[দিনো বুজ্জাতি ১৯০৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন, মারা যান ১৯৭২ সালে। তিনি ইতালির মিলান শহরে এক দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। সব বিষয়ে লেখায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি শুধু সফল সাংবাদিকই নন,একাধারে ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। কল্পবিজ্ঞান বা সায়েন্স ফিকশনও লিখেছেন। এখানেই শেষ নয়। বই অলঙ্করণও করতেন তিনি। নিজের কিছু বইয়ের জন্য বেশকিছু অদ্ভুত সুন্দর ছবিও এঁকেছিলেন। লরেন্স ভেনুতির ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে বাংলা করা হয়েছে।]

 

স্তেফানো রয়ির বয়স তখন ১২ বছর। জন্মদিনের উপহার হিসেবে বাবাকে অনুরোধ জানায়, জাহাজে করে তাকে সাগরে নিয়ে যেতে। তার বাবা সাগরের নাবিক। পালতোলা জাহাজ আছে তার।

ছেলেটা বলল, আমি যখন বড় হব, তোমার সঙ্গে সাগরে যাব। তখন তোমার চেয়ে আরো বড় ও সুন্দর জাহাজ চালাব আমি।

বাবা বললেন, ‘আল্লাহ তোর ভালো করুক, বাবা।’

সেদিনই নিজের জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাবা, সঙ্গে নিলেন ছেলেকেও।

রোদ ঝলমল অপূর্ব একটা দিন। সমুদ্রটাও বড় শান্ত। স্তেফানো এর আগে কখনো জাহাজে চড়েনি। ডেকের ওপর এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগল। পাল খাটানোর জটিল সব কাজ অবাক হয়ে দেখতে লাগল। পাল খাটানোর লোকজনকে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করতে থাকে। স্তেফানোর সঙ্গে কথা বলে তারাও খুশি। সবকিছু খুলে বলে বলতে লাগল।

একসময় ডেকের পেছনে গেল ছেলেটা। সেখানেই সে থেমে গেল। আগ্রহ বেড়ে গেল তার, দু-তিনশ মিটার দূরে হঠাত্ হঠাত্ কী যেন একটা ভেসে উঠছে, জাহাজের পেছনে জলের তোড় বরাবর দূরে এটা ভেসে উঠছে।

জাহাজটি খুব দ্রুত গতিতে চলছে। পালভরা বাতাস একে যেন উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওই বস্তুটা ঠিকই আগের মতো সমান দূরত্ব রেখে চলছে। সেও বুঝতে পারেনি ওটা কি। এ সম্পর্কে কিছু গল্পগুজব আগে থেকেই ছিল। আর তা এখন তার মনকেও তীব্রভাবে টানছে।

স্তেফানোকে ডেকের সামনে দেখতে না পেয়ে বাবা ব্রিজ থেকে নেমে এলেন, তার নাম ধরে চেঁচিয়ে ডাকলেন। কোনো সাড়া পেলেন না। তো তাকে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলেন।

‘স্তেফানো কোথায় রে তুই, এমন চুপচাপ কী করিস?’ ক্যাপ্টেন তার ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন। শেষ পর্যন্ত বাবা তাকে দেখতে পেলেন— তখন ডেকের একদম পেছনে দাঁড়ানো সে, জলের দিকে তাকিয়ে আছে।

‘বাবা, এদিকে আসো, দেখো।’

বাবা সেদিকে গেলেন, আর ছেলে যে দিকে দেখতে বলেছে, ঠিক সেদিকেই তাকালেন। তবে তিনি কিছুই দেখতে পেলেন না।

‘জাহাজের পেছনে জলের তোড়ে একটা কালো কিছু হঠাত্ হঠাত্ ভেসে উঠছে,’ স্তেফানো জানাল, ‘আর পিছে পিছে আসছে।’

‘চল্লিশ বছর ধরে আমি সাগরে ঘুরে বেড়াই। তার ওপর আমি মনে করি, আমার দেখার ক্ষমতা যথেষ্ট ভালো। কিন্তু আমি তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না।’

তবু ছেলে জোরাজুরি করতে লাগল। অগত্যা বাবা একটা টেলিস্কোপ আনতে ছুটে গেলেন। এর পর ওটা দিয়ে সাগরের পিঠে জাহাজের পেছনে জলের বেণি বরাবর তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলেন। স্তেফানো দেখতে পেল, বাবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

‘এটা কী? এমন মন খারাপ করছ কেন, বাবা?’

‘আমি যদি তোর ডাক শুনতে না পেতাম।’ ক্যাপ্টেন বিস্ময় প্রকাশ করলেন। ‘এখন আমি তোরে নিয়ে ব্যাপক দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলাম রে স্তেফানো। তুই যে জলের ওপর ভেসে উঠতে আর আমাদের পিছে পিছে আসতে দেখলি, সেটা আর কিছু নয় রে বাপ, ওটাই কলম্বার। এটাই সেই মাছ রে বাবা, বিশ্বের যেকোনো সাগরে নাবিকরা আর কিছু এত ভয় পায় না। এ খুবই রহস্যময় এক হাঙর। মানুষের চেয়েও বেশি চালাক। কারণ আর কিছুই নয়, কেউই জানতে পারে না, এটা কাকে নিজের শিকার হিসেবে বেছে নেয়। আর কখনইবা তাকে শিকার বেছে নিয়েছে সে, তাও কেউ টের পায় না। হাঙরটা শুধু বছরের পর বছর তাকে অনুসরণ করে চলে, এমনকি ওই লোকের জীবন শেষ না হওয়া পর্যন্ত পিছু নেয়া ছাড়ে না। যত দিন না তাকে গিলে খেতে পারছে, শেষ হয় না তার পিছু পিছু ছুটে চলা। আর অবাক ব্যাপার: অন্য কেউই কলম্বারকে দেখতে পায় না। শুধু যাকে শিকার করবে, সে, আর তার রক্তের আত্মীয়ই তাকে দেখতে পায়।’

‘এটা কি গল্প না, বাবা?’

‘না। আমি কখনো এটাকে দেখতে পাইনি। কিন্তু কতবার কতজনের কাছে এর গল্প শুনেছি। আর এখন একে দেখেই চিনে গেছি আমি। বাইসনের মতো নাক, মুখটা বারবারই খুলছে, আর বন্ধ করছে। ওইসব ভয়ঙ্কর দাঁত। স্তেফানো রে আমার আর কোনো সন্দেহ নাই। যত অমঙ্গলের কথাই হোক, কলম্বারটা তোকেই বেছে নিয়েছে। আর যখনই সাগরে আসবি, এ তোরে কখনই শান্তি দেবে না। আমার কথা শোন বাপ, আমরা আর সাগরে থাকব না। এখনই ভূমিতে চলে যাব, এখনই। তুই ভূমিতেই থাকবি। আর কখনই মাটি ছেড়ে সাগরে আসবি না। কখনো না। কোনো কারণেই না। তুই আমারে কথা দে বাবা। কথা দে, কখনো সাগরে আসবি না। সাগরে ছোটাছুটি তোর জন্য নয় রে স্তেফানো। তোর অবশ্যই এ চিন্তা বাদ দিতে হবে। এর চেয়েও বড় কথা, তুই ভূমিতে থেকেও উন্নতি করতে পারবি।’

এ কথা বলার পরই, বাবা জাহাজের দিক ঘুরিয়ে দিলেন। আবারো বন্দরে এলেন। আর আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তবু ছেলেকে তীরে নামিয়ে দিলেন। এর পর আবার গভীর সাগরে ফিরে গেলেন।

এদিকে ছেলেটি গভীর দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে যায়, সে তীরেই দাঁড়িয়ে থাকে, যতক্ষণ না বাবার জাহাজের মাস্তুলগুলো দিগন্ত রেখায় হারিয়ে যায়। বন্দরে বাঁধা ডকটির পর বিস্তৃত সাগরজুড়ে কিছুই নেই তখন, জনহীন, নীরব ও ফাঁকা। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে স্তেফানো সেদিকেই তাকিয়ে থাকে। হঠাত্ই দেখতে পায়, একটা ছোট্ট কালো বিন্দু, হঠাত্ হঠাত্ জলের ওপর ভেসে উঠছে: ‘তার দেখা কলম্বারটাই। খুব ধীরে ধীরে একবার সামনে, একবার পেছনে যাচ্ছে, আর দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে তার জন্যই অপেক্ষা করছে।

সত্যি বলতে, সেই থেকে ছেলেটি সাগরে যাওয়ার ইচ্ছে সফলভাবেই দমন করেছে। তার বাবা তাকে দেশের একদম ভেতরে একটি এলাকায় পড়তে পাঠালেন। স্কুলটা সৈকত এলাকা থেকে শত কিলোমিটার দূরে। তবে নতুন পরিবেশে তার একদম ভালো লাগে না। প্রথম দিকে বেশকিছু দিন সে ওই দৈত্যের কথা ভাবার অবসর পায়নি। তখনো গরমের ছুটি কাটাতে বাড়িতে আসে সে। আর বাড়ি এসেই প্রথমেই একটা কাজটা করে, একটু ফাঁকা সময় পেলেই, বন্দরের ডকে এসে দাঁড়ায়। আর সামনের সাগরটা একটু পরীক্ষা করে দেখে। যদিও সে মনে করে এমন করার কোনো দরকার আসলে নেই। এভাবেই তার অনেক বছর কেটে গেল। এমনকি তখনো বাবা যে গল্পটি বলেছিলেন, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে মনে করে স্তেফানো। তবে তার মনে হয়, কলম্বার এত দিনে নিশ্চয় তার জন্য অপেক্ষা করা বন্ধ করে দিয়েছে।

তবু স্তেফানো সেখানে এসে দাঁড়ায়, অবাক হয়, তার বুক কেঁপে ওঠে। ডক থেকে মাত্র দু-তিনশ মিটার দূরে, সাগরে, ওই ভয়ঙ্কর মাছটা ধীরে ধীরে একবার সামনে একবার পেছনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাত্ হঠাত্ ওর নাকটা জলের ওপর ভেসে উঠছে। তীরের দিকে মুখ করে ওটা যেন ব্যাকুল হয়ে ভাবছে, স্তেফানো শেষ পর্যন্ত এল কিনা!

তো ওই দুশমন জানোয়ারটা তার জন্য রাত-দিন অপেক্ষা করছে— স্তেফানো সবসময়ই এ কথা ভাবতে থাকে। আর এমনকি ওই দূর শহরেও এ দুর্ভাবনায় তার মাঝরাতের ঘুম ভেঙে যায়। অবশ্যই সে নিরাপদ ছিল। কারণ, কলম্বার আর তার মাঝে তখন শত মাইলেরও বেশি দূরত্ব। তার পরও স্তেফানোর সারাক্ষণ মনে হতো, পাহাড়ের ওই পাড়ে, বন আর আদিগন্ত মাঠের ওই পাড়ে, হাঙরটি তার জন্য ঠিকই অপেক্ষা করছে। তার মনে হতো, সবচেয়ে দূরের মহাদেশে সে চলে যেতে পারে, তবু কঠিন গোঁ ধরা এই কলম্বার ওর প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়ে ওই মহাদেশের সবচেয়ে কাছের কোনো সাগরে গিয়ে ঠিকই ভেসে উঠবে।

স্তেফানো বেশ দৃঢ় মনের ছেলে, বেশ ভালোভাবেই লেখাপড়া চালিয়ে গেল। আর পূর্ণবয়স্ক যুবক হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তার মর্যাদাপূর্ণ ও বেশ ভালো বেতনের একটা চাকরি জুটে গেল, দেশের একেবারে ভেতরের এক শহরে।

এরই মধ্যে তার বাবা রোগে ভুগে মারা গেলেন। আর তার বিধবা স্ত্রী সেই অপূর্ব জাহাজটা বিক্রি করে দিলেন। আর ছেলেও বেশ ভালো সম্পদের উত্তরাধিকারী হলো। কাজ, বন্ধু, বিনোদন, প্রথম প্রেম— সবমিলে স্তেফানোর জীবন ঠিক ছন্দময় হয়ে ওঠেনি। তবে কলম্বারের চিন্তাও তাকে কম ভোগায়নি। এমন একটা মরীচিকা যেটা ভয়ঙ্কর, প্রাণঘাতী, আবার একই সঙ্গে মনকে ভীষণভাবে টানে। আর এভাবেই একের পর এক দিন হারিয়ে যাওয়ার বদলে, ঠিকই পার হতে লাগল। একসময় তার মনে হলো, এ দুর্ভাবনা এখন আরো জেদাজেদির পর্যায়ে চলে এসেছে।

পরিশ্রমী ও সচ্ছল একজন মানুষের কাছে শান্ত জীবনের তৃপ্তি অবশ্যই অনেক বড় বিষয়। তবে কিনা রসাতলে যাওয়ার টান তার কাছে আরো আকর্ষণীয় মনে হয়। স্তেফানো তখন বড় জোর ২২ বছরের তরুণ, সে বছরই সমুদ্র থেকে দূরের এই মাটিতে থাকা তার সব বন্ধুকে বিদায় জানিয়ে দিল, ছেড়ে দিল চাকরিটাও। নিজের শহরে ফিরে মাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিল, সবসময় তার ইচ্ছে, সে ব্যবসা করবে। ওই নারী যার কাছে সে কখনো ওই রহস্যময় হাঙরটার কথা বলেনি, তার সিদ্ধান্তকে আনন্দের সঙ্গে স্বাগত জানালেন। সাগর ছেড়ে ছেলের শহরে থাকতে আসা ওই নারীর কাছে সবসময়ই ছিল পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বাসঘাতক হওয়ার শামিল।

স্তেফানো পাল তুলে ছুটতে লাগল, সে যে সাগরে থাকার যোগ্য, প্রতিট কাজে এর প্রমাণ দিতে লাগল। ক্লান্তি-অবসাদ বলে কিছুই তার পাশ ঘেঁষতে পারে না। সে এক নির্ভীক মানুষে পরিণত হয়েছে। তার পাল তোলা জাহাজ ছুটে চলছে তো চলছেই। বন্দর থেকে জাহাজ ছাড়ার পর, কি দিন কি রাত, রোদ ঝলমলে দিন কি ঝড়-তুফান, কলম্বার ঠিকই জাহাজটিকে বিষণ্নভাবে অনুসরণ করে চলে। সে জানত, এটা তার জন্য অভিশাপ, আর এটাই তার শাস্তি এবং ঠিক এ কারণেই আসলে এর কাছ থেকে দ্রুত দূরে ছুটে পালানোর শক্তি সে পায় না। আর সত্যি কথা হলো, সে ছাড়া জাহাজের কেউই ওই দানোটাকে দেখতে পেত না।

‘ওই যে ওখানে কিছু কি দেখতে পাও না?’ সে মাঝে মধ্যেই জাহাজের পেছন থেকে জেগে ওঠে দূর মিলিয়ে যাওয়া ঢেউয়ের দিকে আঙুল তুলে তার সঙ্গীদের এমন প্রশ্ন করত।

‘না, আমরা তো কিছু্ দেখছি না। কেন বল তো?’

‘আমি ঠিক জানি না। আমার মনে হলো...’

‘নিশ্চয় কোনো কলম্বারকে দেখনি, যা-ই হোক না কেন, দেখনি তো?’ স্তেফানোকে পাল্টা প্রশ্ন করত মাঝিরা। এ সময় জাহাজের মাস্তুল ছুঁয়ে তাকে দিব্যি দিত আর হাসত।

‘তোমরা হাসছ কেন? মাস্তুল ছুঁয়েইবা দোহাই দিচ্ছো কেন?’

‘কারণ কলম্বার এমন এক প্রাণী, যে কাউকেই ছাড়ে না। আর এ যদি এই জাহাজের পিছু নিয়ে থাকে, এর মানে হলো, আমাদের মধ্যে কেউ না কেউ অবশ্যই মারা যাবে।’

কিন্তু এতে একফোঁটা ভেঙে পড়েনি স্তেফানো। তার পায়ে পায়ে যে বিপদ বিরামহীন ঘুরে বেড়াচ্ছে, মনে হলো তা আসলে সাগরের প্রতি নিজেরই গভীর টান, এ টান বরং তার ইচ্ছেশক্তিকে আরো অদম্য করে তুলেছে। ঝগড়া-বিবাদই বলি আর বিপদের কথাই বলি, এ আশঙ্কা যেন তার সাহস আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

একসময় বুঝতে পারে সে-ই এখন নিজের ব্যবসার হর্তাকর্তা। তখনই বাবার কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তির একটা অংশ বেচে দিল। যে টাকা পেল, তা দিয়ে একজন অংশীদারের সঙ্গে মিলে ছোট একটা বাষ্পচালিত জাহাজ কিনল সে। একদিন সে এই জাহাজটার পুরোপুরি মালিক হলো। তার পর বলতে হয়, বেশ কয়েক দফা সফলভাবে মালামাল চালান দিয়ে ভালোই টাকা-পয়সা আয় করল। এসব টাকা-পয়সা দিয়ে সত্যিকার অর্থেই একটা বড় জাহাজ কিনল। একের পর এক বড় বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগোতে থাকে সে। কিন্তু সফলতা আর লাখ লাখ টাকা তার মনে যে অশান্তি চলছে, তা দূর করতে পারেনি। অন্যদিক থেকে বললে, সে নিজেও অশান্তি দূর করার চেষ্টা কখনো করেনি। জাহাজ বিক্রি করে দিয়ে এই ব্যবসা গুটিয়ে সাগর ছেড়ে দূরের ভূমিতে ভিন্ন ধরনের ব্যবসা শুরুর কথা কখনো সে ভাবেনি।

পাল তুলে জাহাজ ছুটিয়ে চলাই ছিল স্তেফানোর একমাত্র চিন্তা। দীর্ঘ যাত্রার পর যখনই কোনো বন্দরে পৌঁছে মাটিতে পা রাখত, তার তর সইত না, এক মুহূর্ত দেরি না করেই আবার জাহাজ ছাড়তে তোড়জোড় শুরু করে দিত। সে জানত, বন্দরের বাইরে ওই খোলা জলের জগতে কলম্বার তার জন্যই অপেক্ষা করছে। আর কলম্বারের আরেক নাম সর্বনাশ। কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এক অদম্য আবেগ তাকে বিরামহীন তাড়া করত। তাকে কেবল এক সাগর থেকে আরেক সাগরে ছুটিয়ে নিয়ে যেত।

এত দিন এভাবেই চলল। তবে স্তেফানো একদিন বুঝতে পারল, সে বুড়ো হয়ে গেছে। খুবই বুড়ো। সে এত ধনী হলো, তবু কেন শেষ পর্যন্ত সাগরের এই অভিশপ্ত জীবন ছাড়তে রাজি হয়নি, তার চারপাশের মানুষ কেউই এর ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। সে বুড়ো হয়ে গেল। আর অত্যন্ত অসুখী। কারণ ওই শত্রুর হাত থেকে পালাতে চেয়ে তার সারাটা জীবন সাগর থেকে সাগরে পাগলের মতো ছুটেই কিনা ফুরিয়ে গেল। কিন্তু ধনদৌলত আর সফলতায় ভরা সুখী একটা জীবনের চেয়ে তার কাছে বিনাশের প্রতি একটা চোরাটানই ছিল বেশি শক্তিশালী।

এক সন্ধ্যায় যেখানে তার জন্ম হয়েছিল, সেখানকার বন্দরেই ছিল তার জাহাজটা। সাগরের তীর থেকে একটু দূরে নোঙর করা। ঠিক তখনই স্তেফানো টের পেল, মরণ তার খুবই কাছাকাছি চলে এসেছে। তখন সে নিজের নাবিককে ডাকল, তার ওপর অগাধ আস্থা। স্তেফানো তাকে নির্দেশ দিল, ‘আমি যা করতে চলেছি, তাতে কোনো বাধা দেবে না।’ এই নাবিক তার প্রতি সম্মানবশত বাধা দেবে না বলে প্রতিজ্ঞা করল।

এই প্রতিশ্রুতি পেয়ে, স্তেফানো নাবিকের কাছে কলম্বারের গল্পটা বলে। জানায়, প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে একে জয় করার বৃথা চেষ্টা করেছে সে। তার কথা শুনে নাবিক ভীষণ ভয় পায়।

‘বিশ্বের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত এটা আমাকে পাহারা দিতে ছুটে গেছে,’ বলল স্তেফানো, ‘সবচেয়ে ভালো বন্ধুও এমন বিশ্বস্তভাবে আমাকে পাহারা দিতে পারত না। আমি এখন মরতে চলেছি। না, আমি এর সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করতে পারি না।’

এ কথা বলে স্তেফানো জাহাজের কর্মচারীদের কাছ থেকে বিদায় নিল। জাহাজ থেকে সাগরের বুকে একটা ছোট নৌকা ভাসানোর নির্দেশ দিল। ওই নৌকায় চড়ার পর তাদের কাছ থেকে একটা বর্শা চেয়ে নিল।

‘আমি এখন এর মুখোমুখি হব,’ চেঁচিয়ে ঘোষণা দেয় সে, ‘একে হতাশ করা ঠিক হবে না। তবে আমার সব শক্তি দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাব।’

পানিতে বৈঠার কয়েকটা এলোমেলো ঘা দিয়েই সে জাহাজের পাশ থেকে বেশ দূরে সরে গেল। দূরত্ব যত বাড়তে লাগল, ওই নাবিক ও অন্য মাঝিরা সবাই সাগরের শান্ত বুকে স্তেফানোকে ক্রমে তলিয়ে যেতে দেখল। দেখল রাতের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যেতে। আর আকাশে উদিত হলো চিকন ও বাঁকা এক চাঁদ।

তাকে খুব বেশি মেহনত করতে হয়নি। হঠাত্ই কলম্বারের ভয়ঙ্কর উঁচু নাকটি নৌকার পাশে ভেসে উঠল।

‘অবশেষে আমি তোমার মুখোমুখি,’ স্তেফানো চীত্কার করে বলল, ‘এখন শুধু তুমি আর আমি।’ এর পর সে শরীরের শেষ শক্তি দিয়ে ছুঁড়ে মারতে হার্পুনটা উঁচিয়ে ধরল।

‘উহ্’ ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল কলম্বারটা। অনুনয় করে বলল: ‘তোমার দেখা পেতে কত কত পথ আমাকে পার হতে হলো।’ অপেক্ষার কষ্টে বেদনায় বিষাদে আমিও ফুরিয়ে গেছি। কত কাল ধরে আমাকে সাঁতার কেটে চলতে বাধ্য করেছ তুমি। আর তুমি এখনো আমাকে পিঠ দেখাচ্ছ, পালিয়ে বেড়াচ্ছ। তুমি আসলে কিছুই বুঝতে পারনি।’

 ‘কী-হ?’ জিজ্ঞেস করল স্তেফানো। তখন তার হার্পুনটার তীক্ষ মাথাটা ঠিক কলম্বারের হূিপণ্ডের ওপর।

‘আমি তোমাকে গিলে খাওয়ার জন্য সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াইনি, যদিও তুমি তাই ভাবতে। সমুদ্রের দেবতা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন যেন এ কথাটি তোমাকে জানাই।’

এর পরই হাঙরটি আলো-ঝলমল একটা গোলাকার বস্তু বুড়ো ক্যাপ্টেনকে দেয়ার জন্য মুখ থেকে জিভ বের করল। স্তেফানো হাত বাড়িয়ে নিল সেটা। পরীক্ষা করল। এ আসলে বড় আকারের একটা মুক্তা, যা সচরাচর পাওয়া যায় না। আর সে এটাকে চিনতে পারল। এটা বিখ্যাত পারলা-ডেল-মারে— যার হাতেই থাকে এ মুক্তা তার জীবনে সুভাগ্য, ক্ষমতা, আর শান্তি বয়ে আনে। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে।

‘হায়! হায়!,’ হাহাকার করে উঠল বুড়ো ক্যাপ্টেন। না না করে তার মাথা হতাশায় ডানে-বামে ঘুরতে লাগল। ‘সবকিছু কী ভুলভাবেই না ঘটে। আমি শেষ পর্যন্ত নিজেকে না দুষে পারলাম না। আমি কিনা তোমার জীবনটা ধ্বংস করে দিলাম।’

‘বিদায়, হতভাগা,’ উত্তর দিল কলম্বার।

আর চিরকালের জন্য কালো জলে ডুবে গেল।

দুই মাস পর, অদৃশ্য স্রোতের টানে একটি ছোট নৌকা অপ্রত্যাশিতভাবে প্রবালপ্রাচীরের কাছে ভেসে আসে। অনেক জেলে একে দেখতে পায়। যারাই কাছে যায়, কৌতূহলী না হয়ে পারে না। নৌকায় তখনো বসে রয়েছে সূর্যের মতোই সাদা একটা কঙ্কাল: এর আঙুলের ছোট ছোট হাড়ের মাঝখানে একটা ছোট গোল পাথর, আঁকড়ে ধরা।

কলম্বার হলো একটা বিশাল আকারের মাছ, একে দেখলেই ভয় লাগে। এ জাতের মাছ খুব কমই চোখে পড়ে। বিভিন্ন সাগর ও সাগরপাড়ের বাসিন্দারা একে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকে। কোনো সাগরের জেলেরা একে কলমব্রে নামে ডাকে, আবার আরেক সাগরপাড়ের মানুষ একে ডাকে— কাহলোব্রা। আবার অন্য সাগরে কেউ কেউ একে কালঙ্গা, বা কালু-বালু, বা চালুংগ্রা বলেও ডাকে। তবে প্রকৃতি বিশেষজ্ঞরা একে আশ্চর্যজনকভাবে উপেক্ষা করে থাকেন। এমনকি কেউ কেউ মনে করেন, এর কোনো অস্তিত্ব নেই।