হে খসরু, প্রেমের নদী কোনদিকে বয়

তার ঠিক-ঠিকানা নেই

নদীতে একবার যে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে-ই ডুবে

আর যে ডুবে সে-ই তো পার পেয়ে যায়।

***

মজনুর পায়ের জিঞ্জিরের শব্দ প্রেমের অর্কেস্ট্রা

জ্ঞানীর শ্রবণ এই সংগীতের মর্ম বুঝতে পারে না।

***

আমি যদি তাকে নাও দেখি, তার কথা তো ভাবতে পারি

আমি তাতেই খুশি

ভিখেরির বাড়ি চাঁদের চেয়ে বেশি আলোকিত করবে কোন বাতি?

***

মানুষ ভাবে তারা জীবিত কারণ তাদের আত্মা আছে

কিন্তু আমি জীবিত কারণ আমার ভেতরে ভালোবাসা আছে

আমার ভালোবাসার যাতনায় আমি শহীদ হয়ে গেছি।

***

আমার প্রেমিকা তুর্কি ভাষায় কথা বলে

আমি তুর্কি জানি না

আমি কেমন করে চাইব তার জিহ্বা যেন আমার মুখে থাকে।

***

বার্ধক্য ও ভালোবাসাবাসি একসাথে যায় না

কিন্তু খসরু, এই যুক্তির বিরুদ্ধে তুমিই তো প্রমাণ।

***

তোমাকে নির্ঘুম দেখায়—কার আলিঙ্গনে কাটছে তোমার রাত

তোমার মদির চোখে এখনো নেশার ঝিমুনি।

***

সুরমা যদি তার সৌন্দর্য তোমার চোখে তুলে না ধরে

তাহলে তোমার দোরগোড়ার ধূলিই চোখে জুতসই হবে।

***

আমাকে সারা রাত নির্ঘুম রেখে

সহানুভূতি কেমন করে তার চোখে প্রতিবিম্বিত হবে

যার চোখ রাতের বেলা ঘুম ছাড়া অন্য কিছু জানে না।

***

আমি হয়ে গেছি তুমি আর তুমি হয়ে গেছ আমি

আমি দেহ আর তুমি আত্মা

যে এমন থেকে কেউ আর বলতে না পারে

তুমি একজন আর আমি অন্য কেউ।

***

কেবল একটি চাহনিতে তুমি আমার দৃষ্টি নিয়ে গেছ, আমার পরিচয়

কেবল একটি চাহনিতে তুমি আমার দৃষ্টি নিয়ে গেছ, আমার পরিচয়

প্রেমের মদিরায় আমাকে চুমুক দেওয়ালে

একটি চাহনিতে তুমি আমাকে মাতাল করে দিলে

আমার সুন্দর কোমল কবজি সবুজ চুড়িতে ঢাকা

কেবল একটি চাহনি আমার সে হাত শক্ত করে ধরে আছে

আমার জীবন তোমাকে দিয়ে দিই রঙের কারিগর

কেবল একটি চাহনিতে তোমার ভেতর আমাকে রাঙিয়ে নিয়েছ।

আমার এ প্রাণ তোমাকে দিয়ে দিই, হে নিজাম

কেবল একটি চাহনিতে তুমি আমাকে তোমার কনে বানিয়েছ

কেবল একটি চাহনিতে তুমি আমার দৃষ্টি নিয়ে গেছ, আমার পরিচয়।

***

চারদিকে এ কী রঙের আভা দেখি মা, রঙের আভা

আমার প্রিয়কে পেয়ে গেছি, পেয়ে গেছি তাকে

আমারই আঙিনায়

আমার পীর নিজামুদ্দিন আওলিয়াকে পেয়ে গেছি

একজন আদর্শ প্রেমিকের খোঁজে

আমি সারা পৃথিবী ঘুরে এসেছি

শেষ পর্যন্ত আমার অন্তর মোহিত করেছে এই মুখ

আমার সামনে খুলে গেছে সারা পৃথিবী

এমন আভা আর আগে কখনো দেখিনি

এখন যখনই দেখি, তিনি আমার সাথেই আছে

প্রিয় তোমার ভেতর আমাকে রাঙিয়ে নাও

প্রিয়, আমাকে বসন্তের রঙে রাঙায়

কী যে তার আভা! কী যে তার আভা!

***

আগার ফিরদাউস বার রুয়ে জামিনাস্ত

পরের লাইনটি; হামিনাস্ত ও হামিনাস্ত ও হামিনাস্ত।

দিল্লির লালকেল্লায় দিওয়ান-ই-খাস খিলানের ভেতরের দিকে উত্তরে এবং দক্ষিণে খোদিত আছে এ দুটি পঙিক্ত। বাংলা অনুবাদে এর অর্থ: পৃথিবীতে যদি কোথাও স্বর্গ থেকে থাকে/ তা এখানেই, তা এখানেই, তা এখানেই।

বহুল উদ্ধৃত স্মরণীয় এ পঙিক্ত দুটো রচয়িতা হিসেবে আমীর খসরুসহ কয়েকজনের নামই উল্লেখিত হয়েছে। আসলে কবি কে সে বিতর্কের প্রেক্ষাপট এবং রানা সাফভির গবেষণার সারাংশ তুলে ধরছি।

তাজমহল: দি ইলুমিনেটেড টম্ব গল্পের লেখকদ্বয় বেগলে ও দেশাই বলেছেন দেওয়ান-ই-খাসে প্রথমবারের মতো প্রবেশ করেই সম্রাট শাহজাহান কবিতার পঙিক্ত খোদাই করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আমীর খসরু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুনীল শর্মা বলেন, তিনি কবির সব দিওয়ান ও মসনবি পাঠ করেছেন। এ পঙিক্ত দুটো তিনি কোথাও পাননি। কাজেই ধরে নেয়া যায় এটা আমীর খসরুর রচনা নয়।

কেউ কেউ বলেছেন, স্বর্গ বলতে শালিমার বাগকে বোঝানো হয়েছে, সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে (১৫৬৯-১৬২৭) নির্মিত শালিমার বাগের উপরিভাগে ব্ল্যাক প্যাভিলিয়নে বসে কোনো কবিতা রচনা করেছেন। রানা সাফভি বাগান ও সব প্যাভিলিয়ন এবং শালিমার বাগসংক্রান্ত সব কাগজপত্র পরীক্ষা করে কারো এমন পঙিক্ত রচনা করার কোনো হদিস পাননি। গবেষক অতঃপর বশিরুদ্দিন আহমদ দেহলভির ওয়াকিয়ান-ই-দারুল হুকুমাত দিল্লি গ্রন্থে পান যে পঙিক্তগুলো লিখেছেন আব্দুল্লাহ খান। মোগল রাজসভায় সর্বোচ্চ জ্ঞানী আল্লামা সম্মানপ্রাপ্ত দুজন ছিলেন, একজন আল্লামা আবুল ফজল, অন্যজন আল্লামা আব্দুল্লাহ খান। আব্দুল্লাহ ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের একজন নামকরা কবি ও বুদ্ধিজীবী। আব্দুল্লা খানের কবিতার পঙিক্ত ভারতবর্ষে উচ্চারিত। আব্দুল্লাহ খান সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকাল নিয়ে লেখা আব্দুল হামিদ লাহোরীর ‘বাদশানামা’ গ্রন্থটির তথ্যাবলি পরীক্ষা করে প্রকাশের অনুমোদন দিয়েছেন। ফার্সি ভাষার পণ্ডিত ও আব্দুল্লাহ খান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এমএইচ কাশেমী জানালেন, তিনি ‘আকানা’ ছদ্দনামে খ্যাত মির্যা মুহাম্মদ তাহিরের মুলাক্কাস-ই-শাহজাহান পাণ্ডুলিপিতে পঙিক্ত দুটো দেখেছেন এবং সে পাণ্ডুলিপি নয়াদিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে রয়েছে। তারই পরামর্শ অনুযায়ী দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষার অধ্যাপক জামিলুর রহমানকে নিয়ে পাণ্ডুলিপি পাঠ ও পরীক্ষা করালেন, দ্বিতীয় পাঠের সময় পাণ্ডুলিপির ৮৮ পৃষ্ঠায় লাইন দুটো পেলেন। তারপর নিবিড় পাঠের সময় বেরিয়ে এসে যে মির্যা মুহাম্মদ তাহির তার পাণ্ডুলিপিতে লিখেছেন: কিলা-ই-মোবারক ও তার বাগান নিয়ে হযরত আমীর খসরুই তা রচনা করেছেন।

এ আবিষ্কার নিশ্চিত করে যে বিখ্যাত পঙিক্ত দুটো আসলে আমীর খসরুরই রচনা।

 

আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক