(চল্লিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালে লেখকের প্রকাশিত প্রবন্ধ)

 

বুদ্ধিজীবী কে এবং তার ভূমিকা

বছরখানেক আগের কথা। ‘পারাপার’ নামে একটি সাহিত্যপত্রের সম্পাদক, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগের ছাত্র, নাছোড়বান্দা হয়ে আমার কাছে একটি লেখা চেয়েছিলেন। আমি আমার অক্ষমতার ওপর জোর দেয়ায় তিনি আমার কাজ সহজ করার জন্য বলেছিলেন, ‘আপনাকে পুরো কোনো প্রবন্ধ লিখতে হবে না। আমাদের কয়েকটি লিখিত প্রশ্নের লিখিত জবাব দিলেই সেটি আমরা সাক্ষাত্কার হিসাবে ছাপাবো। এ রকমে আমরা ইতিপূর্বেও আমাদের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন সাহিত্যিকের সাক্ষাত্কার ছেপেছি।’ মোট কথা, এই তরুণ সম্পাদকের তাগিদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যেমন, তেমনি তার প্রচেষ্টাকে সাহায্য করার উদ্দেশ্য নিয়ে তার পেশ করা কয়েকটি প্রশ্নের আমি জবাব দিয়েছিলাম। কিন্তু সে জবাবের পরে বহুদিন গত হয়েছে। তরুণ এই সম্পাদকের সঙ্গে আর আমার সাক্ষাত্ ঘটেনি এবং তার পত্রিকার প্রকাশিত কোনো সংখ্যাও আমি দেখিনি। এমন হতে পারে, আমার জবাব ক’টি তার পছন্দ হয়নি। তাই তা মুদ্রিত এবং প্রকাশিত হয়নি। আর অমনোনীত লেখার কথা কোন সম্পাদক বা খাতির করে লেখককে জানানোর কষ্ট স্বীকার করেন? আমার জবাব ক’টি তেমন কিছু ছিল না। তা প্রকাশ করার তেমন কোনো যুক্তি আছে বলে সম্পাদককে দেয়ার সময়েও আমি মনে করিনি। তবে সেই নবীন সম্পাদকের তৈরি করা প্রশ্ন ক’টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলেন আমার কাছে আমাদের সমাজে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা সম্পর্কে। শুধু প্রশ্ন ক’টি তুলে দেয়া সঙ্গত হবে না মনে করে আমার জবাবসহ তার প্রশ্ন ক’টিকে এখানে তুলে দিলাম পাঠকদের কাছে এই অনুরোধ জানিয়ে, আমার জবাবকে খুব গুরুত্ব সহকারে না নিয়ে আমাদের এই তরুণ সম্পাদকের উত্থাপিত প্রশ্ন ক’টি সম্পর্কে যেন তারা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করেন।

আপনার মতে ‘বুদ্ধিজীবী’ কথাটির অর্থ কী? বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ কাদের নিয়ে গঠিত? এ প্রশ্নটির জবাব আমিও খোঁজ করছি। বাংলাদেশের ছাত্র, মাস্টার, সাংবাদিক, লেখক, কবি-গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার এদের মধ্যে শব্দটি বিশেষভাবে ব্যবহূত। কেবল যে সাধারণ শব্দ হিসেবে ব্যবহূত তাই নয়। কিছুটা আবেগ সহকারে ব্যবহূত। ‘বুদ্ধিজীবীর বিবেক কি বলে’, ‘বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব’, ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী’ ‘বুদ্ধিজীবীর কর্তব্য’— সংকটে বুদ্ধিজীবীরা কোন পক্ষ নেবেন, আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সংকটাকীর্ণ বাংলাদেশে এরূপ শব্দ বা বাক্যের সঙ্গে আমরা বিশেষভাবে পরিচিত। এরূপ ব্যবহারে ‘বুদ্ধিজীবী’ কথাটির একটি বিশেষ আবেগমণ্ডিত অর্থ হয়তো বাংলাদেশের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে গেছে। আর সে অর্থ হয়তো এই যে, ‘বুদ্ধিজীবী’ বলে একদল লোক আছে যারা সবাই সত্, মহত্ বিবেকমান এবং সংগ্রামী। যারা এরূপ লোককে লক্ষ করে এসব গুণের আশা করে কথা বলেন, তারাই আবার এদের পছন্দ না হলে কিংবা এদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ভূমিকা না পেলে ‘বুদ্ধিজীবীর বিশ্বাসঘাতকতা’ বুদ্ধিজীবীর স্বীয় কর্তব্য পালন না করা’— প্রভৃতি অভিযোগেও উদ্দিষ্ট ‘বুদ্ধিজীবীকে’ অভিযুক্ত করেন।

আমার কাছে বহুদিন ধরে ব্যাপারটা ধোঁয়াটে বলে বোধ হয়েছে। উপরে যেসব প্রচলিত শব্দ বা বাক্যাংশ ব্যবহারের উল্লেখ করা হয়েছে, চিন্তা করে দেখলে সেসব শব্দ মতামত বা ইচ্ছা-অনিচ্ছা নির্বিশেষে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কিছুই বোঝায় না।

কোনো শব্দই অবশ্য অনড় নয়। শব্দ অর্থের বাহক। শব্দের অর্থ পরিবর্তিত হয়, পুরনো শব্দ নতুন অর্থ সংগ্রহ করে। কিন্তু সেটা একটা দীর্ঘকালের প্রক্রিয়ার কথা। সে প্রক্রিয়ার একটি উপাদান আবার এও যে, কোনো বিশেষ সময়ে কোনো শব্দের ব্যবহার ও প্রয়োগকে নির্দিষ্ট অর্থবহ করার জন্য আমরা প্রচলিত অভিধান ও বিশ্বকোষগুলোর ওপর নির্ভর করি। অভিধানই আমাদের বলে, শব্দটি কোন অর্থ ধারণ করে। সেদিক থেকে দেখা যাক ‘বুদ্ধিজীবী’ কথাটির আভিধানিক অর্থ কী?

‘বুদ্ধি’ কথাটির নির্দিষ্ট অর্থ, মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা, অনুধাবন করা বা বোঝার ক্ষমতা। ইংরেজিতে ইন্টেলেক্ট বা ইন্টেলিজেন্সের অর্থ হচ্ছে ‘ফ্যাকালটি অব নোয়িং অ্যান্ড রিজনিং, আন্ডারস্ট্যাডিং’ এটি একটি নির্দিষ্ট অর্থ। এক্ষেত্রে কোনো মতান্তর নেই এবং মানুষমাত্রেরই এই বুদ্ধি বা ইন্টেলেক্ট আছে। তার পরিমাণ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে কম কিংবা বেশি হতে পারে।

‘—জীবী’ শব্দাংশকে আমরা সাধারণত অন্য একটি শব্দ বা শব্দাংশের পরে বসিয়ে একটি কথা তৈরি করি। সেদিক থেকে ‘জীবী বলতে’ ‘জীবিত বা জীবনযুক্ত বা জীবন ধারণের চেষ্টা’ যদি বোঝানো হয় তাহলে কোনো কর্ম বা পেশামূলক শব্দের শেষে ‘জীবী’ যোগ করে আমরা সেই কর্মদ্বারা জীবন ধারণের চেষ্টা বা অবস্থানে বোঝাতে পারি। এভাবে ‘কৃষিজীবী’, ‘শ্রমজীবী’ (দৈহিক শ্রম বিক্রি করে জীবন ধারণকারী) ‘ব্যবহারজীবী’, ‘ব্যবসাজীবী’ প্রভৃতি কথাগুলোর ব্যবহার বোধগম্য। এর দ্বারা এক একটি পেশাকে বোঝানো হয় এবং এরূপ ব্যবহারে আমাদের চিন্তার পারস্পরিক আদান-প্রদানে কোনো অসুবিধা বা দ্ব্যর্থকতার সৃষ্টি হয় না।

কিন্তু ‘ব্যবহারজীবী’, ‘আইনজীবী’ প্রভৃতি কথা বলতে বলতে আমরা, বিশেষ করে বাঙালিরা, ‘বুদ্ধিজীবী’ কথাটাও ব্যবহার এবং প্রচলনের চেষ্টা শুরু করেছি। এবং এ চেষ্টার বেশকিছুটা বয়সও হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও শব্দটি কি সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বোঝাচ্ছে?

শব্দের অর্থ হিসেবে ‘বুদ্ধিজীবী’ বলতে বোঝাবে বিবেকবান বা সত্যবান ব্যক্তি নয়, বোঝাবে বুদ্ধি দ্ধারা যে জীবিকা অর্জন করে বা জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করে তাকে। একটি বাংলা অভিধানে তাই ‘বুদ্ধিজীবী’র সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ‘বুদ্ধিজীবী’ মানে ‘বুদ্ধি বলে জীবিকা অর্জন করে বা স্বীয় কার্য সাধন করে এমন।’ কিন্তু সেদিক থেকে আমার প্রশ্ন, মানুষ মাত্রই তো বুদ্ধি দ্বারা জীবিকা অর্জন করে বা অর্জন করার চেষ্টা করে। কেননা জমির চাষ যা যন্ত্র চালনা এবং হিসাবের খাতা লিখন থেকে কবিতা রচনা সর্বক্ষেত্রেই মানুষের বুদ্ধির প্রয়োজন হয়। কাজেই কেবল বুদ্ধি দ্বারা কেউ জীবন ধারণ করে এবং এমন কোনো কর্ম বা পেশা আছে, যাতে বুদ্ধির আবশ্যক হয় না, এমন কথা বলা যায় না। সে দিক থেকে ‘বুদ্ধিজীবী’ কথাটি কাল্পনিক। ‘বুদ্ধিজীবী’র কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই।

কার্ল মার্ক্স সমাজবদ্ধ মানুষের যে অর্থনৈতিক এবং সামগ্রিক বিশ্লেষণ দিয়েছেন তাতে তিনি এ অভিমতটি উপস্থিত করেছেন যে, মানুষ মাত্রই তার জীবন ধারণের জন্য পরিবেশ বা প্রকৃতির সঙ্গে আর্থিক বা জীবনধারণের কর্মকাণ্ডে জড়িত। আর্থিক কর্মকাণ্ডকে শ্রেণীবদ্ধ করা যায় এবং সে হিসাবে যে কোনো মানুষ তার সময়ে ক্রিয়াশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো না কোনো শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এই ভিত্তিতে আমরা আমাদের বর্তমান সমাজের মানুষের কাউকে কৃষক, কাউকে জোতদার, কাউকে শ্রমিক, কাউকে পুঁজিবাদ বা পুঁজির মালিক হিসেবে, এমনকি বিত্তের পরিমাপে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত বলে অভিহিত করি। এরূপ অভিধার প্রধান লক্ষ্য এই যে, কোনো মানুষই কোনো আর্থিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে নয়। এবং সবাই মোটামুটি আপন আপন আর্থিক অবস্থানের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত্ দ্বারা নির্দিষ্ট হয়। এদিক থেকে ‘বুদ্ধিজীবী’ বললে বুদ্ধিকে একটা আর্থিক কর্ম বলে চিহ্নিত করতে হয় এবং ‘বুদ্ধিজীবী’ দ্বারা একটি বিশেষ আর্থিক শ্রেণী বা অবস্থার লোককে নির্দিষ্ট করতে হয়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে ‘বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে বিশেষ কোনো পেশার সাক্ষাত্ কি আমরা পাই?

আমাদের দেশে অবশ্য স্বেচ্ছামূলক এবং ব্যক্তিগত ইচ্ছার ভিত্তিতে কখনো কখনো ‘বুদ্ধিজীবী’ বলতে বিত্তের দিক থেকে আমরা মধ্যম শ্রেণীর শিক্ষক, অধ্যাপক ও সাংবাদিকদের বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু বুদ্ধিজীবীর মধ্যে লেখক হিসেবেও কাউকে নির্দিষ্ট করা, অন্তত আমাদের দেশে চলে না। কারণ কেবল কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প বা উপন্যাস লিখে এবং তাও অন্যের নিযুক্ত কোনো কর্মচারী না হয়ে, জীবনধারণ করার মতো শ্রেণী বা সম্প্রদায় এখনো আমাদের দেশে তৈরি হয়নি। কাজেই বুদ্ধিজীবী বলতে যদি আমরা কেরানি, শিক্ষক কিংবা সাংবাদিকদের ধরি তাহলেও ব্যবহার অপ্রয়োজনীয় ও নিরর্থক। কারণ কেরানিকে কেরানি বলাই শ্রেয়, শিক্ষককে শিক্ষক এবং সাংবাদিককে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী বলার চেয়ে। কারণ কেরানি বলতে একটা পেশাকে বোঝায় এবং যিনি কেরানি তিনি তার জীবনের চিন্তাভাবনা আন্দোলনে তার সেই অবস্থানের স্বার্থ দ্বারাই চালিত হবেন। এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষক ও সাংবাদিকের ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য।

‘বুদ্ধিবাদ জ্ঞানের ক্ষেত্রে বুদ্ধির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু মানুষের বুদ্ধি তার দেহ এবং বাস্তব পরিবেশ-বিচ্ছিন্ন কোনো স্বাধীন শক্তি নয়। বাস্তব পরিবেশের সঙ্গে ব্যক্তির প্রত্যক্ষ সম্পর্কের মাধ্যমে ব্যক্তি মানসিক বা বুদ্ধিগত ক্ষমতার জন্ম হয়েছে এবং তার বিকাশ ঘটেছে। বুদ্ধির এই আপেক্ষিক বিচার বা তার দ্বন্দ্বমূলক বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃত সর্বযুগে সমান নয়। প্রাচীনকালে মানুষের অসহায় অবস্থায় বুদ্ধি এবং বাস্তব অবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক সহজবোধ্য ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে মানুষের বুদ্ধির যত বিকাশ ঘটেছে, তত অনেকের কাছে বুদ্ধি বাস্তব অবস্থা, এমনকি মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বা মস্তিষ্ক থেকে বিচ্ছিন্ন বিদেহী এবং বিমূর্ত এক শক্তিরূপে প্রতিভাত হয়েছে।... একদিকে বিজ্ঞানের অগ্রগতি অপরদিকে মানুষের সমাজে ধনী ও নির্ধনের আধুনিক শ্রেণী সংগ্রাম বৃদ্ধি এবং বাস্তবের পারস্পরিক আন্তঃসম্পর্ককে সাধারণভাবে অনস্বীকার্য করে তুললেও বর্তমান কালেও মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বুদ্ধির স্বাধীন শক্তি হিসাবে অত্যধিক গুরুত্বদানের একটি প্রবণতা দেখা যায়। বুদ্ধিকে মানুষের সমাজ ও ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করার এই প্রবণতাকে বুদ্ধিবাদ বলা চলে।’ (দর্শন কোষ, পৃষ্ঠা-২৩৬)

এই আলোচনার ভিত্তিতে যে প্রশ্নটি নিয়ে আমরা কথা শুরু করেছিলাম, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ কাদের নিয়ে গঠিত, তার জবাবে বলব: বাংলাদেশে শ্রমজীবী আছে, ব্যবহারজীবী আছে, শিক্ষকতাজীবী আছে, কিন্তু ‘বুদ্ধিজীবী’ বলে কেউ নেই। বুদ্ধিমান আছে, বুদ্ধিজীবী নেই এবং এদিক থেকে শ্রমিক-কৃষক থেকে শুরু করে সাহিত্যিক পর্যন্ত সবাই বুদ্ধিমান।

তবে এ কথা ঠিক, শুধু বাংলাদেশ নয়, ধনবাদী সমাজে সর্বত্র এত দিন শ্রমের ক্ষেত্রেও দৈহিক বা কায়িক শ্রম এবং মানসিক শ্রম বলে একটি বিভাগমূলক শব্দ প্রচলিত ছিল। এরও প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শ্রমজীবী মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা। ভাবটা এরূপ, যেন কায়িক শ্রম অন্ত্যজ এবং মানসিক শ্রম অভিজাত। এজন্য মানসিক শ্রমের মূল্য বেশি এবং কায়িক শ্রমের কম; কিন্তু সে পার্থক্যও দেশ ও সমাজ যত বেশি বিজ্ঞানভিত্তিক হচ্ছে, যত বেশি আধুনিক বৈজ্ঞানিক কারিগরি কৌশল দ্বারা জীবনের প্রতিটি কাজ সম্পাদিত ও পরিচালিত হচ্ছে তত এই কায়িক শ্রম আর মানসিক শ্রমের পার্থক্যও হ্রাস পাচ্ছে। এখন কোনো শ্রমকেই আর কেবল কায়িক বলা চলে না এবং কোনো শ্রমও নেই, যার জন্য কায়িক কোনো শ্রমের আদৌ আর আবশ্যক হয় না। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি শিক্ষাকে ক্রমাধিক পরিমাণে সর্বজনীন করার মাধ্যমে কায়িক শ্রম ও মানসিক শ্রমের বৈষম্য দূর করে এমন অবস্থা সৃষ্টি করা, যেখানে শ্রমের ক্ষেত্রে উঁচু-নিচু অর্থাত্ কোনটি স্থ্থূল, দৈহিক ও হেয় এবং কোনটি সূক্ষ্ম মানসিক ও অভিজাত— এরূপ কোনো পার্থক্য থাকবে না। সমাজতান্ত্রিক সমাজে তাই সবাই যথার্থরূপে বুদ্ধিজীবী বলে বিবেচিত হবে, বিশেষ কেউ নয়।

বাংলাদেশের শ্রমজীবীদের সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্ক কি স্বাভাবিক? যদি স্বাভাবিক না হয় তাহলে এই সম্পর্ক কীভাবে স্বাভাবিক করা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?

আমাদের সমাজ ব্যবস্থার সামগ্রিক রূপটি অস্বাভাবিক এবং তার মধ্যে শ্রমজীবীদের সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কও অস্বাভাবিক। বুদ্ধিজীবী কথাটিকে আমরা অর্থাত্ লেখাপড়া জানা ডিগ্রিধারী মধ্য এবং উচ্চপর্যায়ের অফিসার, অধ্যাপক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক— আমরা সবাই সম্মানজনক শ্লাঘামূলক একটি পদবি বা ভূষণ বলে গণ্য করি। তাই কেউ যদি আমাকে ‘বুদ্ধিজীবী’ বলে অভিহিত করে, তবে আমার মতো একজন শিক্ষক বেশ গর্বিত বোধ করে। শ্রমজীবী মানুষ থেকে এই পার্থক্য ও দূরত্বকেই সে তার শিক্ষা আর জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে সচেতন ও অচেতনভাবে অর্জন করে। তাই আমাদের দেশে যে ব্যক্তি যত উঁচু পর্যায়ের শিক্ষিত, সে ব্যক্তি তত বেশি শ্রমিক ও কৃষক— অর্থাত্ যারা শ্রমের বিনিময়ে জীবন ধারণ করে, তাদের কাছ থেকে নিজেকে অধিক দূরত্বে অবস্থিত বলে গণ্য করে। আমরা শিক্ষা অর্জন করি শ্রমকে সব সৃষ্টির মূল হিসেবে বিবেচনা করার জন্য নয়, সব শ্রমকে সম্মান করার জন্য নয়। আমরা শিক্ষালাভ করি, যে শ্রমে মাথার ঘাম পায়ে পড়ে দেহকে স্বেদসিক্ত করে তাকে ঘৃণ্য মনে করতে! তাই শিক্ষার শুরুতে আমরা কেউ যদি বা মাটির কাছাকাছি থাকি, কেউ যদি হালের লাঙল হাতে সবল পেশির কৃষকের সন্তান হই, তবে যত বেশি প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক এবং মাধ্যমিক থেকে কলেজ আর কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হই, তত বেশি আমার কৃষক পিতাকে অসম্মানীয় মনে করতে থাকি। যত বেশি শিক্ষিত হই, তত বেশি হাতের শক্তিতে কাজ করা এবং পায়ের শক্তিতে হাঁটাকে আমরা অস্বাভাবিক বলে গণ্য করতে থাকি। এ কারণেই এক পুরুষ আগের কৃষকের যে সন্তান লেখাপড়া শিখে আজ দেশের শাসক শ্রেণীতে ‘উন্নীত’ হয়েছে সে যদি এক মাইল পথ হেঁটে গ্রামগঞ্জে সেই কৃষকের সঙ্গে মোলাকাতে যায়, তবে সেটি আধুনিক বিশ্বের অত্যাশ্চর্য এক ঘটনা হিসেবে সংবাদপত্রে সচিত্র সংবাদ হয়ে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়, ‘প্রেসিডেন্ট বা মন্ত্রী সাহেব আজ এক মাইল পথ পদব্রজে অতিক্রম করেছেন!’ শ্রম এবং শ্রমজীবী মানুষকে এমনি হীনতার চোখে দেখাই হচ্ছে আমাদের সমাজের বুদ্ধিজীবীদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য— সে বুদ্ধিজীবী আমি, শাসক কিংবা অ-শাসক যাই হই না কেন।

সমাজকে স্বাভাবিক না করে শ্রমজীবীর শ্রমের শোষণে বুদ্ধিজীবী তথা অন্য সব পরগাছার যেখানে প্রতিপালন, সেখানে সমাজ রূপান্তর ব্যতীত মানুষে মানুষে সম্পর্কের স্বাভাবিকতা আশা করা যায় না। তবু এই সমাজের যে শিক্ষিত ব্যক্তি বিবেকবান তাকে বর্তমান সমাজের অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং নতুন সঙ্গতিপূর্ণ সমাজের এই মূল প্রত্যয়ে প্রত্যয়ী হতে হবে যে, ‘বুদ্ধিজীবী’ বলে ভিন্নতর কোনো শ্রেণী নেই। সবাই শ্রমজীবী এবং শ্রমই হচ্ছে সৃষ্টির মূল। শ্রমজীবীতে শ্রমজীবীতে বিভেদ ও পার্থক্য সৃষ্টি করার বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার স্থূল-সূক্ষ্ম নানা প্রচেষ্টা ও প্রয়াসের মূল উদ্ঘাটনের সচেতন চেষ্টা এবং শ্রমজীবী বা মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমেই এমন সচেতন ‘শিক্ষিত’ ব্যক্তিকে বুদ্ধিজীবীর কৃত্রিম ব্যবধানকে অতিক্রম করে শ্রমজীবী মানুষের নিকটবর্তী হতে হবে। এটিও একটি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন, সংগ্রামী প্রক্রিয়া। এর সচেতন পরিচর্যার মাধ্যমেই সমাজ রূপান্তরের প্রবহমান ধারায় বেগ সঞ্চারিত হবে এবং এর পরিচর্যাতেই শ্রমজীবীর সঙ্গে রূপান্তরের প্রবহমান ধারায় তথাকথিত ‘বুদ্ধিজীবী’র সম্পর্কের অস্বাভাবিকতা বিদূরিত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।

: বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের সাধারণ প্রবণতা কী? এক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রম কি আপনি লক্ষ করেছেন? যদি লক্ষ করে থাকেন, তাহলে তা কী?

: ‘বুদ্ধিজীবী’ বলতে যদি আমরা মধ্যবিত্ত কেরানি-কর্মচারী-শিক্ষক-সাংবাদিককে বুঝি তাহলে এদের সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে দোদুল্যমানতা। এই অংশের একজন হিসেবে বলতে পারি, আমরা একদিকে যেমন আমাদের আর্থিক অবস্থার নাজুকতা এবং লেখাপড়াগত জ্ঞান দ্বারা এই সমাজ ব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতা কিছুটা বুঝতে পারি, তেমনি যেহেতু আমরা এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থারই আনুষঙ্গিক উপকরণ, সে কারণে এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনকে আমরা কল্পনা করতে পারি না। তাই সমাজের রূপান্তরের কথা মুখে বললেও আমাদের সমগ্র সত্তা দিয়ে আমরা তার কামনা করি না এবং শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে শর্তহীনভাবে নিজেদের ভাগ্যকে জড়িত করতে পারি না। এই সমাজের আমরাও ব্যক্তিগতভাবে সুবিধাজনক থেকে অধিকতর সুবিধাজনক অবস্থায় উন্নীত হতে চাই। আবার এই ক্ষয়গ্রস্ত সমাজের সামগ্রিক ক্ষয়ের গতিতে নিজেদের ভবিষ্যেক অনিশ্চিত দেখে আতঙ্কিত হই। এই দোদুল্যমানতার ব্যতিক্রমী চরিত্র আপেক্ষিকভাবে শান্ত বা সমাজের কম সংকটজনক অবস্থায় বিরল। কিন্তু সমাজের সংকট যখন ক্রান্তিকালে উপস্থিত হয়, শ্রমজীবী জনতা যখন কাতারে কাতারে সংগ্রামের ময়দানে হাজির হয় তাদের অমিত তেজে দোদুল্যমান মধ্যবিত্ত আমরাও উজ্জীবিত হই। অন্য সময়ে যে সিদ্ধান্ত বা আত্মত্যাগের যে দৃষ্টান্ত আমরা স্থাপন করতে পারি না, এই ক্রান্তিকালে, অবস্থার সামগ্রিক কারণে সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়। তারই দৃষ্টান্ত হিসেবে ’৫২ সালের ও ’৭১ সালের মধ্যবিত্ত ছাত্র-শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিত্সকদের আত্মদানের কাহিনী আমাদের উদ্দীপিত করে।

: অনেকের মতে বুদ্ধিজীবী সমাজের ভূমিকার ওপরই বাংলাদেশের সামাজিক উত্থান-পতন নির্ভরশীল। এ সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

: তথাকথিত ‘বুদ্ধিজীবী’র ওপর কিংবা মধ্যবিত্ত শিক্ষিতের ওপর নয়, বাংলাদেশের সামাজিক রূপান্তর নির্ভর করে শ্রমজীবী অর্থাত্ কলকারখানায় এবং ক্ষেতখামারে কর্মরত শ্রমজীবী শ্রেণীর আর্থিক ও মানসিক বিকাশের ওপর। শ্রমজীবী মানুষেরা যত অধিক পরিমাণে শ্রমজীবী চরিত্র অর্জন করবে, যত অধিক সে সংগঠিত এবং নিজেদের অনিবার্য ভূমিকা ও শক্তি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে তত অধিক বাংলাদেশের সামাজিক রূপান্তর সংঘটিত হতে থাকবে। শিক্ষিত, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত ছাত্র, শিক্ষক, কেরানি, কর্মচারী, সাংবাদিক, সাহিত্যিকদের মধ্যকার অগ্রগামী অংশের কর্তব্য হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষেরই অর্থের বিনিময়ে আহরিত তাদের জাতীয়, আন্তর্জাতীয় তথ্য, তত্ত্ব এবং ইতিহাসের বিকাশ ও গতির জ্ঞান দ্বারা সমাজের ভবিষ্যেক অবলোকন করা, মানুষের ভবিষ্যতে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং সংগ্রামে, সংগঠনে, আলোচনায়, ভাষায়, সাহিত্যে সংগ্রামী মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানো এবং সংগ্রামী মানুষের তেজ ও চেতনা দ্বারা যেমন নিজেদের বিশ্বাস ও চেতনাকে দৃঢ়তর করা, তেমনি নিজেদের জ্ঞান দ্বারা সংগ্রামী শ্রমজীবীর চেতনাকেও উন্নীত করার চেষ্টা করা। ‘বুদ্ধিজীবীর’ ওপর সমাজের উত্থান-পতন নির্ভর করে, মধ্যবিত্ত ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী-সাংবাদিক-সাহিত্যিককে এই প্রবঞ্চনামূলক আত্মম্ভরিতা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে হবে।

: বাংলাদশের বুদ্ধিজীবী সমাজের ভেতরকার বিভিন্ন বিরোধ এবং তার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজের অভ্যন্তরে কোনো আদর্শগত বিরোধ আপনি লক্ষ করছেন কি? লক্ষ করে থাকলে তার বৈশিষ্ট্য কী?

: বাংলাদেশের অন্যতম সমাজ অর্থাত্ মুসলমান সমাজের ‘বুদ্ধিজীবী’ তথা মধ্যবিত্ত নিজের অস্তিত্বের জন্ম এবং বিকাশকে সাধারণত ১৯৪৭ সাল থেকে গণ্য করে থাকে। এদের সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে এর অধিক পূর্বে না যাওয়া। এটা এদের সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা এবং এর ওপর সাম্প্রদায়িক আদর্শগত তত্ত্বের প্রভাবের চিহ্ন। কিন্তু এই সীমাবদ্ধ পর্যায়েও বাংলাদেশের মুসলমান সমাজের মধ্যে শ্রেণীবিন্যাসের বেশ পরিমাণে রূপান্তর ঘটেছে। ১৯৪৭ সালে মুসলমান সমাজে যে পুঁজিভিত্তিক শ্রেণী ছিল না, আজ ঐতিহাসিক নানা কারণে তার উদ্ভব ঘটেছে। এর চরিত্রগত দুর্বলতা এবং বৈশিষ্ট্য অবশ্য বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ১৯৪৭ সালে মুসলমান মধ্যবিত্ত সংখ্যায়, শক্তিতে ও চরিত্রে যা ছিল এই পর্যায়ের মধ্য দিয়ে তারও পরিবর্তন ঘটেছে। ক্ষেতের কৃষকের সঙ্গে অর্থাত্ জমির সঙ্গে এই মধ্যবিত্তের যোগ ১৯৪৭-এর সময়ে যত ঘনিষ্ঠ ছিল, সে যোগ আজ তত ঘনিষ্ঠ নেই। ’৪৭-এর মধ্যবিত্তের অধিকাংশ যদি কৃষকের ঘর থেকে এসে থাকে, তবে আজ মধ্যবিত্তের অর্ধাংশ কিংবা তারও অধিক অবশ্যই পুরুষানুক্রমে মধ্যবিত্ত। অর্থাত্ মধ্যবিত্তের সন্তান মধ্যবিত্ত। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সন্তান শিক্ষিত ছাত্র-শিক্ষক কর্মচারী। কৃষক ও শ্রমজীবী অপরাপর মানুষ থেকে ভিন্ন এই মধ্যবিত্তের একটা নিজস্ব শ্রেণীস্বার্থ দাঁড়িয়ে গেছে, যে স্বার্থকে চেতন-অবচেতনভাবে রক্ষার জন্য শ্রেণী হিসেবে জনতার স্বার্থের বিপক্ষে যেতেও তাদের অনেক সময় সংকোচ হয় না। এই মধ্যবিত্ত থেকেই শাসক এবং শাসক ও মধ্যবিত্তের ঐক্যবদ্ধ হাতেই রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব এবং সমাজের রূপান্তরের প্রতিরোধ চেষ্টায় সে যন্ত্রের ব্যবহার। এ কারণে ‘বুদ্ধিজীবী’ বলতে আজ আর কোনো একটি আদর্শের অনুসারী ব্যক্তিকে বোঝায় না। এই ‘বুদ্ধিজীবীর’ মধ্যেই রয়েছে শ্রমজীবী অর্থাত্ ব্যাপকতর মানুষের সংগ্রামের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য শত্রু এবং এই বুদ্ধিজীবীর মধ্যেই রয়েছে শ্রমজীবীর সুহূদ, মিত্র। এই উভয় অংশের স্বার্থ এবং চিন্তাগত বিরোধই নানা আবরণে বাংলাদেশের ‘বুদ্ধিজীবী’র চিন্তা জগেক আকীর্ণ করে আছে।

শ্রমজীবী সংগ্রামী মানুষের সুহূদকে এই বিরোধের মধ্যে সচেতনভাবে শ্রমজীবী জনতার পক্ষ অবলম্বনের চেষ্টায় সতত সচেষ্ট থাকতে হবে।’