সুবাদার ইসলাম
খানের নাম
বাংলার ইতিহাসের
সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে
জড়িয়ে। কিন্তু
মানুষটির ইতিহাসের
শিকড় রয়েছে
উত্তর ভারতে।
ইসলাম খান
মোগল বাদশাহ
জাহাঙ্গীরের সময়ে
বাংলার সুবাদার
হয়ে আসেন।
মোগল বংশের
সঙ্গে ইসলাম
খান পুরুষানুক্রমে
যুক্ত। মোগল
দরবারের সঙ্গে
এ বংশের
যোগসূত্র খুঁজতে
আকবরের শাসনামল
স্মরণ করতে
হয়। মোগল
ইতিহাস সম্পর্কে
আগ্রহী কমবেশি
সবাই জানে
শেখ সেলিম
চিশতির দোয়ায়
আকবর একটি
পুত্রসন্তান পেয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে
তিনি সেলিম
চিশতির নামের
সঙ্গে মিল
রেখে পুত্রের
নাম রাখেন
সেলিম এবং
সেলিম চিশতির
সম্মানে ফতেহপুর
সিক্রিতে একটি
শহর পত্তন
করেন। বাংলার
সুবাদার ইসলাম
খান এ
সেলিম চিশতির
উত্তরপুরুষ।
ইসলাম
খানের পিতৃদত্ত
নাম আলাউদ্দীন।
তিনি শেখ
সেলিম চিশতির
পৌত্র। আলাউদ্দীনের
পিতার নাম
শেখ বদরউদ্দীন।
বংশটি চিশতিয়া
তরিকার অনুসারী
হওয়ায় আলাউদ্দীনের
নামের সঙ্গেও
চিশতি যোগ
হয়। আকবরের
সময় থেকে
সেলিম চিশতির
পরিবার মোগল
পরিবারের কাছে
সম্মানীয়। ইসলাম
খান সম্পর্কে
ইতিহাসবিদরা বলেন,
ছেলেবেলায় তিনি
বাদশাহ জাহাঙ্গীরের
খেলার সঙ্গী
ছিলেন। বাদশাহ
জাহাঙ্গীরের দুধভাই
কুতুবউদ্দীন কোকা
ছিলেন ইসলাম
খানের ফুফাতো
ভাই। কুতুবউদ্দীন
কোকার সঙ্গে
জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠ
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক
ছিল। সে
কথা ইতিহাসের
পাঠকমাত্রেই অবগত।
ইসলাম খানের
প্রতি জাহাঙ্গীর
ছিলেন উদার।
এমনকি ইসলাম
খান উপাধিও
আসলে জাহাঙ্গীরের
দেয়া। ইসলাম
খানের প্রতি
বাদশাহের মনোভাব
সম্পর্কে তার
আত্মজীবনী থেকেই
জানা যায়।
জাহাঙ্গীর লিখেছেন,
‘I
dignified Shaikh Ala’u-d-din, grandson of Shaikh Salim, who had strong
connections with me, with the title of Islam Khan.’
ইসলাম
খানের জন্মবর্ষ
সম্পর্কে স্পষ্ট
তথ্য নেই।
তবে জাহাঙ্গীর
লিখেছেন, ইসলাম
খান সম্ভবত
তার তুলনায়
এক বছরের
ছোট। বাদশাহ
জাহাঙ্গীরের জন্মসাল
১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দ
হিসাবে ইসলাম
খানের জন্ম
১৫৭০ খ্রিস্টাব্দ
ধরে নেয়া
যায়। বাংলার
সুবাদার হিসেবে
নিয়োগের সময়
জাহাঙ্গীরের সভাসদরা
এ সিদ্ধান্তের
বিরোধিতা করেছিলেন।
তাদের একটি
যুক্তি ছিল
ইসলাম খানের
বয়স কম।
এছাড়া যুদ্ধবিদ্যায়
ইসলাম খানের
উপযুক্ত প্রশিক্ষণও
ছিল না।
সেখান থেকে
ধারণা করা
যায় ইসলাম
খানের পরিবারে
রণকৌশল, রাজনীতির
শিক্ষার চল
ছিল না।
পরিবারটি ধর্ম
ও অধাত্মবাদই
চর্চা করত।
ইসলাম খানের
জীবন দেখলে
তিনি ধার্মিক
ছিলেন বলেই
মনে হয়।
পানদোষে আক্রান্ত
জাহাঙ্গীর নিজে
ইসলাম খানের
স্বভাবের প্রশংসা
করে লিখেছেন,
‘তিনি
সাহসী এবং
ভালো স্বভাবের
তরুণ। এ
পর্যন্ত তিনি
কখনো মাদক
স্পর্শ করেননি।’
ইসলাম
খানের জন্ম
ফতেহপুর সিক্রিতেই।
যেহেতু তিনি
জাহাঙ্গীরের খেলার
সঙ্গী ছিলেন,
মোগল রীতিনীতির
সঙ্গেও তার
পরিচয় ছিল।
জাহাঙ্গীরের প্রতি
তিনি অনুগত
ছিলেন। বয়সে
মাত্র এক
বছরের কনিষ্ঠ
হলেও জাহাঙ্গীর
তাকে ‘ফরজন্দ’
(পুত্র) বলে
সম্বোধন করতেন।
সিংহাসনে আরোহণের
পর ইসলাম
খান উপাধি
দেয়ার পাশাপাশি
জাহাঙ্গীর তাকে
দুই হাজারি
মনসবও প্রদান
করেছিলেন। ইসলাম
খানের প্রতি
জাহাঙ্গীরের নির্ভরতা
ছিল। জাহাঙ্গীর
কুলি খানের
মৃত্যুর পর
তিনি তাই
সুবাদার হিসেবে
ইসলাম খানকেই
মনোনীত করেন।
জাহাঙ্গীরের বয়ানে,
‘তার
স্বভাবের মাধুর্য
এবং সহজাত
প্রতিভা আমার
অভিজ্ঞ দৃষ্টি
আকর্ষণ করেছিল।
তাই নিজে
থেকে আগ্রহী
হয়েই আমি
তাকে সে
দায়িত্ব দিয়েছিলাম।’
শেখ বদরউদ্দীনের পুত্র ইসলাম খান চিশতির পরিবারের অন্যরাও মোগল দরবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তবে ইসলাম খান সর্বাধিক। তার বিয়ে হয়েছিল আকবরের সভাসদ আবুল ফজলের বোনের সঙ্গে। তারা একটি পুত্রসন্তানের জনক-জননী হয়েছিলেন। হুসাঙ্গ নামে ইসলাম খানের এ পুত্রও মোগল সুদৃষ্টি লাভ করেছিলেন। বাংলায় হুসাঙ্গ তার পিতার সঙ্গে বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এছাড়া অন্য এক স্ত্রী থেকে মুয়াজ্জম নামে তার আরেক পুত্র ছিল। ইসলাম খানের কন্যাও ছিল, কেননা ইসলাম খানের কয়েক বছর পর বাংলার সুবাদারি লাভ করা মোকাররম খান ছিলেন ইসলাম খানের জামাতা। মোকাররম খানও সেলিম চিশতির উত্তরপুরুষ। ইসলাম খানের পুরো পরিবার ও বংশ এভাবেই নিজেদের কর্ম এবং মোগল শাসনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আপন আপন কীর্তি রেখে গেছেন।





