নিজেকে তিনি কৃষকের সন্তান বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন। ওই পরিচয় দানের মধ্যে নিজেকে এবং অন্যদের স্মরণ করিয়ে দিতেন তাঁর উেসর কথা; এবং জানিয়ে দিতেন যে উত্তরজীবনে তাঁর সকল পরিবর্তন সত্ত্বেও মাটির সঙ্গে সত্য আত্মীয়তা বর্জিত হয়নি। এ তাঁর এক ধরনের অহংকার বটে।
তবে সেই সত্তার ওপর প্রলেপ পড়েছিল তাঁর মেধার, আধুনিক শিক্ষার, বিপ্লবী চিন্তার। এক কৃষকসন্তান ‘সরদার ফজলুল করিম’ হয়ে ওঠেন মেধা ও সাহসের জোরে।
আনুষ্ঠানিক বিদ্যাচর্চার প্রতিটি ধাপে তিনি যে অসাধারণ ফল লাভ করেছিলেন, তাতেই আছে তাঁর মেধার পরিচয়। ২১ বছর বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নিযুক্ত হয়েছিলেন সেই ১৯৪৬ সালে। ততদিনে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির একজন কর্মীও, চোখে-মুখে তাঁর সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন। বিলেতে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের সম্ভাবনা তিনি নাকচ করে দেন পার্টির নির্দেশে। পদত্যাগ করেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আত্মগোপন করে বিপ্লবী রাজনীতি চর্চা করার সংকল্প করেন। গোপন সভা থেকে ধরা পড়েন। কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। প্রথম দফায় আট বছর। সরদার অবিচলিত। এসবের জন্য যে সাহস লাগে, সে সাহস তাঁর সহজাত।
জ্ঞানচর্চা অব্যাহত থাকে তাঁর কারাগারে গিয়েও। কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হিসেবে। এই পর্যায়ে রাজনীতিতে যে একটা বড় ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি, তা নয়। সংসদীয় রাজনীতিতে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। এ কে ফজলুল হকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ করেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে আবিষ্কার করেছিলেন নতুন সম্ভাবনা।
সামরিক শাসন জারির সঙ্গে সঙ্গে সরদার ফজলুল করিম আবার কারাগারে। সেখান থেকে বেরিয়ে যোগ দেন বাংলা একাডেমিতে, মুনীর চৌধুরী এবং পরিচালক সৈয়দ আলী আহসানের আগ্রহে। প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে আর সংস্রব নেই, কিন্তু জ্ঞানচর্চা অব্যাহত। ১০-১১ বছর পরে, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে যখন সংসারজীবনে স্থিত, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তখন আবার কারাগারে। বেঁচে যে রইলেন, সেটাই ভাগ্য।
স্বাধীন বাংলাদেশে এবারে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক-সরদার ফজলুল করিম যাঁকে নিজের দ্বিতীয় পিতা বলতেন, তিনি চাইলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরদারকে ফিরিয়ে আনতে। স্বভাবতই দর্শন বিভাগে— যে বিভাগের শিক্ষক ছিলেন তিনি এককালে। কিন্তু আমাদের শিক্ষকদের দলাদলি আছে না? ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের হিসাব কষাকষি আছে, পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার আছে, তাকে গৌরবান্বিত করতে আমরা বলি শিক্ষকদের রাজনীতি। সেই রাজনীতি বাধা হয়ে দাঁড়ায় সরদারের প্রত্যাবর্তনে। আবদুর রাজ্জাক তখন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যক্ষ। সেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগেই সরদারকে শিক্ষক করে আনেন। উপাচার্য মুজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী তাঁর সব কথাই শুনতে প্রস্তুত। তবু বঙ্গবন্ধুকে একটু বলে নেয়া হয়, তিনি সোত্সাহে সম্মতি দেন।
১৩ বছর সেখানে কাটে সরদারের। একের পর এক অনুবাদ করেন প্লেটো, অ্যারিস্টটল, এঙ্গেলস— জ্ঞানতত্ত্বের একেবারে গোড়ায় চলে যান। যুক্তিবিদ্যার বই লেখেন। মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে সংকলন করেন দর্শন-কোষ। আবদুর রাজ্জাকের কথোপকথন দিয়ে প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পূর্ববঙ্গীয় সমাজ। বিতর্কের ঝড়ের মধ্যে পড়ে যায় শেষোক্ত বইটি। দ্বিতীয় পিতাকে বিব্রত করছেন জেনে বিব্রত হন সরদার নিজেও।
তার পরও অদম্য থাকেন লেখালেখিতে। টেপ-রেকর্ডার নামের যন্ত্র তাঁর এখন চিরসঙ্গী। সুযোগ পেলেই কাঁধের ঝোলা থেকে সেটা বের করেন। শব্দ ধারণ করেন অন্যের। এসবই ইতিহাসের উপকরণ। আর দিনপঞ্জি লেখেন প্রত্যহ। অনেক তুচ্ছ কথা থাকে তাতে, অনেক উচ্চভাব। সরদার ফজলুল করিমের কাছে ‘জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা’।...
ধানমন্ডিতে যখন এসেছেন, তখন যাতায়াতের পালায় প্রায় ছেদ পড়েছে।
মুখের হাসিটি যায়নি তবু মিলিয়ে, আশাবাদ অব্যাহত রেখেছেন। সে-আশাবাদকে উসকে রেখেছে জ্ঞানচর্চা। জ্ঞানের শক্তিকে উপলব্ধি করেছেন। নিজের মধ্যে অপরের মধ্যে জাগাতে চেয়েছেন সেই শক্তি। দাঙ্গা-দুর্ভিক্ষ কলহ-নিপীড়ন দৈব-দুর্বিপাকের মধ্যেও পড়ালেখায় ছেদ ঘটতে দেননি। সামান্যের মধ্যেও প্রত্যক্ষ করেছেন অসামান্যকে। কৃষক-সন্তান জাতীয় অধ্যাপক হয়েছেন। আগাগোড়া রয়ে গেছেন সরদার ফজলুল করিম। মৃত্যু তাঁর দেহটিকে নিয়ে গেছে, আর কিছুই নিতে পারেনি।






