সংস্কৃতির স্বভাবই
বয়ে চলা।
সে দেশ,
কাল, সময়ের
সীমা মানে
না। সময়ের
সঙ্গে সংস্কৃতির
উপাদানের রূপ
বদলায়। আর
মানুষের সঙ্গে
সংস্কৃতি ভ্রমণ
করে দেশ
থেকে দেশান্তরে।
বলা হয়,
সংগীতের জন্য
ভাষা, সীমানা
কোনো বাধা
নয়। তাই
সংস্কৃতির অন্যতম
এ উপাদান
সব সময়েই
সর্বজনীন হয়ে
থেকেছে। আর
ভৌগোলিক সীমানা
পেরোনোর ক্ষেত্রে
তা মূলত
মানুষের তথা
শিল্পীর সঙ্গে
ভ্রমণ করেছে।
উপমহাদেশের সুফি
ঘরানার সংগীতধারা
কাওয়ালির ক্ষেত্রে
ব্যতিক্রম কিছু
হয়নি। সাধক,
শিল্পী ও
ভ্রামণিকদের সঙ্গে
সংগীতের বিশেষ
এ ধারাটি
পূর্ব-পশ্চিমে
কেবল ছড়িয়েই
পড়েনি, বরং
প্রবল জনপ্রিয়
হয়েছে। বিশেষত
বাংলায় সংগীতপ্রেমীদের
উপস্থিতি এবং
কাওয়ালির অন্তর্নিহিত
বক্তব্য ও
ভাব এখানকার
মানুষের আবেগকে
নাড়া দিতে
সক্ষম হয়েছিল।
তাই বাংলার
মানুষ খুব
দ্রুত কাওয়ালিকে
গ্রহণ করে
নিয়েছিল।
কাওয়ালির অতীত
ইতিহাস খুঁজতে
গিয়ে অনেকে
বলেন, আবু
হামিদ আল
গাজ্জালী (ইমাম
গাজ্জালী) প্রথম
কাওয়ালি রচনা
করেন। তবে
কাওয়ালি রচয়িতা
হিসেবে নিশ্চিতভাবে
সাদী সিরাজীর
(শেখ সাদী)
নাম নেয়া
যায়। ভারতবর্ষে
কাওয়ালির উত্পত্তি
মূলত কবি
হযরত আমীর
খুসরোর হাত
ধরে। তিনি
ছিলেন দিল্লির
বিখ্যাত সাধক
হযরত নিজামুদ্দিন
আউলিয়ার শিষ্য
ও ভক্ত।
নিজামুদ্দিন মূলত
সুফিবাদের চিশতিয়া
তরিকার প্রবর্তক।
দিল্লিতে তার
দরগাহে ভক্তিমূলক
নানা ধরনের
গান হতো।
সেসব গানের
পাশাপাশি পারস্যের
‘সামা’র
সঙ্গে খানিকটা
মিল রেখে
আমীর খুসরো
নতুন ধরনের
গান রচনা
করেন। পারস্যের
সামার ক্ষেত্রে
যেমন স্রষ্টাকে
ভয় না
করে তার
প্রতি ভক্তি
ও প্রেম
নিবেদন করা
হয়, কাওয়ালিও
অনেকটা সেরূপে
রচিত। কৌতূহলোদ্দীপক
বিষয় হলো
আমরা যাকে
আজ ‘কাওয়ালি’
বলে জানি
তার আনুষ্ঠানিক
নাম ‘মেহফিল-এ-সামা’।
কাওয়ালির উত্পত্তির
পাশাপাশি এর
পরিভ্রমণের সঙ্গে
সুফিবাদ ওতপ্রোতভাবে
জড়িত। মূলত
সুফিবাদের একটি
অন্যতম অনুষঙ্গ
গান। গান
এমনকি নাচের
মাধ্যমে তারা
স্রষ্টার নৈকট্য
লাভের চেষ্টা
করেন। সুফি
ঘরানার সাধকদের
দরগাহ, খানকাহ
বা মাজারেই
এসব গান
গাওয়া হতো।
পীর, দরবেশ
ও সুফিরা
ইসলাম প্রচারের
উদ্দেশ্যে ভ্রমণ
করলে তাদের
সঙ্গে সুফি
ঘরানার সংগীতও
আঞ্চলিক সীমানা
পেরিয়েছিল। এছাড়া
সুফিরা ছিলেন
উদার। তাদের
দরবারে ধর্মীয়
ভেদাভেদ ছিল
না। বিশেষত
নিজামুদ্দিন আউলিয়ার
দরগাহে সব
ধর্মের মানুষের
প্রবেশাধিকার ছিল।
ফলে সেখানে
গাওয়া কাওয়ালির
প্রতি অন্যান্য
ধর্মের মানুষও
আকৃষ্ট হতে
শুরু করে।
রক্ষণশীল মনোভাবের
বাইরে গিয়ে
তাদের প্রচারিত
ঈশ্বর মহিমায়
ভারতের মানুষ
প্রভাবিত হতে
থাকে। পাশাপাশি
খুসরোর একটি
বিশেষত্ব হলো
ত্রয়োদশ-চতুর্দশ
শতাব্দীতে যখন
মুসলিম কবিরা
আরবি-ফারসি
ভাষায় কবিতা
লিখছেন, খুসরো
তখন হিন্দি
থেকে শুরু
করে ব্রজভাষায়ও
কবিতা লিখেছেন।
তিনি তার
সুফি ধারার
কাওয়ালিতে পর্যন্ত
ব্রজভাষা ব্যবহার
করেছেন।
কাওয়ালি এভাবেই
সীমানা পেরিয়ে
যেতে শুরু
করে। বাংলায়
তথা তত্কালীন
বঙ্গে সুফিবাদের
সঙ্গে আসা
কাওয়ালি জনপ্রিয়
হওয়াই স্বাভাবিক
ছিল। প্রথমত,
সুফি সাধকরা
ইসলাম ও
সুফিবাদ প্রচারে
বাংলায় আগমন
করে দরগাহ-খানকাহ
তৈরি করেছিলেন।
তাদের সঙ্গে
আসা কাওয়ালিশিল্পীরা
গানের মাধ্যমে
স্রষ্টা ও
মানুষের নৈকট্য
তুলে ধরলেন।
বাংলার মানুষ
এ গানের
ভাবটা খুব
সহজেই ধরতে
পারল। কেননা
প্রথমত, বাংলার
মানুষ সংগীতপ্রেমী।
দ্বিতীয়ত, আধ্যাত্মবাদ
এখানে বহুদনি
ধরেই প্রচলিত
ও প্রচারিত।
বিশেষত পঞ্চদশ
শতাব্দীতে শ্রীচৈতন্যের
মাধ্যমে যে
ভক্তিবাদী আন্দোলন
তৈরি হয়,
পরবর্তী সময়ে
বৈষ্ণব ভাবধারা
নামে পরিচিত,
এ আন্দোলনের
মূল ভাবের
সঙ্গে কাওয়ালির
মিল রয়েছে।
এমনকি সুফিদের
নাচের ধরনের
সঙ্গে বৈষ্ণবদের
দুই হাত
তুলে করা
কীর্তনেরও মিল
পাওয়া যায়।
তার চেয়ে
বড় কথা,
উভয় ধারার
গানেই মূলত
ঈশ্বরপ্রেমের কথা
বলা হয়।
বাংলায় কাওয়ালি
আগমনের পথরেখা
খুঁজতে হলে
আমাদের মধ্যযুগের
ভারতের মুসলিম
শাসকদের শাসনকাল
এবং তাদের
ক্ষমতার বিস্তৃতি
লক্ষ করতে
হবে। ইরান-আফগানিস্তানে
জন্ম নেয়া
সুফিবাদ কখনো
শাসকদের সঙ্গে
সরাসরি আসেনি।
তবে পরবর্তী
সময়ে শাসকদের
দ্বারা পৃষ্ঠপোষকতা
লাভ করেছে।
এরপর সূচনা
হয় নানা
ধরনের তরিকা।
মুইনউদ্দীন চিশতী,
বখতিয়ার কাকী,
নিজামুদ্দিন আউলিয়ারা
এসব তরিকার
প্রবক্তা ও
প্রচারক। যদিও
নিজামুদ্দিন নিজে
শাসক সম্প্রদায়
থেকে কোনো
সহযোগিতা নিতে
স্বীকার করেননি।
তবে সুলতানি
আমলের বহু
শাসক তাদের
সম্মানের চোখে
দেখতেন এবং
বহু পীর
ও তাদের
মুরিদরা জমি
জায়গির লাভ
করেছেন। পাশাপাশি
ধর্মপ্রচার কিংবা
নিছক ভ্রমণের
জন্য তারা
বেরিয়ে পড়লে
সরকারি সহায়তার
সঙ্গে সাধারণ
মানুষের সহযোগিতাও
লাভ করতেন।
অবশ্য এক্ষেত্রে
ফকির-দরবেশদের
উদার, অসাম্প্রদায়িক
আচরণের পাশাপাশি
তাদের অনুসারীদের
গাওয়া গান
প্রভাব রেখেছিল।
বলা বাহুল্য,
এ গানের
মধ্যে কাওয়ালি
ছিল অন্যতম।
ভারতের তত্কালীন
শাসনকেন্দ্র দিল্লির
পাশাপাশি বাংলারও
কিছু কিছু
অঞ্চলে মুসলিম
শাসন ছিল।
ফলে পীর,
দরবেশ ও
তাদের অনুসারীদের
পক্ষে বাংলায়
বসবাস এবং
মতবাদ প্রচার
করা সহজ
হয়েছিল।
এ ছিল
মোটামুটি রাজনৈতিক
দিক। এর
বাইরে সাংস্কৃতিক
দিক থেকে
বাংলা বরাবরই
সংগীতের দেশ।
পালা-পার্বণ
থেকে ফসল
তোলা পর্যন্ত
সংগীত জড়িত।
তবে ইসলাম
এ অঞ্চলে
কতটা বিস্তৃত
ছিল সে
তর্কে না
গিয়েও বলা
যায়, পীর-দরবেশদের
ভক্তি করা
হতো। তাদের
সঙ্গে এল
কাওয়ালি। যদিও
চিশতিয়া তরিকার
আগে বাংলায়
জালালুদ্দিন তাবরিজির
হাত ধরে
সোহরাওয়ার্দী তরিকা
এসেছিল। ইতিহাসে
পাওয়া যায়
তিনি লক্ষ্মণ
সেনের শাসনামলে
১২০৪-০৫
খ্রিস্টাব্দে বাংলায়
এসেছিলেন। তার
এবং তার
অনুসারীদের হাত
ধরে বাংলায়
সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকা
প্রসার লাভ
করে। কিন্তু
তাতে চিশতিয়াদের
জায়গা পেতে
কোনো সমস্যা
হয়নি। এরপর
একে একে
মাদারিয়া ও
কালান্দারদের আগমন
হয়। এ
প্রতিটি ধারার
পীরদের খানকাহ
তৈরির পর
প্রায় সব
খানকাহে্ গান-বাজনার
আয়োজন হতো,
যার মধ্যে
কাওয়ালি ছিল
অন্যতম। আসলে
যদিও অনেকে
মনে করে,
দুই পক্ষের
‘বাহাস’
নিয়ে তৈরি
গানই কাওয়ালি।
কিন্তু আদতে
আল্লাহ, নবী,
ওলিদের গুণকীর্তনই
কাওয়ালি। হামদ,
নাত, মার্সিয়া,
কাফিও কাওয়ালির
অন্তর্গত। অর্থাৎ
পীর, দরবেশ
ও ধর্মপ্রচারকদের
দরগাহ কাওয়ালির
প্রাণকেন্দ্রে পরিণত
হয়।
কিন্তু এ
কথা বলা
যাবে না
যে সে
সময়েই (আনুমানিক
পঞ্চদশ থেকে
সপ্তদশ শতাব্দী)
কাওয়ালি জনপ্রিয়
হয়েছিল। কেননা
কাওয়ালিকে নানা
ধরনের ফতোয়ায়
পড়তে হয়েছে।
খোদ নিজামুদ্দিন
আউলিয়া প্রশ্নবাণে
বিদ্ধ হয়েছিলেন।
এরপর দিনে
দিনে কাওয়ালি
ছড়িয়ে যাওয়ার
পর তা
জনপ্রিয় হয়েছিল।
আর বাংলায়
কাওয়ালি জনপ্রিয়
হওয়ার নেপথ্য
অবদান মূলত
বাউল ফকিরদের।
ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালির
দেশে মুর্শিদি,
মার্সিয়ার ইতিহাস
বহুদিনের। প্রথমেই
যেমন উল্লেখ
করা হয়েছে,
সংস্কৃতির স্বভাবই
পরিবর্তন এবং
অন্য সংস্কৃতির
সঙ্গে মিশ্রণ।
কাওয়ালির ক্ষেত্রেও
মুর্শিদি, মার্সিয়া,
জারি-সারির
সঙ্গে মিশে
সর্বস্তরের মানুষের
কাছে পৌঁছে
গেছে। অবশ্য
দিল্লিতে যেমন
খুসরো, পাঞ্জাবে
যেমন বুল্লে
শাহ গজল
থেকে কাওয়ালি,
কাফির জন্য
এক নামে
পরিচিত, বাংলায়
এমন নির্দিষ্টভাবে
কাউকে চিহ্নিত
করা যায়
না। তবে
পণ্ডিতেরা ধারণা
করেন, মধ্যযুগের
ভক্তি আন্দোলন
ইসলামী সুফিবাদ,
গান দ্বারা
প্রভাবিত হয়েছিল।
ড. এনামুল
হকের মতে
নদীয়ায় ষোড়শ
শতাব্দীতে বাউল
ধারার সূচনা
হয়েছিল এবং
তা মুসলিম
রীতি দ্বারা
প্রভাবিত হয়।
প্রমথ চৌধুরীর
মতে, ‘ভারতবর্ষের
মধ্যযুগের এ
নব বৈষ্ণব
ধর্ম্ম (গৌড়ীয়
বৈষ্ণব ধর্ম্ম)
সনাতন হিন্দুধর্ম্মের
একটি নবশাখা
মাত্র। তবে
এই নবত্বের
কারণ, মুসলমান
ধর্ম্মের প্রভাব।’
ক্ষিতিমোহন সেন
তার ‘বাংলার
বাউল’ বইয়ে
লিখেছেন, ‘মুসলমানদের
আবির্ভাবে ভারতীয়
চিন্তার মধ্যে
এবং ধর্মসাধনার
মধ্যে বড়ো
একটা সংকট
ঘটিল। পাশাপাশি
থাকিয়াও দুই
দলের পণ্ডিত
চেষ্টা করিয়াও
কিছুতেই দুই
ধারাকে মিলাইতে
পারিলেন না।
তখন নিরক্ষর
সাধকের দল
উভয় সাধনার
মান রক্ষা
করিলেন।’ এ
মিশ্রণের একটি
উপাদান ছিল
গান এবং
সুফি ধারার
কাওয়ালি তার
অন্তর্ভুক্ত।
বাংলায় মূলত
উর্দু কাওয়ালিই
সাধারণভাবে জনপ্রিয়।
তবে এর
বাইরে বৃহত্তর
বাংলায় ছড়িয়ে
ছিটিয়ে আছেন
বহু শিল্পী।
বহু পুরুষ
ধরে নীরবে
নিভৃতে তারা
কাওয়ালি চর্চার
পাশাপাশি কাওয়ালিতে
নিজেদের নিহিত
করে রেখেছেন।
এক্ষেত্রে নদীয়া,
মুর্শিদাবাদ এগিয়ে
থাকবে। নদীয়ার
করিমপুরের গোরভাঙা
গ্রামের শিল্পীরা
বংশপরম্পরায় কাওয়ালি
গেয়ে চলছেন।
বলা যায়,
পশ্চিমবঙ্গের বাংলা
কাওয়ালির বিশুদ্ধ
ধারাটা এরাই
ধরে রেখেছেন।
এ গ্রামের
অধিবাসীদের দাবি,
তাদের পূর্বপুরুষ
মূলত আফগানিস্তান
থেকে এসেছিল।
প্রমাণ হিসেবে
তাদের মুখে
ফারসি, পশতু
ভাষার শব্দ
পাওয়া যায়।
গোরভাঙার অধিবাসীরা
যদিও বাউল
ঘরানার গানই
বেশি করেন,
তবু তাদের
পরিবেশিত গানের
মধ্যে কাওয়ালিও
রয়েছে। ‘আল্লা
আল্লা, আলি
আলি’, ‘আকাশটা
কাঁপছিল ক্যান’,
‘দয়াল
দাতা’, ‘ধন্য
ধন্য এ
সিলসিলা’ এ
ঘরানার গান।
উর্দু কাওয়ালির
সঙ্গে এর
ততটা মিল
না থাকলেও
এটাকে বাংলা
কাওয়ালির উদাহরণ
হিসেবে ধরা
যায়। এসব
গানও তারা
‘টুকে
নিয়েছেন’ এবং
জানা যায়,
গানগুলো তারা
পেয়েছেন বাংলাদেশের
কুষ্টিয়ায়।
বাংলায় কাওয়ালি
কোত্থেকে এল
সে প্রশ্ন
করলে বলতে
হয়, ওই
দিল্লি থেকেই
গায়কের দলের
সঙ্গে এসেছে।
এ সময়টা
ষোড়ষ, সপ্তদশ
শতাব্দী। ঢাকায়
ইসলাম খাঁ
চিশতি এলেন
সুবাদার হয়ে।
তার সঙ্গে
কাওয়াল আসেনি
এ কথা
বলা যায়
না। মাইজভাণ্ডারে
গাওয়া কাওয়ালিকে
বাংলা কাওয়ালি
বলা যায়।
এখানে হযরত
কেবলা বাবা
বলে যিনি
পরিচিত তার
জন্ম ১৮২৬
খ্রিস্টাব্দে। ঊনবিংশ
শতাব্দীর ভারতীয়
সংগীতের অন্যতম
পৃষ্ঠপোষক ওয়াজিদ
আলী শাহ
ঠুমরিসহ ধ্রুপদী
সংগীতের অন্যান্য
শাখায়ও পারদর্শী
ছিলেন। তিনি
কাওয়ালিও অনুশীলন
করতেন। কলকাতার
মেটিয়াবুরুজে ‘নির্বাসন’
দেয়া হলে
তার সঙ্গেও
এখানে বহু
শিল্পী এসেছিলেন
এবং এখানেও
কাওয়ালি প্রচলিত
হয়। মেটিয়াবুরুজের
আশপাশ অঞ্চলে
সে কাওয়ালির
কিছু কিছু
এখনো পাওয়া
যায়।
মাইজভাণ্ডার, মেটিয়াবুরুজ,
মুর্শিদাবাদ কিংবা
ঢাকায় বংশপরম্পরা
বা পেশা
থেকে যারা
কাওয়ালি ধরে
রেখেছেন তাদের
বাইরেও রয়েছে
হারিয়ে যাওয়া
কাওয়ালি। মাঝে
মাঝে খুঁজে
পাওয়া যায়।
অর্থাৎ সেই
কোনো এক
কালে গানগুলো
মুখে মুখে
প্রচারিত হয়েছিল
কিংবা রচিত
হয়েছিল। অনেক
কাওয়ালি রীতিমতো
লোকগানের মধ্যে
হারিয়ে গিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে
তা কাওয়ালি
বলে শনাক্ত
করা যায়।
এসব গান
নানা দরগাহ
ও অনুষ্ঠানে
গাওয়া হয়।
বজবজের খোকন
কাওয়াল তার
দল নিয়ে
রাতভর কাওয়ালি
গেয়ে যান।
বাংলা কাওয়ালিশিল্পীদের
মতে, কিছু
কিছু ক্ষেত্রে
উপস্থাপনার ধরন
বাদে উর্দু
বা ফারসি
কাওয়ালির সঙ্গে
বাংলা কাওয়ালির
কোনো তফাত
নেই। বাংলা
কাওয়ালিতেও আল্লাহ,
নবী, প্রসিদ্ধ
মুসলিম সাধকের
গুণকীর্তন করা
হয়। বাংলাদেশের
নানা দরগাহ,
বিশেষত চট্টগ্রামের
মাইজভাণ্ডারে গেলে
সেখানে যে
কাওয়ালি শোন
যায় তাও
এমনই।
বাংলাদেশ ও
পশ্চিমবঙ্গে ‘দিল্লিতে
নিজামুদ্দিন’ গানটি
খুবই পরিচিত।
গানটির রচয়িতা
হাসান আলী
চিশতী এ
ধরনের আরো
বহু গান
রচনা করেছেন।
এসব গান
মূলত কাওয়ালি
ও মুর্শিদির
ঢঙের মিশ্রণে
গাওয়া হয়।
তার ‘আয়াত
কোরান পড়ে’র
কথা যদি
লক্ষ করি,
সেখানে বলা
হয়েছে, ‘মানুষ
খোদার বড়
কুদরত, তার
ভিতরে চল্লিশ
আয়াত/ পঞ্চ
আত্মার পঁচিশ
খেতাব, এই
খানেতে পঁচিশ
পাই।’ স্পষ্টতই
এ গানের
কথার মাঝে
একদিকে সুফিবাদ,
অন্যদিকে লালনের
মরমি আধ্যাত্মবাদের
ছোঁয়াও পাওয়া
যায়। অন্যদিকে
‘দিল্লিতে
নিজামুদ্দিন আউলিয়া’
গানে সরাসরি
‘পীর’
নিজামুদ্দিনের ইতিহাসের
মাধ্যমে তার
গুণ গাওয়া
হয়েছে। মাদার
পীরের গান
মূলত প্রান্তিক
পর্যায়ে বহুল
প্রচারিত ও
জনপ্রিয়। গানগুলোর
কোনো কোনোটি
মরমি গানের
মতো আর
কোনো কোনোটি
কাওয়ালির ঢঙেই
গাওয়া হয়।
ইরান থেকে
শুরু করছি
না। কেননা
কাওয়ালির যে
বর্তমান রূপ
তার উত্পত্তি
দিল্লিতেই এবং
দিল্লি থেকে
গানের ধারাটির
চট্টগ্রাম পর্যন্ত
পথরেখা খুঁজতে
হলে বলতে
হবে দিল্লি
থেকে দরবেশ,
ব্যবসায়ী, বিজেতাদের
কাফেলার সঙ্গে
কাওয়ালি এসেছিল।
ভ্রমণপথে কখনো
এলাহাবাদ, কখনো
বেনারস পেরিয়ে
মুর্শিদাবাদ-নদীয়া
হয়ে পূর্ব
বাংলায় এসে
নিজের জায়গা
করে নিয়েছিল।
চলার পথে
কখনো কবীরের
দোঁহা, তুলসী
দাসের কবিতা
থেকে প্রভাবিত
হয়েছে। বৈষ্ণব
ধারার ভাব,
লালনের গানের
শব্দ, পাশাপাশি
মার্সিয়া-মুর্শিদি
থেকে ভাব
ও শব্দ
গ্রহণ করে
গঠিত হয়েছিল
নতুন করে।
উত্তর ভারতের
উপাদান, উপমা,
শব্দকে সরিয়ে
দিয়ে কিংবা
কখনো খানিকটা
বদলে গিয়ে
বাংলার সঙ্গে
নিজেকে নতুন
করে তৈরি
করেছে। বাংলা
কাওয়ালি বিশ্লেষণ
করলে স্বকীয়তার
পাশাপাশি পেরিয়ে
আসা বহু
পথের ধূলি
এবং নানা
অঞ্চলের সংস্কৃতির
ছাপ পাওয়া
যাবে।
সূত্র:
১.
বাংলার বাউল:
ক্ষিতিমোহন সেন
শাস্ত্রী (নবযুগ
প্রকাশনী)
২.
বঙ্গে স্বূফী
প্রভাব: ড,
মুহম্মদ এনামুল
হক (র্যামন
পাবলিশার্স)
৩.
The Journey of Qawwali through the Indian Subcontinent: Manidipa
Singha
Sage
Journals
মাহমুদুর রহমান: লেখক






