ইউরোপের অর্থনীতি একসময় নির্ভর করেছিল উলের ওপর। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের উল অন্যতম। এ উলের যাত্রা হয়েছিল বহু আগে। উল নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন তাদের মত হলো খ্রিস্টের জন্মের বহু আগে থেকেই উলের ব্যবহার দেখা যায় মানুষের মধ্যে। কোনো কোনো সূত্র বলছে, হোমোস্যাপিয়েন্স যে সময় থেকে পোশাক পরা শুরু করেছে সে সময়ই উলের ব্যবহার শুরু হয়। পশু পালনভিত্তিক সমাজে পশুর লোমকে তারা নানাভাবে বস্ত্রে পরিণত করেছিল। এর মধ্যে ‘হিস্ট্রি অব ক্লদিং’ বলছে, খ্রিস্টপূর্ব ৪০২ থেকে ৩০০ অব্দের মধ্যে উলের ব্যবহার মানুষের মধ্যে ছিল। এরপর ইউরোপ হয়ে ওঠে উলের অন্যতম সেরা নির্মাতা। পুরাণে দেখা যায়, গ্রিক দেবতারা উলের পোশাক পরেন। পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ডে উৎকৃষ্ট মানের উল তৈরি হতো। মধ্যযুগে উলের ব্যবসা সবচেয়ে জমজমাট হয়ে ওঠে এবং এ সময় ইউরোপে উলের ব্যবসা ছিল সবচেয়ে বড়।
মধ্যযুগের ইউরোপ বস্ত্র তৈরিতে বিশেষ হয়ে উঠেছিল। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে বেশি। বলা যায়, ইংল্যান্ডই উলের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতকারক ছিল। তারা নিজেদের জন্য তৈরি বস্ত্রের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত উল রফতানি শুরু করে। সেখান থেকেই বড় হয় উলের ব্যবসা। এ উল সংগ্রহ করা হতো ইংল্যান্ডের ভেড়া থেকে। সেগুলো থেকে তাঁতে তৈরি করা হতো সুতা। এ কাজে সে সময় সেরা ছিল ইংল্যান্ডের ফ্ল্যান্ডার্স অঞ্চলের তাঁতিরা। বয়নকারী হিসেবে তাদের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো ইউরোপে। কেবল সে সময় নয়, তাদের সুনাম এখনো আছে কিংবদন্তির মতো।
মধ্যযুগে ইংল্যান্ডের অর্থনীতির মূল হয়ে উঠেছিল উল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময় থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময় অবধি উলই ইংল্যান্ডের অর্থনীতিকে ধরে রেখেছিল। অবস্থা এমন ছিল যে উলকে বলা হতো the jewel in the realm. সে স্মৃতি ধরে রাখতে এখনো হাউজ অব দ্য চ্যান্সেলরে একটি বর্গাকৃতি উলের বস্তা রাখা আছে, যার নাম উলস্যাক। মধ্যযুগের উল ব্যবসার স্বর্ণযুগ এভাবেই স্মরণ করে ইংরেজরা।
মধ্যযুগে উলের ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়েছিল ইংল্যান্ডের অভিজাতরা। তারা প্রায় প্রত্যেকেই উল তৈরি করত। নিজেরা না, সেজন্য আলাদা লোকবলের ব্যবস্থা ছিল। সামন্ততান্ত্রিক ইংল্যান্ডের অভিজাত লর্ড, অ্যাবট ও বিশপরা নিজেদের সম্পদের প্রাচুর্য প্রকাশ করতেন ভেড়া দিয়ে। যার যত ভেড়া আছে সে তত ধনী—এমনই সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল মধ্যযুগে। এখানেই শেষ হচ্ছে নয়, বিভিন্ন মঠ ও চার্চও যোগ দিয়েছিল উল উৎপাদনে। এর পেছনে আবার ছিল রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা। কেননা মঠ থেকে উৎপাদিত প্রতি বস্তা উল রফতানির বিপরীতে মঠের নির্দিষ্ট পরিমাণ কর মওকুফ করতেন তৎকালীন রাজা।
ইংল্যান্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তখন পরিণত হয়েছিল ভেড়ার চারণভূমিতে। উত্তরের লেক ডিস্ট্রিক্ট ও অন্যান্য উপদ্বীপ থেকে শুরু করে পশ্চিমের নিম্নভূমি এমনকি ইস্ট অ্যাংলিয়া পর্যন্ত অঞ্চলে লাখ লাখ ভেড়া চরে বেড়াত। এগুলো থেকেই সংগ্রহ করা হতো উল। ফ্লেমিশ ও ইতালীয় ব্যবসায়ীরা নগদ অর্থ দিয়ে খামার মালিক বা সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে তাদের ভেড়ার উল কিনে নিতেন। ইংল্যান্ডের বাইরের এ ব্যবসায়ীরা উল কিনতেন রফতানির জন্য। কেনা উল তারা বস্তায় ভরে গাধা বা অন্য কোনো পশুর পিঠে তুলে নিয়ে যেতেন বোস্টন, লন্ডন, স্যান্ডউইচ ও সাউদাম্পটনের মতো বন্দরে। সেখান থেকে চালান যেত অ্যান্টয়ের্প ও জেনোয়ায়।
এ সময় বড় খামারিরা বিদেশী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তোলেন। এতে তাদের মুনাফা বাড়তে শুরু করে আর সরকারের কোষাগারেও আসতে থাকে ভালো রাজস্ব। মধ্যযুগের ইংল্যান্ডে উল কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা একটি রাজাদেশের দিকে নজর দিলে বোঝা যাবে। রাজা প্রথম এডওয়ার্ড নির্দিষ্ট কয়েকজন নাইট নিযুক্ত করেন নেকড়ে শিকারের জন্য। কেননা চারণভূমিতে ভেড়ার শত্রু ছিল নেকড়ে। এদের শিকার করে ভেড়া রক্ষা ছিল জরুরি।
কিন্তু ইংল্যান্ড একাই উল ব্যবসায় সেরা ছিল না। বিশেষত ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে উলের ব্যবসার বড় নাম ছিল আরেকটি ইউরোপীয় দেশ ইতালি। তবে সে সময়কার উল ব্যবসার নথিপত্রে ইতালির তুলনায় ফ্লোরেন্সের নাম বেশি পাওয়া যায়। ফ্লোরেন্টাইন এ ব্যবসার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বন্দরে ইতালীয় উলের চালান তুলনামূলক বেশি যেত। এর একটি কারণ ছিল ইতালির ব্যবসায়ীদের যোগযোগ। তারা বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে নিজেদের উল তাদের কাছে বিক্রি করতেন আর এক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছিলেন। এ সময় রাজা এডওয়ার্ড ইংল্যান্ডে বেশ কয়েকটি কাস্টমস অফিস স্থাপন করেছিলেন। সেখানে কোনো কোনো কাস্টমস অফিসে ইতালীয় ব্যবসায়ীরা নিজেদের একচেটিয়া ব্যবসা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের হাতে ফ্যান্ডার্সের উল থাকার কারণে ইংল্যান্ডই এগিয়ে যায়।
মধ্যযুগের ইংল্যান্ডে উল ব্যবসা সম্পর্কে জন মুনরো তার Medieval Woollens : Textiles, Textile Technology and Industrial Organisation বইয়ে লিখেছেন, ‘এ ব্যবসার সুবর্ণ সময় ছিল ১২৫০-১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ। এ সময়ের মধ্যেই উল ব্যবসা ইংল্যান্ডের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছিল।’ একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১২৯০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ইংল্যান্ডে ভেড়ার সংখ্যা ছিল ৫০ লাখ। এ পরিমাণ ভেড়া থেকে ৩০ হাজার বস্তা উল প্রতি বছর তৈরি হতো। এর এক শতক পরে অর্থাৎ ১৩৯০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে ছিলেন পঞ্চম হেনরি। তার আমলে দেশের মোট আয়ের ৬৩ শতাংশ আসত উলের ওপর ধার্য করা কর থেকে।
উল যখন এত গুরুত্বপূর্ণ, ইউরোপে ইংল্যান্ড একা এর ব্যবসা করবে তা তো হতে পারে না। কিংবা এ ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালানোর জন্য প্রতিবেশী ও প্রতিযোগীদের ওপর চাপ রাখা দরকার ছিল। ১৩৩৭-১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১১৬ বছর ধরে থেমে থেমে চলে ফ্রান্স-ইংল্যান্ড যুদ্ধ। ইতিহাসে এটি ‘হানড্রেড ইয়ার্স ওয়ার’ নামে পরিচিত। এর পেছনে ফ্রান্সের ওপর ইংরেজদের অধিকার ফলানো, ফ্রেঞ্চ সিংহাসনের প্রতি ইংল্যান্ডের লোভ ইত্যাদি নানা কারণ জনপ্রিয় হলেও এ যুদ্ধের পেছনে একটি কারণ ছিল উলের ব্যবসা। ইংল্যান্ড চেয়েছিল ফ্ল্যান্ডার্সের সঙ্গে ব্যবসা ঠিক রাখতে। কিন্তু ফ্রান্স এক্ষেত্রে তাদের কাজ নির্বিঘ্নে করতে দিচ্ছিল না ইংল্যান্ডকে। এ যুদ্ধের সময় ফ্ল্যান্ডার্সের বহু তাঁতি যুদ্ধের ভয়াবহতা ও ফ্রেঞ্চ শাসকদের ভয়ে ফ্ল্যান্ডার্স ছেড়ে যায়। তাদের নতুন আবাস হয়েছিল নরফোক ও সাফোক।
উলের ব্যবসা এতটাই ছড়িয়েছিল এবং এ থেকে লাভবান হচ্ছিলেন ইউরোপের নানা অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা। ফ্লেমিশদের ব্যবসার পাশাপাশি এতে ঢুকে পড়ে বার্বান্টরা। অ্যান্টয়ের্পের সঙ্গেও নতুন করে শুরু হয় উলের ব্যবসা। এরপর একসময় বার্বান্টরা ফ্লেমিশদের তুলনায় বেশি সুবিধা আদায় করে নেয়। তারা কর মওকুফ ও অন্যান্য সুবিধা আদায় করে নিয়েছিল। কাছাকাছি সময়ের মধ্যে জার্মানরাও উলের ব্যবসায় ঢুকে পড়ে। আগে থেকেই তারা এ ব্যবসায় ছিল, কিন্তু ত্রয়োদশ শতাব্দীর দ্বিতয়ার্ধে তারা ইউরোপের উল ব্যবসায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা বাড়ানোর চেষ্টা করে। জার্মানদের উৎপাদিত উল আসত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। আগে ব্যবসায় যেখানে প্রধান ছিলেন তাঁতি ও ব্যবসায়ী সেখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট।
ব্যবসার বিস্তার ও ইংল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যার কারণে উলের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলত ১৩৪২-৪৩ খ্রিস্টাব্দেই উল উৎপাদন ও বিপণনে নানা সমস্যা দেখা গিয়েছিল। আগের মতো চলছিল না ব্যবসা। এ কারণে ১৩৫৫ খ্রিস্টাব্দে ৩৩ হাজার বস্তা ও ১৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে রফতানি হয়েছিল ৯ হাজার ৭০৬ বস্তা।
উল উৎপাদন একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে তা এত কমে এসেছিল যে আর হিসাবের মধ্যে ধরার কিছু ছিল না। টেক্সটাইল ব্যবসা পঞ্চদশ শতাব্দীতে এত দ্রুত বেড়েছিল যে স্পেন ও ইংল্যান্ড উল রফতানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তখনো মুক্ত বাজার চিন্তাটি ছিল না। ফলে ব্যবসায়ী ও দেশগুলো ব্যবসা নিজের হাতে রাখতে চেয়েছিল। ভারতের সুতি পণ্য ইংল্যান্ডের বাজারে যাওয়া শুরু হলে উলের ব্যবসা মার খায়। ইংল্যান্ড চেষ্টা করেছিল সুতি পণ্য নিষিদ্ধ করে উল ও রেশমের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু একসময় আর তা সম্ভব হয়নি। উলের স্বর্ণালী সময় শেষ হয়ে যায়। কিন্তু উল এখনো ঐতিহ্য ও কখনো আভিজাত্যের অংশ হিসেবে এখনো টিকে আছে।
আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক





