ধরিয়ে দেয়। আমার দিকে এগিয়ে এসে কানে গুঁজে দেয় সেই টকটকে লাল, আর তখনই ফিসফিস করে সে বলে— আমি তোমাকে ভালোবাসি! বলেই ক্ষান্ত হয় না, আমার যেন মঙ্গল হয়— এমন সব শুভাকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করতে থাকে। ত্রিপুরা সমাজে রক্তজবার এমনই কদর— প্রায় বাড়ির উঠোনে, পেছনে অথবা সামনে চোখে পড়বেই এই ফুলের গাছ। এটা এক রকম ওদের ঐতিহ্যেরই অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ত্রিপুরা সমাজ এখন খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত কিন্তু একসময় তারা ছিল সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী। আর সেই সনাতন ধর্ম পালনকালে পূজা দিত ঝিরিতে, বড় কোনো গাছে, বিশাল কোনো পাথর খণ্ডে। এমনকি নদী ও জুমক্ষেতেও ছিল পূজার প্রচলন। সেসব পূজায় বিভিন্ন দেবদেবীর উদ্দেশে প্রার্থনা করার সময় অর্ঘ্য হিসেবে তুলে দিত রক্তজবা। জবার প্রতি সেই পুরনো প্রেমকে কখনই ভুলতে পারেনি আজকের ত্রিপুরা সমাজ, যেমন এখনো পালন করে চৈত্রসংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখের মতো উত্সব; নানা উত্সবে পরে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, রয়েছে নিজস্ব নৃত্য ঘরানাও— এমনকি কারো মৃত্যু হলে সেই সনাতনী প্রথাতেই তারা করে থাকে দাহের ব্যবস্থা। আর এর সবকিছুকেই বর্ণাঢ্যতা বা গাঢ়তা দিতে সঙ্গে থাকে অনিবার্যভাবেই রক্তিম জবা।
কিন্তু এই রক্তিম জবা— আরেকবার যদি লামা যাওয়া হয়, তারপর নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়ায়, কেউ কি এসে, কোনো নারী অসংকোচে কানে গুঁজে দেবে আমার? দ্বিধাহীন স্বরে ফিসফিসিয়ে বলবে— আমি তোমাকে ভালোবাসি! যিশুয়ার মা আন্না মারিয়া যে আর নেই— ম্যালেরিয়া ওকে কেড়ে নিয়ে গেছে অনেক দূরে... যেখান থেকে কখনো ফেরা যায় না!





