বাংলাদেশে পর্তুগিজদের তৎপরতা নিয়ে এর আগে সিল্করুটে দুটি সংখ্যা প্রকাশ হয়েছে, যেখানে চট্টগ্রামে পর্তুগিজদের আগমন ও পরে এককভাবে ও সন্দ্বীপ অঞ্চলে হার্মাদ রাজার কর্মকাণ্ড বিধৃত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতাই এবার আমাদের আয়োজন বাংলায় মগ জলদস্যুদের দস্যুবৃত্তি ও মোগলবাহিনী কর্তৃক মগ ধাওনীর ইতিহাস—
‘ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া’ শব্দ দুটি অর্বাচীন হলেও গণমাধ্যমের দৌলতে আজ ছেলে-বুড়ো, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবারই এর অর্থ জানা। অভিজাত বাংলা অভিধানে শব্দ দুটি খুঁজলে নিরাশ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে ‘ধাওয়া’ শব্দটি যতই অকুলীন হোক না কেন, স্বয়ং ঐতিহাসিক দীনেশচন্দ্র সেন তার বিখ্যাত ‘বৃহত্ বঙ্গ’-এ শায়েস্তা খানের চট্টগ্রাম বিজয়ে এই শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করেছেন।
শায়েস্তা খান বাংলার সুবেদার হয়ে চট্টগ্রাম থেকে মগ দস্যুদের সমূলে উত্পাটন করেছিলেন, এ তথ্য ইতিহাসের ছাত্রমাত্রই জানেন। কথাটা যত সংক্ষেপে বলা হলো, শায়েস্তা খানের জন্য কাজটি তত সংক্ষিপ্ত ছিল না, সহজসাধ্য এবং মসৃণ তো নয়ই, দীর্ঘদিনের সযত্ন প্রস্তুতি এবং কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তার সংমিশ্রণে মগ ফিরিঙ্গিদের বিতাড়িত করে দেশে শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে এনেছিলেন।
ঐতিহাসিক দীনেশচন্দ্র সেন শায়েস্তা খানের এই মগ দলন ও মগ বিতাড়ন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার ‘বৃহত্ বঙ্গ’-এ লিখেছেন, ‘মগেরা প্রাণ হাতে করে যে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে চট্টগ্রাম হতে আরাকানে পালিয়েছিল, সেই পালাবার ঘটনা এখনও এ দেশীয় লোকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে। লৌকিক কথায় এই পলায়নের নাম মগ ধাওনী অর্থাত্ মগ খেদানো।’
শায়েস্তা খান দেশকে শত্রুমুক্ত করে শান্তি, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি বাংলাদেশে বয়ে এনেছিলেন। আমরা গড়পড়তা বাঙালিরা অবশ্য আজো তার আমলের টাকায় আট মণ চালের কৃতিত্বেই আটকে আছি। যেন এটিই তার আমলের একমাত্র অর্জন, কিন্তু এই মগ ধাওনীর আরো একটি অন্যতম সুফল বেশির ভাগ ইতিহাস পড়ুয়ার চোখ এড়িয়ে গেছে। সেটি হলো, শায়েস্তা খানের চট্টগ্রাম বিজয় পরোক্ষ-পরোক্ষভাবে হলেও সম্রাট আলমগীরের আমলে ঢাকা-যশোর অঞ্চলে বাংলা গদ্যের বিকাশের আদি পর্বের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। চট্টগ্রাম দখলমুক্ত হলে শত শত বাঙালি হিন্দু-মুসলিম মগদের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে নিজ নিজ অঞ্চলে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। এই মুক্তি পাওয়া বাঙালিদের মধ্যে ছিলেন একজন বাঙালি ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান— যিনি বাল্যে ভূষণা থেকে মগদের হাতে অপহূত হয়ে বন্দি হিসেবে বিক্রির জন্য চট্টগ্রামে উপনীত হন। এক দয়ালু পাদ্রি তাকে কিনে নিয়ে খ্রিস্ট ধর্ম দীক্ষা দিয়ে লেখাপড়া সেখান। তার প্রকৃত বাঙালি নাম আজো অজানা। যে খ্রিস্টান পাদ্রি তাকে ধর্মান্তর করেন, তিনি নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করে তার নাম দেন ডোম আন্তোনিও রোজারিও। যুবকটি হিন্দু জমিদার বা ভূস্বামীর সন্তান, তা পাদ্রিদের অজানা ছিল না। পর্তুগিজ ভাষায় ডোম অর্থ প্রিন্স, রাজকুমার বা কুমার। সুতরাং এই মূল্যবান ধর্মান্তরিত বাঙালি খ্রিস্টান ডোম বা রাজকুমার পরিচয়টা সবসময়ই সগর্বে
ব্যবহার করেছেন। ডোম আন্তোনিও মুক্তি পেয়ে গোয়া বা অন্য কোনো পর্তুগিজ মিশনারিদের কেন্দ্রে না গিয়ে তার স্বভূমিতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যাতে স্থানীয়দের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের সুযোগ পান আর এ ধর্ম প্রচারের সুবিধার জন্য তিনি কথোপকথনের ভঙ্গিতে রোমান হরফে খ্রিস্ট ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করে একটি বাংলা গদ্যের বই লিখলেন, যার নাম ‘ব্রাহ্মণ-রোমান ক্যাথলিক সম্বাদ’। বইটি লিসবন থেকে ছাপা হওয়ার কথা হলেও তা আর কোনো দিন বাস্তবায়িত হয়নি। বহু পরে ইংরেজ আমলে বইটা কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। গবেষকদের সবাই স্বীকার করেছেন, এই চট্টগ্রাম-প্রত্যাগ শায়েস্তা খানের হাতে মুক্তপ্রাপ্ত। ডোম আন্তোনিওর লেখাই বাংলা গদ্যের অন্যতম আদি নিদর্শন। ডোম নবাব শায়েস্তা খানের কাছ থেকে মোগল রাজকোষে নজরানা দিয়ে জমি বরাদ্দ পেয়েছিলেন ধর্ম প্রচার ও গির্জা তৈরির জন্য। শর্ত ছিল, যেকোনো মুসলিমকে যেন ধর্মান্তর করা না হয়। ডোমের বার্ষিক খাজনা পরিশোধসাপেক্ষে জমির অধিকার নবায়ন হচ্ছিল একাধিকবার। এ থেকে প্রমাণিত হয় ডোম শায়েস্তা খানের দেয়া শর্ত ভঙ্গ করেননি। ডোমের শেষ জীবনের সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। আমরা মূল কাহিনী থেকে বেশ একটু দূরে সরে এসেছি। এবার শায়েস্তা খানের চট্টগ্রাম বিজয়, মগ-ফিরিঙ্গি মর্দন পর্বে ফেরা যাক।
বাংলার নবাব মীরজুমলা ১৬৬২ সালে আসাম আক্রমণ করেন। তার সঙ্গী হিসেবে শিহাবুদ্দিন ওয়ালি মোহাম্মদ তালিশ নামে একজন কর্মচারী ছিলেন। তিনি আসাম যুদ্ধের এক বিস্তারিত ইতিহাস লিখেছেন। এই বইয়ের উর্দু তর্জমা এবং উর্দু থেকে ফরাসি অনুবাদ ছাপা হয়েছে। অক্সফোর্ড-বডনিয়াল লাইব্রেরিতে ওই মূল বর্ণনার এক হাতে লেখা কপির পেছনে ১৪০ পৃষ্ঠার একটি পরিশিষ্ট আছে। যদুনাথ সরকার সেই ১৪০ পৃষ্ঠার ফটোগ্রাফ সংগ্রহ করে এনেছেন। এই পরিশিষ্ট শায়েস্তা খানের বঙ্গ শাসন প্রণালি, সে সময়কার বাংলার অবস্থা, জলদস্যুদের অত্যাচার, সন্দ্বীপ ও চাটগাঁ অধিকারে বিস্তৃত সমসাময়িক বিবরণ দেয়া আছে। চাটগাঁ বিজয়ের বর্ণনার পরেই (২৭ জানুয়ারি ১৬৬৬) বই শেষ হয়েছে। যদুনাথ সরকারের অভিমত, বোধহয় গ্রন্থকার (তালিশ) তারপর বেশিদিন জীবিত ছিলেন না। যদুনাথ সরকার লিখেছেন, ‘সত্যবটে আলমগীরনামাতেও শেষোক্ত দুই যুদ্ধের বিবরণ আছে, কিন্তু তাহা এত বিস্তৃত নহে।’
‘পর্তুগীজদের মতোই মগ জলদস্যুরা জলপথে এসে বাঙ্গলা লুট করত। স্ত্রী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে হিন্দু-মুসলমান সদস্যকে বন্দি করে তাদের হাতের তালু ছিদ্র করে সরু বেত প্রবেশ করিয়ে দিত এবং একজনের ওপর আরেকজনকে চাপিয়ে জাহাজের পাটাতনের নিচে রাখত। পাখিদের যেমন মানুষ আহার দেয়, তেমনি করে তারা প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় ওপর থেকে বন্দিদের চাল ছড়িয়ে দিত। এ খাদ্য খেয়ে যারা প্রাণ ধারণ করতে পারত, দেশে ফিরে দস্যুরা তাদের দিয়ে দস্যুরা তাদের সামর্থ্য অনুসারে চাষ বা অন্য কঠিন কাজে নিয়োগ করত। অবশিষ্টদের দাক্ষিণাত্যে নিয়ে ওলন্দাজ, ইংরেজ বা ফরাসি বণিকদের কাছে বিক্রি করে দিত (সতীশচন্দ্র মিত্র যশোর খুলনা ইতিহাস ২য় খণ্ড ১৮৩)।’
ইসলাম খানের অন্যতম খ্যাতনামা সৈনিক ও ঐতিহাসিক মির্জা নাথন এ প্রসঙ্গে লেখেন, ‘শ্রীপুর অঞ্চলে বাদশাহী শক্তির দুর্বলতার সুযোগে মগেরা শত শত নৌকা নিয়ে ঢুকে অসংখ্য গ্রাম লুণ্ঠন করে এবং জ্বালিয়ে গ্রামবাসীদের বন্দি করে নিয়ে যায়।’
মগ-হার্মাদ দস্যুদের অত্যাচারের প্রত্যক্ষ বর্ণনা দিয়েছিল তত্কালীন ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ের। সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মগ ফিরিঙ্গির অত্যাচারে বঙ্গের ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা পাওয়া যায় তার লেখায়। বার্নিয়ের দ্বিতীয়বার বাংলায় ভ্রমণে এসে মগ-ফিরিঙ্গির অত্যাচারে দেশের যে ভয়াবহ পরিণতি লক্ষ করেছিলেন, তারও বর্ণনা দিয়ে গেছেন— সমুদ্রের কাছাকাছি অনেক দ্বীপ এখন প্রায় জনবসতিশূন্য হয়ে গেছে।
সপ্তদশ শতাব্দীর হাতে লেখা কুলপঞ্জিতে ‘মগ’ অত্যাচারের পরিচয় পাওয়া যায়। মগ অত্যাচারিত এসব পরিবার হিন্দু-সমাজে ‘মগ পরিবাদে’ চিহ্নিত হতো। কুলপঞ্জিতে এরূপ একটি পরিবারের পরিচয় প্রসঙ্গে দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য উল্লেখ করেছেন- কিন্তু মগের হাত থেকে ফিরে এলেও এবং শ্রীকৃষ্ণ তার পুত্র কর্তৃক গৃহীত এবং মৃত্যুর পর পুত্র তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করলেও পুত্রকে জ্ঞাতিহীন হতে হয়।
মগ-পরিবাদে সংশ্রবের দোষে মানুষ পরিবারে সমাজ ব্যবস্থায় কী ভয়াবহ লাঞ্ছনার শিকার হয়, যশোহর-খুলনার ইতিহাস প্রণেতা সতীশচন্দ্র মিত্রও তার কিছু চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, মগ-ফিরিঙ্গি ভয়ে পালাইবার কালে কোনো প্রকার ধৃত বা স্পর্শিত মাত্র হইত, তাহারা কোনো গতিকে উদ্ধার পাইলেও সম্প্রদায় শাসনে জাতিচ্যুত বা সমাজবর্জিত হইয়া থাকিত। তাহাদের স্বামী বা পিতা নিঃসন্দেহে তাহাদিগকে পবিত্র জানিয়া স্নেহের কোলে টানিয়া লইলেও হিন্দু সমাজের রুক্ষ কটাক্ষ তাহাদের প্রতি কিছুমাত্র সহানুভূতি দেখাইত না। তিনি সমাজের নিষ্ঠুর রক্ষণশীলতা প্রসঙ্গে আরো বলেছেন, ‘দস্যুরা গ্রামের ভিতর দিয়া যাইবার কালে, শুধু রঙ্গ রহস্যের জন্য পথ পার্শ্বস্থ স্ত্রীলোকদের অঙ্গুলি দ্বারা স্পর্শ করিত বা তাহাদিগকে লক্ষ করিয়া থুথু ফেলিত। অঙ্গুলি স্পর্শ হইত বা না হইত থুথু গায়ে আসিয়া পড়িত বা না পড়িত দূর হতে যাহারা এই মগের চেষ্টা দেখিত বা অট্টহাসির রোল শুনিত, তাহারাই হতভাগ্য গৃহস্থকে নিগৃহীত করিবার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিত। ফল দাঁড়াইত এই, কতকগুলি গৃহস্থরা আপনাদের দুর্ভাগ্যবশত অথবা অরক্ষিত অরাজক দেশের দোষে সমাজে পতিত ও অপবাদগ্রস্ত হইয়া থাকিত। এই কলঙ্ককে ফিরিঙ্গি বা মগ-পরিবাদ বলিত।’ (যশোহর-খুলনার ইতিহাস ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা-১৮৮)
বঙ্গীয় ঐতিহাসিকগণের সর্বস্বধন রিয়াজ-উস-সালাতীন এত নতুন (১৭৮৮) যে অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বের ঘটনা সম্বন্ধে কোনো স্বাধীন মূল্য নাই— যদুনাথ সরকারের এই তীব্র সতর্কতা বাণী বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শিহাবুদ্দিন তালিশ, আলমগীরনামা এবং যদুনাথ সরকারের বিভিন্ন লেখার সূত্র ধরেই প্রবন্ধটি লেখা হয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য মির্জা নাথান তার বাহারিস্তান-ই-গায়বী বইটি যেখানে শেষ করেছেন, শিহাবুদ্দিন তালিশ সেখান থেকেই তার বাংলার ইতিহাস আরম্ভ করেছেন। অতএব তালিশের সূত্রের প্রাসঙ্গিকতা প্রশ্নহীন।
নবাব আমীর-উল-উমরা শায়েস্তা খান প্রথম দফায় ১৪ বছর (জানুয়ারি ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৭৭) এবং দ্বিতীয় নয় বছর (জানুয়ারি ১৬৮০-১৬৮৮) মোট ২৩ বছর সুবে বাংলা শাসন করেছিলেন।
শায়েস্তা খান এ দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন, তখন বাংলার বড় দুর্দিন। শাহ সুজার নয় বছরের শাসনকালে শান্তি ও সমৃদ্ধি পরবর্তী পাঁচ বছরের বিরামহীন গৃহযুদ্ধ অতীতের গল্পে পরিণত হয়েছিল। আসাম আক্রমণ এবং মগ-ফিরিঙ্গি-হার্মাদের অত্যাচার আর নিষ্ঠুর ধ্বংসের কারণে অতীতের কাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। নবাব মীরজুমলা যে মোগল সেনা ও নৌবাহিনীর সাহায্যে সুজাকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে আওরঙ্গজেবের শাসন কায়েম করেছিলেন, আসাম অভিযানে তা প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। শায়েস্তা খানের জন্য ঢাকার মালখানায় কয়েকশ বস্তা কড়ি ও ঢাকার চাঁদনী কয়েকটি ভাঙ্গা নৌকা ছাড়া সম্ভবত আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
৮ মার্চ ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দ বাদশা আলমগীরের আদেশে শায়েস্তা খান ‘আরাম-নিয়ামত্’ ‘বহুল দোজখ’ বাংলার রাজমহলে পৌঁছলেন। প্রথম থেকে তার দৃঢ় সংকল্প ছিল যে, বাংলা আক্রমণকারী জলদস্যুদের ঊচ্ছেদ করে বাংলার প্রজাদের শান্তি ও নিরাপত্তা দেবেন। আর এজন্য একমাত্র উপায় চাটগাঁ অধিকার করে জলদস্যুদের বাসা ধ্বংস করা। শায়েস্তা খানের বুঝতে দেরি হয়নি যে, শূন্যগর্ভ প্রতিশ্রুতি যেমন নিষ্ফল, তেমনি প্রস্তুতিবিহীন যুদ্ধযাত্রার পরিণাম ততোধিক নিষ্ফল, তাই তিনি মাহমুদ বেগ নামে নৌবহরের এক দারোগাকে জঙ্গি নৌকা প্রস্তুত ও এদের যুদ্ধোপযোগী করেতে পূর্ণক্ষমতা দিয়ে ঢাকা পাঠালেন। নতুন নৌবহরের জন্য কাঠ ও কারিগর আবশ্যক। নবাবের পরোয়ানা নিয়ে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে পেয়াদারা কাঠ ও মিস্ত্রি জোগাড় করে ঢাকা পাঠাতে শুরু করল। নবাবের হুকুম যত শিগগির সম্ভব যুদ্ধ সাজে সজ্জিত একটি শক্তিশালী রণপোত যেন ঢাকায় মোতায়েন থাকে। এছাড়া নবাব হুকুম দিলেন যে— হুগলি, বালেশ্বর, সুরঙ্গ, চিলমারী, যশোর, কড়িবাড়ী প্রভৃতি বন্দরে যতগুলো সম্ভব ততগুলো নতুন নৌকা তৈরি করতে হবে।
দূরদর্শী ও অভিজ্ঞ যোদ্ধা হিসেবে শায়েস্তা খান জানতেন, যুদ্ধে জয়লাভ শুধু অস্ত্রশস্ত্র বা বাহুবলে হয় না, কূটনীতির দক্ষ প্রয়োগ যুদ্ধ জয়ের অন্যতম উপাদান। তাই তিনি রণ প্রস্তুতির পাশাপাশি কৌশলের আশ্রয় নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।
বাংলায় ব্যবসায় নিযুক্ত ওলন্দাজ কোম্পানি কাপ্তেন তখন রাজমহলে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ওলন্দাজদের বলে পাঠালেন যে, তারা প্রতি বছর বাংলায় বাণিজ্য করে প্রচুর লাভবান হন। কিন্তু তাদের কোনো কর দিতে হয় না। স্থানীয় অধিবাসী হিন্দু-মুসললিম ব্যবসায়ীদের লাভের যে কর দিতে হয়, বাদশাহজাদা ওলন্দাজদের সে কর মওকুফ করে দেন। “এই মহা অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তোমাদের উচিত যে, নিজের দেশ থেকে যুদ্ধজাহাজ এনে আরাকানের মগদের বিনাশ করতে মোগল সরকারকে সাহায্য করা” (যদুনাথ সরকার)।
এছাড়া আরাকান ডাচদের যেসব কুঠি রয়েছে, তা বন্ধ করে দিতে হবে। নতুবা বাদশাহের সাম্রাজ্যে কোথাও ডাচদের বাণিজ্য করতে দেয়া হবে না। ডাচ কাপ্তেন মহাফাঁপরে পড়ে সর্বোচ্চ কর্মকর্তার অনুমতির জন্য অবিলম্বে পত্র লিখবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে যাত্রা রেহাই পেলেন। সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হলেন Governor General of the Dutch Indies— যিনি থাকেন ইন্দোনেশিয়ার জাভায়। শায়েস্তা তার জন্য এক প্রস্থ খেলাত, একটি মণিখচিত ঘোড়ার জিন-পোশ (Saddle Cover) এবং এ বিষয়ে এক পরোয়ানা ওই কাপ্তেনের জন্য দিলেন।
যদুনাথ সরকার শায়েস্তা খানের এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কী ফল হয়েছিল, তা আর লেখেননি। আলমগীরনামা কিংবা শিহাবুদ্দিন তালিশের গ্রন্থে উল্লেখ না থাকলেও একজন সমসাময়িক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারী চট্টগ্রাম জয়ে ওলন্দাজদের নবাব শায়েস্তা খানকে তিনি সাহায্য করেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন ড. কালিকারঞ্জন কানুনগো। (Indian Records Streynsham vol 2, p 41) এর ওপর ভিত্তি করে তিনি এই মন্তব্য করেন।
চট্টগ্রাম ও আরাকানে ছিল ফিরিঙ্গি বা পর্তুগিজ জলদস্যুদের আস্তানা। আরাকানের মগরাজা ছিলেন এদের আশ্রয়দাতা। সাধারণত তারা চট্টগ্রাম থেকে বেরিয়ে নদীপথে যখন তখন হানা দিত যশোহর, ভূষণা, বাদ্না, বিক্রমপুর, সোনারগাঁ, ঢাকা প্রভৃতি স্থানে। তাদের এই দস্যুতার সঙ্গী হতো মগের দলও, তাদের ছিল শক্তিশালী দ্রুতগামী নৌবাহিনী।
ফিরিঙ্গি দস্যুরা দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন বন্দরে গিয়ে ওলন্দাজ, ইংরেজ ও ফরাসিদের কাছে বাঙ্গাল বন্দিদের বিক্রি করে দিত। কিন্তু মগরা তা করত না। তারা নিজের দেশে বন্দিদের নিয়ে গিয়ে কৃষিকাজ বা গৃহস্থালির কাজে দাসের মতো ব্যবহার করত।
শায়েস্তা খান ভালো করেই জানতেন, পর্তুগিজ জলদস্যুরা মগদের এবং চট্টগ্রাম অধিকারী আরাকানরাজের সবচেয়ে বড় সহায় বশংবদ মিত্র আর আরাকানরাজের দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই পর্তুগিজদের আরকানরাজের মিত্রতা থেকে বিচ্ছিন্ন না করে চট্টগ্রাম আক্রমণে হাত দেয়া অবিবেচককের কাজ হবে। তিনি কূটনীতির মারপ্যাঁচ এবং প্রচুর অর্থ ব্যবহার করে পর্তুগিজদের আরাকানরাজের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে মুঘল ভূখণ্ডে আশ্রয় দেয়ার বন্দোবস্ত হতে দিলেন। পর্তুগিজরা তাদের পরিবার আশ্রয়সহ আর্থিক ও জীবনের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি পেয়ে শায়েস্তা খানের অনুবর্তী হতে দ্বিধা করবে না— এমনটিই শায়েস্তা খান ভেবেছিলেন। ইতিমধ্যেই মুঘলরা তাদের হুগলি বন্দর থেকে উত্খাত করায় পর্তুগিজদের এছাড়া আর কোনো পথও খোলা নেই।
সতেরশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে চাটগাঁয় ফিরিঙ্গিদের শাক্তিশালী ঘাঁটি মগ রাজার সব রকম কুকর্মে সহায়তা করত। তাদের আয়ত্তে এখন একশখানি দ্রুতগামী অস্ত্রপূর্ণ যুদ্ধজাহাজ (নাম জলবা)। ফিরিঙ্গিরা তার আশ্রয়প্রার্থী এবং তাদের যথেষ্ট নৌকা রয়েছে বলে আরাকানের রাজা ইদানীং নিজেদের নৌকা বাংলামুলুকে পাঠাতেন না, শুধুমাত্র ফিরিঙ্গিদের দিয়ে লুট করিয়ে তার অর্ধেক ভাগ নিজে রাখতেন। শায়েস্তা খান জানতে পারেননি আরাকান রাজা ফিরিঙ্গিদের কোনো বেতন দেন না। সমস্ত বাংলাদেশ ফিরিঙ্গিদের জায়গির ছিল। সারা বছর তারা খাজনা (অর্থাত্ লুট) আদায় করত, মগ রাজার সঙ্গে ফিরিঙ্গিদের বঙ্গের লুটেরা আধাআধি ভাগ হতো।
ঢাকার কাছে লধিকোল বন্দরে লবণ ব্যবসায়ী কয়েকজন ফিরিঙ্গি বণিক বসবাস করত। শায়েস্তা খান এই ফিরিঙ্গিদের দিয়ে চাটগাঁর ফিরিঙ্গিদের চিঠি লিখে নবাবের অনুগ্রহের আশা দেখিয়ে তাদের মগদের পক্ষ ত্যাগ করে বাদশার চাকরিভুক্ত করতে বিশেষ চেষ্টা করলেন, নবাব ও গণী বন্দরের পর্তুগিজ কাপ্তেন তাদের একই উদ্দেশ্যে চিঠি পাঠান। আরাকানরাজের কানে শায়েস্তা খানের এই চিঠি চালাচালির খবর অতিদ্রুত পৌঁছে গেল। মগরাজ চাটগাঁর শাসনকর্তাকে লিখে পাঠালেন যে, ফিরিঙ্গিদের তুষ্ট রাখতে হবে এবং তাদের স্ত্রী-পুত্রকে অভয় দিয়ে এখানে পাঠিয়ে দিতে। মগরাজের ইচ্ছা ছিল যে, কৌশলে ফিরিঙ্গিদের পরিবারগুলো হস্তগত করে চাটগাঁয় পুরুষ ফিরিঙ্গিদের হত্যা করে মোগলদের সঙ্গে যোগ দেয়ার পথ বন্ধ করে দেবেন। ফিরিঙ্গিরা ওই অভিসন্ধি টের পেয়ে নিজ স্ত্রী-পুত্রসহ ৮২ খানা জলবা নৌকা নিয়ে নোয়াখালীতে ফরহাদ খাঁর আশ্রয়প্রার্থী হলো। ফিরিঙ্গিরা বাদশাহের পক্ষে যোগ দেয়ায় মোগলদের বিরাট উপকার হলো। নবাব নিজ তহবিল হতে ফিরিঙ্গি কাপ্তেন মুর এবং অন্যদের ২ হাজার টাকা দিলেন, বাদশাহী তহবিল হতে কাপ্তেনের ৫০০ টাকা মাসিক বেতন ও অপর প্রধানদের জন্য স্বচ্ছন্দে থাকার মতো আয় নির্দিষ্ট করা হলে কাপ্তেন মুর শায়েস্তা খানকে একটি মূল্যবান পরামর্শ দিলেন। শায়েস্তা খানের যুদ্ধ প্রস্তুতির খবর পেয়ে আরাকানরাজ বহু সৈন্য ও নৌকা চাটগাঁ রক্ষার জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদি মোগল সৈন্য তাদের পৌঁছার আগে চাটগাঁ আক্রমণ করে, তবে ওই দুর্গ সহজেই জয় করা যাবে। নবাব এই সুবিধাজনক পরিস্থিতি উপেক্ষা না করে চাটগাঁ অভিযানের বন্দোবস্ত করতে লাগলেন।
বাংলা হতে আরাকানের পথের মাঝামাঝি বঙ্গোপসাগরে সোনাদ্বীপ বা সন্দ্বীপ— এখান থেকে নৌকায় চাটগাঁ পৌঁছতে দুই প্রহর সময় লাগে। এই দ্বীপ শত্রুর হাতে থাকলে মোগল সৈন্যের পথ নিরাপদ হয় না। কিন্তু বাদশাহের অধিকারে এলে একেই সুবিধাজনক সরবরাহ ঘাঁটি প্রস্তুত করা যায়। এজন্য শায়েস্তা খান প্রথমে সন্দ্বীপ জয় করা আবশ্যক মনে করলেন। নবাবের আজমত ইবনে হোসেন নৌ-সেনার দারোগা ও মোহাম্মদ বেগ আবাকাজ ১৪১ খানা নৌকা নিয়ে এবং মুনাওয়ার খাঁ ঢাকার জমিদার ১৫০০ বন্দুকধারী সৈন্য এবং কয়েকখানা বড় ‘পাতিলা’ নৌকা (যাতে ঘোড়া বহন করা যায়) সঙ্গে নৌকাখানি পৌঁছেছিল। আসাম যুদ্ধের প্রখ্যাত যোদ্ধা ফরহাদ খাঁও সন্দ্বীপে হাজির হলেন।
নোয়াখালী based operation হইল, এখানে সব সৈন্য, নৌকা, রসদ জমা রাখা হলো। উল্লেখ্য, নোয়াখালী হতে ভোরে নৌকা ছাড়লে সন্ধ্যায় আগে সন্দ্বীপে পৌঁছা যায়। অতিশীঘ্র সন্দ্বীপের বৃদ্ধ রাজা দিলাওয়ারকে পরাজিত করে মোগল নৌবহর ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে সন্দ্বীপ অধিকার করে। দিলাওয়ারকে শিকলে বেঁধে তার আত্মীয়-পরিবার ৯৯ জন বন্দি ও বন্দিনীর সঙ্গে মুনাওয়ার খাঁ জমিদারের তত্ত্বাবধানে ঢাকা পাঠানো হয়। ঢাকার কারাগারে ৮০ বছরেরও অধিক বৃদ্ধ দিলওয়ার মৃত্যুবরণ করেন। নবাব শায়েস্তা খান তার বয়ঃপ্রাপ্ত ছেলেদের বন্দি করে রাখলেন। কিন্তু ছোট ছেলেমেয়েদের ভরণ-পোষণের জন্য ঢাকার কাছে কয়েকখানা গ্রাম দান করেন। যদুনাথ সরকার তার পাঠকদের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন দিলাওয়ারের বংশধর কেউ ঢাকা অঞ্চলে এখনো আছেন কিনা? সন্দ্বীপের বীর দিলাওয়ারের প্রসঙ্গটি এজন্য উল্লেখ করা হলো, আগ্রহী কোনো গবেষক হয়তো ঢাকার আশপাশে দিলাওয়ারের বংশধরদের সন্ধানে ইচ্ছুক হতে পারেন।
যুদ্ধপ্রস্তুতির পরিকল্পনা, রসদ সরবরাহ, নৌকা এবং স্থলবাহিনীর মধ্যে সংযোগ রক্ষা, জঙ্গল কেটে বাড়ি তৈরি— এসবই ঢাকায় বসে শায়েস্তা খান নিখুঁত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছিলেন। তার আদেশ ছিল— নৌবাহিনী ও স্থলবাহিনী কাছাকাছি থেকে অগ্রসর হতে থাকবে।
অভিযানে রওনা হওয়ার দিন নবাব শায়েস্তা খান সকাল থেকে দুপুর এবং বিকাল হতে রাত্রি ৯টা পর্যন্ত সব তদারক করতে লাগলেন। তারপর অন্তঃপুরে বিশ্রামে গিয়েও যদি কোনো জরুরি কথা মনে পড়ত, অমনি সেই বিষয়ে কেরানিদের উপদেশ লিখে পাঠাতেন এবং তাদের কাছ থেকে সংবাদপূর্ণ চিঠি পেতেন।
বাজারের গোলার আমলাদের প্রতি নির্দেশ দেয়া হলো যে, ব্যাপারিরা ঢাকায় যত খাদ্যশস্য আমদানি করবে, তার অর্ধেক সৈন্যদের পাঠাতে হবে। বাংলার সব ফৌজদারদের প্রতি হুকুম জারি হলো— যত দূর সম্ভব খাদ্যদ্রব্য ফৌজের জন্য ঢাকায় পাঠাতে হবে। আর এই কাজ তদারক করার জন্য নবাবের তরফ থেকে এক ধরনের রাজকর্মচারী নিযুক্ত হয়ে গেল। শায়েস্তা খান ভালো করেই জানাতেন যে, শত্রু প্রথমে সৈন্যদের দুর্বল ও যুদ্ধ প্রতিরোধ অক্ষম করে ফেলে তা হলো— খাদ্যাভাব। নবাব এদিকে এত তীক্ষ দৃষ্টি রাখলেন যে, এই যুদ্ধে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সেনাছাউনিতে ও ঢাকা শহরে শস্যের দাম ১০ ও ৯ এই অনুপাতে বজায় ছিল।
বুজুর্গ উমেদ খান দ্রুত সৈন্যসহ ফেনী নদী অতিক্রম করে মগরাজ্যে প্রবেশ করে জঙ্গল কেটে পথ বানিয়ে অগ্রসর হতে লাগলেন। সুলতান বেগ মনসবদার কিছু সৈন্য নিয়ে ফেনীর থানাদার হয়ে রইলেন। ‘পদে পদে— সমুদ্রতীর দিয়ে জঙ্গল কাটিয়া রাস্তা তৈয়ারী হইতে লাগিল। জল ও স্থলপথের সৈন্যগণ কুচ ও বিশ্রাম কোনো সময়ই পরস্পর হইতে পৃথক হইত না। স্থলপথে ফরহাদ খাঁ, মির মুর্তাজা ও হাজী খাঁ জমাদারের অধীনে অগ্রে চলিল।’ (যদুনাথ সরকার)
বাংলার নবাবরা মগদের অত্যাচার এত দিন নীরবে সহ্য করে চলেছিলেন। একমাত্র মোগল নবাব, যিনি অসীম সাহসে চাটগাঁ অবরোধ করেছিলেন, সেই ইব্রাহিম খান ফতে জঙ্গও দুই বছর পর সেখান হতে বিফল হয়ে ফিরে এসেছিলেন। ফলে বাংলার জনগণের ধারণা হয়েছিল, চাটগাঁ জয় করা অসাধ্য ব্যাপার। শায়েস্তা খানের প্রস্তুতি ও বীরত্ব সম্পর্কে সন্দিহান না হয়েও মগদের বিরুদ্ধে তার চূড়ান্ত সফলতা সম্পর্কে সবাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ল।
বাংলার মোগল অভিজাত শ্রেণী ভাগ্য গণনা ও দৈবের প্রতি প্রচণ্ড বিশ্বাস রাখতেন। শায়েস্তা খান এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। রজব মাসের নতুন চাঁদ দেখা গেলে নবাব ভাগ্য পরীক্ষার জন্য হঠাত্ পবিত্র কোরানের পাতা ওল্টালেন এবং সুরার এ অংশটির ওপর তার চোখ পড়ল— ‘সে সময় কাছে এসেছে, যখন তোমাদের প্রভু তোমাদের শত্রুকুল ধ্বংস করবেন এবং তোমাদের পৃথিবীর উত্তরাধিকারী করবেন।’
২৩ জানুয়ারি মোগলদের সঙ্গে মগ নৌসেনাদের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষ ঘটে— কাঁঠালিয়া থানার বাইরে। মগরা চাটগাঁ হতে এসে কাঁঠালিয়া থানায় ঘাঁটি গেড়েছিল। সমুদ্রের প্রচণ্ড বাতাস ও জোয়ারে বাদশাহী নৌকাগুলো আগাগোড়া সিক্ত হয়ে পড়েছিল। তবু ইবনে হোসেন যুদ্ধের জন্য নৌকা খুলে দিলেন। তীর হতে একজন তুর্কি সৈন্য মাহমুদ বেগ আবাকাশকে বিরত করার জন্য বলল, ‘তুমি পাগল নাকি যে, এমন তুফানে এই গভীর সমুদ্রে নৌকা নিয়ে চলেছ? আবাকাশ উত্তর করল,
‘ওরে পাগলই যদি না হতাম, তবে যুদ্ধের ব্যবসা করতে আসতাম না।’
জলযুদ্ধের সম্ভাবনার খবর পেয়ে ফরহাদ খাঁ ও ইসা খাঁ দ্রুত স্থলপথে মোগল নৌসেনার সাহায্যে এগিয়ে এলেন। ১০ খানা ঘরাব ও ৪৫ খান জলবা নৌকা সম্মুখে এগিয়ে এসে তোপ দাগতে শুরু করে। কাপ্তেন মুর ও অন্য ফিরিঙ্গিদের নৌকা মোগলদের পক্ষ নিয়ে সর্বপ্রথমে ছিল। তারা নির্ভয়ে শত্রু নৌকার ওপর হামলা চালাল। ইবনে হোসেন ও তাদের পিছু পিছু তেড়ে এল। মগরা এ আক্রমণ সইতে না পেরে তাদের সেনারা ঘরাব ছেড়ে পানিতে ঝাঁপ দিল আর জলবাগুলো পালিয়ে গেল। ইবনে হোসেন মগদের ঘরাবগুলো অধিকার করে পশ্চাত্ধাবন করতে চাইলেন। যথেষ্ট মনে করে আর এগোনো রাজি হলো না। ইবনে হোসেন রাত কাটালেন।
পরদিন মগদের দু-তিনখানি নিশানাযুক্ত নৌকা দূরে দেখা গেল।
ভোরে মগেরা নিজের বড় নৌকা ও অন্যান্য নৌকা পথের মধ্যে হলার নালায় লুকিয়ে রেখেছিল। ইবনে হোসেনের উত্সাহবাণীতে উত্তেজিত বঙ্গীয় নৌসেনারা হলার দিকে রওনা দিল। মগের মোগলদের উপস্থিতি টের পেয়ে নালা হতে বেরিয়ে এসে সমুদ্রে নৌব্যূহ রচনা করে দাঁড়াল। প্রথমে ইবনে হোসেন ছোট দ্রুত নৌকাসহ সেখানে পৌঁছে বড় ভারী নৌকাগুলোর অপেক্ষায় দূরে তোপ দাগতে লাগলেন।
পরদিন ২৫ জানুয়ারি ভোরে বাদশাহী নৌবাহিনী মহা উত্সাহে বাজনা বাজিয়ে আর গোলা ছুড়তে ছুড়তে শত্রুর দিকে অগ্রসর হলো। প্রথমে রাখা হয়েছিল সবচেয়ে বড় জাহাজ (মন্ব)। তাদের ওপর ভারী কামানে সাজানো। দ্বিতীয় সারিতে ছিল মাঝারি আকারের জাহাজ ঘরাবগুলো। সবার পেছনে মোগলরা নিয়ে এল ছোট দ্রুত জলবা ও কুছা শ্রেণীর নৌকা। যদুনাথ সরকার ও অন্য ঐতিহাসিকরা মন্তব্য করেছেন, এই যুদ্ধে নৌযুদ্ধে অভিজ্ঞ মগরা মহাভুল করেছিল। একে মোগল নবাবরা ফিরিঙ্গিদের পেয়ে শক্তি বাড়িয়ে ফেলেছিল, তার ওপর মগ নৌসেনা দুই ভাগ হয়ে দুদিন দুই ভিন্ন স্থানে যুদ্ধে গেল। এভাবে শক্তির ভাগে মগদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। মগ বাহিনী যদি একত্রে ইবনে হোসেনকে কুমারিকা নালায় প্রথম দিনই আক্রমণ করত, তবে জেতার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হতো। কারণ তখন ইবনে হোসেন একা, রাস্তা তৈরি হয়নি এবং স্থলপথের মোগল সেনার পুরোভাগ তখনো কুমারিকায় পৌঁছতে পারেনি। ঐতিহাসিকের অভিমত, ‘এই যুদ্ধে মগদের কোনো রণকৌশল বা দূরদর্শিতার চিহ্ন পাওয়া যায়নি।’
মগরা পিছু হটতে শুরু করল। কর্ণফুলী নদীর মুখে পৌঁছে তার মাঝে চর— চাটগাঁ দুর্গের ঠিক সামনে গিয়ে নোঙর ফেলল। মোগল নবাব কালবিলম্ব না করে নদীর মুখ দখল করে নিল। এই পদক্ষেপই মগদের দ্বিতীয় মারাত্মক ভ্রম। নদীর মধ্যে নৌকা নিয়ে পালিয়ে তার পেছনে তাড়া করা মোগল সেনাদের হাতে যেন খাঁচার মধ্যে বন্দি হলো। তার চেয়ে খোলা সমুদ্রে থাকলে পরাজিত হলেও দ্রুত নৌকাগুলো আরাকানে নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হতো। ইবনে হোসেন তার পর কর্ণফুলী নদীর পশ্চিম মোহনায় মগদের তৈরি বাঁশের গড় আক্রমণ করে, কেল্লাগুলো পুড়িয়ে দিয়ে মোহনার দিকে এলেন। এবার ইবনে হোসেন শত্রু নৌকাতে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ফিরিঙ্গি ও মোগল নৌসেনা প্রবল বেগে শত্রুর চারদিকে আক্রমণ করল। চাটগাঁ দুর্গ হতে মগরাও গোলাবর্ষণে বিরাম দেয়নি। ‘অবশেষে বিজয়ের বাতাস মুসলমান পতাকার ওপর বহিতে লাগিল।’ নদীর মুখ মোগলদের হস্তগত। মগ নৌকার পালাবার পথ বন্ধ। অনেক মগ দাঁড়ি ও সৈন্য পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে চেষ্টা করে। অন্যেরা নৌকার ওপর ধরা দিল। কতগুলো নৌকা মোগলদের তোপে ও টক্করের আঘাতে ডুবে যায়। অবশিষ্ট ১৩ উখান মগ জঙ্গি নৌকা ইবনে হোসেনের হাতে বন্দি হয়েছিল। এরই মধ্যে বুজুর্গ উমেদ খান জলযুদ্ধের সংবাদ পেয়ে সৈন্যসহ দ্রুত চাটগাঁর নিকট পৌঁছলেন। দুর্গবন্দি মগরা স্বচক্ষে জলযুদ্ধের ফলাফল দেখে এবং মোগল সৈন্যের আগমনের খবর পেয়ে মহাভয়ে রাতারাতি দুর্গ হতে পালিয়ে গেল।
চাটগাঁর সম্মুখে নদীর দক্ষিণ পাড়ের ছোট দুর্গে যেসব মগ সেনা ছিল, তারাও পালিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ মনে করে। ফলে মোগলদের দুর্গ দখল করতে বেগ পেতে হয়নি। নদীর এই পাড়ের কৃষকদের অধিকাংশই বাংলা হতে ধরে আনা বন্দি মুসলমান— পলায়নরত মগদের ওপর এবার তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল। এক মগ সেনাপতিকে হত্যা করে তার দুটি হাত এনে ইবনে হোসেনকে দেয়া হলো।
২৭ জানুয়ারি উমেদ খাঁ চাটগাঁ দুর্গে প্রবেশ করেন। সবাইকে আশ্বস্ত করে নিজ সেনাদের কড়া হুকুম দিলেন যে, প্রজাদের কারো প্রতি যেন লুট বা অত্যাচার করা না হয়। শিহাবুদ্দিন তালিশের মতে, বুজুর্গ উমেদ খাঁ ২৪ জানুয়ারি কুমিল্লা থেকে রওনা করে ফরহাদ খাঁর একদিন পরে অর্থাত্ ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম পৌঁছে বিজয়ী নৌবাহিনীর সঙ্গে একযোগে চট্টগ্রাম অবরোধ করেন। ৩৬ ঘণ্টা অবরোধের পর দুর্গরক্ষী মগ সেনাপতি উমেদ খাঁর হাতে কেল্লার চাবি সমর্পণ করেন। শিহাবুদ্দিন তালিশে মতে, মোগল নৌসেনাই চট্টগ্রাম দুর্গ জয় করেছিল এবং ২৬ তারিখ সকালবেলা নৌসেনাপতি ইবনে হোসেনের কাছে মগ দুর্গাধিপতি আত্মসমর্পণ করেছিল। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারও অনুমান করেন, মোগল স্থলবাহিনী দুর্গ দখলের পর পৌঁছেছিল।
মোগল বিজয়ের পর চট্টগ্রামের নামকরণ হলো ইসলামবাদ। চট্টগ্রাম বিজয়ের ফলে বাংলাদেশের সীমা বৌদ্ধ যুগের রম্যক বা রামু পর্যন্ত প্রসারিত হলো। হাজার হাজার হিন্দু-মুসলমান মগের গোলামি হতে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরতে লাগল। চট্টগ্রামের অন্দর কিল্লার জুমা মসজিদ এখনো শায়েস্তা খানের চট্টগ্রাম জয়ের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ বিদ্যমান। তবে চট্টগ্রামে সাধারণের কাছে এটি শাহ সুজা মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদের প্রশস্তি ফলকে তারিখ নবাব আমীর-উল-উমরা (শায়েস্তা খানের উপাধি) লিখিত রয়েছে। ড. কালিকারঞ্জন কানুনগোর মন্তব্য— ‘জনপ্রবাদের কোনো ভিত্তি নেই।
মগ দুর্গস্বামীকে বন্দি করে জয়ের সংবাদসহ নবাব শায়েস্তা খানের কাছে পাঠানো হলো। বন্দি মগদুর্গাধিপতি ২৯ জানুয়ারি ঢাকায় পৌঁছেন। চারদিকে আনন্দ বাদ্য বাজানো শুরু হলো। শায়েস্তা খান ফিরিঙ্গি ও মোগল সেনাদের মোটা পুরস্কার দিলেন। নবাবের নবদী সৈন্যদের এক মাসের বেতন বকশিশ দেয়া হলো।
বাদশাহ আওরঙ্গজেব জয়ের বিবরণ হাতে পেয়ে নবাব শায়েস্তা খানকে এক মণিখচিত তরবারি, দুটো হস্তী, দুটো ঘোড়া (সোনার সাজসহ) এবং একপ্রস্ত খেলাত পাঠালেন। সেনানায়কের সবাই উচ্চতর মসনবে উন্নীত হলেন।
পূর্ববঙ্গ গীতিকায় নসর মালুম পালায় শায়েস্তা খানের মগদলন ও মগদের পরাজয় এবং পলায়নের বিবরণ রয়েছে এমনই ভাষায়:
‘অরাজক হইল দেশ জঙ্গ হৈল ভারি
দক্ষিণ মিক্যা (মুখে) ধাইয়ে মগ বাড়িঘর ছাড়ি
সোনা-দানা, দৌলত মাডিতে (মাটিতে) গাড়িয়া
দহিন (দক্ষিণ) মিক্যা ধাইয়ে চাটিগাঁ ছাড়িয়া।’
পালাবার সময় মগদস্যুরা ধনসম্পদের সব না নিতে পেরে কিছু কিছু অংশ মাটিতে পুঁতে রেখে যায়। একদল মগদস্যু সেই আক্রমণের সময় বারো ঘড়া মোহর মাটিতে লুকিয়ে পালিয়েছিল। এক রাতে সব চুকেবুকে গেলে সেই মগদল ফিরে এসে যে বাঙালি বৃদ্ধ তাদের ফেলে যাওয়া ভিটেয় বসবাস করছিল, তার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে মাটি খুঁড়ে বারো ঘড়া মোহর তুলে আনল। বৃদ্ধকে কৃতজ্ঞতার চিহ্নস্বরূপ তা থেকে দুই ঘড়া মোহর দিয়েছিল। কারণ বৃদ্ধ এত দিন এই ধন পাহারা দিয়ে গেছে। কাহিনীটি বর্ণিত হয়েছে নসর মালুম পালায় সেই গুপ্তধন সন্ধানী মগের এমনই জবানিতে—
‘বার ঘড়া সোনার মোহর ডিঙ্গার (ডাঙ্গার) মাঝে রাখি।
গেড়াম ছাড়িয়া এখন নানার বাড়িতে থাকি।।
বলিতে বালিতে মাডি কুড়িতে (খুঁড়িতে) নাগিল।
বার ঘড়া সোনার মোহর তুলিয়া আনিল ।।
বুড়ারে কহিল তারা লও দুই ঘড়া।
এতদিন এই দন (ধন) দিল পাহারা ।।
পাইল বুড়া দুই ঘড়া সোনার মোহর
রাইতে রাইতে ধাইলরে মগ না হৈতে ফজর ।।’
মগ বিতাড়নের সাফল্যের পর মোগল রাজস্ব বিভাগের নতুন বিজিত এই প্রদেশের খাজনার সলুক সন্ধান করা শুরু করল। প্রধানমন্ত্রী জাফর খান বাদশাহ আলমগীরের হুকুম অনুযায়ী দিল্লি হতে শায়েস্তা খানকে লিখে পাঠালেন, ‘নববিজিত প্রদেশে জমা (রাজস্ব) কত?’ নবাব উত্তর দিলেন, “আসল কথায় এর ‘জমা’ = রাজস্ব হচ্ছে— বাংলার মুসলমানদের মনের ‘জম্মায়েত্’ = শান্তি, আর এর কর হচ্ছে— ইসলামের প্রভাব বৃদ্ধি, এর নগদ (আয়) হচ্ছে বাদশাহীর স্থায়িত্বের জন্য প্রজাদের দোয়া। মগ উপদ্রব থেমেছে, এখন বাঙ্গলার আবাদ শীঘ্র বৃদ্ধি পাবে; তা হতেই চাটগাঁ জয়ের কী লাভ বুঝতে পারবেন।” (সূত্র যদুনাথ সরকার রচনা সমগ্র)।
নবাব শায়েস্তা খানের ভবিষ্যদ্বাণী বিফল হয়নি। তার আমলে সব খরচ বাদ দিয়ে থোক ৫০-৬০ লাখ টাকা প্রতি বছর বাদশাহী খাজনাখানায় পাঠানো হতো। আগ্রা থেকে ঢাকা আসার পথে এক স্থানে দেখেছিলেন, ১১০ খানা গরুর গাড়ি বোঝাই বাংলার রাজস্ব আগ্রায় পাড়ি দিচ্ছে। প্রত্যেক গাড়িতে তিন জোড়া বলদ রুপার সিক্কা টাকার বোঝা সুদীর্ঘ পথ টেনে চলছে। আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্যের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ অভিযান এই বাংলার রাজস্ব থেকেই মেটানো হয়েছে।





