দাদিমার বাড়িটা এখনো টিকে আছে। উনিশশ বিশ-এ, তার জন্মসালে এসব রাস্তার কোনো নাম ছিল না। দাদিমা বলেছেন, এক জোরালো ভূমিকম্প ওদের আলাদা করে দিয়েছে। আর মা যখন জন্মাল, আটচল্লিশ সালের দুবছর পর, দাদিমার মনে আছে— ওরা স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার আর ভয়াবহ ঠাণ্ডায় আটকা পড়েছিল নিজ বাড়িতেই। সেবারই নাকি এমন আচম্বিৎ তুষার ঝড়ে গোটা জেরুজালেম ঢাকা পড়েছিল। আমার কাছে দাদিমার এই-ই সম্বল, শহরের সঙ্গে এটুকুই পরিচয়, যে শহর প্রকৃতি আর মানুষ, দুয়েরই বৈরী আচরণে বিপর্যস্ত। কিন্তু শহরটির এমন বৈরিতা আমাকে তেমন ছুঁতে পারেনি, যতটা আমার মা আর দাদিমাকে স্পর্শ করেছিল।

ফিলিস্তিনের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মায় অনেক পরে এসে— দাদাজান মারা যাওয়ার পর, জর্ডান থেকে দাদিমা যখন টেক্সাসে আমাদের সঙ্গে থাকতে এলেন তখন থেকে। ওই মাসটায় দাদিমা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করে গেলেন নীরবে, একে একে। আমি জানতাম দাদিমা ততটা শোকাতুর নন। ভেতরের কথাটা হলো, তিনি দাদাজানকে কখনই অতটা ভালোবাসতেন না। কিন্তু ওই একই বছর দাদিমার ছোট ছেলে মানে আমার কাকা হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে আচমকা মারা যাওয়ার পর তিনি একেবারেই ভেঙে পড়েন, শোকটা তিনি সইতে পারেননি। কাকার বয়স ছিল মাত্র তেতাল্লিশ।

একেবারেই মৌন হয়ে গেলেন দাদিজান। অথচ এই কিছুদিন আগেও তিনি তার সরব উপস্থিতি, রসালো মন্তব্য দিয়ে মাতিয়ে রাখতেন আর গল্পবুড়ি হিসেবে বেশ নাম কুড়িয়েছিলেন। চোটটা বেশ গভীরই ছিল। একদিন তাকে তার বাড়িটার একটা মানচিত্র এঁকে দেয়ার বায়না ধরলাম, ভাবলাম এতে হয়তো শোকাবহ অবস্থা কিছুটা হালকা হবে। আরো একটা কারণ ছিল, সামনেই আমার জেরুজালেমে বেড়াতে যাওয়ার কথা। তখন হয়তো একফাঁকে ওই এলাকাটা সরেজমিন ঘুরে আসা যাবে। জেরুজালেমের জাদুকরী পিপুলগাছের গল্প সেই ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। জেরুজালেম আমার কাছে সেই জাদুকরী পিপুলগাছের আবেশ নিয়েই বর্তমান! মা এদিক-সেদিক খুঁজে পেতে কত যে হাবিজাবি মরিচগাছ লাগিয়ে বাগানটা ভরিয়ে ফেলেছিলেন অথচ একটা গাছও দাদিমার পছন্দ হতো না, কারণটা সহজেই অনুমেয়। ধীরে ধীরে আমাদের বাগানটা স্মৃতির কবরে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল।

দাদিজানের বয়স এখন নব্বই। মুখাবয়বে বলিরেখার অজস্র আঁকিবুঁকি, ভাঁজ। অনেকটা তার আঁকা জেরুজালেমের এবড়োথেবড়ো মানচিত্র। মন খারাপের সময়, তার মুখাবয়বের ভাঁজগুলো প্রকট হয়ে উঠত। কিন্তু কোনো কিছুই দাদিমার মনঃকষ্টকে ঢেকে দিতে পারত না। দাদিমা আমাকে বলেছেন:

‘বাবাকে (মানে দাদির বাবাকে) যখন গুলি করে মেরে ফেলা হয়, তখন আমার বয়স মাত্র সতের। বাবার একটা বেকারি ছিল। ওই বেকারিতেই গনগনে চুল্লিটার পাশে তার মরদেহ পড়েছিল। সেদিন ঠিক কী বার ছিল আমার মনে নেই, তবে এটুকু মনে আছে আমাদের পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে গেল। চার মেয়ের মধ্যে আমিই সবার বড় ছিলাম, ফলে আমাকে তড়িঘড়ি করে বিয়ে দিয়ে দেয় আত্মীয়স্বজন। একদিক দিয়ে আমার কপাল ভালোই বলা যায়, কারণ আমার বাকি তিন বোনকে পাঠিয়ে দেয়া হয় চাচার কাছে। আর চাচার বাড়িতে, তারা দাসী-বাঁদির চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না! চাচা ওদের ধরে ধরে কুর্দি গোষ্ঠীতে বিয়ে দিয়ে দেয়। (তোর কখনো মনে হয়নি আমার বোনদের ছেলেপিলেগুলোর চেহারাসুরত সব একই রকম!) আমাদের বেকারিটা তালাবন্ধ পড়ে রইল। আর মা, আমার দুঃখী মা সন্তান-সন্ততিহীন পড়ে রইলেন একা। তাহলে সেই বাড়ি, যে বাড়িতে আমার শৈশব-বেড়ে ওঠা, তার কথা আমার কেন অত মনে পড়বে? কেন? ওখানে কেবলই কষ্ট আর যন্ত্রণার ছায়া।

জানিস, বাবা খুব চনমনে আর দিলখোলা মানুষ ছিলেন। তার সংগ্রহে বেশকিছু পুরাণ আর গল্পের বই ছিল: খ্রিস্টান, ইহুদি, মুসলমান, কোনো বাছবিচার ছিল না। মজার একটা তথ্য দিই, মরক্কোর এক ইহুদি নারীর প্রেমে বাবা বেশ কাবু ছিলেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে, তিনি আমাদের বাড়িতে সুগন্ধি ফুল বিক্রি করার ছুঁতোয় মাঝেমধ্যে আসতেন। অবশ্য এসব আটচল্লিশের আগের কথা। লোকজনকে বলতে শুনেছি বাবা আর ওই মহিলার ঘরে একটা মেয়ে আছে! ভাবতে পারিস আমার একটা ইহুদি বোন আছে, যে জেরুজালেমে বাস করে! তবে এ-ও ঠিক, বাবার জন্য আমাদের অনেক গঞ্জনাও শুনতে হয়েছে। আমি একটু বোকা কিসিমের ছিলাম... বাবাকে আমার বেশ সু-পুরুষই মনে হতো। বাবার চেহারা আমাকে ওই আমেরিকান অভিনেতার কথা মনে পড়িয়ে দিত... কী যেন নামটা? এন্থনি কুইন! যাই হোক, একবার, আমার বয়স তখন চৌদ্দ, এক বন্ধু বেড়াতে এল আমাদের বাড়িতে। মা কীভাবে অতিথিদের খাইয়ে-পরিয়ে সেবা করে আর সেটা যে আমিও করতে পারি, তা-ই ওকে দেখিয়ে দেব ভাবলাম। ফলে বড়দের মতো নেমন্তন্নের প্রথম পানীয় হিসেবে চায়ের বদলে এক গ্লাস আরক খাওয়ানোর কথা মাথায় এল। ঢেলে দিলাম বাহারি বোতল থেকে। কিন্তু বোতলে আরকের বদলে ছিল মদ! আমি কি ছাই জানতাম? কেউ তো বলেওনি! সেদিন বন্ধুটি মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরল। বেচারি কড়া মার খেয়েছিল ওর মায়ের হাতে।’

এটুকু শুনে আমি কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম। তাও আবছা শুনতে পেলাম দাদিমা মাকে বলছে—

‘মেয়েটা এমনভাবে জেরুজালেমের কথা শুনতে চায়, ভাবে, যেন এ তার হারানো ধন, যা সে ওখানে গিয়ে খুঁজেপেতে নেবে। সে যে জেরুজালেমে যাওয়ার কথা ভাবছে... ব্যাপারটা ভালোই। এমনকি তা যদি হয় মামুলি পিপুলগাছের জন্য তাহলে তা-ই হোক। আচ্ছা ইয়ানি, মেয়েটা কি জানে যে পিপুলগাছ দেখতে দেবদারু কিংবা আগরগাছের মতো হয় না! থাক, আমার মনে হয় জেরুজালেমকে নিজের মতো করে জানাটাই আসল এবং দরকারি। সত্যটা পৃথিবীর জানা উচিত।’

জেরুজালেমে তখন হেমন্তের শুরু কেবল। চিটপিটে গরম রয়ে গেছে, আর ভ্যাপসা বাতাস। এমনই ভ্যাপসা যে মানচিত্রের কালিও তাতে গলে গিয়ে থেবড়ে যাওয়ার উপক্রম। দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম, কালি মুছে গিয়ে না কোনো দিক ভুল করে ফেলি, অন্য রাস্তায় গিয়ে পড়ি! ঠিক তখনি দাদিমার কথাটা মনে পড়ল, বেরোবার আগে আগে দাদিজান বলে দিয়েছিলেন, ‘যদি পিপুলগাছটা খুঁজে না পাস তাহলে কাউকে জিজ্ঞেস করে নিবি আমেরিকান খেলার মাঠটা কোথায়। আমাদের বাড়িটা ছিল ঠিক ওই সেন্টারের উল্টো দিকে।’

পুরনো শহরের দামাস্কাস গেট দিয়ে শহরে ঢুকলাম আমি, হাতে মানচিত্র, ঢুকেই ডান দিকের প্রথম গলিটা নিলাম। এ গলিটা ‘মার্চেন্ট অব গড’ গলির আগের গলি। এ গলিটায় বাইবেলে বর্ণিত নানা উপহারসামগ্রী বিক্রি হয় জানা ছিল, কিন্তু সেখানে এমন কোনো কার্যক্রমই চোখে পড়ল না। শুধু এক পোলট্রিওয়ালাকে মুরগি বিক্রি করতে দেখলাম। আর বাচ্চারা একটা ফুটো ফুটবল নিয়ে ফাঁকা গলিটায় হুজ্জতি করছে। বাড়িটা এখানেই কোথাও থাকার কথা, অন্তত দাদিমা যেভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু না, এখানে সেটা নেই। আমি আবারো প্রথম থেকে শুরু করলাম। একেবারে পায়ে পায়ে। যে কে সেই! সাহায্যের আশায় সেই মুরগিওয়ালার কাছে ধরনা দিলাম। দাদিমার আঁকা মানচিত্রটা দেখিয়ে বাড়িটার হদিস জানতে চাইলাম। আমার দিকে সন্দেহভরা দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে লোকটা জিজ্ঞেস করল, ‘কোত্থেকে এসেছ? ঠিকানাটা আবার বলো তো।’

শহরের অন্য পাশটায় যাওয়া মনস্থ করলাম। আমার মনে হলো, এমনো তো হতে পারে যে দাদিজানের যেহেতু মানচিত্র আঁকার কলাকৌশল জানা নেই, ফলে উত্তর-দক্ষিণ বা এ রকম বড় কোনো ভুল হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এর-ও এক ঘণ্টা পর আমার মনে সন্দেহ দানা বাঁধল। দাদিজান আমার সঙ্গে একটা বড়সড়ো মশকরা করেছেন! আমি হাঁটতেই থাকলাম, হাঁটতেই থাকলাম যতক্ষণ না বুঝতে পারলাম যে, একটা বৃত্তের মতো জায়গায় ঘুরছি। প্রথমে খ্রিস্টান কলোনি, তারপর আফ্রিকান কলোনি, ফের সেই শুরুর জায়গা। রণে ভঙ্গ দেয়ার কথা ভাবছিলাম। ক্রমেই লোকজন বেশ সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ছে আমার প্রতি, এমনকি মায়ের মতো জেরুজালেমি টানে কথা বলার পরও! অবশ্য হওয়ারই কথা, শহরজুড়ে সবার মধ্যেই দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। সময়টা ভালো নয়। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না, কে যে শত্রুপক্ষ, কে যে কার ঘরে কখন হামলে পড়বে বোঝা মুশকিল। জঘন্য, ওরা কি আমাকে হিব্রুভাষী আরবি গোয়েন্দা ভাবছে!

শেষতক, দাদিমার কথামতো আমেরিকান মাঠের খোঁজ লাগালাম। তথৈবচ, কেউই চেনে না জায়গাটা, মনে হলো ইহজন্মে শোনেওনি। শেষে এক বুড়ো জানাল যে, ওই মাঠ প্রায় সত্তর বছর আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, এখন আর ওই মাঠ নেই। আরেকজন বেশ রুবাই ছাড়লেন, ‘এই নগরের সুখের স্মৃতি পড়েছে ঢাকা ধুলোয়’। আরেকজন তো বেড়ে বললেন, ‘এ রকম নামের কোনো মাঠ কোনোকালে ছিলই না। সবই মিথ!’ আমি আবারো বুড়োর কাছে ধরনা দিলাম। জানতে চাইলাম দাদিমাকে চেনে কিনা, আমাদের বংশের নাম, অন্যদের নামধাম, জায়গাটার নাম... যতটুকু আমার সংগ্রহে ছিল আর কী। বুড়ো লোকটা তার প্লাস্টিক চেয়ারে বসে চুপচাপ শুনে গেল আর তরমুজ খেয়ে খেয়ে বিচিগুলো এদিক-সেদিক ছুড়ে ফেলতে লাগল।

শহরে আমি প্রায় চার ঘণ্টা ছিলাম: হতাশ, বিরক্ত আর গরমে ঘেমেনেয়ে ক্লান্ত। বিধ্বস্ত হয়ে বন্ধুর ফ্ল্যাটে ফিরে এলাম। হয়তো দাদিমার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারিনি বা ভুল ব্যাখা করেছি। যত যা-ই হোক, মাত্র উনিশ বছর বয়সে দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। কিন্তু আমি শুনেছি স্মৃতি কখনই ধোঁকা দেয় না। আমার বিশ্বাস, ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভেবে দেখলে দাদিমা নিশ্চয় নতুন আরেকটা মানচিত্র এঁকে দিতে পারবেন।

দাদিজান হয়তো ভাবতে পারেন যে আমি ফিলিস্তিনের প্রতি বেশ স্মৃতি ভারাতুর, তাই পুরনো ঘরদোর দেখার জন্য এতটা মরিয়া। আমার তো দাদিমাকে এটা বলতেও বুক কাঁপবে যে আমি জানি গোলমরিচ লম্বা গাছে ধরে না, লতানো গাছে ধরে। কিন্তু আমি যদি (এবং এই যদিটা বেশ বড় একটা যদি) বাড়িটা খুঁজে পাই তখন কী হবে? যদি খুঁজে পাই, আর দেখি যে বাড়িটা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, ভেতরে এখনো সেই পুরনো আসবাব... আমাকে খোঁজটা জারি রাখতেই হবে। আমি জানি বাড়িটা এখনো বর্তমান। দাদিমা আমাকে বলছেন:

আমি দেখতে পাই দুর্দশায় মোড়া একটা শতক। কখনো কখনো দেখতে পাই সেই ছিন্নবস্ত্র মানুষটিকে। জানালার কাচে নিজেরই প্রতিবিম্বের কাছে সে ফিসফিস করে বলে রাখছে আপন কথাগুলো। দেখতে পাই চিঠির বাক্সে উড়ে এল এক চিঠি, মোহন রমণীর সুগন্ধিভরা লেখা। অথবা পৃথিবীর সমস্ত নীরবতাকে সাথী করে জবুথবু বসে থাকা সেই একই বাক্স। শুনতে পাই ফুলেরা বলাবলি করছে ফুরিয়ে যাওয়া গাছটির কথা। নিজেকে দেখতে পাই পুরনো শহরের পথে পথে হাঁটছি। মনোহারী দোকানগুলোর কথাও বেশ মনে আছে। রাস্তাগুলোর কোনো নাম অবশ্য ছিল না। তবুও আমি ঠিক পৌঁছে যেতাম বাড়িতে। হাট করে খোলা দরজা। ভেতরে বাবা। বাইরে দাঁড়ানো একটা লোক তাড়া দিল— সন্ধ্যা হওয়ার আগেই আমাদের কবরস্থানে পৌঁছাতে হবে।

এই স্বপ্নের মানে আমি কখনই খুঁজে পাইনি। তবুও এই একই স্বপ্ন রোজ রাতে দেখতাম। হে শহর, নির্বাসনে নির্বাসনে জেরবার শহর। কোথাও কেউ নেই। শুধু পিপুলগাছটা, পিপুলগাছটা রয়ে গেছে একই।

আরেকটা মানচিত্র? নিশ্চয় হাবিবতি, তোকে আমি আরেকটি মানচিত্র এঁকে দেব।

সুসান হাম্মাদ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিন ও ফ্রান্সে বসবাস করেন। আল জাজিরাসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও পত্রিকায় নিয়মিত তার লেখা প্রকাশিত হয়।

অনুবাদ: মাহমুদ আলম সৈকত