রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর দেখা হয় ১৯২৪ সালে। কবি যাচ্ছেন পেরুর স্বাধীনতা সংগ্রামের শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে। সঙ্গী লিওনার্ড এলমহার্স্টকে নিয়ে জাহাজে চড়েছেন। সমুদ্রপথে দীর্ঘযাত্রার ধকল সহ্য হলো না ৬৩ বছর বয়সী ওই শরীরে। অসুস্থ হয়ে পথিমধ্যে আর্জেন্টিনায় যাত্রাবিরতি নিতে বাধ্য হন বৃদ্ধ কবি। পরের গল্পটা সবার জানা। বুয়েন্স আয়ার্সের প্লাজা হোটেলে কবিকে দেখতে এলেন তার গুণমুগ্ধ পাঠিকা, যিনি কিনা নিজেও ছিলেন একজন সাড়া জাগানো লেখিকা; নারীবাদী, পত্রিকার সম্পাদক। কবির শারীরিক দুরবস্থা দেখে কাঠখোট্টা সে হোটেল থেকে তাকে রাজি করিয়ে নিয়ে গেলেন নিজের বাড়িতে। স্যান ইসিদ্রোর মিরালরিও থেকে ভিলা ওকাম্পো— নিজের তত্ত্বাবধানে রেখে দেখভাল করেছেন কবির।
দুই মাস তার আতিথ্যে ছিলেন কবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভিক্টোরিয়ার নাম দিয়েছিলেন বিজয়া। ওই সময় প্রায় ৩০টি কবিতা লেখেন রবীন্দ্রনাথ। পাশাপাশি তার চিত্রকর হয়ে ওঠার পেছনেও ভূমিকা রয়েছে ভিক্টোরিয়ার। এমনকি ১৯৩০ সালে প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের প্রথম চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর আয়োজনে অন্যতম উদ্যোগীর ভূমিকা পালন করেন ভিক্টোরিয়া।
বলা হয়, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্লেটোনিক প্রেমে জড়িয়েছিলেন ৩৪ বছর বয়সী আর্জেন্টিনার এই সাহিত্যিক। নানা ঘটনায় বিভিন্নভাবে চর্চিত ভিক্টোরিয়া-রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক। এবার আর্জেন্টিনার নির্মাতা পাবলো সেসার এ দুই সাহিত্যিকের ওপর নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র— ‘থিংকিং অব হিম’। এরই মধ্যে ১০০ মিনিট দৈর্ঘ্যের এ ছবির শুটিং সম্পন্ন হয়েছে। ছবিতে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকায় হাজির হচ্ছেন কলকাতার ভিক্টর ব্যানার্জি আর ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর ভূমিকায় রয়েছেন আর্জেন্টিনার অভিনেত্রী এলেনোরা ওয়েক্সলার। আরো রয়েছেন রাইমা সেন ও হেক্টর বোরদোনি। রবীন্দ্রনাথ, আর্জেন্টিনা, তাকে নিয়ে ছবি নির্মাণ, শিল্পী নির্বাচন আর শুটিংসহ নানা বিষয়ে কথা হয় পরিচালকের সঙ্গে, তারই উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে পত্রস্থ হলো।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রুহিনা ফেরদৌস
‘থিংকিং অব হিম’ নির্মাণের গল্পের শুরুটা কীভাবে?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আমার পরিচয় তার কিছু অনুবাদ কবিতা দিয়ে। বলতে পারেন আবেগভরা, ছন্দময় সেসব লেখা পড়ার পর আমি তার গুণমুগ্ধ পাঠকে পরিণত হই। এর পর গীতাঞ্জলি, দ্য গার্ডেনার পড়া। বছর নয় আগের কথা, ২০০৮ সালে আর্জেন্টিনায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত রঙ্গরাজ বিশ্বনাথের সঙ্গে পরিচয় হলে কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি আমাকে ১৯২৪ সালের কথা বলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর হঠাত্ সাক্ষাত্ এবং পরবর্তীতে তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরামর্শ দেন। কাজটি করতে আমি নিজেও ভীষণ উত্সাহী হই।
কাজটি নিশ্চয়ই সহজ ছিল না, বিশেষ করে ছবিটি যখন দুই মহাদেশের দুই বিখ্যাত সাহিত্যিকের ওপর। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ-ভিক্টোরিয়ার এক ধরনের প্রেমের গল্পও বেশ চর্চিত?
হ্যাঁ, সেজন্য আমাদের খুব খাটতে হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য জোগাড় করা, তা নিয়ে পরবর্তীতে গবেষণা করা, এভাবে নানা ধাপের মধ্য দিয়ে আমরা কাজটি করেছি। সিনেমার জন্য জুতসই গল্প লিখতে চিত্রনাট্যকার জেরোনিমো টুবেসের সঙ্গে কাজ শুরু করি আমি। বছর দুই পর আমরা চলচ্চিত্র নির্মাণের উপযোগী একটি চিত্রনাট্য লিখতে সমর্থ হই।
ছবিটি রবীন্দ্রনাথ-ভিক্টোরিয়ার বিভিন্ন সময়ের কথা যেমন বলবে, তেমনি গুরুত্ব পাবে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি, শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা— ভিন্ন ধরনের শিক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার বিষয়গুলো। এখানে আমি কিন্তু জানি না, ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ তার এ কাজগুলোকে কীভাবে দেখেছেন। আমি তাকে তার কাজগুলো দিয়ে যেভাবে চিনতে পারি তা হলো— রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অনন্য, অপ্রতিম ব্যক্তি। ভিন্ন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তিনি যে উদ্যোগটি নিয়েছিলেন, তা সর্বত্র প্রয়োগ করা সম্ভব হলে তা হতো মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি কল্যাণকর। একমাত্র উদারমনা ও উন্মুক্ত মনের অধিকারী হলেই জগেক এভাবে দেখা যায়।
বুয়েন্স আয়ার্স থেকে কলকাতার শান্তিনিকেতন— ছবির কাহিনী যেভাবে এগিয়েছে—
ছবিটা মূলত দুটি ভিন্ন সময়ের দুটি গল্প ঘিরে এগিয়ে যাবে। বর্তমানের গল্পে আমরা পরিচিত হই ফেলিক্স নামে ভূবিজ্ঞানের এক অধ্যাপকের সঙ্গে। জীবনে ব্যর্থ, অসফল মানুষটি একটি কিশোর সংশোধনাগারে শিক্ষকতা করেন। একদিন ক্লাসরুমে শান্তিনিকেতন নাম লেখা একটি বই পান তিনি। পড়তে শুরু করেন। জানতে পারেন বইটি সংশোধনাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া কোনো এক কিশোরের। বইটি পড়ে ও আকস্মিক সব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ফেলিক্স সব ছেড়েছুড়ে শান্তিনিকেতনের পথে যাত্রা করেন। শান্তিনিকেতনে এসে অধ্যাপক প্রকাশ ও কমলি নামে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার। পরিবর্তন আসে ফেলিক্সের রোজকার জীবনে। এদিকে অতীত পর্বে আমরা দেখি— পেরু যাওয়ার উদ্দেশে আর্জেন্টিনায় রবীন্দ্রনাথের যাত্রাবিরতি এবং ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে পরিচয়-পরবর্তী ঘটনাগুলো।
ছবিতে ভিক্টর ব্যানার্জি কাজ করলেও শুরুতে রবীন্দ্রনাথ চরিত্রে আপনার পছন্দ ছিল অমিতাভ বচ্চন। এর পর নাসিরুদ্দিন শাহের অন্তর্ভুক্তির কথাও শোনা গেছে। ছবিতে অভিনয় শিল্পীদের নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু বলবেন?
যেকোনো চলচ্চিত্রের নির্মাণকাজের শুরুতে বিভিন্ন চরিত্রের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বহুমাত্রিক যাচাই-বাছাই ও নিরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে। তাই রবীন্দ্রনাথের ভূমিকায় সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য অভিনেতা কে হতে পারেন, তা নিয়ে আমাকেও নানা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বলিউডের অনেক গুণী শিল্পীর সঙ্গে দেখা করা এবং কথা বলার পর আমরা ভিক্টর ব্যানার্জিকেই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মনে করেছি। এটি একটি যৌথ প্রযোজনার ছবি। এর নেপথ্যে রয়েছে ভারতের জনসনস-সুরাজ ফিল্মস ইন্টারন্যাশনাল এবং আর্জেন্টিনাভিত্তিক আমার কোম্পানি সেসার প্রডাকশন। শিল্পী নির্বাচনে সহ-প্রযোজক সুরাজ কুমারের সহযোগিতা পেয়েছি আমি।
কলকাতার গুণী শিল্পীদের একজন ভিক্টর ব্যানার্জি, এদিকে বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রাইমা সেন। ছবিতে তাদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে জানতে চাই...
মনে আছে, দেরাদুনের মসৌরিতে আমি যখন ভিক্টরের বাড়িতে পৌঁছি, ভীষণ মুগ্ধ হয়েছিলাম সবকিছুতে। তার পড়ুয়া স্বভাব, চিন্তার গভীরতা, পাহাড়ে ঘেরা পরিবেশে ধ্যানীর মতো জীবনযাপন— আমার হূদয় ছুঁয়ে যায়। আমি উপলব্ধি করি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরিত্রের জন্য তিনিই আদর্শ।
রাইমা সম্পর্কে আমাকে বলেছিলেন সহ-প্রযোজক সুরাজ কুমার। এর পর কলকাতায় বসেই ওর ইন্টারভিউ নিয়েছি। রাইমার সৌন্দর্যকে কি কেউ উপেক্ষা করার স্পর্ধা রাখে! তাছাড়া ক্যামেরার সামনে ওর দীপ্তি ছড়ানো উপস্থিতি একজন পরিচালকের কাছে অপ্রত্যাশিত উপহারের মতো।
এ পর্যন্ত যতটুকু তথ্য জানা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে ছবিটা সাদা-কালো? অতীতকে ধরার প্রয়াসেই কি এমন প্রচেষ্টা?
না না, গোটা ছবিটা কিন্তু সাদা-কালো নয়। দুটো সময়কে বোঝাতে আমরা দুটো কালার ব্যবহার করেছি। ছবিতে ফেলিক্সের অংশটা রঙিন দেখা যাবে, আর রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়ার অংশটা সাদা-কালো। দুটি অংশের শুটিংয়েই আমরা ৩৫ মিলিমিটার ক্যামেরা ব্যবহার করেছি। যাতে ছবির ভিজুয়াল মানের পাশাপাশি দূর ভবিষ্যতে ছবির নেগেটিভ নিয়ে আমাকে কোনো চিন্তায় পড়তে না হয়। কারণ ৩৫ মিলিমিটার ফিল্মের নেগেটিভ এর স্বভাব অনুযায়ী পরবর্তী ১২০ বছরের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। আমাকে যদি প্রশ্ন করেন,
সাদা-কালো কেন বেছে নিলাম, তাহলে বলব প্রায় ১০০ বছর আগের কোনো গল্পকে দৃশ্যবন্দি করতে এটি আমার কাছে যথাযথ মনে হয়েছে। ছবিটির ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফির দায়িত্ব পালন করেছেন কার্লোস এসমান। এখানে সেবাস্তিয়ান সাবাসের কথা বলতে চাই। আর্ট টিমের কাজ করতে গিয়ে তিনি নিখুঁত ঐতিহাসিক পুনর্গঠকের কাজ করেছেন ভিক্টরকে রবীন্দ্রনাথের চরিত্রে তুলে ধরার গুরুতর দায়িত্ব নিয়ে। উলহাস আদনেকারসহ থিংকি অব হিম টিমের সবাই আমাকে শত বছর আগের দিনগুলোয় ফিরে যেতে সহযোগিতা করেছে। আর ফেলিক্সের অংশটা রঙিন, সেখানে আপনি বোলপুর, শান্তিনিকেতনের সৌন্দর্যকে পুরোটাই উপভোগ করতে পারবেন।
ছবিটির নামকরণ নিয়ে জানতে চাই। থিংকিং অব হিম— নামটি বেছে নেয়ার পেছনে নিশ্চয় কোনো ঘটনা অনুঘটক হয়ে কাজ করেছে?
১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুসংবাদটি ভিক্টোরিয়া শুনতে পান তার গাড়িতে বাজতে থাকা রেডিওর মাধ্যমে, বুয়েন্স আয়ার্স থেকে মার দেল প্লাতা যাচ্ছিলেন তিনি। মৃত্যুসংবাদটি শোনার পর রবীন্দ্রনাথের পরিবারের কাছে ভিক্টোরিয়া একটি টেলিগ্রাম পাঠান, সেখানে তিনি লিখেছিলেন— ‘থিংকিং অব হিম। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো।’
তাহলে প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ কিংবা লেখক রবীন্দ্রনাথ না হয়ে থিংকিং অব হিম ছবিতে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারক হিসেবে কেন বেশি গুরুত্ব দেয়া?
ছবিতে রবীন্দ্রনাথের তিনটি গুণাবলির পাশাপাশি আমরা তার চিত্রকর সত্তাকেও তুলে ধরেছি। ১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথের আঁকা চিত্রকর্ম নিয়ে প্যারিসের গ্যালারি পিগালিতে যে প্রদর্শনীটি হয়েছিল, ছবিতে সে অংশটি রেখেছি আমরা। ও বলে রাখি, এ ছবিতে ভিক্টোরিয়ার চরিত্রে চমৎকার অভিনয় করেছেন আর্জেন্টাইন অভিনেত্রী এলেনোরা ওয়েক্সলার। তিনি বেশ নৈপুণ্যের সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ভিক্টোরিয়ার অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।
তবে এ ছবিতে আমি মানুষের কাছে শিক্ষা ব্যবস্থার জরুরি পরিবর্তনের প্রতিফলন তুলে ধরতে আগ্রহী। মানুষ তার নিজের মন ও অন্যের ভাবনা দ্বারা অনেক বেশি ভীত-সন্ত্রস্ত। দারুণ এক মহাজগতের বাসিন্দা আমরা, আর এই মহাজাগতিক ভাষা বুঝতে হলে আমাদের মনকে উন্মুক্ত করে পরিচালিত হতে হবে নিজেদের প্রজ্ঞা আর উপলব্ধি দিয়ে। দুঃস্বপ্নতাড়িত না হয়ে আমি এ জগেক নিজের মতো করে দেখতে চাই। রবীন্দ্রনাথ সে পথের কথা বলেছেন। হূদয় ও কল্পনাকে উন্মুক্ত করার কথা বলেছেন।
ছবিটি কবে নাগাদ মুক্তি পাচ্ছে?
এখনো নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক হয়নি। তবে আমরা এ বছরই ছবিটিকে প্রেক্ষাগৃহে নিয়ে আসব।





