‘‌দ্য ডিকশনারি অব ইকোনমিক প্রডাক্টস অব ইন্ডিয়া’-এর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৮৮৯ সালে। তত্ত্বাবধান করেন স্কটিশ চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও উদ্ভিদবিদ জর্জ ওয়াট। তাতে বিস্তর আলোচনা রয়েছে ভারতের উল উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনীতি নিয়ে। উল উৎপাদনের যোগ্য চারটি ভেড়ার জাতকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করেছেন তিনি। প্রজাতি চারটি কুরুমবা, মহিসুর, পাটনা ও রাজপুতনা। প্রজাতির নাম দেয়া হয়েছে বেড়ে ওঠা অঞ্চলের নামে। দুঃখজনকভাবে এদের কোনোটিই এখন চিহ্নিত করা সম্ভব না। তবে ঔপনিবেশিক আমলে উপমহাদেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় যে উল গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছিল, তার ধারণা পাওয়া যায়। 

ব্যবহারের ওপর ভিত্তি ধরে উলকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। পরিধেয় উল ও কার্পেট উল। কার্পেটে ব্যবহার করা উল শক্ত ও লম্বাটে। ফলে মেঝেতে ব্যবহারের পরও দীর্ঘদিন টিকে থাকে। অন্যদিকে পরিধেয় হিসেবে ব্যবহৃত উলকে হতে হয় নরম, ছোট ও আরামদায়ক। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, রাশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ ইউরোপে উৎপাদিত উলকে গণ্য করা হতো অনুন্নত উলের কাতারে। পরিধেয় হিসেবে ব্যবহার করার হয় ভারতে এমন জাতের উল খুব কম। সে সূত্র ধরেই এখানকার উলের খ্যাতি ছড়িয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়ান কার্পেট উল হিসেবে। কার্পেট উলের বড় একটা অংশ ভারত থেকে রফতানি হতো। যদিও পরিধেয় উলের ক্ষেত্রে ভারত বরাবরই আমদানিমুখী।

১৯৩৮ সালে সামগ্রিকভাবে বিশ্বের শতকরা ২ শতাংশ উল উৎপাদন করত ভারত। তবে কার্পেট উলের ক্ষেত্রে ভারত পূরণ করত বৈশ্বিক চাহিদার ২০ শতাংশ। ঠিক চীনের পরই ছিল উপমহাদেশের অবস্থান। আর কার্পেট উলের এ সম্প্রসারণের প্রধান কারণ ছিল এখানকার ভেড়ার প্রাচুর্য। ফলে কার্পেট ঘরানার উলের রফতানিকারী হিসেবে শক্ত আসন তৈরি করেছে ভারত। সে ব্রিটিশ আমলে উলকে কেন্দ্র করে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, তার বড় অংশেরই এখন আর অস্তিত্ব নেই। সময়ের প্রতিবন্ধকতায় হারিয়ে গেছে। পুঁজি, দূরত্ব, ব্যবহারিক জ্ঞানের ঘাটতি ও কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতাও রেখেছে অনুঘটকের ভূমিকা। তার পরও দীর্ঘদিন ধরে উল শিল্পের সফলতা ছিল উল্লেখযোগ্য। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ স্যার মার্ক কুবোনের পরীক্ষামূলক খামার। ১৮৮০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত হওয়া খামারটি ছিল মহিসুরের পার্বত্যাঞ্চলে। উল উৎপাদনে স্থানীয় প্রজাতির প্রতি জোর দিয়েছিলেন মার্ক। 

গাঙ্গেয় সমভূমির তৃণপ্রধান অঞ্চলে পালন করা হতো ভেড়া ও ছাগল। সাধারণত গরুর তুলনায় ভেড়ার পেছনে খরচ কম। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে তারা বেশি সক্ষম। ফ্রান্সিস-বুকানন হ্যামিলটন লিখেছেন, ভারতের কুরুবা সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তিরই ৫০-১০০ ভেড়া আছে। কুরুবা নামের অর্থই ভেড়াপালক বা রাখাল। রেজিনাল্ড এডওয়ার্ড ইথনোভেন ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসক। তিনি দাবি করেছেন, ভেড়া পালকরা কেবল ভেড়ার পাল নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করত। তারা পালন করত গ্রামীণ পরিবেশে আবহাওয়াবিদের ভূমিকা। কারণ তৃণের সন্ধান এবং আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করেই নির্ধারণ হতো ভেড়ার পরবর্তী গন্তব্য। ধনগড় সম্প্রদায়ের লোকেরা শাল ও কাপড় বুনত ভেড়ার পশম দিয়ে। তাদের জীবনযাপনের প্রধান উপকরণ ছিল পশুপালন। দ্বিতীয় শতকের বৌদ্ধ পুস্তকেও তাদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। সেদিক থেকে দেখলে উলের সঙ্গে সম্পর্কও তাদের আদিকাল থেকেই। এমনকি ধনগড় নামটিও ধেনুগড় থেকে এসেছে বলে দাবি ঐতিহাসিকদের, যেখানে ধনু অর্থ গাভী। কুরুবা ও ধনগড়ের বাইরে ভুটিয়ারা ছিল বণিক সম্প্রদায়। তবে তারাও পশম উৎপাদন ও বুননের সঙ্গে জড়িত ছিল। প্রতি গ্রীষ্মে তারা তিব্বতের গারতক, তাকলাকত ও গানেমার বাজারে ভ্রমণ করত। ভারত থেকে নিয়ে যেত ধাতব সরঞ্জাম, তামাক, রূপা ও শস্য। অন্যদিকে তিব্বত থেকে নিয়ে আসত উল ও লবণ। অন্য সম্প্রদায়ের মতো ভুটিয়ারা কৃষির সঙ্গে সেভাবে যুক্ত ছিল না বরং তাদের অর্থনীতির বড় একটা অংশ ছিল উল ব্যবসাকে কেন্দ্র করে। পুরুষরা পশম ছাড়াত ও প্রক্রিয়াজাত করত। নারীরা তার মাধ্যমে তৈরি করত পোশাক। ব্যবসার ক্ষেত্রে ভুটিয়াদের আধিপত্য ছিল বলতে গেলে একচেটিয়া।

১৮৬৫ সালে বন মন্ত্রণালয় বনভূমিতে চলাফেরায় সীমা আরোপ করে। ফলে পশুচারণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। বর্ষার তিন মাসই দেশব্যাপী পশুচারণ করা যেত। অন্য সময়ে মাটি মাত্রাতিরিক্ত শুষ্ক ও তৃণশূন্য থাকত। ফলে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে খাল খননের চিন্তা। বিভিন্ন জায়গায় পানি সরবরাহ সহজ করার জন্য জলাশয় খনন করা হয়। এ সময়ই ব্রিটিশরাজ কর ব্যবস্থায় বিপুল পরিবর্তন আনে। নতুন ব্যবস্থায় গ্রাম্য এমন সব মানুষকেও আওতায় আনা হয়, যারা আগে অব্যাহতি পেয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পাঞ্জাবের মতো অঞ্চলে কৃষক সম্প্রদায় বেশ বেকায়দায় পড়ে। তার প্রমাণ রয়েছে ১৮৮০-১৯৫০ পর্যন্ত বহু নথিতে। ঠিক এ সময়েই ব্রিটিশরাজের নজরদারি থেকে রক্ষা পেতে পাটনা এবং অযোধ্যার মেষপালক জাতিগোষ্ঠী গদরিয়ারা নেপাল ও বনভূমিপ্রধান অঞ্চলের দিকে সরে যায়।

জর্জ ওয়াট যখন পুস্তক রচনা করছেন, তখন অনেকেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কেউ কেউ বিলুপ্তির পথে। বনভূমির ওপর সংরক্ষণনীতির আরোপের কারণে ভেড়া পরিপালন সংকুচিত হয়ে পড়ে। দক্ষিণ ভারতের কুরুবা যেন বলতে গেলে এক রকম উধাও হয়ে যায়। যে গ্রামে ভেড়ার সংখ্যা একসময় ১৫ হাজার ছিল, দুয়েক বছরের মধ্যেই সেখানে সংখ্যা দুই হাজারে নেমে আসে। আবহাওয়ার কারণেও তারা কোথাও স্থির হতে পারেনি। প্রথমত, আবহাওয়ার কারণে খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে, দ্বিতীয়ত বেড়েছে মৃত্যুর হার। সংকট দুয়েক বছর স্থায়ী হলেই মানের দিক দিয়েও পতন ঘটত উলের। বিশ শতকের প্রথম দশকে চারণভূমির পরিমাণ এবং মান কমে যাওয়াকে বড় দুর্ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় উত্তর প্রদেশের উল শিল্পের জন্য। দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের বিস্তৃত অংশজুড়েও ভেড়া কমে যেতে থাকে বিস্ময়কর দ্রুতগতিতে। আর্থিক সংকটের কারণে অন্য পেশায় চলে গেল অনেকেই। ১৯২০-এর দশকে রাজস্ব বোর্ডের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে দাবি করা হয়, কুলু, কুমাও ও কাশ্মীরিদের কয়েকটি অঞ্চল ছাড়া বাকিদের মধ্য থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে ভেড়া পালনের সংস্কৃতি। পশুপালনের খরচ বেড়ে যাচ্ছিল কয়েকটি অঞ্চলে। ফলে বড় একটা অংশই দীর্ঘদিনের পেশাটি ত্যাগ করেছে। হয় শহর পরিবর্তন করেছে, নাহলে চলে গেছে কৃষিকাজে। কেউ তাদের পূর্ববর্তী পেশায় পরিবর্তন এনেছে এবং কেউ গুটিয়ে নিয়েছে ব্যবসার পরিসর।

একসময় ভেড়া পালন করা হতো স্বপ্রণোদিতভাবে। কিন্তু ক্রমে ভেড়া পালন হতে থাকল মালিকের মাধ্যমে, যিনি বেতনের মাধ্যমে রাখাল রাখতেন। উল ব্যবসায়ীরাই সাধারণত মালিকের কাজটি করত। আগাম কিছু টাকা দিয়ে রাখত রাখালকে। তারা নির্দেশনা অনুযায়ী গড়ে তুলত। তার পরও দেখা গেছে, রাখালের সংখ্যা, কার্পেট বুননকারী কিংবা উলের জিনিসপত্র বুননকারী কমেছে দ্রুতগতিতে। এভাবে ক্রমে ভেড়া পালন কেবল পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যেই সীমিত হয়ে পড়ে। ভেড়ার সংখ্যায় পরিবর্তন আসার কারণে পরিবর্তিত হয়েছে উলের সরবরাহ। চল্লিশের দশকেই উলের ব্যবসায় শক্তিশালী অবস্থান দেখাতে থাকে রাজস্থান। গাঙ্গেয় সমভূমিতে উলের ব্যবহার জারি থাকলেও ভেড়া পালন বিলুপ্ত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে সেখানকার চাহিদা পূরণ করত উত্তর ভারত থেকে আসা পণ্য। দক্ষিণ ভারতের উৎপাদনকারীর অনুপাতে গ্রাহক বেশি ছিল। চাহিদা বেশি থাকায় সেখানকার সম্প্রসারণ দ্রুত হয়েছে। ভারতীয় শুল্ক বোর্ডের জরিপ অনুযায়ী, ১৯২৪ সালে ভারতে ভেড়ার সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৪৭ লাখ। ২০২৯ সালে উল উৎপাদনের পূর্বাভাস ছিল ৪ লাখ ৫৫ হাজার টন।

উপনিবেশ যুগে ভারতীয় অর্থনীতি ছিল বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। ১৯২৯-৩৩ সালের মধ্যে উলের উৎপাদন ছিল ১০ কোটি পাউন্ড, যেখানে সমুদ্র পথের আমদানি ৬০ লাখ পাউন্ড। রফতানি ৫ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড। স্থলপথে উল আসত প্রায় দুই কোটি পাউন্ড। অবশ্য শুল্ক বোর্ডের এ তথ্য পুরোপুরি নিশ্চয়তা না দিলেও বাণিজ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতে উল ও উল থেকে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি বেড়ে যায়। তবে ১৯৩০-এর দশকে আমদানি করা উলের পণ্যে শুল্ক আরোপ করা হলে উলের কাঁচামালের জন্য কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। ১৯২৪ সালের উল বাণিজ্যের পরিসংখ্যান থেকেও দেখা যায় সমুদ্র ও স্থলপথে আমদানি করা পণ্যের মধ্যে বড় অংশ উলের কাপড় এবং রফতানি পণ্যের বড় অংশই উলের কার্পেট। উলের বাণিজ্যে এ উল্লম্ফনের চিত্র আরো স্পষ্ট হয় রফতানি জরিপের দিকে তাকালে। ১৯০০-০১ থেকে ১৯০৪-০৫ অর্থবছরের মধ্যে সমুদ্রপথে উলের কাঁচামাল এসেছে ২৮ লাখ পাউন্ড। অন্যদিকে উল রফতানি হয়েছে ২ কোটি ৮২ লাখ পাউন্ড। পরবর্তী চার দশকে উল ব্যবসায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ১৯৩৫-৩৬ থেকে ১৯৩৮-৩৯ অর্থবছরের মধ্যে সমুদ্রপথে কাঁচামাল আমদানি হয়েছে ৭৪ লাখ পাউন্ড। অন্যদিকে উল ও উলজাত পণ্য রফতানি হয়েছে ৪ কোটি ৮৬ লাখ পাউন্ড। ভারতের এ দীর্ঘ আমদানীকৃত উলের দুই-তৃতীয়াংশ আসত তিব্বত থেকে। সেগুলো কানপুরের উল কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা হতো। তিব্বত ছাড়াও অন্য উৎসের মধ্যে রয়েছে ইরান, আফগানিস্তান ও এশিয়ার অন্য অঞ্চল। উত্তর প্রদেশের উল কারখানায় জড়ো হয়ে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ত গাঙ্গেয় অঞ্চলে। বাণিজ্য পরিচালনা করত সাধারণত ভুটিয়ারা। ভুটিয়াদের সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ও যোগ দেয় শিগগিরই। অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা বিবেচনা করে অভিজাত ব্যবসায়ীদের মনোযোগের কেন্দ্রে পরিণত হয় উল। সে সময় উল বাণিজ্যের প্রধান অঞ্চল ছিল পাঞ্জাব। শাল, শীতবস্ত্র ও কার্পেট তৈরি হতো কারখানাগুলোয়। পাঞ্জাবের প্রধান বাজার ছিল আবার ফাজিলকা। এছাড়া অমৃতসর, লুধিয়ানা ও মুলতান পরিচিতি অর্জন করেছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে। এ সময় রেলপথের সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে উলের সম্প্রসারণ গতিতে। আগ্রা থেকে রাজপুতনা কিংবা পাঞ্জাব থেকে উত্তর প্রদেশের সংযোগ স্থলপথে বাণিজ্যে সুবিধা করে দেয়। উত্তর ভারতজুড়ে গড়ে ওঠা বিশাল উলের বাজার জর্জ ওয়াটও তার লেখায় সত্যায়ন করেছেন। আগে যেসব অঞ্চগে মুঘল নগরী গড়ে উঠেছিল, সেসব নগরীতেও ছড়িয়ে পড়ে উলের ব্যবসা। আগ্রা, অমৃতসর, মুলতান, লাহোর, লক্ষ্ণৌ, মুরাদাবাদ, ফররুখাবাদ ও বেনারস ছিল উলের বাণিজ্যিক ঘাঁটি।

উলের ইতিহাসের তুলনায় উল কারখানার ইতিহাস অতটা পুরনো নয়। ভারতে উল কারখানার যাত্রা শুরু হয় ব্রিটিশ যুগে ১৮৭৬ সালে। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া করপোরেশন তখন দুটি কারখানা স্থাপন করে উত্তর ভারতে। প্রথমটি পাঞ্জাবের ধারিওয়াল, দ্বিতীয়টি কানপুরে। কানপুর তখন উদীয়মান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। পরবর্তী এক দশকের মধ্যেই কারখানা স্থাপিত হয় বোম্বে ও বেঙ্গালুরুতে। ফলে পাঞ্জাব থেকে মহিসুর পর্যন্ত বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরো গভীর হয়ে ওঠে এ সময়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে কারখানা কার্যক্রমে দ্রুত পরিবর্তন আসে। তবে চাহিদা তখনো ছিল ব্যাপক। ফলে উত্তর ভারতজুড়ে ছোট ছোট ব্যবসা গড়ে ওঠে। তাদের মধ্যে বৈচিত্র্যও আসতে থাকে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক শ্লথতার মধ্যে পড়ে বিশ্ব। এ সময়ে চাহিদা কমে যায়। ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য টিকে থাকাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ সময়ে আমদানি কাঁচামালের ওপর ভর করে পাঞ্জাবে কিছু উল কারখানার উত্থান ঘটে। ১৯২৯-৩০ সালে জাপান, ইতালি ও পোল্যান্ড থেকে আসা সস্তা উলের কাপড় স্থানীয় কারখানাগুলোর জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। স্থানীয়রা শুল্ক আরোপের দাবি তোলে। শুল্ক বোর্ড আমদানি করা কাপড়ের ওপর শুল্ক আরোপ করলেও কাঁচামালকে শুল্ক মুক্ত রাখে। তার পরও কিছুটা ইতিবাচক ফল ভোগ করে স্থানীয় উল।

ভারতীয় উলের গল্পে কাশ্মীরি শালের প্রসঙ্গ না আনাটা অবিচার। কাশ্মীরি শালের ইতিহাস পুরনো হলেও উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে হিমালয়সংলগ্ন অঞ্চলগুলোর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কারুকাজ, আভিজাত্য ও আরামদায়ক হওয়ায় ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের বাজারে দ্রুত প্রভাব বিস্তার করে শাল। অবশ্য কার্পেট শিল্পের বিকাশ শালের সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। ক্রমে অন্য কেন্দ্রগুলো ক্রমে হারিয়ে যায়। আধিপত্য সংকুচিত হয়ে পড়ে লাদাখ, জম্মু ও কাশ্মীরের মধ্যে। এজন্যই মনে হয় ঐতিহাসিকরা দাবি করেন, কাশ্মীরি শালের ভস্মের ওপর মাথা উঁচু করেছিল উপমহাদেশের কার্পেট শিল্প। ভিনসেন্ট রবিনসন বলেন, ‘‌নতুন ফ্যাশন এসে পরাজিত করেছে কাশ্মীরের মহারাজার শালকে।’

আহমেদ দীন রুমি: লেখক