দি ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড বা আইএমএফ গঠন হয় ১৯৪৪ সালের জুলাইয়ে। ৪৪ দেশের প্রতিনিধিরা নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডসে মিলিত হয়েছিলেন আলোচনা করতে। এ সভাতেই আইএমএফ গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়। এ সংগঠন গড়ে তোলার পেছনে তখন অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের উত্থানকে রুখে দেয়া, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। এছাড়া আরো কিছু জরুরি প্রয়োজন ছিল, যেমন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য কিছু নির্ধারিত নিয়ম এবং এমন সম্পর্কের স্থিতিশীল রাখার জন্য বিভিন্ন ধরনের ইনস্টিটিউট তৈরি করা। আরো একটি দায়িত্ব আইএফএফকে দেয়া হয়েছিল। সেটা হলো বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মানকে স্থিতিশীল রাখা এবং মুদ্রার কনভার্সনকে সহজ, বাধামুক্ত রাখা। এছাড়া ১৯৩০-এর দশকে মুদ্রার প্রতিযোগিতামূলক অবমূল্যায়নে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য রীতিমতো স্থবির হয়ে পড়েছিল। এসব পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উদ্দেশ্য ছিল সেই ব্রেটন উডস সভার সিদ্ধান্তে।
ব্রেটন উডস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ১-২২ জুলাই। সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় বিধ্বস্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে সচল করা। ১৯৪৪-এর এ সম্মেলনের সূত্র ছিল ১৯৪১ সালের আটলান্টিক কনফারেন্সে। সে ধারাবাহিকতায় ১৯৪২ সালে ইউএস সেক্রেটারি অব দ্য স্টেটের বিশেষ সহকারী হ্যারি ডেক্সটার হোয়াইট আরো বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করেন। তার সঙ্গে ছিলেন গত শতকের বিখ্যাত ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস। তিনি তখন ব্রিটিশ ট্রেজারির উপদেষ্টা। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় ছিল এই ডেক্সটার ও কেইনস তখন দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক স্কুলের প্রতিনিধি। ১৯৪৪-এর জুনে আটলান্টিক শহরে একটি প্রাথমিক সম্মেলন হয় এবং ১ জুলাই বসে চূড়ান্ত ব্রেটন উডস কনফারেন্স। এ সম্মেলনে দুটি প্রতিষ্ঠান জন্ম নেয়—একটি আইএমএফ, অন্যটি ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইবিআরডি), যা শিগগিরই ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে পরিণত হয়। শুরুতে আইএমএফের প্রধান কাজ নির্ধারণ করা হয়েছিল আমেরিকান ডলার ও স্বর্ণের ভিত্তিতে মুদ্রা বিনিময় হারে ভারসাম্য বজায় রাখা। অন্যদিকে আইবিআরডির দায়িত্ব ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো পুনর্নির্মাণ এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করা। আইএমএফ ও আইবিআরডি যাত্রা শুরু করে ১৯৪৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর। আইবিআরডি বিশ্বব্যাংক হিসেবে কাজ শুরু করে পরের বছরের ২৫ জুন। ব্যাংকটি প্রথম ঋণ ছাড় করে ১৯৪৭ সালে।

১৯৪৬ সালে আইএমএফ প্রতিষ্ঠার চুক্তি ছবি: কাইসু তাই
১৯৫৬ সালের অক্টোবরে শুরু হয় সুয়েজ সংকট। মিসর, ইসরায়েল, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। তাদের এ দ্বন্দ্ব দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ সংকট ছিল আইএমএফের সংকট মোকাবেলার সক্ষমতার প্রথম বড় পরীক্ষা। চারটি দেশকে আইএমএফ বড় অংকের ঋণ দেয়। এটিই ছিল সংস্থাটির দেয়া প্রথম বড় ঋণ ছাড়।
ষাটের দশকে আফ্রিকার দেশগুলো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হতে শুরু করে। ১৯৬১ সালে আইএমএফ আফ্রিকা বিভাগ চালু করে। এ মহাদেশ থেকে প্রথম সদস্য দেশগুলো ছিল মিসর, ইথিওপিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৯৬৯ নাগাদ আরো ৩৪টি দেশ যুক্ত হয়।

মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেলের গোল্ডরুমের ভেতরে আইএমএফ প্রতিষ্ঠার স্মরণে কাঠের ফলক ছবি: ব্যারি লিভিংস্টোন/উইকিমিডিয়া
সত্তরের দশকে ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চালাচ্ছিল। এ যুদ্ধে তাদের বিপুল অর্থ ব্যয় হতে থাকে। ফলে দেখা দেয় মুদ্রাস্ফীতি ও ডলারের অবমূল্যায়ন। এতদিন পর্যন্ত ব্রেটন উডস সিস্টেম চালু ছিল। অর্থাৎ বিনিময় হার ছিল নির্ধারিত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারকে স্বর্ণে রূপান্তরের সুযোগ রহিত করলেন ১৯৭১ সালের আগস্টে। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে আরেকবার বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল হয়ে পড়ে। ওপেক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এ সংকট সামলাতে দেশগুলোকে সাহায্য করে আইএমএফ।
১৯৭৮ সালের এপ্রিলে সংস্থাটি সদস্য দেশগুলোকে তাদের পছন্দমতো বিনিময়-হার ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার দেয়। আশির দশকের মাঝামাঝি আইএমএফ নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে মার্কেট রেটের চেয়ে কমে ঋণ দিতে শুরু করে।
নব্বইয়ের দশকে বিশ্ব সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সাক্ষী হয়। এ ঘটনার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে মুক্তবাজারের আধিপত্য প্রায় নিরঙ্কুশ হয়ে পড়ে। একদা কমিউনিস্ট দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুক্ত হয় এবং পুঁজির প্রবাহ বেড়ে যায়। ১৯৯১ সালে একদা কমিউনিস্ট ২০টি দেশ আইএমএফে যুক্ত হয়, যা ছিল ১৯৬০-এর দশকের পর সংস্থাটির সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ। এ দেশগুলোকে কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে প্রবেশের জন্য নীতিসহায়তা, কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দেয় আইএমএফ।
১৯৯৪ সালে মেক্সিকোয় ডলারের বিপরীতে পেসোর অবমূল্যায়ন শুরু হয়। এতে অনেক বিনিয়োগকারী তাদের মূলধন তুলে নিতে শুরু করেন। মেক্সিকোর অর্থনীতিকে তখন ৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রোগ্রাম দিয়ে সহায়তা করে। একই সঙ্গে রাশিয়া, ব্রাজিল ও অন্য উদীয়মান বাজারগুলোয়ও সংস্থাটির সহায়তা প্রসারিত হতে থাকে।

ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত আইএমএফের সদর দপ্তর ছবি: অজয় সুরেশ
১৯৯৭ সালে থাইল্যান্ডের সংকটের মাধ্যমে শুরু হয় এশীয় আর্থিক সংকট। থাই বাথের অবমূল্যায়নের মাধ্যমে এ সংকটের শুরু। আইএমএফ থাইল্যান্ডের জন্য ১৭ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি ঘোষণা করে। এরপর ইন্দোনেশিয়ার জন্য ২৩ বিলিয়ন ও দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য ৫৭ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ দেয়া হয়। ১৯৯৮ সালে রাশিয়ার বাজেট ঘাটতি ও রুবলের অবমূল্যায়নে সংকটে পড়ে রাশিয়ার অর্থনীতি। তখন আইএমএফ ও অন্য আন্তর্জাতিক ঋণদাতারা দেশটিকে ২২ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়।
২০০৮ সালে বিশ্ব অর্থনীতি বড় মন্দার দ্বারপ্রান্তে হাজির হয়। আমেরিকায় বৈশ্বিক ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান লেহম্যান ব্রাদার্স দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী এক দশকে ৯০টি দেশকে আইএমএফ ৫০০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে। প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রবেশ করিয়েছে।
২০১১-১৪ আরব বসন্তে টালমাটাল হয়ে পড়ে আরব বিশ্বের দেশগুলোর রাজনীতি ও অর্থনীতি। তিউনিসিয়া, মিসর, লিবিয়া, ইয়েমেনে শাসক বদল হয়। এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন ও স্থিতিশীল করতে আইএমএফ ৩৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়। এ ঋণের বিনিময়ে দেশগুলোয় তাদের পরামর্শে রাজস্ব খাত, মুদ্রানীতিতে বিভিন্ন পরিবর্তন বা সংস্কার আনা হয়।
বর্তমানে আইএমএফের সদস্যদেশের সংখ্যা ১৯১। প্রতিষ্ঠার পর সংস্থাটি এ-যাবৎ সদস্যদেশগুলোকে ১ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। আইএমএফের এ ঋণ ও নীতিসহায়তা দেয়ার ইতিহাস প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। ২০০৮ সালে রোমানিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী পপেস্কু টারিসেনু এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন ২০০৫ সালে থেকে দেশটির অর্থনীতির প্রশংসা করে চলেছে আইএমএফ, যা আদৌ বাস্তবতাকে প্রতিনিধিত্ব করে না। তানজানিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট জুলিয়াস নায়েরেরে দাবি করেন ঋণগ্রস্ত আফ্রিকান দেশগুলো আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছে তাদের সার্বভৌমত্ব হারাচ্ছে। তিনি একবার সংস্থাটির সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘দুনিয়ার সব দেশের অর্থমন্ত্রী হওয়ার জন্য কে আইএমএফকে নির্বাচিত করেছে?’ আইএমএফের একসময়কার প্রধান অর্থনীতিবিদ ও রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সাবেক গভর্নর রঘুরাম রাজনও আইএমএফর অনেক ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তার কথায় আইএমএফ উন্নত দেশগুলোর সাইডলাইন খেলোয়াড় হিসেবে ভূমিকা রাখে। সংস্থাটির আরেকটি বড় সমালোচনা এমন যে তারা যখন কোনো দেশে নীতি সংস্কার করার দিকে এগোয়, তখন স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সংস্কৃতি ও পরিবেশকে তারা আমলে নেয় না।
এসএম রশিদ: লেখক








