এক ব্যক্তি নিজের তারুণ্যের বেলা কাটানো ধূলিধূসর গ্রামে ১৮ বছর পরে ফিরে আসে। কয়েক দশকের বিচ্ছেদের পর এক দম্পতির তাত্ক্ষণিক পুনর্মিলন ঘটল। মাথা গরম কয়েক ভাই একটি খুনের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য হন্যে হয়েছিল, যদিও সেই খুন তারা স্বচক্ষে দেখেনি বা সেই খুন তাদের হূদয়েও দাগ কাটেনি। এটা একটা বন্দুকযুদ্ধ।

অনেকভাবেই ১৯৬৬ সালে নির্মিত ‘তিয়েম্পো দে মোরি’ (আ টাইম টু ডাই) ছিল মেক্সিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা আর্তুরো রিপস্টেইনের প্রথম চলচ্চিত্র। এ চলচ্চিত্র নির্মাণে তরুণ আর্তুরো নির্দেশনা ও সহায়তা পেয়েছিলেন লুই বুনুয়েলের কাছে। অনেকভাবেই চলচ্চিত্রটি ওয়েস্টার্ন সিনেমার ক্যাটাগরিতে ভালোভাবেই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। সিনেমায় দেখা যায় শুষ্ক, রুক্ষ প্রান্তরে আইনহীন অরাজক পরিবেশে মর্যাদা আর ন্যায়বিচার নিয়ে জীবন-মৃত্যুর খেলা।

কিন্তু সিনেমাটা সবচেয়ে স্মরণীয় হতে পারে এর চিত্রনাট্য লেখকের পরিচয়ে— লেখক কলম্বিয়ার একসময়কার সাংবাদিক, যার নাম গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস।

তার জীবন এবং লাতিন আমেরিকান সাহিত্যকে বদলে দেয়া উপন্যাস ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’ প্রকাশিত হওয়ার আগে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া, পেরুর লেখক মারিও বার্গাস ইয়োসার সঙ্গে তার কিংবদন্তি, রহস্যময় ঝগড়ার আগে মার্কেস চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ করতেন। মার্কেস তিয়েম্পো দে মোরির গল্প লিখেছিলেন আর্তুরোর অনুরোধে। এবং তার পর তার বন্ধু, আরেক মেক্সিকান ঔপন্যাসিক কার্লোস ফুয়েন্তেসের সহায়তায় গল্পটিকে সিনেমার জন্য উপযুক্ত করে তোলেন।

সিনেমাটিতে এমন অনেক থিম স্পর্শ করা হয়েছে, যেগুলো পরবর্তীতে মার্কেসের উপন্যাসগুলোয় মূর্ত হয়ে উঠেছে— ঐতিহ্য, মালিকানা ও ভাগ্য। এটা প্রতিশোধের গল্প, যা মূলত পরিবারের গতিশীলতাকে প্রকাশ করেছে। আর সেখানে এমন একটা পরিস্থিতিও তৈরি করা হয়েছে, যাতে মনে হবে এটা বাস্তব জগত্ থেকে বিচ্ছিন্ন।

মার্কেসের ছেলে চলচ্চিত্র পরিচালক রদ্রিগো  গার্সিয়া পিতার সিনেমা সম্পর্কে বলেন, ‘আমি গল্পটার সরলতা ভালোবাসি— তার পরও কিন্তু গল্পটা অনেক শক্তিশালী।’

‘গানফাইটে প্রতিপক্ষকে হত্যা করে অনেক বছর পর বাড়ি ফেরে এক ব্যক্তি। সে ভেবেছিল, সব শান্ত হয়ে গেছে তত দিনে। কিন্তু সেই খুন হওয়া ব্যক্তির ছেলে কিন্তু সবকিছু শেষ বলে মেনে নেয়নি। এক্ষেত্রে গল্পটিতে গ্রিক ট্র্যাজেডির একটা ছায়া আছে— অর্থাত্, তোমার ভবিষ্যত্ আগেই লেখা হয়ে আছে। তুমি অতীত থেকে পালাতে পারবে না।’

একটা ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে ছবিটি আকর্ষণীয়। এটা নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিকের বহুদিনের সিনেমাপ্রীতির প্রমাণ।

১৯৫০-এর দশকের শুরুর দিকে কলম্বিয়ার একজন সাংবাদিক হিসেবে গার্সিয়া মার্কেস বারানকিল্লা শহরে দৈনিক এল হেরালদোতে সেপটিমাস ছদ্মনামে সিনেমার সমালোচনাও লিখতেন। 

ইতালির নিওরিয়ালিস্টদের কাজে বিমোহিত মার্কেস তার প্রথম রিভিউ লেখেন ভিত্তোরিও দি সিকা’র ১৯৪৮ সালের ক্লাসিক ‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’ নিয়ে।

এ সময় তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণেরও চেষ্টা করেছিলেন। সুররিয়ালিস্ট কাজ ‘লা লাগুস্তা জুল’ (দ্য ব্লু লবস্টার)-এর চিত্রনাট্যের সহলেখক ছিলেন তিনি— রহস্যময় তেজস্ক্রিয় গলদা চিংড়ির বিষয়ে অনুসন্ধানরত এক ব্যক্তির কাহিনী নিয়ে এ গল্প।

১৯৬১ সালে চিত্রনাট্যকার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মার্কেস মেক্সিকোতে আসেন। মার্কেসের কথায়, ‘সে সময় মেক্সিকোর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দারুণ সুসময় এবং সেটা তখন বেশ স্থিতিশীল। মেক্সিকোর মানুষ তখন তাদের সিনেমা দেখত। এবং এসব সিনেমা লাতিন আমেরিকা ও স্পেনেও প্রদর্শিত হতো।’&dquote;&dquote;

এ সময়টা গার্সিয়া মার্কেস ফিকশন ও ফিল্মের মধ্যে আনাগোনা করেছেন। এ সময় প্রকাশিত হয়েছে তার গল্পগ্রন্থ ‘দ্য লিফ স্টর্ম’ (১৯৫৫) এবং ‘নো ওয়ান রাইটস টু দ্য কর্নেল’ (১৯৬১)। একই সঙ্গে তিনি অনেকগুলো সিনেমার চিত্রনাট্যও লিখেছেন, যার মধ্যে আছে নৈতিকতা নিয়ে ১৯৬৪ সালের ‘এল গ্যালো দে ওর’ (দ্য গোল্ডেন রুস্টার) এবং ‘এন এস্তে পুয়েবলো নো হে লারোনস’ (ইন দিজ টাউন দেয়ার আর নো থিভস)। শেষেরটি মার্কেসের নিজের একটি ছোটগল্পের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এবং এ ছবিতে মার্কেস নিজে অভিনয় করেছেন, আরো ছিলেন লুই বুনুয়েল (পাদ্রির চরিত্রে), ঔপন্যাসিক হুয়ান রুলফো, চিত্রশিল্পী হোসে লুই কুয়েভাস ও লিওনোরা ক্যারিংটন।

সেই দশকের মাঝামাঝি মার্কেস একটা ওয়েস্টার্ন সিনেমা নির্মাণে রিপস্টেইনের সঙ্গে জুটি বাঁধেন। ২০১৪ সালে রিপস্টেইন মেক্সিকোর পত্রিকা প্রসেসোকে বলেন, ‘আমি একটা বিশ্রী চিত্রনাট্য লিখছিলাম এবং মার্কেসকে জিজ্ঞেস করলাম যে, তিনি আমার সঙ্গে একটু কাজ করবেন কিনা। তিনি তখন এখনকার মতো বিখ্যাত ছিলেন না।’ সেই গল্পটাই ছিল তিয়েম্পো দে মোরি।

‘‘তিয়েম্পো দে মোরিতে বর্ণিত শহরটিতে মানুষ ছিলেন মাত্র নয়জন। তাদের ঘিরে ছিল শুষ্ক-রুক্ষ মরুভূমি। আপনি যদি মার্কেসের ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’ পড়েন, তাহলে দেখবেন সেখানে বর্ণিত গ্রামীণ পরিবেশ আর তিয়েম্পো দে মোরিতে বর্ণিত শহরটি একেবারে ভিন্ন।” এ মূল্যায়ন লিব্রো শিমরোসের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড কিপেনের।

কিন্তু মোটের ওপর সিনেমাটির বক্তব্য হচ্ছে যে, আপনি চাইলেই ভাগ্যের লিখন বদলাতে পারেন না। তিয়েম্পো দে মোরির মূল চরিত্রের আসন্ন মৃত্যু সিনেমায় টেনশন তৈরি করেছে। দর্শকরা জানেন যে, তার মৃত্যু হবে— সিনেমার একেবারে শুরুতেই এটা জানিয়ে দেয়া হয়।

মার্কেসের ১৯৮৩ সালের উপন্যাস ‘ক্রনিকেল অব আ ডেথ ফোরটোল্ড’ এমন একজন মৃত্যুপথযাত্রীর গল্প, যেখানে তার মৃত্যু আগেই নির্ধারিত হয়ে আছে। তিয়েম্পো দে মোরির প্রিমিয়ারের এক বছর পর প্রকাশিত হয় ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড। উপন্যাসের প্রথম লাইনেই পরিবর্তনের অযোগ্য পরিণতির কথা বর্ণিত হয়েছে। নিজের পিতার লেখা সম্পর্কে গার্সিয়া বলেন, ‘তার কাজের বিভিন্ন দিক রয়েছে, কিন্তু একটা বিষয় একেবারে নিশ্চিত যে কিছু জিনিস আগেই নির্ধারণ হয়ে গেছে। একজন মানুষ সকালে জেগে ওঠে এবং জানে না যে সে এরই মধ্যে মৃত। এবং কোনো কিছুই সৌভাগ্য বা প্রচেষ্টা বা বুদ্ধি সেই মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে পারে না।’

তিয়েম্পো দে মোরিতে হুয়ান সায়াগো (চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন জর্জ মার্তিনেস) নামের এক ব্যক্তি দুর্গম এক গ্রামে প্রতিশোধপরায়ণ ভ্রাতৃদ্বয়ের মুখোমুখি হয়। ১৯৬৬ সালের আগস্টে মেক্সিকো শহরের সিনে ভারিয়েদাদেজে তিয়েম্পো দে মোরির প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। তবে সিনেমাটা বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি।

সিনেমার সংলাপগুলো একেবারে আনুষ্ঠানিক ধরনের। এত ভদ্র সংলাপ মার্কেসের উপন্যাসে মানালেও পর্দায় মানায় না। তার পরও সিনেমাটা লেখকের জীবনের একটা সন্ধিক্ষণ। ২০০৯ সালে জেরাল্ড মার্টিনের লেখা জীবনীগ্রন্থ ‘গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: আ লাইফ’-এ লেখা হয়েছে যে, তিয়েম্পো দে মোরির নির্মাণের অভিজ্ঞতা হয়তো লেখককে সাহিত্যের আরো গভীরে প্রবেশ করতে সহায়তা করেছে। গার্সিয়া মনে করেন, ‘সিনেমা খুবই বাস্তবানুগ। ভিজ্যুয়াল এফেক্টের এত সুবিধা এ যুগে থাকা সত্ত্বেও আপনাকে গল্প বলার যোগ্যতা থাকতে হবে। সেখানে থেকে কাব্যিক অংশটি ছুঁড়ে ফেলাটা সব সময়ই কঠিন।’

সিনেমা ছিল গার্সিয়া মার্কেসের আবেগ, এমনকি সেটা তিনি দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করতেন তার পরও। ১৯৮১ সালে প্যারিস রিভিউকে বলেছিলেন, ‘সিনেমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সেই দম্পতির মতো, যারা আলাদাভাবে বাস করতে পারবে না। আবার তারা একসঙ্গেও থাকতে পারবে না।’

তিয়েম্পো দে মোরি’র মুক্তির ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে সম্প্রতি অলাভজনক লাইব্রেরি লিব্রো শিমরোসের হলিউডের ফোর্ড থিয়েটারে এক রাতের জন্য আউটডোর স্ক্রিনিংয়ের আয়োজন করেছিল। সিনেমা নিয়ে ভূমিকামূলক কথা বলেছেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের পুত্র নির্মাতা রদ্রিগো গার্সিয়া।

সূত্র: ক্যারোলিনা এ. মিরান্দার প্রবন্ধ. লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস, ফোর্ড থিয়েটার অবলম্বনে