চট্টগ্রামের সবচেয়ে
সুনন্দ ও
বিখ্যাত দালান
হলো পাহাড়ের
একদিকের চূড়ায়
অবস্থিত আসাম
বেঙ্গল রেলওয়ের
অফিসগুলো; অন্যদিকের
চূড়ায় আছে
পোস্ট অফিস,
সার্কিট কোয়ার্টার
ও ডাকবাংলো।
সবই এক
ছাদের নিচে।
এলাকাটি পরিব্রাজক-দর্শনার্থীদের
জন্য বিশেষ
কোনো আবেদন
তৈরি করে
না বটে;
কিন্তু আরব
সাগরে নিয়োজিত
লস্করদের মতো
ঝগড়াটে মুসলিম
মাঝি-মাল্লা,
বঙ্গোপসাগরগামী নাবিকদের
হেডকোয়ার্টার হিসেবে
এটি বেশ
পরিচিত। এ
এলাকায় বিক্রির
জন্য ইউরোপীয়
কোনো বই
নেই, কিংবা
নেই কোনো
সংবাদপত্র। অবস্থাদৃষ্টে
মনে হয়
যে রেলস্টেশনের
টিকিট বিক্রেতা
তার প্রতিষ্ঠানের
সময়সূচি পর্যন্ত
পড়তে জানেন
না। তার
কথায়ই সেটি
স্পষ্ট। যেমনটা
বলেছেন, তিনি
কামারবান্ধা আলী
স্টেশনের নাম
কখনো শোনেননি
কিংবা ওই
স্টেশনগামী কোনো
যাত্রীর কাছে
টিকিট বিক্রি
করেননি। আসলে
উপরোক্ত স্টেশনটি
চট্টগ্রামমুখী প্রধান
লাইন থেকে
৪৬০ মাইল
দূরের একটি
স্টেশন।
আসাম বেঙ্গল
রেলপথ হলো
চট্টগ্রাম থেকে
শুরু হয়ে
ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার
তিনসুকিয়া পর্যন্ত
বিস্তৃত একটি
মিটার গেজ
লাইন। এর
পুরো দৈর্ঘ্য
৫৭৪ মাইল।
আর ১৬৫
মাইলের ব্যবধানে
একেকটি স্টেশন
অবস্থিত। রেলপথটি
১৮৯৭ সালের
১২ জুন
সংঘটিত ভূমিকম্পে
নজিরবিহীন ক্ষতির
শিকার হয়েছিল।
ক্ষয়-ক্ষতির
পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল
৯০ হাজার
পাউন্ডের উপরে
এবং ১
হাজার ৫০০-এর
বেশি মানুষ
মারা গিয়েছিল।
তদুপরি বর্ষাকালে
কঠিন-বন্ধুর
পাহাড়ের ভাগে
রেলপথটি সাংবাৎসরিক ক্ষতিতে
পড়ে এবং
লাইনের সবর্ত্রই
বিপর্যয়কর অবস্থার
সৃষ্টি হয়।
এখানে একটি
কথা অবশ্যই
মনে রাখতে
হবে যে
রেলপথটির খাসি
পাহাড়ের উত্তর-পশ্চিমাংশের
ধারে বিশ্বের
সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের
রেকর্ড বিদ্যমান।
সংগতকারণে তুমুল
বৃষ্টির পর
সেখানে ট্রেনগুলো
শিডিউল বিপর্যয়ের
শিকার হয়।
এতে পুরো
লাইন একসঙ্গে
অচল না
হলেও ট্রেন
চলাচলের পরিবেশ
তৈরির জন্য
অবশ্য অব্যাহত
শ্রমের দরকার
পড়ে।
যা-ই
হোক, ৮
ঘণ্টার ভ্রমণ
শেষে আমরা
সবচেয়ে নিকটস্থ
রেল সংযোগ
লাকসাম জংশনে
পৌঁছি, তার
জন্য আমাদের
ট্রেনটি অবশ্য
মেঘনার পূর্ব
তীরের চাঁদপুরকে
ছেড়ে আসতে
হয়েছিল, যে
নদীটি গঙ্গা
ও ব্রহ্মপুত্রের
সন্ধিস্থলে গঠিত
একটি প্রধান
নদী। সেখানে
আমরা কলকাতা
মেইলের জন্য
প্রতীক্ষায় ছিলাম,
যেটি গোয়ালন্দ
থেকে স্টিমারের
মাধ্যমে নেমে
আসে এবং
পরে লাকসামের
পথে একটি
রেস্তোরাঁ-কারে
রাতের খাবার
সেরেছিলাম। রাতে
আমরা ত্রিপুরা
পাহাড়ের পশ্চিম
ও উত্তরাংশের
সীমান্তে অবস্থান
করেছিলাম এবং
পরদিন আমরা
বদরপুর, শিলচর,
লুমডিং ও
গুয়াহাটি জংশন-সংলগ্ন
পাহাড়ের অংশে
ঘোরাঘুরি করে
সময় কাটিয়েছিলাম।
সুরমা নদী
পার হওয়ার
পর রেললাইনটি
পাহাড়ের মধ্য
দিয়ে জাতিঙ্গা
নদী উপত্যকা
হয়ে দামছড়া
স্টেশন পর্যন্ত
বিস্তৃত। এ
স্টেশন ও
লুমডিংয়ের মধ্যকার
অংশটি ১৯০৩
সালের ১
ডিসেম্বর যান
চলাচলের জন্য
উন্মুক্ত করে
দেয়া হয়েছিল।
রেলপথটি জাতিঙ্গার
ডান দিকের
তীর ধরে
প্রথম শুরু
হয়, যা
বড় বড়
গাছে আচ্ছাদিত
পাহাড়ের ভেতর
দিয়ে চলে
গেছে এবং
সেখান থেকেই
খুব চমত্কার
ও দৃষ্টিনন্দন
প্রাকৃতিক দৃশ্যের
অবতারণা।
চট্টগ্রাম থেকে পুরো রেলপথজুড়ে মাইল ও কোয়ার্টার মাইল প্রদর্শনকারী পোস্ট ও টানেল রয়েছে। টানেলগুলোও নাম্বারিং করা। দুই নম্বরটি ২৭২তম মাইলপোস্টের কাছে এবং তিন নম্বরটি একটি ল্যান্ডস্লিপের মধ্য দিয়ে চলে গেছে। আরো দূরে অন্য ল্যান্ডস্লিপের কাছে সদ্য বিচ্যুত একটি ট্রেন দুমড়েমুচছে গিয়েছিল। দুর্ঘটনাটি নিয়ে নানা বিতর্ক বিরাজমান। কেউ কেউ এর জন্য অত্যধিক গতি, আবার কেউ কেউ স্থায়ী পথের ত্রুটি-বিচ্যুতিকে দায়ী করেছেন। তবে কারণ যা-ই হোক না কেন, রেলওয়ের কাটিংগুলো নিশ্চিতভাবে খুব খাড়া এবং এ অংশে পিচ সরিয়ে মেরামতের কাজ চলছে। স্থানীয়দের কাছে কোদালি নামে পরিচিত নিড়ানি দিয়ে এবং সাধারণত বার্মিজ দার মতো (যেটিকে তারা দাও বলেন) বড় ছুরি দিয়ে রেলকর্মীরা কাজ করেন।
মজার বিষয়
হলো, আসামে
গণ্ডার, হাতি,
চিতাবাঘ, বন্য
মহিষ, বাঘসহ
হরেক রকম
বণ্য প্রাণীর
দেখা মেলে।
আমরা আসার
কিছুক্ষণ আগে
থেকে বাঘের
থেতলানো একটি
মরদেহ রেলপথে
পড়ে থাকতে
দেখেছি এবং
হারাঙ্গাজাওতে আমরা
একটি চিতাবাঘের
দেহ দেখেছি,
কয়েক ঘণ্টা
আগে সেটি
রেললাইনে মারা
পড়েছিল। এ
স্টেশনে এসে
ট্রেনে দুটি
ইঞ্জিন জুড়ে
দেয়া হয়;
একটি সামনের
দিকে, অন্যটি
পেছনের দিকে
এবং এখান
থেকেই আমাদের
সত্যিকার যাত্রা
শুরু হয়।
আরো তিন
মাইল যাওয়ার
পর রেললাইনের
ধারে শ্বেত
মার্বেল পাথরে
আবৃত একটি
কবর চোখে
পড়ে।
লুমডিংয়ের পর
যেখানে ডাইনিং
কার পরিবর্তন
করেছিলাম, রেলপথটি
গ্রামের মধ্য
দিয়ে ধানসিঁড়ি
স্টেশনের দিকে
চলে গেছে
এবং সেখান
থেকে তারপর
লাইনটি ধানসিঁড়ি
উপত্যকায় নেমেছে।
আবার মনিপুর
সড়কের পর—যেখান
থেকে কোহিমার
দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী
এবং তারপর
দক্ষিণমুখী একটি
রোড রয়েছে—রেলপথটি
পূর্বে নাগা
পাহাড়ে অবস্থিত
শিবসাগর জেলার
দিকে ধাবমান।
রাত ৩টার
দিকে আমরা
অবশেষে কামারবান্ধা
আলী স্টেশনে
এসে যাত্রার
ইতি টানি
এবং যেখানে
এসে আমরা
কিছু আন্তরিক
বন্ধুর সান্নিধ্য
লাভ করি,
যাদের চা
বাগানগুলো এ
জেলাতেই অবস্থিত।
আসাম চা
বাগানের বাংলোর
জীবন ভারতের
অন্য দূরবর্তী
জেলাগুলোর চা
বাগানের জীবনের
চেয়ে ভিন্নতর
নয়। এখানে
প্রতিনিয়ত সাংঘাতিক
জীবনঝুঁকি বিদ্যমান।
এখানে স্বাস্থ্যকে
নেয়া হয়
হালকাভাবে এবং
সামাজিক মামুলি
বিষয়গুলোকে নেয়া
হয় গুরুত্বসহকারে।
স্থানীয় প্রথা
ও ‘হোমের’
চর্চাগুলোর প্রতি
এখানে একটা
ঘনিষ্ঠতা বিদ্যমান।
বড় বিষয়
হলো, চা
শিল্পের বিকাশই
বিজন ভূমিতেও
হোমসগুলো সম্ভবপর
করে তুলেছে।
আসামের প্রকৃত
রোমান্স হলো
ব্যবসা-বাণিজ্যের
রোমান্স। এ
সমৃদ্ধি সম্ভব
হয়েছিল সভ্য
শাসনের অধীন
চাষাবাদ, অভিবাসী
শ্রম এবং
একটি একক
পণ্য উৎপাদন
ও তার
বাণিজ্যের মাধ্যমে।
এটি সত্য
যে ব্রহ্মপুত্র
উপত্যকায় চা
আবাদের অনেক
আগে চট্টগ্রাম
ও আসামের
পশ্চিমাংশের জেলাগুলো
একটি ঔপনিবেশিক
সরকারের অধীনে
এসেছিল। একই
সঙ্গে এটিও
সত্য যে
অঞ্চলটিতে মাটির
নিচে তেল
ও কয়লার
সন্ধান পাওয়া
গেছে, যে
মাটিতে অসমিয়ারা
নিজেদের খোরাকির
জন্য প্রয়োজনীয়
ধান আবাদ
করে। তবে
অন্য সম্পদ
থাকা সত্ত্বেও
অঞ্চলটি চা
আবাদের জন্য
আবিষ্কার এবং
চূড়ান্তভাবে চা
বাগানগুলো প্রতিষ্ঠা
করা না
হলে সম্ভবত
ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার
ওপরের অংশে
স্থানীয় উপজাতিগুলোর
জন্য বাদ-বিসংবাদহীন
ভূমি মালিকানা
নিশ্চিত হতো।
চা বাগানগুলোর
জন্য তা
আর হয়ে
ওঠেনি। কিন্তু
স্বীকার করতে
হবে যে
আসামের জন্য
চা বাগানগুলো
ঠিক হাওয়াই
দ্বীপপুঞ্জের আখ
বাগানগুলোর মতোই,
সেগুলো অঞ্চলটির
রফতানি, ব্যবসায়িক-বাণিজ্যিক
সমৃদ্ধি ও
প্রাচুর্যের উৎস।
[ওয়াল্টার
ডেল মার
রচিত দ্য রোমান্টিক ইস্ট: বার্মা,
আসাম অ্যান্ড কাশ্মীর
গ্রন্থের দ্বাদশ
অধ্যায়ের অংশবিশেষের
ভাষান্তর]





