বাংলার ইতিহাসে পলাশীর যুদ্ধ একটি স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে আছে। যুদ্ধ, সিরাজউদ্দৌলা, যুদ্ধকেন্দ্রিক ষড়যন্ত্র এবং রবার্ট ক্লাইভ সম্বন্ধেও নানা রকম কথা প্রচলিত। ইতিহাসের সঙ্গে কিংবদন্তি মিলে আঠারো শতকের এ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাকে আজও ধোঁয়াশাময় করে রেখেছে। পলাশীর সঙ্গে জড়িত দুই প্রধান ব্যক্তি সিরাজউদ্দৌলা ও রবার্ট ক্লাইভ সম্বন্ধে কিংবদন্তি সর্বাধিক। কিংবদন্তি থেকে সরে গিয়ে নানা রেকর্ড, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চিঠিপত্র থেকে সে সময়ের ঘটনাবলি সম্বন্ধে বহু তথ্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব। সে লক্ষ্যেই ব্রিটিশ রেকর্ডে থাকা ক্লাইভের কিছু চিঠিপত্র নিয়ে এ আয়োজন।

মানিকচাঁদকে লেখা ক্লাইভের চিঠি (১৫ ডিসেম্বর, ১৭৫৬)

‘মাদ্রাজ থেকে এ অঞ্চলে এসে আমি শুনেছি ইংরেজ কোম্পানির প্রতি আপনি বিশেষ বন্ধুত্ব প্রকাশ করেছেন। এ কারণে আমি আপনাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি। আমার এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই— তবু আশা করব, কোম্পানির প্রয়োজনে আপনি সর্বাত্মক সহায়তা করবেন।’

চিঠি পেয়ে মানিকচাঁদ কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ উত্তরই দেননি, বরং দূত হিসেবে রাধাকৃষ্ণ মল্লিককেও ক্লাইভের কাছে পাঠিয়েছিলেন। অন্যদিকে জানুয়ারিতে জগৎ শেঠ ও খোজা ওয়াজিদকেও ক্লাইভ একই ধরনের চিঠি পাঠিয়েছিলেন।

ক্লাইভকে লেখা মানিকচাঁদের চিঠি (২৩ ডিসেম্বর, ১৭৫৬)

ক্লাইভের পত্রের প্রাপ্তি স্বীকারের পাশাপাশি তার স্বাস্থ্য সম্বন্ধে সাধারণ কুশল জিজ্ঞাসা করেন। তিনি আরো লেখেন, ‘আপনি লিখেছেন আপনি শান্তিরক্ষার ইচ্ছা রাখেন। আমিও সে রকম ইচ্ছাই রাখি, যেহেতু শান্তিরক্ষার মতো ভালো কিছু আর নেই। সব ধরনের স্বার্থচিন্তার বাইরে গিয়ে এটিই মানুষের শুদ্ধ বৈশিষ্ট্য। এছাড়া অন্যান্য বিষয় সম্বন্ধে রাধাকৃষ্ণ মল্লিক আপনাকে অবহিত করবে। আপনি বলেছেন, যে তিনটি চিঠি পাঠিয়েছেন, কিন্তু তার মধ্যে দুটো আমি পেয়েছি। সম্ভবত অন্যটি হারিয়ে গেছে। আমার মনে হলো এ কথা আপনাকে জানানো প্রয়োজন।’

মানিকচাঁদকে লেখা পরবর্তী চিঠিতে ক্লাইভ নিশ্চিত করেছেন, চিঠিটি কোনোভাবে তার দিক থেকেই হারিয়েছে। সে যা-ই হোক, এ সময়ে ক্লাইভের চিঠিপত্রের ভাষা লক্ষ করে বোঝা যায়, তিনি দেশীয় রাজা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রাথমিক সম্পর্ক রক্ষা করছিলেন। মানিকচাঁদ, জগৎ শেঠকে লেখা চিঠিতে এ প্রাথমিক বন্ধুত্ব প্রার্থনার ইচ্ছা স্পষ্ট হলেও দেখা যায়, এ সময়ে এ দেশীয় রাজা ও ব্যবসায়ীরা ক্ষেত্রবিশেষে ক্লাইভের প্রতি ভদ্রভাবে কঠোরতা প্রকাশ করেছেন। যেমন জগৎ শেঠের চিঠিই লক্ষ করা যায়। হুগলিতে ইংরেজ বাহিনীর তাণ্ডবের পর...

ক্লাইভকে লেখা জগৎ শেঠের চিঠি

(১৪ জানুয়ারি, ১৭৫৭)

‘আপনি হয়তো এমনটা ভেবে খুশি হন যে নবাবকে আমি যা উপদেশ দান করি তিনি সে মতো কাজ করবেন এবং আশা করেন আমি আপনার ও দেশের সাধারণ লাভের জন্য কাজ করব। বস্তুত আমার কাজ একজন ব্যবসায়ীর এবং আমি সেই মতোই কথা বলার চেষ্টা করব যা তিনি মানতে পারেন। কিন্তু আপনি সম্পূর্ণ বিপরীত কাজ করেছেন এবং জোর করে কলকাতা দখল করে নিয়েছেন। এরপর হুগলি দখল করে ধ্বংস করেছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যুদ্ধ করা ছাড়া আপনার ভিন্ন কোনো লক্ষ্য নেই। এ অবস্থায় আমি কিসের ভিত্তিতে নবাবের সঙ্গে আপনার সমঝোতার প্রস্তাব করতে পারি? আপনার এ প্রতিকূল আচরণ দেখে আপনার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ ধরনের আচরণ বন্ধ করুন এবং আমাকে আপনার চাহিদা সম্পর্কে জানান। এরপর আপনি আমার ওপর নির্ভর করতে পারেন, আমি নবাবের ওপর আমার প্রভাব বিস্তার করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব। আসলে আপনি কীভাবে আশা করেন যে একটি সুবা কিংবা শাহজাদার ওপর আপনি আক্রমণ করবেন আর নবাব তা এড়িয়ে যাবেন? নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন।’

ক্লাইভ তার যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য দিয়েছিলেন। আর্মেনীয় ব্যবসায়ী খোজা ওয়াজিদ এর মধ্যে প্রধান। রাজা মানিকচাঁদের মতো তিনিও কোম্পানির প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন। ক্লাইভকে লেখা তার চিঠিতে এ প্রমাণ পাওয়া যায়।

ক্লাইভকে লেখা খোজা ওয়াজিদের চিঠি

(১৭ জানুয়ারি, ১৭৫৭)

‘ইংরেজ কোম্পানির প্রতি বরাবরই আমি সম্মান ধারণ করি। যে কারণ ও লাভের জন্য আপনার জাতি এ দেশে স্থায়ী হয়েছে, তা পূরণ করার জন্য আমি চন্দননগরের পরিচালক মি. রেনোঁর সঙ্গে নবাবের সমস্যা মিটিয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। মি. রেনোঁ সে সম্পর্কে আপনাকে নির্দিষ্টভাবে জানাবেন।’

এ সময়ে কলকাতা অভিযান এবং অন্যান্য কারণে ক্লাইভের মধ্যে কিছু অহংকার, দুর্দমনীয় মনোভাব দেখা যায়। মহারাজা স্বরূপচাঁদ ও শেঠ মাহতাব রায়কে লেখা চিঠিতে ক্লাইভের এ ধরনের মনোভাব প্রকাশ পায়।

স্বরূপচাঁদ ও মাহতাব রায়কে লেখা ক্লাইভের চিঠি

(২১ জানুয়ারি, ১৭৫৭)

‘আমাকে লেখা আপনাদের চিঠি আমি পেয়েছি এবং তা আমাকে আপনাদের কাছে লিখতে উৎসাহিত করেছে। আমি লক্ষ করলাম, আপনারা দেশের স্বার্থে আপনাদের প্রভাব ব্যবহার করে নবাবের সঙ্গে কোম্পানির সংকট উত্তরণে আগ্রহী। কিন্তু ইংরেজদের প্রতি যে অবিচার সিরাজউদ্দৌলা করেছেন এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন তা আপনি বহু লোকের কাছ থেকেই শুনেছেন বলে মনে করি। এ নৃশংসতার পুনরুল্লেখ বাহুল্য মনে করি।...(এ পর্যায়ে ক্লাইভ সংক্ষেপে ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দেন, বিশেষত হতাহতের কথাই বলেন)...

এমন অবস্থায় আমরা আমাদের ক্ষোভ থেকে কী প্রকারে সরে আসতে পারি বলে আপনি আশা করেন? আমরা কি জবাবের আশা রেখে কেবল সামান্য দাবিদাওয়া জানিয়ে নবাবের কাছে একাধিক চিঠি প্রেরণ করিনি? কোনোরূপ আক্রমণ বা প্রতিকূলতা সৃষ্টি না করে আমরা কি বহুদিন ফুলতায় অবস্থান করিনি? মহান রাজার নৌকায় গোলা ছুড়ে বজবজের গভর্নরই কি প্রথম যুদ্ধ শুরু করেননি? এমন আচরণের পর আমরা কী করতে পারি?

এ চিঠিতে ক্লাইভ কেবল ক্ষোভ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং ইংরেজ কোম্পানির শক্তি এবং ক্লাইভের শক্তি ও আক্রমণ সম্ভাব্যতা নিয়েও ভদ্র ভাষায় হুমকি দেন। তিনি লেখেন, ‘অনুগত প্রজাদের মৃত্যুসংবাদ শুনে হিজ ম্যাজেস্টি কীভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করবেন বলে মনে হয়? রাজার শক্তিশালী নৌবহর প্রেরিত হয়েছে এবং মনে রাখবেন, রাজার ইংরেজ প্রতিনিধি হিসেবে আমি রাজার সমান ক্ষমতা ধরি। করোমানডেলে আমরা নবাবের মতো ক্ষমতাশীল শত্রুর মোকাবেলা করেছি এবং সফল হয়েছি; এখানেও সে ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।’

একই দিন তিনি খোজা ওয়াজিদকে একটি চিঠি লেখেন। মাহতাব রায় ও স্বরূপচাঁদকে লেখা চিঠির তুলনায় ওয়াজিদকে লেখা চিঠির ভাষা বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল।

খোজা ওয়াজিদের কাছে ক্লাইভের চিঠি

(২১ জানুয়ারি, ১৭৫৭)

‘আমি আপনার দুটি চিঠিই পেয়েছি এবং আমি আপনাকে নিশ্চিত করছি যে আপনাকে আমি বন্ধুর মতোই দেখেছি সবসময়। আপনি ইংরেজদের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী এবং আমি ক্ষমতায় থাকাকালীন আপনাকে সর্বাত্মক সহায়তা করার চেষ্টা করব। হুগলিতে আপনার ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জেনে আমি মর্মাহত। কিন্তু আমি আপনাকে নিশ্চিত করছি, সেখানে কোনো কিছুই আপনার বিরুদ্ধে কিংবা আপনাকে শত্রুজ্ঞান করে করা হয়নি। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, সেখানে কী ধরনের নৃশংস কর্মকাল্ডের পরিপ্রেক্ষিতে এ পদক্ষেপ নিতে আমরা বাধ্য হয়েছি।

মেজর কিলপ্যাট্রিককে লেখা যে চিঠির কথা আপনি উল্লেখ করেছেন তা আমি কিংবা মেজর কেউই লাভ করিনি। আমার মনে হয়, চিঠিটি হারিয়ে গেছে কিংবা ভুল ঠিকানায় গেছে।

আপনি নিশ্চয়ই করোমানডেলে আমাদের সাফল্য সম্পর্কে শুনে থাকবেন। আমাদের প্রবল ও বহুসংখ্যক শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছে। ক্রমাগত তাদের সঙ্গে সংঘর্ষ করেও আমরা প্রতিবার সফল হয়েছি।...আমি আশা করব, আপনি আপনার প্রভাব ব্যবহার করে নবাবকে ইংরেজদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন করে তুলবেন। আমরা নবাবের সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষা করতে আগ্রহী। সে রকম হলে ইংরেজ কোম্পানিকে নবাব তার বন্ধু হিসেবেই লাভ করবেন।

এক্ষেত্রে আমি ফরাসিদের হস্তক্ষেপে ভরসা করতে পারি না। আমি আপনার বন্ধুত্বের গভীরতায় বিশ্বাস স্থাপন করতে পারি এবং নবাব ও আমাদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভাবতে পারি।’

খোজা ওয়াজিদের প্রতি ক্লাইভের ভরসা ও বন্ধুত্বের নিদর্শন দেখা যায়। অন্যদিকে উমিচাঁদ স্বয়ং ক্লাইভের কৃপাদৃষ্টি কামনা করেন।

ক্লাইভকে লেখা উমিচাঁদের চিঠি

(২৮ জানুয়ারি, ১৭৫৭)

‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, কলকাতা তার পুরনো গৌরব ফিরে পেয়েছে। তারা বেশি ভাগ্যবান যারা আপনার সেবায় নিযুক্ত। কিন্তু আমি আপনার সেবায় নিযুক্ত থাকতে না পেরে নিজেকে অসুখী মনে করছি। আশা করি আমি যখন আপনার সেবা করার সুযোগ লাভ করব, সঙ্গে সঙ্গে আমার স্বাধীনতাও নিশ্চিত হবে। আমি অবগত আছি যে বর্তমানে কিছু দুষ্ট লোকের কারণে আমি আপনার অসন্তোষের কারণ হয়েছি। কিন্তু সেসব দাগ আমি মুছে ফেলতে পারব বলে নিঃসন্দেহ।’

ঈশ্বরের নামে শপথ করে কোম্পানি ও ক্লাইভের সহায়তা ও বন্ধুত্বের নিশ্চয়তা দান করেন উমিচাঁদ। চিঠির শেষে মেজর কিলপ্যাট্রিককে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান তিনি। এ সময়ে কোম্পানি ও যুদ্ধক্ষেত্রে ক্লাইভ সফলতা লাভ করছিলেন। খোজা ওয়াজিদের সঙ্গে সঙ্গে উমিচাঁদের আনুগত্য লাভ করে তার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। এ সময় পিতার কাছে ক্লাইভের লেখা একটি চিঠি পাওয়া যায়। চিঠিটি কৌতূহলোদ্দীপক।

পিতার কাছে ক্লাইভের চিঠি (৩/৪ ফেব্রুয়ারি, ১৭৫৭)

‘আপনাকে শেষবার আমি চেস্টারফিল্ড থেকে লিখেছিলাম এবং আমার বাংলা অভিযান সম্পর্কে জানিয়েছিলাম। এ মুহূর্তে আমি আপনাকে এ কথা জানাতে আনন্দ অনুভব করছি যে আমি নিরাপদে এখানে পৌঁছতে পেরেছি। জেনে খুশি হবেন আমরা জল ও স্থল উভয় ক্ষেত্রে সফলতা লাভ করেছি। কলকাতা পুনরুদ্ধার সম্পন্ন এবং আমরা শক্তি বৃদ্ধি করেছি। কিছুদিন আগে এ প্রদেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর (হুগলি) দখল করে লুণ্ঠন করা হয়েছে।

আমরা আমাদের ছোট সেনাদল নিয়ে ঘাঁটি গেড়ে অপেক্ষা করছি এবং নবাবের ৪০ হাজার সেনাবহর নিয়ে যুদ্ধের অপেক্ষা করছে। আমি আশা করছি শেষ পর্যন্ত সবকিছু কোম্পানির পক্ষেই যাবে। যদিও খুব একটা গৌরবপূর্ণ বিজয় আসবে বলে মনে হয় না। আরো বিস্তারে জানার জন্য আমি আপনাকে মি. ম্যাবটের সঙ্গে কথা বলার জন্য অনুরোধ করছি।’

চিঠির পরবর্তী পর্যায়ে নিজের স্বাস্থ্যগত কিছু বিষয়ে কথা বলার পর তিনি লেখেন, ‘এ দুঃসময়ে আমার অর্থ-সম্পদ ইংল্যান্ডে থাকার কারণে আফসোস করছি। অবশ্য আমি মনে করি সেগুলো এখানে সুরক্ষিত হতো না। কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না, এখানকার যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি আসলে কী হবে। কলকাতা দখলে আমার ক্ষতির পরিমাণ কোনোভাবেই ২ হাজার ৫০০ পাউন্ডের কম নয়।’

অর্থাৎ যুদ্ধ একটা দানা বাঁধছিল, সে কথা ক্লাইভ নিজেও জানতেন। এ সময় তিনি তাই মিত্র তৈরি করায় মনোযোগী হন। উমিচাঁদ তো নিজেকে সমর্পণ করেই রেখেছিলেন, এ পর্যায়ে ক্লাইভ তাকে কেবল বন্ধুত্বে বরণই করলেন না; আমন্ত্রণ জানালেন।

উমিচাঁদের কাছে ক্লাইভের চিঠি

(৯ ফেব্রুয়ারি, ১৭৫৭)

‘আপনার সঙ্গে দেখা করতে আমি বিশেষভাবে আগ্রহী এবং আপনাকে বহু বিষয়ে অবহিত করার আছে। আপনি যদি স্বল্প সময়ের জন্যও আসতে পারেন, সাবধানে কাজটা সমাধা করা যায়। আপনার কোনো ক্ষতি হবে না এবং আপনি আপনার ইচ্ছামতো সময়ে নিরাপত্তার সঙ্গে প্রত্যাবর্তন করতে পারবেন।’

ফেব্রুয়ারিতে লালা রঞ্জিত রায়কে পাঠানো চিঠিতে ক্লাইভ তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

লালা রঞ্জিতের কাছে ক্লাইভের চিঠি

(৯ ফেব্রুয়ারি, ১৭৫৭)

‘আমাদের দাবি ও সন্ধির নকলসহ পাঠানো আপনার চিঠি আমাকে আনন্দিত করেছে। নবাবের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক আমাকে বিস্মিত করেছে। আমি উপলব্ধি করেছি, আপনি আমাদের প্রস্তাবের প্রতি অনুকূল মনোভাব ধারণ করেন। ঈশ্বর সাক্ষী, আমার পদক্ষেপগুলো প্রকাশ্য, উদার ও শান্তির অনুকূল।’

জগৎ শেঠ ও মহারাজ স্বরূপচাঁদকে লেখা ক্লাইভের চিঠি (১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৭৫৭)

‘উমিচাঁদ আমাকে জানিয়েছেন যে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য সম্মানিত নবাবের কাছে লালা রঞ্জিত রায়কে সন্ধি প্রস্তাব নিয়ে পাঠানো হয়েছে। চুক্তিতে সবাই সম্মত হয়েছে এবং উভয় পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তা অনুমোদন করেছে। কোম্পানির মুদ্রা পুনরুদ্ধারে আপনারা যে প্রকার সহায়তা করেছেন, আমি ইউরোপে সে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছি।’

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, এ সময়ে ক্লাইভ বেশ শান্ত এবং তিনি শান্তির কথা বলছেন। পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে, জগৎ শেঠ, স্বরূপচাঁদদের সঙ্গে এ সময়ের মধ্যে তার ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। মনে রাখতে হবে, পলাশীর যুদ্ধ ১৭৫৭ সালের জুনে সংঘটিত হয় এবং এসব চিঠি একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে আদান-প্রদান হয়েছিল। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ক্লাইভ তার পিতাকে আরেকটি চিঠি লেখেন।

পিতার কাছে ক্লাইভের চিঠি

(২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৭৫৭)

‘জনাব, বিগত চিঠিতে আমি আপনাকে জানিয়েছিলাম, ২০ হাজার ঘোড়সওয়ার ও ৩০ হাজার পদাতিক সেনা নিয়ে আমাদের অবস্থান থেকে এক মাইল দূরে নবাব অবস্থান করছিলেন। এ অবস্থায় আমি আক্রমণ করতে বাধ্য হই এবং সকাল হতে না হতেই আক্রমণ করি। আমাদের সাফল্য ছিল অনেক। ২ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা ১ হাজার ৩০০ সেনাকে হত্যা করি। সকাল ৫-৬টার মধ্যে শতাধিক ঘোড়সওয়ার ও চারটি হাতি নিকাশ করে দিই। এ অবস্থার কারণে নবাব একটি চুক্তি করতে বাধ্য হন। কোম্পানির জন্য এ চুক্তি খুবই সম্মানজনক এবং লাভ বয়ে আনবে। এখান থেকে আগের তুলনায় কোম্পানির জন্য বেশি সুযোগ তৈরি হবে। নবাব আমাকে মুরদের একটি পোশাক, রত্ন ও একটি হাতি উপহার দিয়েছেন।’

পিতার কাছে লেখা ক্লাইভের এ দ্বিতীয় চিঠি প্রমাণ করছে, নবাবের সঙ্গে সে মুহূর্তে তার স্বাভাবিক সম্পর্ক বিদ্যমান। একই সময়ে নন্দকুমারকে লেখা এক চিঠিতে তিনি নন্দকুমারের প্রতি বন্ধুত্ব প্রকাশ করেন। নন্দকুমারকে লেখা ১৬ মার্চের চিঠিতে ক্লাইভের বক্তব্য দেখে মনে হয়, নবাবের প্রতি তার কোনো ক্ষোভ বা ক্রোধ অনুপস্থিত। তিনি মনে করেন, ফরাসিরা কূটনৈতিক কৌশলে নবাবকে ইংরেজদের সম্পর্কে ভুল ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে তিক্ততা সৃষ্টি করেছে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে মোহনলাল বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন, এ কথা সবারই জানা। মজার ব্যাপার, ক্লাইভ তাকেও একটি চিঠি লিখেছিলেন এবং সেখানে নবাবের পক্ষে ক্লাইভ ও ইংরেজ বাহিনী প্রয়োজনে যুদ্ধ করবে বলে কথা দেন।

মোহনলালের কাছে ক্লাইভের চিঠি

(২৩ এপ্রিল, ১৭৫৭)

‘আপনার অসাধারণ দক্ষতা এবং নবাবের সঙ্গে আপনার নৈকট্য আমাকে আপনার কাছে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমি মনে করি, চেষ্টা করলে আমাদের সংকট সমাধান করা সম্ভব। এতে যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হবে। কলকাতা আক্রমণের সময় আমি তা প্রতিরোধ করেছিলাম এবং এখন আমার সেনা আরো সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হয়েছে। আমি এ মুহূর্তে আপনাকে অনুরোধ করছি, আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব বৃদ্ধি লাভ করুক। প্রয়োজনে আমি এখন নবাবের বিপক্ষে নই, বরং পক্ষে লড়াই করব। এতে বন্ধুত্ব তৈরির পাশাপাশি শান্তিও রক্ষিত হবে।’

কিন্তু আদতে শান্তি রক্ষিত হয়নি। ক্লাইভ নবাবের পক্ষে লড়াই করেননি; বরং এ চিঠি প্রদানের দুই মাসের মাথায় তিনি নবাবের বিরুদ্ধেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এর মধ্যে ক্লাইভ নানা সময় নন্দকুমার, মীরজাফর আলী খান প্রমুখের সঙ্গে পত্রালাপ করেছেন। এর মধ্যে জুনের শুরুতে হুগলির ফৌজদার আমিরউল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করে তার আনুগত্য (বন্ধুত্ব) কামনা করলে আমিরউল্লাহ সরাসরি জানিয়ে দেন, তিনি নবাবের খেদমতে নিয়োজিত।

মূলত ক্লাইভ এ সময়ের মধ্যে দেশীয় ব্যবসায়ী, সেনাপতি, রাজনীতিকদের কাছে পত্র পাঠিয়ে কোম্পানি ও নিজের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেছেন। বহু চিঠি তিনি নবাবকেও লেখেন। নবাব ও অনেক দেশীয়র কাছে ব্যর্থ হলেও বহু ক্ষেত্রে সফলতা লাভ করেছেন। মোহনলাল, আমিরউল্লাহ না হলেও মীরজাফর আলী খান, মীরন, জগৎ শেঠ, নন্দকুমারদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়। এসব বন্ধুত্ব, মীরজাফরের সঙ্গে চুক্তি, উমিচাঁদদের সহায়তার কারণেই আম্রকাননে ক্লাইভ সফল হয়েছিলেন।

মাহমুদুর রহমান: লেখক