[ইসলাম খানের মৃত্যু ও দাফনের নিচের বিবরণটি খালেকদাদ চৌধুরী অনূদিত মির্জা নাথানের বাহারীস্তান-ই-গায়বী থেকে সংকলিত] 

ইসলাম খাঁর টোক থেকে ভাওয়াল যাত্রা

এই বিস্ময়কর ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ হচ্ছে—কোচরাজ্য জয়ের অভিযানের শুরুতে ইসলাম খাঁ তাঁর পুত্র শেখ হুসাঙ্গকে শাহি ফরমান অনুসারে শাহি রাজধানীতে প্রেরণ করেন। শেখ হুসাঙ্গ ইসলাম খাঁর জন্য কিছু মৌখিক নির্দেশ নিয়ে শেখ ইবনে ইয়ামিনের সঙ্গে পুনরায় ঢাকা ফিরে আসেন। ইসলাম খাঁ শাহি নির্দেশের বিস্তারিত বিবরণ জানতে পেরে খোদাই গজবের মতো নির্মম শাহি অসন্তুষ্টির মুখেও নিজকে সংযত রাখেন এবং এ ব্যাপারে কারো সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। তিনি শেখ ইবনে ইয়ামিনকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন এবং তাকে তার বিশ্বস্ত কর্মচারীদের জিম্মায় ছেড়ে দেন। তিনি সব সময়েই কোচ বিজয়ের খবর রাখতেন। তিনি কী কী ধন সম্পদের অধিকারী সে সম্বন্ধে অবহিত রাখার উদ্দেশ্যে কোনো না কোনো ছুতায় তিনি প্রতিদিন তাঁর পুত্র হুসাঙ্গকে তাঁর সমস্ত হীরা-জহরত, ধন-দৌওলত ও অন্যান্য দ্রব্য দেখাতেন। তিন মাস অতিবাহিত হওয়ার পর পরীক্ষিতের পলায়ন এবং শাহি ফৌজ কর্তৃক পশ্চাদ্ধাবনের সংবাদ তাঁর কাছে পৌঁছলে তিনি ভাওয়াল হয়ে জাহাঙ্গীরনগর প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত করেন। তাই ভাওয়াল রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত হন এবং পুত্র শেখ হুসাঙ্গ ও দেওয়ান শেখ ভিকনকে জাহাঙ্গীরনগর পাঠিয়ে দেন। এক শুভলগ্নে তিনি যাত্রা করেন এবং প্রতি মঞ্জিলে শিকার করতে করতে চারদিনের মধ্যে ভাওয়াল পৌঁছেন। তিনি নববর্ষের উৎসবে ভাওয়ালের গৃহসমূহ দিনের মতো আলোকসজ্জিত করার জন্য হুকুম দেন।

ইসলাম খাঁর মৃত্যু

রাজা পরীক্ষিত কর্তৃক সমস্ত রণহস্তী সমর্পণ এবং তাঁর আত্মসমর্পণের খবর সংবলিত মোকাররম খাঁ ও শেখ কামালের চিঠি ইসলাম খাঁর নিকট এসে পৌঁছলে সংবাদ লেখক খাজা ইয়াঘমাকে ডেকে পাঠিয়ে বলেন: ‘আপনি আপনার ইতিকথায় লিখে রাখুন যে, যে কোচরাজ তার বংশের এক শতাব্দীর স্বাধীন রাজত্বের দাবি করতেন, তাকে কী করে মুহূর্তের মধ্যে পদানত করা হয়েছে, এবং কী করে আমি তাকে বাদশার অধীন সামন্তরাজে পরিণত করেছি।’ তিনি খাজা তাহির মোহাম্মদ বখ্শীকে হুকুম দেন সেদিন থেকে আগের মতো সমস্ত ওমরাহদের চৌকিতে হাজির থাকার জন্য। মোকাররম খাঁ ও শেখ কামালের চিঠির জওয়াবে তিনি তাদের অবিলম্বে চলে আসার নির্দেশ দেন। তখন তিনি আমোদ-প্রমোদ ও শিকারে নিজকে নিয়োজিত করলেন। মহা ধুমধাম ও জাঁকজমকের সঙ্গে রাজা পরীক্ষিতের আত্মসমর্পণ গ্রহণের প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকলেও আল্লাহর অভিপ্রায় ছিল ভিন্নরূপ। একদিন তিনি শিকারের জন্য বের হলে তাঁর মৃত্যু হয়।


শিকারের আনন্দ উপভোগের পর এবং রাত্রের আহারের শেষে শিবিরে ফিরে আসার জন্য ইসলাম খাঁ হাতির পিঠে অবস্থিত হাওদায় উঠে বসেন। ইবনে ইয়ামিনকেও তাঁর হাতিতে উঠিয়ে নেন এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে বাদশাহের মৌখিক নির্দেশ পালন করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি অসুস্থ বোধ করেন এবং দ্রুত ভাওয়ালের দিকে এগিয়ে চলেন। সেই মুহূর্তেই সংবাদবাহীরা তাকে জানায় যে রাজা পরীক্ষিতকে নিয়ে মোকাররম খাঁ, শেখ কামাল, মির্জা হাসান এবং রাজা রঘুনাথ টোকে এসে পৌঁছেছেন। তখনই তিনি তাঁর ওস্তাদ পুত্র হানসুকে রাত্রের মধ্যেই টোক থেকে তাদের নিয়ে আসার জন্য দ্রুতগামী ঘোড়া প্রেরণ করেন। তিনি নিজে ‘সুখপালে’ আরোহণ করে সন্ধ্যার দু’ঘড়ি পর তাঁর শিবিরে পৌঁছেন। তাঁর এ অবস্থা সত্ত্বেও তিনি বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের সঙ্গে তাঁর কর্তব্য থেকে বিরত হননি। ওমরাহদের বখ্শী মুসা খাঁ কাম্বুকে তাহমাস কুলি আসঘাসীর নিকট পাঠানো হয়, খাজা তাহির মোহাম্মদ বখ্শী ও অন্যান্য ছোট বড় সকল জমিদারদেরকে ইসলাম খাঁর ব্যক্তিগত কক্ষে ডেকে পাঠানোর খবর দিতে। সেভাবেই কাজ করা হয়। সমস্ত খাঁ-দের আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সেই কক্ষে আবদ্ধ করা হয়। অত্যন্ত দুর্বলতাবশত তখনি ইসলাম খাঁ সংজ্ঞা হারাতে থাকেন। অন্য কোনো ভারতীয় চিকিৎসক কাছে না থাকায় সেই সংকট মুহূর্তে তিনি হেকিম কুদ্সীকে তাঁর চিকিৎসা করার জন্য ইঙ্গিত করেন। কিন্তু মৃত্যুর তীর ততোক্ষণে জ্যা চ্যুত হয়ে গেছে। তাই সংজ্ঞাহারা অবস্থায় যে উপযুক্ত ও শক্তিবর্ধক ওষুধ দেওয়া দরকার হেকিম তা না দিয়ে বোকার মতো চন্দনের প্রলেপ মালিশ করেন এবং প্রচুর গোলাপ জল তাঁর গায়ে ছিটিয়ে দেন এবং এতেই তার সব শেষ হয়ে যায়।

ইসলাম খাঁর মৃত্যুসংবাদ গোপন রাখা হয়

হান্সু যিনি টোক থেকে মোকাররম খাঁ, শেখ কামাল, মির্জা হাসান বখ্শী এবং রাজা রঘুনাথকে আনতে গিয়েছিলেন, প্রস্তাব করেন যে রাজা পরীক্ষিতসহ তাদেরকে যথাসম্ভব শিগগির নিয়ে আসতে হবে, যাতে তাঁরা ইসলাম খাঁর মৃত্যুর পূর্বেই এসে পৌঁছতে পারেন। কিন্তু দিন শেষ হওয়ার ছ’ঘড়ি পূর্বে রওনা হওয়ায় রাত দেড় প্রহরের পর তিনি টোকে পৌঁছেন। ঠিক সে সময়েই শাহি কর্মচারীগণ রাজা পরীক্ষিতকে নিয়ে অপরদিক থেকে টোকে এসে উপস্থিত হন। মোকাররম খাঁ, শেখ কামাল এবং অন্যরা দ্রুততম গতিতে ইসলাম খাঁর নিকট পৌঁছার জন্য দ্রুতগামী ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ভাওয়াল রওনা হন। (এখানে পাণ্ডুলিপিতে অর্ধেকটি বাক্য মুছে গেছে)। কিন্তু ইসলাম খাঁ ততক্ষণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কারারুদ্ধ রাখা নজরবন্দি সমস্ত জমিদারদেরকে বিশ্বস্ত কর্মচারীদের হেফাজতে রাখা হয়। তারা এত সতর্কতা ও তত্পরতার সঙ্গে তাদের কাজ শেষ করেন যে রাত চার প্রহর পর্যন্ত কাকেও ঘর থেকে বের হতে বা ঘরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। রাতেই তারা ইসলাম খাঁর লাশ সরিয়ে ফেলার জন্য কাফনের ব্যবস্থা করেন।

পরীক্ষিত কর্তৃক ইসলাম খাঁর মৃতদেহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন

শাহি কর্মচারী এবং রাজা রাঘুনাথকে নিয়ে মোকাররম খাঁ পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে খাজা তাহির মোহাম্মদ বখশী ইসলাম খার পক্ষ থেকে মোকাররম খাঁ, শেখ কামাল, মির্জা হাসান এবং রাজা রঘুনাথকে ভেতরে যেতে বলেন। এরপর রাজা পরীক্ষিত তার সম্মান দেখাবেন। তাঁরা ভেতরে ঢুকে ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ দেখতে পান এবং নীরব থাকেন। রাজা পরীক্ষিতকে ভেতরে ডাকা হলো। ইসলাম খাঁর মৃতদেহের প্রতি তাঁকে আনুগত্য জানাতে হলো। তারা উচ্চকণ্ঠে বললেন: ‘ইসলাম খাঁর ব্যাপার যখন এ পর্যন্ত পৌঁছেছে তখন বাদশার নিরাপত্তার জন্য চলুন আমরা প্রার্থনা করি। হাজার হাজার জীবন তাঁর জন্য উৎসর্গ হতে প্রস্তুত আছে। আল্লাহ সর্বপ্রকারে তাকে সুখী করুন।’ তাঁরা তখন ইসলাম খাঁর পদ্ধতি অনুযায়ী রাজা পরীক্ষিতকে কারারুদ্ধ করে রাখার প্রস্তাব করেন। কিন্তু মোকাররম খাঁ তাঁর জামিন হলেন।

ইসলাম খাঁর দাফন

শাহি কর্মচারীরা সকল রকম আড়ম্বরসহ ইসলাম খাঁর লাশ নিয়ে ভাওয়াল পরিত্যাগ করে জাহাঙ্গীরনগরের দিকে রওনা হন। পথে দ্বিতীয় মঞ্জিলে ভাওয়াল থেকে ছ’ক্রোশ এগিয়ে এসে বরমপুরের দিকে দু’ক্রোশ এবং জাহাঙ্গীরনগর থেকে চার ক্রোশ দূরবর্তী এক স্থানে তারা থামেন। মির্জা হোসেন বেগ দেওয়ানসহ শেখ হুসাঙ্গ এবং শেখ ভিকন জাহাঙ্গীরনগর থেকে এখানে এসে শোকাচার পালন করেন। যেখান থেকে তাঁকে জাহাঙ্গীরনগরস্থ ‘বাগ-ই-শাহী’ (ঢাকার পুরাতন হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ) উদ্যানে আনা হয় এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

উল্লেখ্য, ইসলাম খানের মৃত্যু হয়েছিল ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ আগস্ট। পরবর্তী সময়ে ইসলাম খানের শবাধার ঢাকার মাটি থেকে আগ্রার ফতেহপুর সিক্রিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার দাদা সুফি সন্ত সেলিম চিশতির মাজারের ভেতরে তাকে পুনরায় সমাধিস্থ করা হয়।