সাহিত্যমাধ্যম হিসেবে বাংলা ছোটগল্পের সাফল্য বিস্ময়কর। এ ভাষায় লেখা হয়েছে অসংখ্য শিল্পসফল ছোটগল্প। এর কোনো কোনোটি আমাদের স্মৃতিতে হানা দেয় প্রতিদিন, কখনো তাত্ক্ষণিকভাবে উঁকি দিয়ে যায় কোনো কাহিনী, কোনোটি দিনযাপনের ভাষ্যকার। তেমন কিছু ছোটগল্প নিয়ে এ ধারাবাহিক—
বনফুল তথা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের গল্প লেখা সম্পর্কে একটি গল্প প্রচলিত। কখনো কখনো কোনো সাহিত্য পত্রিকা দপ্তরে তিনি পোস্টকার্ডে গল্প পাঠিয়েছেন! সংবাদটি যেকোনো ভাষার সাহিত্যের পাঠকের জন্য বিস্ময়কর, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিস্ময়কর এই জন্য, একটি পোস্টকার্ডে লেখার জন্য কতটুকু জায়গা, তা আমাদের ভালোমতো জানা আছে। সেখানে একটি গল্প পাঠানো তো দূরকল্পনা, ছাপানোর জন্য একটি কবিতাও ঠিকঠাক পাঠানো যায় কিনা, সে সন্দেহ কিন্তু কোনোভাবে মুছে যায় না। বনফুল গল্প-উপন্যাস রচনার পাশাপাশি কবিতাও লিখতেন। পেশায় চিকিত্সক, সে চর্চায় তাঁর সুনাম ছিল। তাই পোস্টকার্ডে গল্প— এ সংবাদ সত্যি দূরকল্পনা, যারা তাঁর কাব্যচর্চা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তারা কবিতা পাঠানোর কথা ভেবে নিতেও পারেন। কিন্তু সত্য এই, বনফুল পোস্টকার্ডে পত্রিকায় প্রকাশের জন্য গল্প পাঠিয়েছেন।
ছোটগল্পের এ আরো ছোট আকৃতির গড়ন আর ধরনকে আজকাল অনুগল্প ইত্যাদি বলা হয় বটে। কিন্তু উপদেশমূলক গল্পের বাইরে, বাংলা তথা ভারতবর্ষের সর্বত্রই এমন অতি ছোট আকারের কাহিনী বলার অথবা লেখার চল যত দূর জানা যায় প্রাচীনকাল থেকেই ছিল। বনফুলের আগে এ মাধ্যমের আর এক সার্থক লেখকের নাম রবীন্দ্রনাথ। তবে রবীন্দ্রনাথের এ ক্ষুদ্র আকৃতি ছোট ছোট গল্পের তুলনায় বনফুলের আঙ্গিকগত কিছু তফাত্ চোখে পড়ে। হয়তো এজন্য বাংলা ভাষায় এমন আকৃতির গল্পের প্রধান লেখক হিসেবে বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় ওরফে বনফুলকেই ভাবা যায়। এর অবশ্য একটি কারণ, এসব আকৃতিময় সার্থক গল্প তিনি প্রচুর লিখেছেন। যেন গল্প-কল্পনা মগজে কোনোভাবে জায়গা পাওয়া মাত্রই কাহিনীর চুম্বক অংশকে সিধে কাহিনী বর্জনের সচরাচর পথের বাইরে গিয়ে মূল গল্পটাই বলে ফেলেছেন। আর প্রায় সব গল্পেই শেষের আগ পর্যন্ত তা প্রায় কোনো গল্পই না, যেন শেষ পঙিক্ততে গিয়ে তা প্রকৃত ছোটগল্প হয়ে উঠল অনায়াসে। তবে তাতে কিন্তু বহুশ্রুত ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’ বলে রবীন্দ্রনাথের নামে চলা প্রচলিত যে হেয়ালি, তারও কোনো সার্থকতা রচিত হয় না; কারণ ওখানেই বনফুল-রচিত গল্পটি শেষ। অতি সংক্ষিপ্ত বলে এ গল্প বাংলা সাহিত্যের শ্রেণীপাঠ্য কোনো সংজ্ঞার্থকে কোনোভাবে আমলে নেয় না। বনফুল সম্পর্কে এ কথাগুলো মাথায় রেখে, তাঁর অতি পরিচিত ‘নিমগাছ’ গল্পটি পড়তে পড়তে এক ধরনের নিজস্ব দোলাচলও তৈরি হয়। কেন ‘নিমগাছ’ প্রথম পড়া থেকে আজ পর্যন্ত যতবার পড়েছি, প্রতিবারই নতুন, এক বিস্ময়ও বটে আর কিছুতেই এ গল্প কোনোভাবেই ভোলা গেল না, ভোলা যায় না। এ গল্পটা গল্পের সব ধরনের সংযম রক্ষা করে প্রায় কবিতা? মাত্র আটাশ পঙিক্তর রচনা। বাংলা ভাষায় কবিতা তো সাধারণত এমনই আকৃতির হয়। অতটুকু জায়গায় কত কথা বলে যান কবি। শব্দের অর্থান্তর ঘটে সেখানে পাঠকের নিজস্ব জগতে। গল্পে সে সুযোগ আসলেই কম। ‘নিমগাছে’ তা নেইও। কিন্তু বারবার পড়ায় এক ধরনের কবিতা পড়ারই স্বাদও পাওয়া যায়। অথচ ‘নিমগাছ’ গল্প। যেভাবেই ভাবা হোক গল্পই।
আবার উল্টো করে যদি ভাবা যায়, যদি সেই ভাবনার কোনো অনায়াস চলনের সুযোগ নেয়া যায়। তাহলে কল্পনায় এটি একটি কবিতা, যদিও সে বৈশিষ্ট্যের কোনো কিছুই সেখানে নেই, কিন্তু গীতি কবিতা? এ অবশ্যই অতি কষ্ট-কল্পনা। কিন্তু সে ব্যাপারটিও ঘটেছে। কবীর সুমন প্রথমবার এসেছেন বাংলাদেশে। তখনো তিনি সুমন চট্টোপাধ্যায়। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে তাঁর অনুষ্ঠান। এর আগে বের হওয়া ক্যাসেটগুলো থেকেই গাইছেন। হঠাত্ দুটো গানের মাঝখানে যেমন সংবাদ পাঠকের ঢঙে একটু ছড়ানো গলায় কথা বলেন, সেভাবে বললেন, একদিন চলচ্চিত্র পরিচালক অরিন্দম মুখোপাধ্যায় তাঁকে ফোন করেছেন। অরিন্দম মুখোপাধ্যায় বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ছোট ভাই; দুই ভাইয়ে বয়সে ফারাকও বেশ। অরিন্দম মুখোপাধ্যায় সুমনের কাছে জানতে চাইলেন, সুমন কবিতা থেকে (অন্যের কবিতা) তো গান করেছ, কখনো কোনো গল্পকে সুরারোপ করে গেয়েছ? শুনে, সুমন চট্টোপাধ্যায়ের তোতলামোর মতো অবস্থা। তাঁর বক্তব্যে সে কাজটিও করলেন। তার পর অরিন্দম মুখোপাধ্যায় তাঁকে বললেন, যদি গল্প থেকে গান করেন, তাহলে তাঁর দাদার (বনফুল) ‘নিমগাছ’ গল্পটা নিয়ে একটা চেষ্টা তিনি করে দেখতে পারেন। এ কথা বলে সুমন চট্টোপাধ্যায় বনফুলের ‘নিমগাছ’ গেয়ে শোনালেন। পুরোটাই। তাহলে ওই গল্পটা এক অর্থে গীতিকবিতাও। আচ্ছা, এসব কথার মাঝখানে, ‘নিমগাছ’ নিয়ে আর কোনো কথায় পৌঁছানোর আগে একবার গল্পটা পড়ে নেয়া যাক। তাতে ভালো লাগায় উদ্ধৃতির বছরের ভার বাকি কথায় আর কোনোভাবে বাড়বে না।
কেউ ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করছে।
পাতাগুলো ছিঁড়ে শিলে পিষছে কেউ।
কেউ বা ভাজছে গরম তেলে।
খোস দাদ হাজা চুলকানিতে লাগাবে।
চর্মরোগের অব্যর্থ মহৌষধ।
কচি পাতাগুলো খায়ও অনেকে।
এমনি কাঁচাই...
কিংবা ভেজে বেগুন-সহযোগে।
যকৃতের পক্ষে ভারি উপকার।
কচি ডালপালাগুলো ভেঙে চিবোয় কত লোক... দাঁত ভাল থাকে।
কবিরাজরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
বাড়ির পাশে গজালে বিজ্ঞরা খুশি হন।
বলে— নিমের হাওয়া ভাল, থাক, কেটো না।
কাটে না, কিন্তু যত্নও করে না।
আবর্জনা জমে এসে চারিদিকে।
শান দিয়ে বাঁধিয়েও দেয় কেউ— সে আর এক আবর্জনা।
হঠাত্ একদিন একটা নূতন ধরনের লোক এল।
মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল নিমগাছের দিকে। ছাল তুললে না, পাতা ছিঁড়লে না, ডাল ভাংলে না, মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শুধু।
বলে উঠল, —বাঃ, কি সুন্দর পাতাগুলি... কি রূপ!
থোকা থোকা ফুলেরই বা কি বাহার... এক ঝাঁক নক্ষত্র নেমে এসেছে যেন নীল আকাশ থেকে সবুজ সায়রে। বাঃ—
খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে চলে গেল।
কবিরাজ নয়, কবি।
নিমগাছটার ইচ্ছে করতে লাগল লোকটার সঙ্গে চলে যায়। কিন্তু পারলে না। মাটির ভিতরে শিকড় অনেক দূর চলে গেছে। বাড়ির পিছনে আবর্জনার স্তূপের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল সে।
ওদের বাড়ির গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মী বউটার ঠিক এই দশা।
এখন এক নিঃশ্বাসে পড়া হয়ে গেলে এই গল্প নিয়ে আর যেন কোনো কথাও চলে না। আবার ভাবনার এক প্রস্ত সুযোগও ঘটে। পড়তে পড়তে অনির্ণেয় এক উত্তেজনায় শেষ মুহূর্তে একটি গাছকে একজন মানুষের সঙ্গে, একজন নারীর জীবনের সঙ্গে, এই ভাবে তুলনায় জড়িয়ে দেয়া যায়, তাও যেন ছিল কল্পনার অতীত। কিন্তু একটি মাত্র পঙিক্ততে, একেবারেই শেষ পঙিক্ততে তাই ঘটে গেল। এখানে পঙিক্ত শব্দটি ব্যবহার করছি, বাক্য শব্দটা কেন যেন আপাত অচল।
ওদিকে বাঙালি জীবনে নিমগাছ তো উপরের গুণগুলো নিয়েই বর্তমান। সে কবিরাজি বিদ্যায় হোক আর প্রচলিত প্রয়োজনেই হোক। তা নিয়ে গল্পকারের কল্পনা আলাদা কোনো মাত্রাও যেন পায় না। শুধু ‘শান দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছে কেউ’-এর পরে ‘সে আর এক আবর্জনা।’ এ কথাগুলোর তাত্পর্য বোঝা যায় এক বন্ধনের চৌহদ্দি ভেবে নিলে! কিন্তু গল্প তখনো তো নিমগাছকে নিয়েই। একটি গাছ, যত উপকারেই লাগুক সে প্রায় জড়ই! এ নিয়ে আলাদা আলাদা কোনো ভাবনার প্রয়োজনও পড়ে না।
আর, এর পর, যেখানে নিমগাছটার মনে হয়, লোকটার সঙ্গে চলে যায়, এই জায়গায় এসে গাছটাই যেন প্রায় একটি জীবন্ত চরিত্র হয়ে ওঠে। তখনো গল্পে এই বাড়ির গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মী বউটির প্রবেশ ঘটেনি। ওই জায়গার আগে, সেখানে সবাইকে ছাড়িয়ে একজন নতুন ধরনের লোকের আবির্ভাবের কথা লিখলেন, সেখানেই গল্পটা আসলে গল্প হয়ে উঠল, অথবা একটি সাধারণ গল্প থেকে অসাধারণ গল্পের দিকে অগ্রসরমান। যদিও পাঠক হিসেবে তা আমাদের তখনো জানা হয়নি। এ অসাধারণ বর্ণনাটুকু আবার পড়া যাক, যেখানে একটা নূতন ধরনের লোক এসেছেন গাছটার কাছে:
মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল নিমগাছের দিকে। ছাল তুললে না, পাতা ছিঁড়লে না, ডাল ভাংলে না, মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শুধু।
বলে উঠল, —বাঃ, কি সুন্দর পাতাগুলি... কি রূপ!
থোকা থোকা ফুলেরই বা কি বাহার... এক ঝাঁক নক্ষত্র নেমে এসেছে যেন নীল আকাশ থেকে সবুজ সায়রে। বাঃ—
খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে চলে গেল।
কবিরাজ নয়, কবি।
এর পর গাছটা জীবন্ত হয়ে উঠছে। গাছটার এই কবির সঙ্গে চলে যেতে সাধ হয়। কিন্তু কোনোক্রমে সে উপায় তো নেই। এত বড় গাছ, এত দিনের। শিকড় গজিয়েছে। অর্থাত্ বন্ধনের তো শেষ নেই। ডাল ভাঙা, পাতা ছেঁড়া, ছাল ওঠানো— তবু সাধের শেষ নেই। কিন্তু বন্ধন। আর চারদিকে যে কংক্রিটের শান দিয়ে বাঁধানো, তা উপড়ে এই কবি লোকটির সঙ্গে যাওয়াও তো কোনোভাবে সহজ নয়। সহজ নয় কী, কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই এত এত আবর্জনার অর্থাত্ জীবনের সব অপ্রাপ্তি, নির্মম শোষণ, সহমর্মিতার অভাব, অনুকম্পার পাত্রী, দুঃখে সঙ্গীহীন, কষ্টে ক্লান্ত হয়ে ওই গাছ একাকী নিঃসঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। যেমন দাঁড়িয়ে আছে বহুদিন, দাঁড়িয়ে থাকবে আরো বহুদিন।
আর, এখন, গোটা গল্পটাকে মুহূর্তে চিরকালীন বাংলাদেশের প্রায় সব নারীর কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ারও যে পরের পঙিক্তটি, সেটি আর উল্লেখ করা অপ্রয়োজনীয়।
বহুবার, প্রয়োজনে, আলস্যে কিংবা সচেতনে বনফুলের এ অবিস্মরণীয় গল্প পড়া সম্ভব। এমনকি আর না পড়লেও, একবার পড়া থাকলে কল্পনায় ভেবেও নেয়া যায়। সেখানে সময়ক্ষেপণ প্রায় নেই। কাহিনীই তো নেই। এই গল্পের কাহিনীর কাহিনী অমর!





