যুক্তরাজ্যের সংসদের উচ্চকক্ষ হাউজ অব লর্ডস। এর সভাপতিকে বলা হয় লর্ড স্পিকার। তার জন্য বরাদ্দ আসনটি ‘উলস্যাক’ নামে পরিচিত। ব্রিটিশ কমনওলেথের সব জায়গা থেকে উল সংগ্রহ করে আসনটি তৈরি করা হয়েছে। উলস্যাক তাই কমনওয়েলথের ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। মধ্যযুগে ইংল্যান্ডের অর্থনীতির কেন্দ্রে ছিল উলের ব্যবসা। দেশটির অর্থনীতিতে উলের গুরুত্ব বোঝাতেই তৈরি হয়েছে উলস্যাক। ১৪ শতকে রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ড নির্দেশ দিয়েছিলেন, আইনসভায় লর্ড চ্যান্সেলরকে উলের তৈরি আসনে বসতে হবে। সেই থেকে এ প্রথার প্রচলন। মধ্যযুগ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এ আসনে বসতেন লর্ড চ্যান্সেলর। তখন পর্যন্ত হাউজ অব লর্ডসের সভাপতি ছিলেন লর্ড চ্যান্সেলর। তারপর সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে লর্ড স্পিকারকে সভাপতির মর্যাদা দেয়া হয়। তখন থেকে উলস্যাক তার জন্য নির্ধারিত। 

উলস্যাক উলের তৈরি একটি বড় কুশন। এটি লাল কাপড়ে আবৃত থাকে। এর কোনো পিঠ বা হাতল নেই। তবে এর ঠিক মাঝখানে হেলান দেয়ার জন্য একটি গদি রাখা আছে। উলস্যাকের পেছনের দিকে লর্ড স্পিকারের অলংকৃত ছড়িটি রাখা হয়। কাঠ বা অন্য কোনো ধাতু দিয়ে তৈরি সম্মানসূচক এ দণ্ড উলস্যাকের পেছনের দিকে রাখা হয়। লর্ড স্পিকার যখন হাউজের স্পিকার হিসেবে বক্তব্য রাখেন তখন তিনি উলস্যাকে বসেই কথা বলতে পারেন। কিন্তু বিতর্কে অংশগ্রহণ করলে তাকে অবশ্যই উলস্যাকের বাম পাশ থেকে কথা বলতে হবে। অথবা লর্ডদের জন্য নির্ধারিত সাধারণ আসনে বসে তার বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে। লর্ড স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার হাউজ অব লর্ডসে সভাপতিত্ব করেন। তিনি তখন উলস্যাকে বসেন। তবে যখন ‘কমিটি অব দ্য হোল’ তথা সব সদস্যের অংশগ্রহণে হাউজে কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়, তখন উলস্যাক খালি থাকে। লর্ড স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার তখন হাউজে থাকা টেবিলের সামনে একটি চেয়ারে বসেন।

লর্ড স্পিকারের জন্য নির্ধারিত উলস্যাকের সামনে তুলনামূলক বড় আরেকটি কুশন আছে। এর নাম ‘জাজেস উলস্যাক’। যুক্তরাজ্যে সংসদ অধিবেশনের শুরুতে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এটি ‘স্টেট ওপেনিং অব পার্লামেন্ট’ নামে পরিচিত। এ অনুষ্ঠানের সময় জাজেস উলস্যাকে ‘ল লর্ড’রা বসেন। যুক্তরাজ্যের ১৮৭৬ সালের ‘অ্যাপিলেট জুরিসডিকশন অ্যাক্ট’ অনুসারে ল লর্ডদের হাউজ অব লর্ডসে নিয়োগ দেয়া হয়। তারা হাউজের বিচারিক প্রক্রিয়াগুলো তত্ত্বাবধান করেন।

১৯৪৯ সাল পর্যন্ত কানাডার সিনেটেও জাজেস উলস্যাকের ব্যবহার ছিল। ৭০ বছর ধরে সংসদ অধিবেশনের শুরুতে এ উলস্যাক হাউজের মাঝখানে স্থাপন করা হতো। কানাডার সুপ্রিম কোর্টের সাতজন বিচারক উলস্যাকটিতে বসতেন। ১৯৫০ সালের পর থেকে এর ব্যবহার কমে যেতে থাকে। ১৯৫৩ সালে কানাডার সিনেটরদের ভোটে উলস্যাকের ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। তবে এটি এখনো সিনেটের আর্কাইভে সযত্নে সংরক্ষিত আছে।

দুই হাজার বছরেরও আগে ইংল্যান্ডে উলের ব্যবসার প্রচলন ঘটেছিল। রোমান শাসনামল থেকেই উলের পোশাক মূল্যবার রফতানি দ্রব্য হিসেবে বিবেচিত। ১২ শতকে উল ইংল্যান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদে পরিণত হয়। উল ও উলের তৈরি পোশাক রফতানি ছিল দেশটির আয়ের অন্যতম উৎস। ১৫ শতকে ইংল্যান্ডে টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি যাত্রা করে। তখন উলের পণ্য উৎপাদন বেড়ে যায়। উল প্রক্রিয়াকরণ শিল্প বিপ্লবের পটভূমি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ১৫৮৯ সালে আবিষ্কার হয়েছিল ‘ফ্রেমওয়ার্ক নিটিং মেশিন’। এ মেশিন উল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য ব্যবহার হতো।

বর্তমানে ব্রিটেনে ৬০টিরও বেশি জাতের ভেড়া পাওয়া যায়। ব্রিটিশ উল দিয়েই সর্বোৎকৃষ্ট মানের পশমি জামা তৈরি হয়। এর জনপ্রিয়তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। উল একটি অসাধারণ পণ্য হিসেবে এখন সারা বিশ্বে স্বীকৃত। ২০ শতকে সিনথেটিক কাপড় উৎপাদন বাড়লেও উল তার অনন্যতা ও গুরুত্ব ধরে রাখতে পেরেছে। যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যিক ইতিহাসে উলের এ অনন্য অবস্থানের প্রতীক হিসেবে হাউজ অব লর্ডসে টিকে আছে উলস্যাক।

আহমদ শাকিল: লেখক