গত দশদিন আগে, কতকিছুই তো দুর্যোগ ও সাবলীল ব্যবহারে কখনো স্বল্প, কখনো দীর্ঘ সময়ের গর্ভে গত হয়, কিন্তু মাথার মধ্যে তখন, সেই সকালে ঢুকে পড়া একটি শোনা কথা, ভাঙা ভাঙা, ঠাণ্ডায় বসে যাওয়া বৌ রেহানার গলা থেকে ফ্যাঁসফেসে, ঝাউশাখায় বাতাসের খসখস যেন, এক সময়ের বাম রাজনীতির উত্সাহী সমর্থক এবং ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’ ও ম্যাকিয়াভেলির ‘প্রিন্স’ এবং রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রবন্ধ ‘সভ্যতার সংকট’-এর একনিষ্ঠ পাঠক জাকির আলীর শ্রবণপথে আছড়ে পড়াতে তার ঘুম ভেঙে যায়।
ঘুম থেকে জেগে ওঠা মানুষ বা অন্য প্রাণী, ঘুম ভাঙার শব্দ কখনো শুনতে পায় না। ঘুম বেশির ভাগ সময় একা একাই গড়ে ওঠে, ভাঙেও নিজের মতো করে। এবং কখনো কখনো অন্য কিছু পতনের বা মানুষের কথার শব্দে অথবা স্বপ্নে, দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙে যেতে পারে। ঘুম নিয়ে অনেক দর্শন-কথা আছে। এখানে ওইসব বলবার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া প্রয়োজনের ব্যাপারটাই গ্রহণসাপেক্ষ।
রেহানার কথা জাকিরের মনে হঠাত্ প্রশ্ন তোলে, কথা তোলে, প্রশ্ন কখন কোনো এক ইতি বা নেতির প্রেক্ষিত থেকে জন্ম নেয়, সে কথা আমাদের কমবেশি জানা আছে, ‘প্রতি সকালে রেহানার মুখ থেকে শোনা প্রথম কথা বা বাক্যটি ডায়েরিতে লিখে রাখলে কেমন হয়?’ সপ্তাহ বা মাস শেষে কথাগুলোকে সাজালে, কথার প্রসঙ্গে কিছু কথা লিখলে একটি অর্থপূর্ণ অথবা অর্থহীন ছবি এবং প্রতিদিনের কথাগুলোর পেছনের কার্যকারণ কী, ব্যাখ্যা কী, দেখা যেতে পারে। যদি কাজটি ঠিকমতো করা যায়, ভাষ্যগুলো হয়ে উঠতে পারে একজন মানুষের অস্তিত্ব সংকটের দিনলিপি অথবা বেঁচে থাকার কিছু সাধারণ শর্ত। সবকিছুই তো জানা ও না-জানা কোনো না কোনো শর্তের অধীন। মনস্তাত্ত্বিকরা বলে থাকেন, অবচেতনার অবস্থা থেকে মানুষ কখনো বের হতে পারে না। তো, রেহানার অবচেতনে থাকা কথাগুলো সকালে কোনো কোনো কার্যকারণেই উচ্চারণ হয়ে প্রকাশ পায়। প্রকাশ ছাড়া জীবন কোথায়?
বিবাহিত জীবনের দুই বছর পর রেহানার কথা ও আচরণ ৬ বছর আগের পূর্ণ মানবিক মানুষ রূপে চেনা ও প্রেমিকা হয়ে ওঠা রেহানার থেকে এতটা আলাদা, ক্রমশ অচেনা হয়ে ওঠা, কীভাবে হলো, কেন হলো, সকালের প্রথম উচ্চারিত কথা থেকে তার একটা ছবি জাকির পেতে পারে। ছবিটার ভেতরের চোখ-মুখ ও মন-মানসিকতার দিকচিহ্ন যদি কিছুটা বোঝা যায়, তাহলে আগামী জীবনের সংসার-পালন হতে পারে সুখকর। পরস্পরের বোঝাপড়ার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা অথবা জেগে থাকা জটিলতাগুলোর জট খোলা যেতে পারে। বেশ কিছুদিন থেকে দুজন দুজনের কাছে যেন কেবল প্রয়োজন মেটাবার এক করপোরেট সম্পর্কের কাজ করা, কথা বলা, বিজ্ঞাপন দেখা, ডিসেম্বরে নতুন বছরের ক্যালেন্ডার সংগ্রহ করা এবং ঘড়ির দিকে বারবার তাকানো জাতক হয়ে উঠছে।
কথা লেখার কাজটি জাকিরকে করতে হবে গোপনে, রেহানা যদি ডায়েরি পড়ে, প্রতিক্রিয়া হতে পারে সংসারে শান্তিরক্ষার বিপরীত ব্যবহার। ‘শান্তি’র মাপ-পরিমাপ কী কী লক্ষণ থেকে বা দেখে বোঝা যায়, তার হিসাব ব্যক্তির মনমানসনির্ভর, সে কথা জাকির জানে। শান্তির গন্তব্যে পৌঁছানোর ঘটনা বা আখ্যানগুলো সবসময় চড়াই উতরাইয়ে পূর্ণ।
০১.০১.২০১৬ : পো কা অ লা ফু ল ক পি’
মূত্রথলিতে সারারাত্রির জমা পিশাপের চাপ আমাকে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত ঢুকিয়ে দিল টয়লেটে। ফলে রেহানার পরের কথাগুলো শুনিনি। সম্ভবত ‘ফুল কপি’ পর্যন্ত বলেছিল খাবার টেবিলের কাছে। টেবিল থেকে আমাদের বিছানার দূরত্ব ১৪/১৫ ফিট মতো হবে। এবং পরের কথাগুলো, হতে পারে, রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলেছিল, যা আমি শুনিনি।
গতকাল সন্ধ্যায় ফুলকপি কেনার সময় আমি কীভাবে বুঝব, বড়, সুন্দর কপিটার ভেতরে তিন-চারদিনের শিশুর কড়ে আঙুলের সমান ঘোলাটে শরীরের নরম দু’তিনটি নিরীহ, বোকা বোকা পোকা, দেখলে মায়া হয়, কপিটা কাটার পরই খাদক মানুষের অত্যাচারে ঘুম ভেঙে জেগে উঠবে? কপি কেনার সময় কোনো ক্রেতা ফুলগুলো ভেঙে বা খুলে দেখে না, দেখা যায়ও না। কখনো কখনো কোনো কোনো ক্রেতা বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করে: পোকা হবে না তো?’ কোনো কোনো বিক্রেতা কখনো একটু হেসে, সে হাসির শব্দ হয় না, যদিও হয় বিনীত, বলে, ‘কপির ভিতরে ঢুকি নাই, পোকা হয়ছে কিনা কমু ক্যামনে।’ তার কথা ঠিক। কখন জীবনের, সমাজ ও রাষ্ট্রের কোথায় কোথায় পোকা বড় হচ্ছে, পোকাকে লালন-পালন ক’রে কে বা কারা ছেড়ে দিচ্ছে, দেয়া হচ্ছে, সাধারণ ক্রেতা, বিক্রেতা কীভাবে বুঝবে? সব মানুষই কখনো না কখনো ক্রেতা বা বিক্রেতা।
বেশ ক’দিন আগে এক শুক্রবারের সকালে আমি ফুলকপি কেনার সময় দেখেছিলাম, এক ক্রেতা বেশ ক’টি কপি হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, উপর-নিচ করে দু’তিনবার ঝাঁকি দিল, পরীক্ষা করল, কপিতে পোকা থাকলে একটা পড়তই। ওই ক্রেতা কপি ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলেছিল, ‘সবখানেই তো পোকা, প্রকাশ্যে আর গোপনে।’ স্বগোতক্তি কী পলিটিক্যাল হলো, নাকি সংসারের কথাও আছে? কপিঅলার পাশে বিক্রি হচ্ছিল গফরগাঁওয়ের ঘন বেগুনি রঙের বড় বড় গোল বেগুন। সকালের রোদ পড়েছিল বেগুনের ওপর। রৌদ্রের সোনা রঙ আর বেগুনি রঙের মিশ্রণে দৃষ্টি চমকে দেয়া এক রঙ ভালো লাগছিল। একটি পোকা পৃথিবীর মতো গোলাকার বেগুনের ভেতর থেকে মুখ বের করে দেখছিল পৃথিবীর আলো আর মানুষ। পোকাটা মানুষ আর আলো দেখে ভয়ে দ্রুত নিজের ঘরে চলে যায়। অবশ্য কখনো জানবে না, বাসস্থান নিরাপদ কি না। আমার মনে হয়, ‘পৃথিবীতে সবচেয়ে সাংঘাতিক পোকা হচ্ছে মানুষ, কথা বলতে পারে, পাশাও খেলতে পারে।’
পিশাপের শেষ ফোঁটা পড়বার পর, আমার চোখ পড়ে টয়লেটের আয়নায়, এক গম্ভীর মুখ, বেশ কিছুদিন হলো ভালো করে হাসতেও পারেনি। রেহানার কথাটির আমি কোনো উত্তর দিইনি, দিলেই বা কী হতো। কত কথা বা প্রশ্নের উত্তর মানুষ দেয় না, সমাজ দেয় না, রাষ্ট্রও দেয় না। উত্তর দিলেই কি সমাধান হয়?
০২.০১.২০১৬ : খা লি খু নে র খ ব র’
আজ শনিবার। ছুটির দিন। আমার ঘুম আগেই ভেঙেছে। লেপের ভেতর জাগরণ-পরবর্তী সুখকর আলস্য আনন্দের। গত রাতের প্রয়োজনের প্রেমপর্বে দু’জনই ছিলাম পূর্ণ। রেহানা সকালে ঘুম থেকে উঠেই বড় এক মগে চা না খেলে তার মন ও শরীর সারাদিন স্যাঁতসেঁতে লাগে। আমি সকালে বাসি পেটে চা খেলে, বেলা ১২টা পর্যন্ত আমার খিদে পায় না। রেহানা জানে, ছুটির দিনে সকালে তার স্বামী বিছানাতে বসেই খবরের কাগজ পড়তে ভালোবাসে। কাগজটা আমার লেপের ওপর দিতে দিতে রেহানা বলে: খালি খুনের খবর।’ কাগজের খসখসে শব্দের মধ্যে কথাগুলো, গতকালের ঠাণ্ডায় বসে যাওয়া গলার ফ্যাসফেসে কথা নয়। ‘কবে থেকে যেন খুন শুরু হয়েছিল?’ নিজেকে প্রশ্ন করে আমার মনে পড়ে হাবিল-কাবিলের কথা। ভাই ভাইকে খুন করার কথা। খুন এক চলমান কাজ, না থাকলে মানুষের বেঁচে থাকার আইনকর্ম থেমে যেত। প্রতিটি প্রাণীর মধ্যে একজন চেনা বা অচেনা খুনি বাস করে।
খুনের সত্যই কি এখনকার জীবনে একমাত্র সত্য হয়ে উঠছে? সব প্রাণীর মধ্যেই খুনের প্রবণতা আছে, তবে মানুষের মধ্যে বেশি। খুন ও ধ্বংসকে মানুষ এক ধরনের অধিকার বলে মনে করে। যদিও সব মানুষের মধ্যে একজন সভ্য ও অসভ্য খুনি জেগে থাকে, ঘুমিয়ে থাকে, রেহানা মানুষ বলে তার মধ্যেও ওই প্রবণতা আছে, আমিও একই প্রবণতার দাস। কোনো রক্তপাত না ঘটিয়ে বা কোনো কিছু দিয়ে সামান্য আঘাত ছাড়াও খুন করা যেতে পারে। ক্রমাগত অপমানজনক কথা বলে বলেও একজনকে খুন করা যায়। নিজেকে যারা খুন করে, যাকে বলা হয় আত্মহত্যা, মনে হয়, তারা নিজের কাছে সত্ স্বীকারোক্তি করা একজন মানুষ।
ক’দিন আগে তাজা কই মাছগুলোর মাথা যেভাবে শিল দিয়ে ছেঁচে দিচ্ছিল, রেহানাকে মনে হচ্ছিল খুনি। মাছগুলোর মাথা ছেঁচার সময় ওর চোখমুখ জিঘাংসায় কী উজ্জ্বল ছিল। যেন এক বিজয়ী মানুষ। আমার মা কই মাছ কাটার সময় মাছটার সারা গায় শুধু ছাই মাখিয়ে নিত। রেহানা আগে হত্যা করে, পরে ছাই মাখিয়ে কাটে। ক’দিন আগে আমাকে বলেছিল, ‘খবরের কাগজ বন্ধ করে দিতে। এত নেগেটিভ নিউজের মধ্যে বেঁচে থাকা, শ্বাস নেয়া কষ্টকর। কাগজ খুললেই খুন, গুম, খুন। দেশ-বিদেশে শুধু খুন আর খুন।’ রেহানা খুনের খবর থেকে দূরে থাকার জন্যই সন্ধ্যা থেকে টিভিতে বাংলা, হিন্দি সিরিয়াল দেখে। সিরিয়ালও খুন, ধর্ষণ আর গুমে ভরা। ও টিভির খবর দেখেও না, শোনেও না। খবরাখবর থেকে পালিয়ে থাকতে চায়। এমনও হতে পারে, অনেক দিন থেকে একই রকম খবর ঘুরে-ফিরে বিভিন্ন ফর্মে আসছে। ফলে রেহানা বুঝে গেছে, পৃথিবীতে আর নতুন কোনো খবর নেই। মানুষ সব খবর বলে ফেলেছে বা শুনে ফেলেছে।
‘কোনো পালানোই আনন্দে রাখে না’ এই বিষয় নিয়ে রেহানা আর আমি সংসার করার আগে কত কথা বলেছি। প্রেমপর্বের দিনগুলো ছিল আকাশের শূন্যতার বিপরীতে রুদ্র পলাশের বিদ্রোহ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে লেখাপড়া করা, আমার সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিবাদী মিছিলে হাঁটা একজন রেহানা অন্য রকম কেন হয়ে যাচ্ছে, তার ব্যাখ্যা হয়তো করতে পারবেন একজন সমাজবিজ্ঞানী, একজন মনোবিজ্ঞানী এবং একজন অর্থনীতিবিদ। হয়তো এখনকার ব্যাখ্যা কিছুদিন পর তাদেরই আর যৌক্তিক মনে হবে না। আরো নতুন নতুন যুক্তি দিয়ে তারা অন্য ব্যাখ্যা করবে, খুঁজবে। নিজেদের অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে বিবিধ অবস্থাকে ব্যাখ্যা করতেই হয়।
কাগজের খেলার পাতা আমি প্রথমে পড়ি। তার পর বিনোদনের পাতা। বলিউডের এক সুন্দরী নায়িকার শরীরের সৌন্দর্য দেখে মনে হলো, যে বিশ্বসুন্দরী সেও এত সাজে কেন? মানুষ নিজের সৌন্দর্যে অতৃপ্ত বলেই বোধহয় বারবার সাজে আর আয়নার সামনে বসে, দাঁড়ায়। প্রতিটি মানুষের মুখে, চোখে, ঠোঁটে কোনো না কোনো খুঁত নিশ্চয়ই আছে, তা না হলে যাকে বলা হচ্ছে সুন্দর, সে নিশ্চয়ই তার খুঁত ঢাকার জন্য রঙ মাখে, অলঙ্কার পরে। যারা সাদামাটা, চেহারায় বলবার মতো কিছু নেই, দেখা গেছে তারাও কিছুক্ষণ আগে যে মুখ আয়নায় দেখেছে, তা ঠিক আছে না বদলে গেছে, সেই ভয় থেকে আয়নায় মুখ আবার দেখে নেয়। যেমন— ঘুম থেকে উঠে, ঘুমাতে যাওয়ার আগে অনেক মানুষ আয়নায় মুখ দেখে। হয়তো মনে করে, যে মুখ নিয়ে শুতে যাচ্ছি, ঘুম থেকে সকালে ওঠার পর তা কি ঠিক থাকবে? কোনো দুঃস্বপ্নে বা সুখের স্বপ্নের আঘাতে চোখের জায়গায় চোখ আছে কি না।
‘আমিও কি খুনের ও রাজনীতির খবরগুলো পড়তে চাই না?’ মনে মনে বলা আমার কথা কেউ শোনেনি।
আমি বিছানার যেখানে বসে খবরের কাগজ পড়ি, তার বিপরীত দিকে বড় আলমারির পাল্লায় ৫ ফিট উচ্চতা ও ২ ফিট চওড়া এক আয়না আছে। এই আয়না আমাদের আদিম আনন্দের নগ্নতা কতবার দেখেছে। অন্য মানুষ আমার পেছন থেকে আমাকে দেখলে, যদি কাগজটা চোখের সামনে থেকে আমি সামান্য নামাই, দেখবে অনেক উল্টো শিরোনামের মধ্যে একজন সাধারণ মানুষ, চোখে-মুখে আশা না নিরাশা, বোঝার উপায় নেই, বসে আছে স্থবির হয়ে। মনে করা যাক, আমি পড়ছি ‘প্রথম আলো’। আয়নায় উল্টো হয়ে ‘আলো’ শব্দটি চলে আসবে ‘প্রথমে’র আগে। কেউ মনে করতে পারে, এই দেশের সবকিছুতে আলো উল্টে গেছে। যদি সে পড়ে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন।’ আয়নায় ‘বাংলাদেশ’ আর ‘প্রতিদিন’ হবে উল্টো এবং তার উপর একজন মানুষের মুখ। এবং এই মানুষ যখন তখন খুন করতে পারে। সে তো এক উল্টো মানুষ।
০৩.০১.২০১৬: এরশাদ আসবে না’
কোন এরশাদ? রেহানার সঙ্গে একজন পড়ত, নাম এরশাদ। আমার সঙ্গে রেহানার পরিচয়ের আগে রেহানার কথা অনুসারে এরশাদ শুধু তার বন্ধু ছিল। রেহানার প্রেমিক ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। আমি এই ব্যাপারে কোনো কথা বলিনি। মনে হয়, রেহানার দিক থেকে কোনো সাড়া পায়নি এরশাদ। ভদ্র লোক বাসায় এলে বা কখনো কখনো রেহানাকে ফোন করলে, আমার বৌকে বেশ উত্ফুল্ল দেখায়। একটু খারাপ লাগে আমার। নিজেকে বলি, ‘প্রতিটি মানুষের মধ্যে একটু খারাপ লাগা থাকতে হয়, না থাকলে ভালো লাগাগুলোকে মাপা যায় না।’
আমি যে খবরের কাগজটি পড়ছি, খুলে দেখলাম, কোথাও সাবেক রাষ্ট্রপতি, যাকে তাঁর কাজের কারণে বলা হয় স্বৈরশাসক এবং আগামী দিনে যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা হবে, তখনো তাকে বলা হবে স্বৈরশাসক, কাগজের কোথাও তার নাম নেই। তাহলে রেহানা কি বন্ধু এরশাদের নাম নাকি উর্দি পরা এবং বন্দুকের নল ও কার্তুজের শক্তিতে গর্বিত সামরিক শাসক এরশাদের নাম বলল? আমার মাথার ভেতর ট্রমা কে তৈরি করেছে? রেহানা কোন এরশাদের নাম বলল? বন্ধু এরশাদ, আমি জানি ও শুনেছি, ও কখনো নামাজ পড়ত না, এখনো পড়ে না। রেহানার বন্ধু আমাদের পারিবারিক বন্ধু। জেনারেল এরশাদ স্বপ্ন দেখত কোনো মসজিদে নামাজ পড়বেন। জেনারেল কী ধার্মিক! রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঢুকিয়ে দিলেন সংবিধানে। বিটিভিতে চালু করলেন আজান। আমি বড়দের কাছে শুনেছি, তারা বলাবলি করতেন, ‘আগে যখন টিভিতে আজান প্রচার করা হতো না, তখন কি এই দেশের মানুষ কখন আসর হবে, কখন হবে মাগরেব, জানত না?’ আজানের আগে টিভিতে হয়তো চলছিল একটি সাবানের বিজ্ঞাপন, একজন উচ্ছল তরুণীকে দেখা গেল সাবান হাতে নাচছে, আজান শেষ হতেই আবার দেখা গেল কোনো সিনেমার নায়িকা নায়কের সঙ্গে সমুদ্রতীরে দৌড়াচ্ছে, কাপড় ভেজা। সামরিক শাসনে কত কিছু করা যায়। রেহানাকে জিজ্ঞেস করলে ও হয়তো বলবে, ‘সকালে কী বলেছি মনে করতে পারছি না তো।’ ওর এই কথা থেকে অনেকে মনে করতে পারে, বাঙালি বিস্মৃতিপ্রবণ এক জাতি। ইতিহাস থেকে কিছু শিখতে পারে না। কারণ, বিস্মৃতি। কারণ শেখার আগ্রহ নেই।
০৪.০১.২০১৬: আ বা র কি সে ই স ন্ত্রা স?
অনেক আগে জনাব মফিজুল হকের লেখা ‘সন্ত্রাসের ব্যাকরণ’ নামে একটি বই পড়েছিলাম। সন্ত্রাস কে করে, কেন করে বা করা হয়, করার পেছনে কী কী কারণ ও স্বার্থ থাকে, তার পথ ও পন্থার ব্যাখ্যা ছিল বইটিতে।
আমি জানি, রেহানা বইটি পড়েনি। না পড়লেও ওর মধ্যে এক সন্ত্রাসজনিত ট্রমার শিকড় ক্রমশ বড় হচ্ছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে বিএনপি গত বছর না আগের বছর, কী লজ্জাকর বিস্মৃতির ঘোরে আমার সনটাও মনে নেই। ক’জন বন্ধুকে ফোন করলাম। একজন বলল, ২০১৪তে, নির্বাচনের সময়। আর একজন দাবি করল, গত বছর মানে পনেরোতে, তিন মাস সন্ত্রাস করল বিএনপি-জামাতচক্র। আমি কি রেহানাকে সঠিক সন কোনটা জিজ্ঞেস করব? সন্ত্রাসের মধ্যে একদিন আমি দেখেছিলাম একটি বাস পুড়ছে। বাসের ভেতর থেকে যাত্রীরা, যেমন ছোট মাছ জালের খোপ থেকে লাফিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে, যাত্রীরা বাসের জানলা, দরজা দিয়ে, কী আর্তনাদ তখন ফেটে পড়ছিল চারদিক, বের হচ্ছিল। আমি স্বার্থপর হয়ে দৌড়াচ্ছিলাম, মানুষকে বাঁচানোর কথা মনে না হয়ে, মনে হলো, পৃথিবীতে সকলেই কমবেশি যাত্রী। দার্শনিকতায়ও কখনো কখনো অসভ্যতা থাকে। আমি পালানোর সময়, আমার পাশ দিয়ে মুখ পোড়া একটি মেয়ে আর্তনাদ করতে করতে দৌড়াচ্ছিল।
বাসা থেকে বের হলেই মনে হয়, এক অচেনা সন্ত্রাস আমাকে আক্রমণ করবে। বিচিত্র ধরনের সন্ত্রাস যারা ঘরে-বাইরে ছড়িয়ে দিচ্ছে, তাদের লক্ষ্য পরিষ্কার, মানুষকে সবসময় আতঙ্কে রাখো, ভয়ে রাখো। ভয় পাওয়া মানুষরা নিজের খোলসের মধ্যে ঢুকে যায়, অন্যায় কোনো কিছুকে প্রতিবাদ করে না, ঈশ্বরমুখী হয়। তাতে সন্ত্রাস-ব্যবসায়ীদের অন্যান্য ব্যবসা ভালো হয়।
আমি আর রেহানা কি সন্ত্রাসের শিকার?
০৫.০১.২০১৬ : জী ব ন য খ ন ছি ল ফু লে র ম তো’
আজ বেশ ভোরে ঘুম থেকে উঠেছে রেহানা। সকালে নাশতা করার সময় বলেছিল, বারান্দায় বসে দেখেছে, ভোরের আকাশ ধীরে ধীরে কীভাবে নীল হয়। এবং ও নাকি আকাশ থেকে অন্ধকার মুছে যাওয়ার দৃশ্য আগে কখনো এইভাবে দেখেনি। যখন অন্ধকারের মধ্যে থেকে নীলের আভা বের হচ্ছিল, ওর মন আর শরীরের মধ্যে এক শান্তির অনুভব বোধ করে এবং ইচ্ছে হয় সঙ্গম করতে। ইচ্ছেটাকে তীব্র করার জন্য বসেছিল আরো কিছুক্ষণ। আমি বলেছি, ‘আমাকে জাগালে ভালোই লাগত, শান্তিকে শরীরী করার সুযোগ নষ্ট হলো।’ কিন্তু যখন পুব আকাশ লাল হয়ে উঠছিল, ও দরজাটা একটু জোরে খুলে ঘরে ঢোকে, শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আয়না আর বিছানার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে ‘জীবন যখন ছিল ফুলের মতো’ গেয়ে ওঠে। এবং ‘পাপড়ি তাহার ছিল শত শত’ লাইনের ‘পাপড়ি তাহার’ পৌঁছে যায় খাবার ঘরে যাওয়ার দরজার কাছে, আমি ‘ছিল শত শত’র শেষ ‘শত’ শুনিনি। ওকে বলেছি, ‘প্রেম করবার ইচ্ছেটা কীভাবে মরে গেল?’ রেহানার উত্তর ছিল: মনে হয় সকালের প্রথম রোদ বাধা দেয়।’
গত রাতে বলছিল, এবার সন্তান নেয়া দরকার। আত্মীয়রা বলছে, ‘তোদের কোনো সমস্যা আছে নাকি? বাচ্চা নিস না কেন? তুমি অফিসে চলে যাওয়ার পর খুব একা লাগে। আমি এবার মা হতে চাই, একটা শিশুর সঙ্গ কত সুন্দর।’ আমি বলেছি, ‘কেন আমার সঙ্গ আর ভালো লাগছে না?’ রেহানা কথার উত্তর দেয়নি। পাশ ফেরে ঘুমানোর জন্য। কোনো কোনো রাতে আমাদের শারীরিক সম্পর্ক না হলেও বেশ কিছুক্ষণ আলিঙ্গন করে, দুজন দুজনকে দু-একটি চুমু দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। বেশ কিছুদিন হলো ঘুমানোর আগে ও আর আলিঙ্গন করছে না। আমি করতে গেলে বলে, ‘আর ভালো লাগে না।’
বিয়ের আগে, প্রেম করার সময় আমরা পরস্পরকে বলেছিলাম, অন্তত দুই বছর কোনো বাচ্চা নেব না। উপভোগ করব আমাদের সময়। একটি শিশু কি সময় উপভোগ করার বড় বাধা?
রবীন্দ্রনাথের গানটি পূজাপর্বের। আমার ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরও চোখ বুজে ছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম, আরো কয়েক লাইন শুনতে। গানটিতে বসন্ত, পাতা ঝরা, হেমন্ত, ফল, রসের ভার-এর কথা আছে। আমি অপেক্ষা করছিলাম, রেহানা চায়ের পানি চুলোয় দিয়ে গানটা গাইবে, আমি চোখ বুজে শুনব।
দোষটা কি আমার নাকি অন্য কিছুর? সম-অসম প্রতিযোগিতার অসভ্যতায় রেহানার জীবনের পাপড়িগুলো ঝরে গেছে? সন্তানের মা হলে ওর জীবন কি আনন্দধারায় জেগে উঠবে? প্রতিটি ক্রিয়ার পেছনে একটি কার্যকারণ থাকে, আমি আর রেহানা সেই কার্যকারণ বোঝার পরেও এক ধরনের জীবনবোধহীন খাঁচার মধ্যে কি আটকে যাচ্ছি? ওর সাথে কথা বলতে হবে। আমি জানি না, আমরা দুজন জীবনের কোনো একটা সুস্থ জায়গায় পৌঁছাতে পারব কি না।
গত পাঁচদিন সকালে প্রথম শোনা কথাগুলো জাকির ধারাবাহিকভাবে লেখে: পোকাঅলা ফুলকপি, খালি খুনের খবর, এরশাদ আসবে না, আবার কি সেই সন্ত্রাস?, জীবন যখন ছিল ফুলের মতো।
কেন অর্থপূর্ণ বাক্য হয়নি। ছাত্র বয়সে জাকির ব্যাকরণে ভালো ছিল না। তবে জানে, বাক্য অর্থপূর্ণ হতে হয়। না হলে বাক্যবোঝা মানুষ বাক্যকে পাগলের প্রলাপ বলে মনে করে।
জীবন যখন ছিল পোকাঅলা ফুলকপির মতো, খালি খুনের (আর) সেই সন্ত্রাসের খবর (না নিয়ে) আবার এরশাদ কি আসবে না?
‘আর’ ও ‘না নিয়ে’ ব্র্যাকেটবন্দি। মনে হয়, বাক্যে দু-একটা শব্দ বন্দিত্ব হলে বাক্য পূর্ণ অর্থ ধারণ করে। জাকির বাক্যটি কয়েকবার পড়ে। মনে হয়, অর্থপূর্ণ হয়েছে। আর না হলে কীইবা করার আছে? ‘জীবন’ শব্দটিকে অন্য শব্দগুলোর প্রথমে, নাকি মাঝে, নাকি শেষে রাখবে এবং প্রয়োজনে আরো কিছু নতুন শব্দ, যা রেহানা বলেনি, যোগ করবে?
জাকির শব্দগুলো এমনভাবে কাটে যেন একটি শব্দও কেউ বুঝতে না পারে। সতেরটি শব্দের মাঝখানের শাদা স্পেসগুলোও ঘন কালো কালিতে ঢেকে দেয়।
বাক্যটাকে নতুন করে লেখা যায় কি না, ভাবে। জাকির চমকে ওঠে, মনে হয়, সাদা পাতার ওপর একটি কালো সাপ শুয়ে আছে। জীবন্ত।





