ইংরেজদের গালাগাল
দিয়ে কাজ
নেই, ইতিহাসের
বাইরেরটা না
দেখে ভেতরে
দেখুন। উইলিয়াম
ডালরিম্পল ভেতরের
সত্যটা দেখিয়েছেন
তার ‘দি
অ্যানার্কি’ গ্রন্থে।
আকবর প্যাটেলের
একটি লেখা
‘ব্রিটিশরাজের
দায় ব্যাংকারদের’
সংক্ষেপে অনুসৃত
হচ্ছে—
১৬৬২-এর
এপ্রিলে ইংল্যান্ডের
রাজা দ্বিতীয়
চার্লস পর্তুগিজ
রাজকুমারীকে বিয়ে
করে যৌতুক
হিসেবে যা
পেলেন, তা
কেবল ভারতবর্ষের
নয়, পৃথিবীর
ইতিহাসের মোড়
ঘুরিয়ে মাল্টিন্যাশনাল
শক্তির অভ্যুত্থানের
সুযোগ করে
দিল। ভারতে
সৃষ্টি করল
কুচক্রী এক
ব্যাংকারগোষ্ঠী। ভারতীয়
উপকূল তখন
পর্তুগিজ শাসনে।
পর্তুগিজরা তাদের
প্রিন্সেসকে নিয়ে
কন্যাদায়গ্রস্ত ছিল
মনে করার
কারণ নেই,
কিন্তু যে
পাত্র তাদের
পাত্রীর ও
শ্বশুরালয় হিসেবে
পর্তুগালের মর্যাদা
বাড়িয়ে দেবে,
তার জন্য
উপযুক্ত উপদেষ্টা
ও যৌতুক
তো প্রাপ্য
হতেই পারে।
যৌতুকের প্রতিশ্রুতি
এবং বাস্তবতার
মধ্যে কিছু
প্রতারণা ছিল।
কথা ছিল
চার্লসকে বোম্বের
ভেতরে বড়িভালি
পর্যন্ত পুরো
অঞ্চল দিয়ে
দেবে। কিন্তু
দিল কোলাবা
থেকে মাহিম
পর্যন্ত। ভারতবর্ষে
ব্রিটিশ ইতিহাসের
সনাতন স্কুল
মনে করে,
ব্রিটিশদের ভারত
দখল মূলত
ভারতের পূর্বাংশ-বাংলায়
ঘটেছে, তারপর
দখল ছড়িয়েছে
ভারতবর্ষে। এটি
আংশিক সত্য।
শুরুটা আসলে
পশ্চিমে চার্লসের
যৌতুকের অন্তরালে।
সনাতন স্কুলের
ভাষ্য ব্ল্যাক
হোল হত্যাকাণ্ডের
ঘটনা ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানিকে
এবং সঠিকভাবে
ইংরেজদের ক্ষিপ্ত
ও প্রতিশোধপরায়ণ
করে তোলে।
তারা বাংলার
নবাব সিরাজউদ্দৌলার
প্রধান সেনাপতি
মীরজাফরকে ঘুস
দিয়ে তাদের
পক্ষে টেনে
নেয়। তাকে
দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা
করায় এবং
পলাশীর যুদ্ধে
সিরাজকে হারিয়ে
দেয়, তাকে
হত্যা করায়
এবং মীরজাফরকে
পুতুল সরকার
হিসেবে বসিয়ে
বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা
অধিকার করে।
তারপর দিল্লি
দখল করে
নেয়।
২
পলাশীর
যুদ্ধের আগে
কী ঘটেছে?
স্যার পেনডেরেল
মুন ভারত
বিশেষজ্ঞদের একজন।
তিনি বাহাওয়ালপুর
প্রদেশের অর্থমন্ত্রী
এবং আরো
কয়েকটি রাজ্যের
কমিশনার ছিলেন।
‘দ্য
ব্রিটিশ কনকোয়েস্ট
অ্যান্ড ডোমিনিয়ন
অব ইন্ডিয়া’
গ্রন্থে তিনি
উল্লেখ করেছেন,
মুর্শিদাবাদের প্রভাবশালী
কয়েকজন ব্যাংকার
সিরাজউদ্দৌলার সহিংসতা
ও খামখেয়ালিপূর্ণ
আচরণে ক্ষতিগ্রস্ত
হন, গোপনে
ব্রিটিশদের জানায়
যে তারা
সিরাজের অপসারণের
কথা ভাবছেন।
এ ব্যাংকাররা
ছিলেন অসওয়াল
জৈন (অসওয়াল
হিন্দুও আছে),
তাদের নেতৃত্ব
তিনি ছিলেন
জগৎ শেঠ।
এটা তার
খেতাব মানে
জগতের ব্যাংকার।
তার প্রকৃত
নাম খেতাবের
আড়ালে হারিয়ে
গেছে, সম্ভবত
তিনি মাহতাব
রায় (মাহতাব
চাঁদ)।
সে আমলে
অর্থনীতি ও
আর্থিক লেনদেন
চালানোর মতো
উদ্যোগী মুসলমান
পাওয়া ছিল
একটি দুর্লভ
ব্যাপার। এ
কাজে হিন্দু
বণিক গোষ্ঠীকে
বিশ্বাস করা
হতো। উল্লেখ্য,
আকবরের অর্থনীতিবিদ
টোডরমল ছিলেন
পাঞ্জাবি ক্ষত্রী।
সিরাজের সঙ্গে
জগৎ শেঠের
সমস্যার একটি
কারণ বয়সের
অপরিপক্বতা—তিনি
ছিলেন কুড়ির
ঘরে। সুদ
বা আর্থিক
লেনদেন তিনি
ভালো বুঝতেন
না। তিনি
ভাবতেন তার
হুকুমে সবই
হয়ে যাবে।
কিন্তু যখন
জানলেন তিনি
হুকুম দেয়ার
পরও তার
সেনাবাহিনীর সবার
বেতন হয়নি
তিনি ক্ষিপ্ত
হলেন, কারণ
রাজকোষে টাকা
নেই। স্যার
পেনডেরেল লিখেছেন,
সিরাজ জগৎ
শেঠকে শারীরিকভাবে
আক্রমণ করেন
এবং তাকে
খতনা করিয়ে
দেয়ার হুমকি
দেন। জগৎ
শেঠ আড়াল
থেকে ষড়যন্ত্রে
তা দিতে
থাকেন। ইতিহাস
আরো একজন
ব্যাংকার ব্যবসায়ী
পাঞ্জাবি ক্ষত্রী
আমিন চান্দের
কথা বলে—রবার্ট
ক্লাইভ ও
মীরজাফরের মধ্যকার
লেনদেনের সম্পর্ক
তিনিই পাকাপোক্ত
করে দেন।
কিন্তু আমিন
চান্দ পরে
ইংরেজদের ব্ল্যাকমেইল
করেন। ৩০
লাখ টাকা
না দিলে
ষড়যন্ত্রের বিষয়টি
তিনি সিরাজউদ্দৌলাকে
জানিয়ে দেয়ার
হুমকি দেন।
ক্লাইভ তার
কথার রাজি
হয়ে প্রতারণার
জাল ফেললেন।
তার সঙ্গে
চুক্তি করলেন
এবং চুক্তিনামায়
ভুয়া স্বাক্ষরে
তাকে সন্তুষ্ট
করলেন। এটা
জানার পর
পরবর্তী সময়
আমিন চান্দ
অজ্ঞান হয়ে
যান।
তবে পলাশীর
ইতিহাসে আমিন
চান্দ তেমন
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে
উঠতে পারেননি।
জগৎ শেঠ
সিরাজউদ্দৌলা, মীরজাফর
ও মীর
কাশিমের পক্ষে
রাষ্ট্রীয় আর্থিক
কার্যক্রম পরিচালনা
করেছেন। প্রমাণ
রয়েছে রাষ্ট্রের
উপার্জিত রাজস্বের
দুই-তৃতীয়াংশই
যেত জগৎ
শেঠের তহবিলে।
তিনি নবাবকে
ঋণ দিতেন।
ষড়ন্ত্রের চূড়ান্ত
বাস্তবায়ন ঘটল
সিরাজের পক্ষে
তার প্রধান
সেনাপতি মীরজাফর
আলী খানের
যুদ্ধে অংশগ্রহণ
না করার
মধ্য দিয়ে।
সিরাজের পরাজয়
নিশ্চিত হলো
১৭৫৭-এর
২৩ জুন।
যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের
জন্য মীরজাফর
ক্লাইভের সরকারকে
১৬ কোটি
টাকা দিতে
প্রতিশ্রুত হলেন;
তিনি নিজে
মসনদে বসলেন।
রাষ্ট্রের ট্রেজারিতে
তখন টাকার
পরিমাণ আনুমানিক
১০ কোটি।
জগৎ শেঠই
ঠিক করে
দিলেন অবশিষ্ট
টাকা কখন
কীভাবে পরিশোধ
করা হবে।
তার চেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
হচ্ছে বাংলার
মসনদে কে
বসবে দিল্লির
সম্রাটের কাছে
সে প্রস্তাব
তিনি পেশ
করবেন, এমনই
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে
উঠেছেন। তিনি
দিল্লি গিয়ে
ইংরেজদের বিজয়
মেনে নিয়ে
মীরজাফরকে নবাবের
স্বীকৃতি প্রদান
করতে রাজি
করান। মোগলদের
সঙ্গে তার
সম্পর্ক যেমন
গড়ে ওঠে,
ইংরেজরাও তার
ওপর নির্ভরশীল
থাকেন।
নবসৃষ্ট কলকাতা
শহরের ব্যবসা-বাণিজ্যে
লেনদেনের তিনিই
হয়ে ওঠেন
প্রধান ব্যাংকার।
আর্থিক সংকট,
বেতন না
পাওয়া সৈন্যদের
বিদ্রোহ, ইংরেজদের
বেপরোয়া মনোভাব
সিংহাসনের ভিত্তি
নাড়িয়ে দিল।
এদিকে মীর
কাশিমও প্রতারিত
বোধ করতে
থাকলেন। জগৎ
শেঠ পরিবারের
দুজন সদস্যকে
রেইনহার্ট নামের
এক জার্মান
জল্লাদকে দিয়ে
হত্যা করান
এবং তাদের
মরদেহ জন্তুর
ভোগের জন্য
ফেলে রাখেন।
জগৎ শেঠদের
প্রভাবে সুরাটে
তাদের পছন্দের
সরকার গঠিত
হয়। পলাশীর
ঘটনার শতবর্ষ
আগে থেকেই
সুরাট হয়ে
ওঠে বণিক
নিয়ন্ত্রিত শহর;
কার্যত শাসনও
তাদের হাতে
চলে যায়।
সুরাটের কাজি
বেনিয়াদের ইসলাম
ধর্ম গ্রহণ
ও বলপূর্বক
খতনা করানোর
আদেশ দেন।
জন এফ
রিচার্ডস তার
‘মোগল
এম্পায়ার’ গ্রন্থে
লিখেছেন, কাজি
নিজে তার
হিসাবরক্ষককে ধর্মান্তর
করিয়ে খতনা
করেন। কয়েক
দিনের মধ্যেই
হিসাবরক্ষক আত্মহত্যা
করেন। সুরাট
থেকে আট
হাজার বণিক
পালিয়ে গেলে
অর্থসংকটের সৃষ্টি
হয়।
সব অর্থসংকট
কার্যত জগৎ
শেঠের পক্ষে
কাজ করেছে।
আকবর প্যাটেল
যুক্তি দিয়ে
দেখিয়েছেন, সিরাজের
অপসারণ এবং
ভারতবর্ষে ব্রিটিশরাজ
প্রতিষ্ঠিত হয়েছে
জগৎ শেঠদের
স্বার্থে তাদের
পরিকল্পনা ও
ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের
মাধ্যমে। ব্যাংকারদের
আমন্ত্রণেই ব্রিটিশরাজ
ভারতে সম্প্রসারিত।
ইবনে মোতালিব: লেখক





