সেদিন রাতে পাশাপাশি শুয়ে ঘুমানোর আগে মনোয়ার ভাই হঠাৎ বললেন, আপনাকে একটা কথা বলতে চাই যদি কাউকে না বলেন।
আমি বললাম, একটা কথা কেন, আপনি যত কথাই বলেন না কেন, আমি কেন কাউকে বলতে যাব?
আমার কথায় আশ্বস্ত হয়ে মনোয়ার ভাই বললেন, সন্ধ্যা হলেই হাসনাহেনা ফুলের ঘ্রাণ পাই দুদিন ধরে।
আমি একটু সোজা হয়ে বসলাম। বললাম, তাই নাকি? ক্যামন করে সম্ভব? এখানে তো কোনো ফুলগাছ নাই?
মনোয়ার ভাই একটু মুচকি হাসলেন মনে হলো।
প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতে আমাদের শোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সামনের রাস্তা দিয়ে যেতে থাকা একটা প্রাইভেট গাড়ির হেডলাইটের আলোয় দেখি তার শান্ত মুখে একটা স্বপ্নালু ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। তা দেখে মনে হলো, আমিও হাসনাহেনার ঘ্রাণ পাচ্ছি। অথচ মনোয়ার ভাই হাসনাহেনার ঘ্রাণ পেলেন নাকি ছাতিমের ঘ্রাণ পেলেন তা দিয়ে আমার কিছু আসে যায় না। জবাব না দিয়ে মনোয়ার ভাই তার একটু পরই অন্য পাশে ঘুরে শুয়ে পড়লেন।
আমি উনার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, এই লোকটার সঙ্গে থাকাটা আমার নেশায় পরিণত হয়েছে। উনি যাই বলেন তাই ভালো লাগে, বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে। মাত্র এক সপ্তাহের পরিচয়ে লোকটা কীভাবে আমাকে এত প্রভাবিত করে ফেলেছেন যে, উনি যাই বলেন আমি অনুভব করার চেষ্টা করি। হাসনাহেনার কথা ভাবতে ভাবতে সেদিন আমিও চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম কখন মনে নেই।
মনোয়ার ভাই রাজশাহীর হালদারপাড়া গ্রামের একমাত্র স্কুল মহানন্দখালি হাই স্কুলের শিক্ষক। উনিই সেই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা এবং হেডমাস্টার। উনার মেয়ের বয়স ১২। স্ত্রীর ক্যান্সার হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। মেয়ের জন্মের সময় আকবর হাজিকে রাজি করিয়েছিলেন স্কুলের জন্য একটা একতলা বিল্ডিং বানিয়ে দিতে। হাজি সাহেব খুব দরাজ দিল না হলেও বিল্ডিং ঠিকই বানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বছর পাঁচেক পার হওয়ার আগেই তিনি মরে গিয়ে স্কুলকে একটা ভগ্নদশায় ফেলে দিয়ে গেছেন। তারপর থেকে হাল ধরে বসেছিলেন মনোয়ার ভাই। স্বপ্ন দেখছিলেন একদিন সরকার স্কুলের শিক্ষকদের মাসিক বেতন-ভাতা দিয়ে স্কুলটিকে রক্ষা করবে। সেই আশায় নানাভাবে এর-ওর কাছে চেয়ে, ঋণ নিয়ে স্কুলটা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু সব যোগ্যতা অর্জন করা সত্ত্বেও সরকারি মান্থলি পেমেন্ট অর্ডারের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি তার স্কুল।
যেদিন প্রেস ক্লাবের সামনে আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে সরকারি মান্থলি পেমেন্ট অর্ডারের অন্তর্ভুক্তির দাবিতে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করি, সেদিনই উনার সঙ্গে পরিচয়। আমি খুলনার মানুষ। আমার স্কুলেরও একই দশা। ধীরে ধীরে মনোয়ার ভাইয়ের ওপর আমি এমন নির্ভরশীল হয়ে উঠি যে, আমার জীবনের সমস্ত গল্প তার কাছে করতাম।
এখানে আসার পর আমি আমার স্ত্রী তনুকে একটা চিঠি লিখেছি। চিঠিটা পাঠাতে পারিনি এখনো। চিঠিটা আমার পকেটেই থাকে। আমার সারাক্ষণ মনে হয় আমি যেকোনো সময় মরে যেতে পারি। আমার অ্যাজমা আছে। পুলিশ যদি পিপার স্প্রে করে, বা টিয়ার গ্যাস ছোড়ে, তাহলে আমি নিঃশ্বাস বন্ধ হয়েই মরে যাব।
একদিন রাতে ঘুমানোর সময় মনোয়ার ভাইকে বললাম, আমার পকেটে একটা চিঠি আছে। আমি মরে গেলে সেটা আপনি আমার স্ত্রীকে পৌঁছে দেবেন। মনোয়ার ভাই আমার দিকে তাকালেন, কিছু বললেন না। উনি ঘুমিয়ে গেলে আমি চিঠিটা খুলে আবার পড়লাম। কিছু বাদ পড়ল কিনা দেখি। এমন নয় যে চিঠিটায় কিছু বাদ পড়লে আমি নতুন করে যোগ করতাম। নিজের লেখা, নিজের মনের কথা পড়তে আমার ভালো লাগে।
মাঝে মাঝে ভাবতাম, একটা ফোন করে তনুর সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু সাহস হতো না।
১৫ই অক্টোবর ২০১৫
প্রিয় তনু,
প্রবারণা পূর্ণিমা আজ। প্রেস ক্লাবের সামনে শুয়ে আছি তোমার কেনা চাদর গায়ে দিয়ে। আকাশি রঙের চাদরটা চাঁদের আলোয় সাদা দেখাচ্ছে। আজ তিনদিন হলো আমরা অবস্থান ধর্মঘট করে ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছি। এখানে আমার সঙ্গে যারা অবস্থান নিয়েছেন তাদের সবাই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষক। কারো সঙ্গে পরিচয় হলে আমার প্রথমেই মাথায় আসে এই শিক্ষকও কি আমার মতো পালিয়ে চলে এসেছেন? অনেক দিন পালিয়ে যাওয়ার জায়গা খুঁজেছি। পাইনি। তুমি যখন সারা দিন অফিস করে এসে রান্নাঘরে ঢুকে আমাকে বলো, মেয়ের দুধের টিন খালি হয়ে গেছে, অথবা যেদিন আমার বাসায় ফেরার টেম্পো ভাড়াটাও থাকে না আর তুমি আমাকে বলো চাল শেষ হয়ে গেছে, অথবা যেদিন তুমি আমাকে স্মরণ করিয়ে দাও বিবাহবার্ষিকীর দিনটা, সেদিন আমার বাসা থেকে বের হয়ে কোথাও পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আমি এতদিন পালাইনি। অথবা বলা ভালো, যে প্রস্থানের অর্থ ঠিক পালিয়ে যাওয়া নয়, আমি তেমন একটা প্রস্থানের কারণ খুঁজছিলাম মনে মনে।
যখন জানলাম শিক্ষকদের বেতন সরকারের মান্থলি পেমেন্ট অর্ডারের আওতায় আনার জন্য শিক্ষকরা অবস্থান ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে, তখন ভাবলাম এই তো সুযোগ। পালিয়ে এসে আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের অংশ হয়ে গেছি। এখানে আমাদের দাবিদাওয়া আছে। অথচ তোমার কাছ থেকে আসার সময় নিজেকে কেমন পলাতক লাগছে।
তনু, সারা রাত কানের কাছে মশা ভ্যানভ্যান করে। ঘুম আসে না। হঠাৎ করে বিকট আওয়াজ করে যখন বাস চলে যায়, তখন বর্ষাকালে আমাদের টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার কথা মনে আসে। ব্যাঙ, ঝিঁঝি পোকা, ডাহুকের ডাকের কথা মনে আসে। আমি দেখতে পাই তুমি ঘুমিয়ে আছ আর তোমার বুকে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে আছে দিবা। অনেকবার এভাবে চোখ বুজি। যতবারই চোখ বুজি কোনো না কোনো অজানা আশঙ্কায় ভয়ে জেগে উঠি। আজ ঠিক করেছি ঘুমাব না। তোমাকে চিঠি লিখব। ল্যাম্পপোস্টের বাতিটা গতকাল পর্যন্ত জ্বলছিল না। আজকে কী কারণে জ্বলছে জানি না।
আমার পাশে মতিন ভাই ঘুমাচ্ছেন আজকে। মতিন ভাই এসেছেন বিরহপুর থেকে। চাঁদপুরের একটা গ্রাম। নামটা কী অদ্ভুত না? এখানে সবাই মতিন ভাইকে বিরহ ভাই বলে ডাকে। উনি আবার সুন্দর গানও গান। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা এখানে মাইক দিয়ে বক্তৃতা করি, কেউ কেউ কবিতা আবৃত্তি করে, কেউ গান শোনায়। কখনো কখনো কোনো রাজনৈতিক নেতা আসেন। আমাদের সঙ্গে সংহতি জানান। আমি কিছুই করি না। এদিক যাই, ওদিক যাই। একটু পায়চারী করি। নতুন কারো সঙ্গে পরিচয় হলে দু-একটা সুখ-দুঃখের কথা শুনি। সেদিন এক শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ হলো। স্কুলে পড়ানো শেষ হলে রিকশা চালান উনি। এক সাংবাদিক উনাকে ইন্টারভিউ করার সময় আমি পাশেই দাঁড়িয়েছিলাম। সেই সাংবাদিক হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি স্কুলে পড়ানো ছাড়া আর কিছু করি কিনা। আমার ইচ্ছা করল, বলি যে আমি বাস চালাই বা ট্রাক চালাই। কিন্তু আমি জানি, আমাকে দেখলেই বোঝা যায় আমি মধ্যবিত্ত। আমি রিকশা, বাস, ট্রাক, ঠেলাগাড়ি কিছুই চালাই না। সাংবাদিক আর আমার প্রতি আগ্রহ দেখালেন না।
আন্দোলনের স্বার্থে সাংবাদিকরা যখন আসেন, তখন আমাদের ওই রিকশাওয়ালা ভাইকে আগে ঠেলে দিই। আমাদের তো বৌ চাকরি করে, ভাই চাকরি করে, অথবা আত্মীয়স্বজন কেউ আছে ধার দেয়ার। আমাদের গল্প পত্রিকায় তাই স্থান পায় না। সাদামাটা গল্পে মানুষের আগ্রহ নেই।
সেদিন এক রাজনীতিবিদ এলেন। সবাই ব্যস্ত হয়ে গেলেন তার হাতে মাইক দেয়ার জন্য। খবর ছড়িয়ে পড়ল, উনি প্রধানমন্ত্রীর খুব কাছের লোক। বক্তৃতায় উনি প্রথমেই আমাদের খুব প্রশংসা করলেন। বললেন, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর শিক্ষকরা এই মেরুদণ্ডের ডাক্তার। ডাক্তার না থাকলে যেমন মানুষের রোগ নিরাময় সম্ভব না, তেমনি শিক্ষক ছাড়া জাতি বেঁকে যেতে পারে। সবাই খুব তালি দিল নিজেদের গুরুত্ব বুঝতে পেরে। আমিও দিলাম। তারপর উনি বললেন, শিক্ষকদের কাজ শুধু দেয়া। সেইসব শিক্ষকরাই নেন, যারা নীতিবিবর্জিত।
তিনি বলতে থাকেন, তবে, আপনাদের কথা যদি একবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলি, তাহলে উনি আপনাদের বেতন দিবেনই। কিন্তু ফুটপাতে এভাবে শুয়ে বসে থাকলে কি আপনাদের দেখবেন? উনার সাথে দেখা করতে হবে। আমিই আপনাদের দেখা করিয়ে দিব। শুনে সবাই আবার তালি। আমার মনে হয়, আকাশ থেকে কোনো এক পুতুলনাচের কারিগর অদৃশ্য সুতা দিয়ে আমাদের হাতগুলোকে কাঠের পুতুলের মতো ডানে-বামে টানছিল আর তাই তালি বাজছিল।
সবাই ভাবে, আমরা শখ করে এই পেশা বেছে নিয়েছি। জেনেশুনেই যেহেতু এই জীবন বেছে নিয়েছি, তাহলে এখন আন্দোলন কিসের? তনু, কে বোঝাবে বলো আমাদের ছেলেমেয়েদেরও অসুখ-বিসুখ হয়, চাল ফুরিয়ে যায়, দুধ ফুরিয়ে যায়, অসময়ে অসুখ বেঁধে যায়, নিজের বৌ পর হয়ে যায়, ঋণ দেয়ার ভয়ে আপনজনরা ফোন ধরে না। তনু, তুমিও তো দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছিলে, কত রাতে ঘুম ভেঙে অ্যাবোরশন করা শিশুটার জন্য কেঁদেছিলে। তাই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমাদের যখন সন্তান হবে আমি আদর্শ বাবা হব। সেই আমি অনেকবার ধার করে দুধ কিনেছিলামও। মাঝে মাঝে সন্ধ্যা হলে কেউ যখন ধার দিতে চাইত না তখন দেরি করে বাড়ি ফিরে বলতাম, দুধের সাপ্লাই শেষ অথবা বলতাম দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। ততক্ষণে মেয়ে ঘুমিয়ে যেত বলে কিছুই বলতে না তুমি। কিন্তু এভাবে মিথ্যা বলতে বলতে কখন যে তুমি দূরে সরে গেলে অথবা আমিই তোমাকে দূরে ঠেলে দিলাম বুঝিনি।
মনে আছে, এক বছর বয়সে দিবার যখন অসুখ হলো তখন আমি ঢাকায় একটা শিক্ষক সম্মেলনে এসেছিলাম। দীবার অসুখের কথা শুনে যখন ফিরে গেলাম, তখন দিবা প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছিল। সেই বছর শাহবাগে শিক্ষকদের ওপর পিপার স্প্রে করা হয়েছিল। সামনে থেকে দেখেছিলাম। দৌড়ে পালাতে পেরেছিলাম কারণ পিপার স্প্রে করার আগেই আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ায় আমাকে দূরে নিয়ে গিয়েছিল কয়েকজন শিক্ষক। ফিরে এসে তোমার চোখে রাজ্যের অভিমান দেখেছিলাম। তিনদিন আমার সঙ্গে কথা বলোনি। আমিও তোমাকে জানাইনি যে, আমি মরে যেতে পারতাম সেদিন। সেদিন থেকে আমার মনে ভয় ঢুকে গিয়েছিল যে, আমি মরে গেলে অনেক কথা না জানা থেকে যাবে তোমার।
একটা চাকরি খোঁজার জন্য অনেক আগে থেকেই বলছিলে তুমি। সেবার তিনদিনের দিন একটা চাকরির ইন্টারভিউয়ের চিঠিও ধরিয়ে দিলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি ইন্টারভিউতে যাইনি। তোমাকে বলেছিলাম গিয়েছি। কারণ ইন্টারভিউতে যাওয়ার জন্য একটা শার্টও তুমি আমাকে কিনে দিয়েছিলে। কেন যাইনি জানো? কারণ স্কুলটা আমি তিলে তিলে গড়ে তুলেছি। বেতন দিতে না পেরে স্কুলের শিক্ষকরা যখন চলে যেতে চাচ্ছিল, তখন হাতে-পায়ে ধরে অনেক শিক্ষককে দীর্ঘদিন বুঝিয়েছি। আমি শুধু আর্থিকভাবে ঋণগ্রস্ত না, আমি ঋণগ্রস্ত তাদের অবদানের কারণেও। যাদের স্বপ্ন দেখিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে অনেক কিছু ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলাম, তারাও এখন আমাকে দোষ দেয়। তাই, মাঝে মাঝেই পালিয়ে যাওয়ার জায়গা খুঁজে বেড়াই।
এই যে প্রেস ক্লাবের সামনে শুয়ে আছি আমি, আর তোমাকে চিঠি লিখছি এর কারণ আমি সামনে থাকলে তোমাকে বলতে পারি না আমার কী কষ্ট হচ্ছে। তোমার কষ্ট দেখলে আমার নিজের কষ্ট দিয়ে আর তোমাকে ভারাক্রান্ত করতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু আমি যদি এই চিঠি না লিখে যাই তুমি ভাববে আমি একটা চরম স্বার্থপর মানুষ, তোমাকে চরম উপেক্ষা করেছি। নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তোমাকে বিপদে ফেলে দিয়েছি। আমি যদি মরে যাই কখনো জেনে রেখো আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসতাম।
আমাদের টিনশেডের বাড়িটা আমি তোমার নামে লিখে দিয়েছি অনেক আগেই। অন্তত এতটুকুই আমি তোমাকে দিয়ে যেতে পারলাম। ঠিক আজকেই তোমাকে এই চিঠিটা লিখলাম কেন জানো? প্রবারণা পূর্ণিমা এই দিনটি হলো বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আত্মসমর্পণ ও আত্মনিবেদনের অনুষ্ঠান। আষাঢ়ের পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস ধরে একসঙ্গে জ্ঞানচর্চা ও বর্ষাব্রত পালন শেষে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। একে অপরকে তাদের ভুলভ্রান্তি সম্পর্কে অবগত করেন এবং তা সংশোধনের আহ্বান জানান। এ দিনটিকে বেছে নিলাম তোমার কাছে আত্মসমর্পণের জন্য।
ইতি
তোমার শাহেদ
চিঠিটা পড়া শেষ করে আমি আবার মনোয়ার ভাইয়ের দিকে তাকালাম। উনার নিঃশ্বাস ওঠানামা করছিল একটু আগেও। এখন আর করছে না। বোধ হয় গভীর ঘুম। এপাশ-ওপাশ করে রাত কেটে গেল, ঘুম তো এলই না, বরং তন্দ্রা এলেই কোনো না কোনো গাড়ির বিকট শব্দে চমকে উঠি বারবার। সকালে উঠে মনোয়ার ভাইকে দেখি একভাবেই শুয়ে আছেন। কোনো নড়াচড়া নেই। আমি আস্তে আস্তে মনোয়ার ভাইকে ডাকলাম, কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আমার সন্দেহ হলো। কাছে গিয়ে নিঃশ্বাস পড়ছে কিনা দেখতে গিয়ে বুঝলাম উনি অচেতন হয়ে আছেন। সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের সবাইকে ডাকলাম। একটা সিএনজি নিয়ে চলে গেলাম মেডিকেলে। ইমার্জেন্সিতে ডাক্তার দেখে জানিয়ে দিলেন উনি মারা গেছেন হার্ট অ্যাটাক করে। অ্যাটাকটা রাতেই হয়েছে ঘুমের মধ্যে। এরপর ডাক্তার বললেন, শাহেদ কে? আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, আমি। উনি বললেন, আপনার জন্য একটা চিঠি লিখে গেছেন। বুকপকেটে ছিল। আমি চিঠিটা হাতে নিলাম। বুকে হাত দিয়ে দেখি আমার চিঠিটা পকেটেই আছে। মনোয়ার ভাইয়ের চিঠিটা খুললাম।
প্রিয় শাহেদ,
তুমি যেদিন তোমার তিন বছর বয়সী মেয়ের গল্প করছিলে, সেদিনই আমি ঠিক করে রেখেছিলাম তোমাকে এই চিঠিটা লিখব। তোমার তো স্ত্রী আছে। আমার তো তাও নেই। আমার স্ত্রীর নামও ছিল তনু। কী অদ্ভুত মিল দেখো। আমার মেয়েটার বয়স এখন বারো। নাম হেনা। হেনার জন্য সারা জীবন কিছুই করতে পারিনি। স্ত্রী যেদিন বিনা চিকিৎসায় মারা গেল সেদিন রাত থেকে আমি হ্যালুসিনেশনে ভুগছিলাম। প্রায়ই তনুর রান্না করা মাছের গন্ধ পাই। যেদিন গন্ধ পাই, সেদিন আর কিছু খেতে পারি না। যেদিন হাসনাহেনা ফুলের ঘ্রাণ পাই, সেদিন আর রাতে ঘুমাতে পারি না। তনু কয়েকটা জবাগাছ লাগিয়েছিল। জবা ফুল ফুটলেই সেদিন আমি ঘরে থাকতে পারি না। একদিন হেনাকে না জানিয়ে জবাগাছ কেটে ফেললাম। হেনা খুব কেঁদেছিল, আমি কিছুই বলিনি। মায়ের অভাব আমি পূর্ণ করতে তো পারিইনি, উপরন্তু ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতাম। স্কুলের এই অবস্থা, তার মধ্যে টাকা-পয়সা নেই।
আমি যদি মারা যাই আমার জন্য সরকার কিছুই করবে না জানি। আমার স্কুলটা কেউ চালাবে না। কোচিং করিয়ে অর্থ উপার্জন করে আমাদের স্কুলশিক্ষকরা কোনোমতে চালিয়ে দেবেন জীবন। আমাদের কষ্ট আমরা ছাড়া আর কেউই বুঝবে না। আমি জানি, তুমি নিজেও কষ্টে আছ। কয়েক দিন ধরে আমারও কেবল মনে হচ্ছে আমি বাঁচব না। তাই তোমার পথ অনুসরণ করে আমি একটা চিঠি লিখে যাচ্ছি। আমার মেয়েকে আমার বোনের কাছে রেখে এসেছিলাম। আমার বোন নিজেই একটা যৌথ পরিবারে থাকে। নিজেই মাথা নিচু করে থাকে, আমার উঠতি বয়সী এতিম মেয়েটাকে সে দেখে রাখতে পারবে না— এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।
আমি গতকাল স্বপ্নে দেখেছি কি জানো? হেনা আর তোমার মেয়ে দীবা একটা বাগানে খেলছে। সেই বাগানের চারিদিক জবা ফুলের গাছ। থোকা থোকা জবা ফুল ধরেছে। হেনা আর দীবা হাতে মেহেদি দিচ্ছে আর বলছে হাসনাহেনার ঘ্রাণ কী সুন্দর।
আমি মরে গেলে তুমি যদি হেনার দায়িত্ব নাও, তাহলে আমার আত্মা শান্তি পাবে। তোমাকে না জানিয়ে আমি একটা অপরাধ করে ফেলেছি। তনুকে লেখা তোমার চিঠিটা আমি পড়ে ফেলেছি। মনে আছে আমার শার্টটা হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিল সেদিন। তোমার শার্টটা দিয়েছিলে পরতে। সেদিন প্রেস ক্লাবে বাথরুমে গিয়ে বুকপকেটে তোমার চিঠিটা পেয়ে পড়ে ফেলেছিলাম বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। চিঠিটা আমি পড়তে চাইনি। তনুর নাম দেখে পড়া শুরু করেছিলাম। আর থামতে পারিনি। জানলাম তোমাদের একটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হতে পারেনি। তনু যে একজন অসম্ভব ভালো মানুষ তা আমি তোমাকে দেখে বুঝতে পেরেছি। আমার মেয়ে যদি ভালো থাকে, তবে সে শুধু তনুর কাছেই ভালো থাকবে।
ইতি
তোমার মনোয়ার ভাই
চিঠিটা পড়ে আমি মনোয়ার ভাইকে ক্ষমা করে দিলাম। মনোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে রাগ করা চলে না। কিন্তু নিজের মেয়ের দায়িত্বটা যিনি আমাকে দিয়ে গেলেন, তিনি তো জানতেন আমার অবস্থা। তা সত্ত্বেও কেন আমাকেই খুঁজে বের করলেন তা আমি জানি না।
আমরা কয়েকজন মিলে ট্রাকে করে মনোয়ার ভাইয়ের লাশ নিয়ে যেদিন রাজশাহী পৌঁছাই, সেদিন প্রথম হেনাকে দেখি। দেখতে অবিকল মনোয়ার ভাইয়ের মতো। মাথায় ঘোমটা দেয়া সত্ত্বেও কোঁকড়া চুল মুখের সামনে এসে পড়েছে। শীর্ণদেহের এই কিশোরীকে দেখে মনে হয় পৃথিবীর নির্মম বাস্তবতা যে তার সামনে হাজির হয়েছে সে তা এখনো বুঝতে পারেনি। হেনার ফুপুর কাছে আমি চিঠিটা দিই এবং তাকে জানাই নিজে জেনে-বুঝে সিদ্ধান্ত দিতে। উনি চারদিন সময় চান।
পরদিন মনোয়ার ভাইয়ের কবরের পাশে পুকুরঘাটে সিমেন্টে বাঁধানো বসার জায়গায় বসে আলাপ শুরু করেন। শ্বশুরবাড়িতে উনার নিজের টিকে থাকার সংগ্রামের দীর্ঘ গল্প আমাকে শোনান। উনি যে হেনার দায়িত্ব নিতে পারবেন না, সেটা নিজ মুখে বলতে পারছিলেন না। এ কারণে নয় যে, উনি চান না দায়িত্ব নিতে। উনি বলতে পারছিলেন না, কারণ নিজ সংসারে একজন অবহেলিত ও বঞ্চিত মহিলা হিসেবে নিজের লড়াই করার সামর্থ্য নেই বলে তিনি লজ্জায় ও আড়ষ্টতায় কুঁকড়ে ছিলেন। আমার যা বোঝার তা আমি আগেই বুঝে নিয়েছিলাম। শুধু জানার প্রয়োজন ছিল একমাত্র অভিভাবক হিসেবে তিনি আমার কাছে হেনাকে রাখতে দেবেন কিনা।
হেনাকে নিয়ে খুলনায় ফিরে আসি কার্তিক মাসে। সারা দেশে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে শুরু করেছে। বর্ষা শেষ হলেও সমুদ্রে নিম্নচাপের কারণে সেদিন সারা দিন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। বিকালের দিকে যখন ট্রেন এসে স্টেশনে থামে, তখন তুমুল বর্ষণ শুরু হয়। যাত্রীরা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে। তাকিয়ে দেখি হেনার চোখ দিয়ে দরদর করে পানি পড়ছে। হয়তো ঝড়ের দিনে বাবার সঙ্গের সময়গুলোর কথা তার মনে হয়েছে। বৃষ্টি থামলে আমি যখন বাড়ি পৌঁছাই, দূর থেকে দীবার আনন্দধ্বনি শুনি। দরজায় আমাকে দেখে দীবা খুশিতে নাচতে থাকে। তারপর হেনাকে দেখে তার হাত ধরে বাগান দেখাতে নিয়ে যায়। বাড়ির সামনের উঠানে আমের বোল ঝরে পড়ে হলুদ হয়ে গেছে। এর ওপর পা দিয়ে হেঁটে যায় দীবা আর হেনা।
ঘরের দরজার সামনে খোলা বারান্দার দিকে চোখ চলে যায়। তনুকে দরজার বাইরে এসে দাঁড়াতে দেখে আমি মুখ নিচু করে রাখি। এই লজ্জা কোথায় রাখি। এতদিন পালিয়ে থেকে ফিরে এসেছি। আবার সেই তনুর কাছেই, যে তনুকে আমি দিনের পর দিন কষ্টে রেখেছি। তনু কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে হেনার দিকে। আমি তনুকে ঘরে আসতে ইঙ্গিত দিয়ে নিজেও ঘরে ঢুকি। তনুকে সব বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি। মনোয়ার ভাইয়ের লেখা চিঠিটা পড়তে দিই। তনু মুখ কালো করে বসে থাকে।
আমি একটা অপ্রয়োজনীয় মানুষের মতো ব্যাগ খুলে কাপড় বের করি। গোছাতে গোছাতে যখন দেখছি তনু ঘটনার আকস্মিকতায় প্রায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছে, আমি ভেজা কাপড় ছেড়ে গোসলখানায় ঢুকে যাই। ভেতর থেকে শুনি দীবা আর হেনা বাইরে গল্প করছে। হেনা বলছে, হাসনাহেনা ফুলের ঘ্রাণ কী সুন্দর! দীবা বলে, ঘ্রাণ কী? হেনা ঘ্রাণ নেয়ার ভঙ্গি করে বলে ফুলের ভেতর ঘ্রাণ থাকে।
আমি আস্তে আস্তে গায়ে ঠাণ্ডা পানি ঢালতে থাকি। ভাবি এই গোসলটা শেষ না হলে কী ভালো হতো। মগ দিয়ে পানি ঢালতে ঢালতে আমার খুব ক্লান্ত লাগে। কতদিন পর নিজের বাড়িতে গোসল করতে ঢুকেছি। সন্ধ্যা নেমে আসছে। অথচ বের হতে গিয়ে মনে হচ্ছে পা ভারী হয়ে গেছে। হঠাৎ কারেন্ট চলে গেলে অন্ধকারেই গা মুছে বের হই।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই তনু এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। তনুকে বুকে জড়িয়ে ধরে দেখি টেবিলের ওপর হ্যারিকেনের আলোয় তনুকে লেখা আমার চিঠিটা খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। বুকপকেট থেকে নিজেই খুঁজে বের করে নিয়েছে তনু।
হাসনাহেনা ফুলের গন্ধে তখন ভরে গেছে ঘর। বাইরে হেনা আর দীবা পাঁচ-ছয়টা বিড়াল ছানার পেছন পেছন ঘুরছে। আমি তখন তনুকে জড়িয়ে ধরি। মনোয়ার ভাই কি আগেই জানতেন এমন একটা কিছু ঘটবে? আমি জানতাম না। আমার তো পিপার স্প্রে খেয়ে মরে যাওয়ারই কথা ছিল।





