একদিন হজরত ইব্রাহিম ইবনে আদহাম ইমাম আবু হানিফার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। তার গায়ে ছিল উলের তৈরি পোশাক। এ ধরনের পোশাক ছিল খুবই সস্তা। দারিদ্র্যের প্রতীক। তাই ইমাম আবু হানিফার শিষ্যরা তার দিকে অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তাকাচ্ছিলেন। ইমাম তা বুঝতে পারলেন। বললেন, ‘আমাদের শায়খ ইব্রাহিম ইবনে আদহাম এসেছেন।’ শিষ্যরা এবার সতর্ক হলেন। তারা জানেন, ইমাম আবু হানিফা কখনো রসিকতা করে কিছু বলেন না। তখন তারা প্রশ্ন করলেন, ‘তিনি কীভাবে শায়খের মর্যাদা অর্জন করলেন?’ ইমাম উত্তর দিলেন, ‘নিষ্ঠা ও একাগ্রতাপূর্ণ ইবাদতের মাধ্যমে। আমরা যখন নিজেদের আরাম-আয়েশ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, তিনি তখন আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকেন। তাই তিনি আমাদের শায়খ হতে পেরেছেন।’
ইমাম আবু হানিফা প্রথম জীবনে মানুষের সাহচর্য ত্যাগ করে নির্জনে দিন অতিবাহিত করতেন। সে সময় তিনি উলের জামা পরিধান করতেন। একদিন তিনি স্বপ্নে হজরত মুহাম্মদ (দ.)কে দেখলেন। নবীজি তাকে মানুষের মাঝে বাস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেন তিনি সাধারণ মানুষকে ইসলামের বিধান জানাতে পারেন। নবীজির নির্দেশনা অনুসারে ইমাম আবু হানিফা নির্জনতা পরিহার করেন। কিন্তু তিনি কখনই দামি পোশাক পরিধান করেননি।
সুফিবাদের প্রথম যুগের বিখ্যাত সুফি হজরত দাউদ তাই উলের পোশাক পরতেন। সাহাবি হজরত ওমর ও হজরত আলী তাবেয়ি হজরত ওয়াইস করনিকে উলের পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছিলেন। সেটিতে অসংখ্য তালি লাগানো ছিল। প্রখ্যাত সুফি হাসান বসরি, মালিক ইবনে দিনার ও সুফিয়ান সাওরিও এ রকম তালি লাগানো উলের পোশাক পরিধান করতেন। ওপরের তথ্যগুলো থেকে পরিষ্কার যে সুফিরা সাধারণত উলের তৈরি জামা পরতেন। ‘সুফি’ শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে বেশ কয়েকটি মত প্রচলিত আছে। তার মধ্যে একটি হলো ‘সুফি’ শব্দটি আরবি ‘সুফ’ থেকে এসেছে। এর অর্থ উল। আরবি তিনটি হরফ ‘সোয়াদ’, ‘ওয়া’ ও ‘ফা’-এর সমন্বয়ে ‘সুফ’ শব্দটি গঠিত। হজরত জোনায়েদ বাগদাদিকে সুফিদের সুলতান বলা হয়। তিনি এ তিনটি বর্ণের চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, সোয়াদ দিয়ে বোঝায় সবর, সিদ্ক্ ও সাফা। সোয়াদ বর্ণ দিয়ে শুরু এ তিনটি শব্দের অর্থ যথাক্রমে ধৈর্য, সত্যবাদিতা ও পরিশুদ্ধি। ওয়া দিয়ে বোঝায় ওয়াদ্দ, ওয়ের্দ ও ওয়াফা। আরবি শব্দ তিনটির অর্থ যথাক্রমে প্রেম, প্রার্থনা ও বিশ্বস্ততা। আর ফা দিয়ে বোঝায় ফারদ, ফকর ও ফানা। ফা বর্ণ দিয়ে শুরু এ তিনটি শব্দের অর্থ যথাক্রমে নির্জনতা, দারিদ্র্য ও স্রষ্টার মধ্যে লীন হওয়া। হজরত জোনায়েদ বাগদাদির বর্ণনা অনুসারে, এসব গুণাবলি যাদের মধ্যে আছে, তারাই সুফ তথা উলের পোশাক পরিধান করার অধিকার রাখেন। আর যারা সুফ পরেন, তারাই সুফি। অর্থাৎ উলের পোশাক পরিধানকারী। সে কারণে সুফিদের বোঝাতে ফার্সিতে ‘পশমিনাপুশ’ নামে একটি অভিধা প্রচলিত আছে। ফার্সি পশমিনা ও পুশিদান শব্দ দুটির সমন্বয়ে পশমিনাপুশ শব্দটি গঠিত। পশমিনা অর্থ পশম। পুশিদান অর্থ পরিধান করা। পশমিনাপুশ শব্দের অর্থ পশমি জামা পরিধানকারী। হজরত আবু আলি রুদাবারি বলেন, ‘একজন সুফি উলের পোশাক পরিধান করেন। তিনি পরিশুদ্ধ। নিজের নফসকে তিনি নিয়ন্ত্রণে রাখেন। তিনি দুনিয়াকে ত্যাগ করে হজরত মুহাম্মদ (দ.)-এর দেখানো পথে জীবন অতিবাহিত করেন।’ সুফিদের পরিচয় দিতে গিয়ে হজরত ইবনুল জাওজি বলেন, ‘তারা উলের পোশাক পরিধান করেন।’
ওপরের বর্ণনা থেকে বোঝা যায় সুফিরা সাধারণত উলের পোশাক পরিধান করতেন। সুফিদের উলের পোশাক বেছে নেয়ার বেশকিছু কারণ আছে। উলের পোশাক মোটা ও খসখসে। এটি সম্পূর্ণ বিলাসিতা বর্জিত। এর দাম কম। সুফিরা যেহেতু দুনিয়াবি আরাম-আয়েশ ত্যাগ করেছেন, তাই তারা অন্য সব বিলাসী, ব্যয়বহুল ও মসৃণ কাপড়ের পরিবর্তে উলের পোশাককেই গ্রহণ করেছেন। উলের পোশাক তাই কঠোর সাধনা ও দুনিয়া ত্যাগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আবার উলের পোশাক পরিধানকারীকে সমাজে অমার্জিত হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তাই সবাই তাদের সঙ্গ এড়িয়ে চলত। সুফিরা মানুষের সংস্রব যথাসম্ভব এড়িয়ে সর্বদা স্রষ্টার আরাধনায় নিমগ্ন থাকতে চান। তাই তারা উলের পোশাক বেছে নিয়েছেন। যেন সাধারণ মানুষ তাদের অমার্জিত মনে করে তাদের কাছ থেকে দূরে থাকে। এসব কারণে হজরত জালালউদ্দিন রুমি সুফিদের জন্য উলের পোশাককেই যথাযথ বলে মনে করতেন।
কেবল সুফিরাই নন, নবীজি ও সাহাবিরাও উলের পোশাক পরিধান করতেন। সাহাবি হজরত আনাস ইবনে মালিক বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল (দ.) ক্রীতদাসদের দাওয়াতও গ্রহণ করতেন। তিনি গাধার পিঠে চড়তেন এবং উলের জামা পরিধান করতেন।’ সুফি শায়খ হজরত শিহাবউদ্দিন সোহরাওয়ার্দি তার ‘আওয়ারেফুল মাআরেফ’ কিতাবে এ হাদিস উল্লেখ করেছেন। সুফি হজরত দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি তার ‘কাশফুল মাহজুব’ কিতাবে উলের পোশাক সম্পর্কিত আরেকটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। হজরত মুহাম্মদ (দ.) বলেন, ‘তোমাদের উচিত উলের পোশাক পরিধান করা। এতে তোমরা নিজেদের অন্তরে ঈমানের সুমিষ্ট স্বাদ অনুভব করতে পারবে।’ হজরত মুসা (আ.) ও হজরত ঈসাও (আ.) উলের পোশাক পরিধান করতেন। হজরত ঈসা (আ.)কে যিনি শনাক্ত করেছেন, সেই ‘জন দ্য ব্যাপ্টিস্ট’ তথা হজরত ইয়াহিয়াও (আ.) মোটা ও খসখসে উলের পোশাক পরতেন। সুফি হাসান বসরি বদরের যুদ্ধে অংশ নেয়া ৭০ জন সাহাবিকে দেখেছিলেন। সবার গায়ে ছিল উলের তৈরি পোশাক। ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক উলের পোশাক পরিধানে অভ্যস্ত ছিলেন। হজরত হাসান বসরি আরো জানান, তিনি সাহাবি হজরত সালমান ফার্সিকে উলের জামা পরিহিত অবস্থায় দেখেছেন। সেটিতে অসংখ্য তালি লাগানো ছিল।
এবার একটি ঘটনা বলা যাক। আহলে বায়তের সদস্য হজরত ইমাম জাফর সাদেক সম্পর্কে ঘটনাটি প্রচলিত আছে। একবার তিনি বেশ দামি ও আরামদায়ক একটি জামা পরিধান করে বের হলেন। মানুষ তখন তার সমালোচনা করা শুরু করল। তারা বলতে লাগল, তিনি দুনিয়া পরিত্যাগের দাবি করেন, অথচ আরামদায়ক ও দামি পোশাক পরে আছেন। ইমাম জাফর সাদেক এসব কথা শোনার পর সমালোচনাকারীদের একজনকে ডাকলেন। তার হাত ধরে নিজের জামার ভেতর নিলেন। সে ব্যক্তি অনুভব করলেন যে ভেতরে আরেকটি পোশাক আছে। আর তা হলো উলের তৈরি। মোটা ও খসখসে। এ ঘটনার একটি তাৎপর্য আছে। হজরত ইমাম জাফর সাদেক বোঝাতে চেয়েছেন যে বাইরের আবরণ ও আভরণ দিয়ে কাউকে বিচার করা ঠিক নয়। বরং তার অন্তর পরিশুদ্ধ কিনা সেটিই মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত। উলের পোশাক পরিধান করা নিয়ে অনেক সুফি তাই আপত্তি তুলেছেন। তাদের মতে, যদি কারো অন্তর পরিশুদ্ধ না হয়, তাহলে লোক দেখানোর জন্য তো তার উলের পোশাক পরিধান করার দরকার নেই। আর অন্তর যদি পরিশুদ্ধই হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে বিশেষ পোশাকের কী প্রয়োজন! এসব যুক্তি অনুসারে অনেক সুফি উলের পোশাক পরিধান করাকে অপরিহার্য বা প্রয়োজনীয় মনে করেননি। তারা সাধারণ পোশাকই পরিধান করতেন। এতে তাদের আধ্যাত্মিকতা চর্চা ও স্রষ্টার নৈকট্য অর্জনে কোনো সমস্যা হয়নি।
হজরত দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি ছিলেন ১১ শতকের সুফি। তিনি ‘কাশফুল মাহজুব’ কিতাবে উল্লেখ করেন, তার সময়ে পোশাক তৈরির উপকরণ সুফিদের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে যায়। তখন ভালো মানের উলের অভাব দেখা দেয়। তাই অধিকাংশ সুফি উলের পোশাক পরিধান করা ছেড়ে দেন। ১১ শতকের আরেক বিখ্যাত তাত্ত্বিক হজরত আবুল কাসিম আল কুশাইরিও তার ‘রিসালা’য় উলের পোশাক সম্পর্কে সুফিদের মধ্যকার বিতর্ক তুলে ধরেছেন। এক জায়গায় তিনি উল্লেখ করেছেন, উলের পোশাক কঠোর তপস্যার প্রতীক। আরেক জায়গায় তিনি জানান, নয় শতকের সুফি হজরত ইয়াহিয়া ইবনে মুয়াজ উলের পোশাককে দুনিয়া সম্পৃক্ততা ও জাঁকজমকের প্রতীক মনে করতেন।
উলের তৈরি পোশাকের ব্যবহার, প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব নিয়ে বিতর্ক আছে। বর্তমানে সুফিদের মাঝে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। তা সত্ত্বেও সুফিবাদে উলের তৈরি পোশাক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক





