সানফ্লাওয়ার সিনেমার বিখ্যাত নায়ক মার্শেলো মাস্ত্রোইয়ানি বলেছেন: জ্ঞানী পুরুষরা জানেন নারীর সঙ্গে লড়াই করার সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র হচ্ছে পারফিউম।

 

তিনি ভুল বলেননি। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অনেক রোমান্টিক উপন্যাসে প্রেমের শুরুটা একটি পারফিউম উপহার দিয়ে। নরনারীর জোড়ের বিরোধ নিষ্পত্তিও ঘটেছে পারফিউম উপহারের মধ্য দিয়ে। পারফিউম ছড়িয়ে আছে পারস্যের সাহিত্যে ও পারসিক জীবনে। সে খুশবু ছড়িয়েছে বাংলাদেশেও।

একালের সেরা ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনার জ্যঁ পাতুও বলেছেন, পুরুষ মানুষ যেমন সবদিক দিয়ে পুরোপুরি ভালো হয় না, একটা না একটা খুঁত থাকে, পারফিউমও তেমনি। একেকটার একেক বৈশিষ্ট্য, তবে একটা না একটা আপনাকে মোহিত করবেই।

এলিজাবেথ টেলরের ছিল বিশাল পারফিউম সংগ্রহ। তিনিই বলেছেন, পারফিউমের সুঘ্রাণ আপনার অন্তরের সঙ্গে কথা বলে।

পারফিউম তৈরি ও ব্যবহারের ইতিহাস অন্তত পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। তাবে প্রথম দিককার পারফিউম প্রস্তুতকারীদের মধ্যে ইতিহাসে যাদের নাম এসেছে, তাদের প্রথমজন একজন মেসোপটেমিয়ান নারী—তাপুত্তি। মেসোপটেমিয়ান সরকারের ওপর তার বিশেষ প্রভাব ছিল এবং তিনি রাজপ্রাসাদে সুবাস সরবরাহ করতেন—এসব পাঁচ হাজার বছর আগের কথা।

প্রাচীন পারস্যে সুগন্ধির চর্চা ছিল। ফুল ও সুবাসিত বৃক্ষ থেকে সুগন্ধি তৈরি হতো; তেল, ক্রিম, কস্তুরী, আগরের সঙ্গে পারস্যের সাধারণ মানুষও পরিচিত ছিল। প্রাচীন পারস্য সম্রাট দারিউসের একটি পাথর-মূর্তির সমান দুটি সুগন্ধির বোতল, পেছনের একটি হাতে ফুল। সন্দেহ নেই এ ফুল ছিল বহুবর্ণ এবং বহু বিচিত্র ঘ্রাণের।

সৌরভের যে বাণিজ্য, তার শুরু কার হাতে এ নিয়ে বিতর্ক আছে কিন্তু বিখ্যাত ঐতিহাসিক উইল ডুরান্ট বলেছেন, অবশ্যই এর সূচনা পারস্যে। সেখানেই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বেশি পরিমাণে উৎপাদনের প্রমাণ পাওয়া যায়। কসমেটিক পাউডারের বাণিজ্যিক উৎপাদনও পারস্যেই প্রথম।

মুসলিম দেশগুলোয় সুগন্ধি আতরের ব্যবহার ধর্মীয়-সংস্কৃতিক অঙ্গে পরিণত হয়েছে। আরব দেশীয় রসায়ন শাস্ত্রবিদ ও ওষুধ প্রস্তুতকারী জাবির ইবন হাইয়ান এবং (জন্ম ৭২২ খ্রি. ইরাক) ও আল কিন্দি (জন্ম ৮০১ খ্রি. ইরাক) সুগন্ধির কারখানা স্থাপন করেছিলেন। জাবির ছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। তিনি সুগন্ধি প্রস্তুতির জন্য ডিস্টিলেশন, এভাপোরেশন ও ফিলট্রেশন (পরিশোধন, বাষ্পায়ন ও পরিশ্রুতকরণ) পদ্ধতি নির্ধারণ করেন।

অন্যদিকে আল কিন্দিকে গণ্য করা হয় বিচিত্র সৌরভ সৃষ্টির জনক হিসেবে। তিনি বিভিন্ন গাজ-গাছালি ব্যবহার করে সুগন্ধি প্রস্তুতির বহুসংখ্যক রেসিপি লিখে রেখে গেছেন। তার একটি বসার জায়গা ছিল। তিনি সুগন্ধি প্রস্তুত করছেন এ অবস্থায় যারা তাকে দেখেছেন, তাদের একজন আবু ইউসুফ ইয়াকুব লিখেছেন, আমাদের উপস্থিতিতে তাকে আরো বেশি উপাদান মেশাতে দেখেছি। তিনি গালিয়া নামের সুগন্ধির কথা লিখেছেন। একালের বিখ্যাত কিছু আরবি পারফিউমের নাম উল্লেখ করছি: রাসাসি, আজমল, আফনান, লাত্তাফা, নাবিল, আল রিহ্যাব, এমপার, সুইস অ্যারাবিয়ান, রিহানাহ, নিমাহ, ইয়াস পারফিউমস, দ্য ফ্র্যাগর্যান্স কিচেন, হিন্দ আল আউধ, খালতাত, খালিস পারফিউমস, আরদ আল জাফারান, সাপিল প্রভৃতি।

এখানে যেসব সুগন্ধির নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তার সবই আরবি পারফিউম নয়। যেমন রাসাই পারফিউমস ইন্ডাস্ট্রি তুলনামূলকভাবে নতুন প্রতিষ্ঠিত হলেও আন্তর্জাতিক বাজার ভালোই দখল করে নিয়েছে। এল নাবিল ব্র্যান্ড ফরাসি ও আরবীয় সুগন্ধির মিশেল দিয়ে ৬০ ধরনের সুগন্ধি বাজারজাত করেছে। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের পারফিউমের বাজারের আর্থিক আকার ছিল ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। এ বাজারের একটি সাম্প্রতিক প্রবণতা: ভোক্তার পছন্দ স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক সুগন্ধি থেকে সরে সিনথেটিক পারফিউমের দিকে হেলে পড়ছে। করোনাভাইরাস অন্যসব বাজারের মতো সুগন্ধি বাজারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবু তাদের প্রত্যাশা ২০২৪ সালে এ বাজারের আকার হবে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

সুঘ্রাণ, বৃক্ষরাজি ও ফুল যে পার্সিয়ানদের আদিযুগেই আকৃষ্ট করেছে, সে বিবরণ পাওয়া যায় গ্রিক ও রোমান পাণ্ডুলিপিতে: আড়াই হাজার বছরের পুরনো পাহলভি রাজত্বের শুরুর দিককার প্রামাণ্য রচনাতেও সুগন্ধির উল্লেখ রয়েছে। এ দেশেরই শেষ রাজা শাহানশাহ রেজা শাহ পাহলভি। কস্তুরী, আতর, সুগন্ধি কাঠসহ বিভিন্ন ধরনের বিচিত্র সুগন্ধি দ্রব্যাদি রাজপরিবার ও ধনী পরিবারের সদস্যদের আকৃষ্ট করেছে।

ফার্সি ভাষায় কবিদের রচনায় পুষ্পসৌরভ এবং পারফিউমের ঘ্রাণ ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ে। প্রধান কবিদের সবাই সৌরভের স্তুতি পেয়েছেন। একদা সুগন্ধির স্বর্গরাজ্য পারস্য থেকে ব্যবসাটি সরে গেছে। এখনকার ইরানের পারফিউম মার্কেটের ৯০ ভাগ পণ্যই বিদেশ থেকে আমদানি করা। কিন্তু সরকার এ আমদানি নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। এখন ইরানে অনেক বিদেশী পারফিউম চোরাচালানের মাধ্যমে আসে। একদা সুগন্ধির জন্য সবচেয়ে লোভনীয় স্থান বাগদাদ ও বসরার ঐতিহ্য স্লান হয়ে গেছে। মসুলেও এ বাণিজ্য জমে উঠেছিল। মরক্কোর মারাকেশ ও ক্যাসাব্ল্যাঙ্কাতে সুগন্ধির বড় বাজার থাকলেও এখানে বিক্রি হয় আমদানি করা পারফিউম।

পৃথিবীর সুগন্ধির বাজারের আর্থিক আকৃতি ২০১৮ সালে ছিল ৩১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এ বাজারে ৩ দশমিক ৯ ভাগ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি আশা করা হয়েছিল, করোনাভাইরাস তা কিছুটা সংকুচিত করে দিয়েছে। বাংলাদেশও পিছিয়ে থাকবে না। বাংলাদেশের সৌরভের কেন্দ্রস্থল আগর বৃক্ষ আচ্ছাদিত বড়লেখার সুজানগর। এখনকার আগর গাছ থেকে তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের আতর।

পারফিউমের কালক্রমিক সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মিসরীয় সাম্রাজ্যে পারফিউম যে অবশ্যই ছিল তার বড় প্রমাণ মমি। সুঘ্রাণযুক্ত মমি এবং কোনো কোনো দেয়ালে মমিতে ব্যবহূত সুগন্ধির রেসিপিও লেখা ছিল। রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম সেনাধ্যক্ষ এবং দার্শনিক প্লিনি দ্য এল্ডার (২৩-৭৯ খ্রিস্টাব্দ) গোলাপজল ব্যবহারের কথা বলেছেন, তাতে জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় কস্তুরীর ঘ্রাণ পাওয়া যেত। খ্রিস্টজন্মের ৪৭ বছর আগে জুলিয়াস সিজার যখন বলপূর্বক মিসরের সিংহাসন দখল করলেন, তিনি জনতার মাঝে সুগন্ধিপূর্ণ বোতল নিক্ষেপ করেছিলেন।

চতুর্দশ শতকে ১৩৭১ সালে অ্যালকোহলভিত্তিক সুগন্ধি তৈরির জন্য হাঙ্গেরির কুইন এলিজাবেথের অনুমোদনে প্রথম উদ্যোগ নেয়া হয়। পৃথিবীর প্রথম আধুনিক সুগন্ধির নাম হাঙ্গেরি ওয়াটার। এতে শুরুর দিকে ছিল অয়েল অব রোজমেরি, অরেঞ্জ বসম ও অ্যালকোহল সল্যুশন।

পঞ্চদশ শতকে ‘কলোন ওয়াটার’ই প্রথম অধিকসংখ্যক মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে আসা সুগন্ধি। ষোড়শ শতাব্দীতে রানী প্রথম এলিজাবেথ (শাসনকাল ১৫৩৩-১৬০৩) জনসমাগমের স্থানগুলো দুর্গন্ধ মুক্ত রাখতে সেসব স্থানে সুগন্ধি ছড়ানোর নির্দেশ দেন।

সপ্তদশ শতকে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই (শাসনকাল ১৬৪৩-১৭১৫), তার সুগন্ধি নির্মাতাকে সপ্তাহের প্রতিদিনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ঘ্রাণের পারফিউম তৈরির নির্দেশ দেন।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ১৭০৯ সালে ইতালীয় সুগন্ধি প্রস্তুতকারী জিওভান্নি মারিয়া ফারিনা তার নিজের শহর কোলনের নামে অ্যালকোহলভিত্তিক ফ্র্যাগর্যান্স অডি কোলন তৈরি করেন। পৃথিবীতে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এ সুগন্ধি। অডি কোলন যে একটি ব্র্যান্ড নাম, তা ভুলে কোলন মানে দাঁড়ায় সুগন্ধি। একটা সময় এটাই ছিল পারফিউমের প্রতিশব্দ।

উনবিংশ শতাব্দীতে রানী ভিক্টোরিয়ার আমলে পারফিউম আরো সহজলভ্য হয় এবং ক্রাউন প্রতীক ব্যবহার করে ক্রাউন পারফিউমারি স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়। ১৮৭২ সালে তা প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিশ শতকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পারফিউম বাণিজ্যের বিকাশ ঘটে। এ সময়ের দুটো জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হচ্ছে: শ্যানেল ফাইভ এবং ক্রিশ্চিয়ান ডিয়ো। এখন পারফিউম বাণিজ্যের কেন্দ্রভূমি হয়ে উঠেছে দুবাই।

কবি, কবিতা ও পারফিউম

একালের পাঠকের শেকসপিয়ার মনপ্রাণ দিয়ে পড়ার কথা নয়, সিনেমা হলে অবশ্য ভিন্নকথা। এমনকি শেকসপিয়ারের জন্মভূমি ব্রিটেনেও শেকসপিয়ার পাঠ করা বেশি সংখ্যক ভক্ত পাওয়া যাবে না। বেশি সংখ্যকে পাওয়া যাবে শেকসপিয়ার শুঁড়িখানায়। শেকসপিয়ার ট্যাভার্ন বিভিন্ন স্থানে রয়েছে এবং তা লোকারণ্যেই থাকে। তার নাম বাঁচিয়ে রেখেছে এবং আরো জনপ্রিয় করে তুলেছে পারফিউম। তার নামে ১০টি পারফিউম দেদার বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি ১০০ এমএল বোতলের দাম ২২৯ পাউন্ড, বাংলাদেশী টাকায় ২৬ হাজার। যখন সুযোগ হয় কেনা যাবে, কিন্তু নামগুলো জেনে নেয়া ভালো: শেকসপিয়ার এ মিড সামার নাইটস ড্রিম, শেকসপিয়ার এন্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা, শেকসপিয়ার অ্যাজ ইউ লাইক ইট, শেকসপিয়ার ডার্ক লেডি, শেকসপিয়ার হ্যামলেট, শেকসপিয়ার জুলিয়াস সিজার, শেকসপিয়ার লাভার্স কমপ্লেইন, শেকসপিয়ার ম্যাকবেথ, শেকসপিয়ার রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট, শেকসপিয়ার টুয়েলফথ্ নাইট।

শার্ল বোদলেয়ারের কবিতা থেকে উদ্ভূত ‘বাইরেদা’ এখন একটি জনপ্রিয় পারফিউমের নাম। ৫০ এমএল বোতল ৮৮ পাউন্ড।

এডগার অ্যালান পোর কবিতা থেকে এসেছে, ফ্ল্যাপিন নেভারমোর ১০০ এমএল ৯৮ পাউন্ড। ইএম ফর্স্টারের ‘এ রুম উইথ আ ভিউ’-তে তরুণীর উক্তি: সিবি আই হেইট পারফিউম। এখন এটাই ১০০ পাউন্ড মূল্যের ১০০ এমএল পারফিউমের নাম।

ফরাসি কোলেটির ১৯৪৪ সালের বিখ্যাত উপন্যাস জিজির নায়িকা জিজির নামে বাজারে এসেছে জিজি পারফিউম, ১০০ এমএল বোতল ৬৯ পাউন্ড। অস্কার ওয়াইল্ডের নাম নিয়ে জার্ডিন কোম্পানি বাজারে এনেছে ‘অস্কার’ পারফিউম, ১০০ এমএল ৭৫ পাউন্ড। ভার্জিনিয়া ওলফের ফ্যানটাসি নায়িকা আঠার শতকের লেডি ওরলান্ডো পারফিউমের নাম হয়েছেন। ওরলান্ডো, ১০০ এমএল বোতল ৭৫ পাউন্ড। লেস জার্ডিন কোম্পানি অস্কার ওয়াইল্ড, চার্লস ডিকেন্স, ভিক্টর হুগো এবং কোলেটিকে পারফিউমেও অমর করে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে।

আতর-খুশবু-সুগন্ধির কমতি নেই বাংলা কবিতায়ও। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন:

কোন জন চাহে গুলের খুশবু কোন জন চাহে গুল

খুশবুর সাথে ফুলেরেও চাহে প্রেমিক বুলবুল

সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় নারী বলতে পারেন: আমার বিছানে নাই সোহাগের তাঁতের চাঁদর/...বেবাক ফুল কাফনের ইরানী আতর।

সৈয়দ আলী আহসানের কবিতায়—‘আতরের পানি মেশকের রেণু খোশবু বিলায়ে যায়’।

 

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা