১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পলাশীতে মুখোমুখি হয় ব্রিটিশ ও বাংলার বাহিনী। প্রকৃত অর্থে তখন বিশাল সেনাবাহিনী ছিল না ব্রিটিশদের। বরং ক্লাইভের শিবিরে ছিল ব্রিটিশ সৈন্য, দেশীয় সিপাহি এবং অর্থাৎ পর্তুগিজ সৈন্যদের মিশ্রিত দল। সব মিলিয়ে ক্লাইভের কাছে প্রায় এক হাজার ইউরোপীয় সৈন্য এবং দুই হাজার সিপাহি ছিল। তাদের সঙ্গে ছিল আটটি বন্দুক এবং দুটি হাওয়াইতজার। বাহিনীতে বেঙ্গল, মাদ্রাজ এবং বোম্বে আর্টিলারি, ব্রিটিশ ৩৯তম রেজিমেন্ট, বেঙ্গল, মাদ্রাজ ও বোম্বে ইউরোপীয় রেজিমেন্টের দলভুক্ত সৈন্যরা ছিল।
পলাশী যুদ্ধের জন্য চারটি রেজিমেন্ট যুদ্ধ করে। ৩৯তম পদাতিক রেজিমেন্ট এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তিনটি রেজিমেন্ট। সে তিনটি হলো বেঙ্গল ইউরোপীয় রেজিমেন্ট, প্রথম মাদ্রাজ ইউরোপীয় রেজিমেন্ট ও বোম্বে ইউরোপীয় রেজিমেন্ট। ১৭৫৪ সালের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বেশকিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়। ফলে লন্ডন থেকে রয়্যাল রেজিমেন্ট পাঠানোর আবেদন করা হয়। প্রতিক্রিয়ায় ৩৯তম রেজিমেন্ট ও রয়্যাল আর্টিলারি দল পাঠানো হয়। কর্নেল জন আল্ডারক্রনের নেতৃত্বে রেজিমেন্টটি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত মান অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সেখানে প্রতিটি কোম্পানির জন্য তিনজন সার্জেন্ট, তিনজন করপোরাল, দুজন ড্রামার ও ৭০ জন সাধারণ সৈনিক ছিল। সঙ্গে ছিল কোয়ার্টারমাস্টার ও সার্জনের সহকারী। নিয়োগের জন্য সময় খুবই অল্প ছিল বলে রেজিমেন্টটি অন্যান্য ইউনিট থেকে সৈন্য ড্রাফট করে। বেশ কয়েকজন অফিসার ভারতে যেতে অস্বীকার করেন এবং অবসর গ্রহণ করেন। তাদের স্থানে নিয়োগ দেয়া হয় কম বয়সী ও অনভিজ্ঞ অফিসার।
মিডল্যান্ডসে গঠিত আরো দুটি কোম্পানি ১৭৫৬ সালে ভারতে পৌঁছায়, যার মধ্যে একটির নেতৃত্বে ছিলেন আইর কুট। ভারতে পৌঁছার পর রেজিমেন্টের পরিবহনের জন্য আটটি টামব্রিলের প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে ছয়টি ছিল গোলাবারুদের জন্য, একটি ওষুধের জন্য এবং একটি অর্থের বাক্স বহনের জন্য। পলাশী যুদ্ধের দুই মাস আগে চুঁচুড়ার কাছে শিবিরে ৩৯তম রেজিমেন্টে ছিল তিনজন ক্যাপ্টেন, চারজন লেফটেন্যান্ট, পাঁচজন এনসাইন, আটজন সার্জেন্ট, ১০ জন করপোরাল, সাতজন ড্রামার ও ২১৩ জন সাধারণ সৈনিক। যুদ্ধে এ রেজিমেন্টের কোনো সৈন্য নিহত হয়নি, তবে একজন সার্জেন্ট ও তিনজন সাধারণ সৈনিক আহত হয়েছিল।

নবাবের আর্টিলারি বাহিনী শিল্পী: রিচার্ড ক্যাটন উডভিল ছবি: ন্যাশনাল আর্মি মিউজিয়াম
প্রথম মাদ্রাজ ইউরোপীয় রেজিমেন্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বিতীয় সৈন্যদল হিসেবে ১৬৬০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু এটি ১৭৪৮ সাল পর্যন্ত ব্যাটালিয়নে রূপান্তর হয়নি। এর প্রথম কর্নেল ছিলেন স্ট্রিংগার লরেন্স, যিনি ১৭৪৮ সালের জানুয়ারিতে ফোর্ট সেন্ট ডেভিডে এসে কোম্পানির বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি মাদ্রাজ ইউরোপীয় রেজিমেন্ট থেকে ফরাসিদের সঙ্গে বিভিন্ন সংঘাতে অংশগ্রহণ করেন। ১৭৫৭ সালের ৭ এপ্রিল চুঁচুড়ার কাছাকাছি শিবিরে গৃহীত রোল কল অনুযায়ী, মাদ্রাজ রেজিমেন্টে ছিল একজন মেজর, পাঁচজন ক্যাপ্টেন, পাঁচজন লেফটেন্যান্ট, চারজন এনসাইন, পাঁচজন স্বেচ্ছাসেবক, ৪১ জন সার্জেন্ট, ২৬ জন করপোরাল, ১০ জন ড্রামার ও ১০৫ জন সাধারণ সৈনিক।
রয়্যাল আর্টিলারি ডিটাচমেন্ট সম্পর্কে খুব কম তথ্য পাওয়া যায়। ১৭৫৬ ও ১৭৫৭ সালে ভারতে থাকা আর্টিলারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে ছিলেন নর্থাল, হিসলপ ও মাইটল্যান্ডের কোম্পানিগুলো। মাইটল্যান্ড ও নর্থালের কোম্পানিগুলো ১৭৫৬ সালে গেরিয়া দুর্গে যুদ্ধ করেছিল। ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হিসলপের ডিটাচমেন্ট ১৭৫৭ সালের জানুয়ারি-মে পর্যন্ত ফোর্ট সেন্ট জর্জে এবং জুনে চিংলেপুট শিবিরে ছিল। ১৭৫৭ সালের জানুয়ারিতে হিসলপের ডিটাচমেন্টে ছিল ছয়জন অফিসার, একজন ক্যাডেট, দুজন সার্জেন্ট, দুজন করপোরাল, পাঁচজন বোম্বার্ডিয়ার, ২০ জন গানার, নয়জন ম্যাট্রোস ও একজন ড্রামার। জানা যায়, পলাশী যুদ্ধে ১৭১ জন আর্টিলারি সদস্য ছিল, যার মধ্যে ৫০ জন নাবিক এবং সাতজন মিডশিপম্যান ছিল এবং তাদের কাছে ১০টি ফিল্ড পিস এবং দুটি ছোট হাওয়াইতজার ছিল, যা রয়্যাল নেভির লেফটেন্যান্ট হেটারের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল।
আর্টিলারি বেশ কয়েক বছর ধরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছিল। বিভিন্ন অভিযানের জন্য সামগ্রী সরবরাহ করত। উদাহরণস্বরূপ, রয়্যাল আর্টিলারির ক্যাপ্টেন-লেফটেন্যান্ট জোসেফ উইন্টার ১৭৫৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি তালিকা প্রস্তুত করেন, যেখানে গেরিয়া দুর্গ আক্রমণের জন্য তিনটি নৌযানে মর্টার, বন্দুক ও মর্টারের জন্য শেল, কর্ন পাউডার, ছুরি খোদাই করার জন্য স্টুল, একটি ল্যাবরেটরি চেস্ট এবং স্পঞ্জ সরবরাহের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। স্থানীয় ব্যাটালিয়নের জন্য নিয়োগ করা সহজ ছিল। উত্তর ভারতের সরকারগুলোর সাধারণ অস্থিরতা এবং মুসলিমদের বাংলা আক্রমণের কারণে প্রচুরসংখ্যক যোদ্ধা চাকরির সন্ধানে নিচের প্রদেশগুলোয় চলে আসতে বাধ্য হয়েছিল। কলকাতার আশপাশে গঠিত সৈন্যদলের মধ্যে পাঠান, জাট, রাজপুত ও রোহিলা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার অধীনে থাকা বাহিনীর সংকট ছিল অদক্ষতা। পলাশীর যুদ্ধে তার পক্ষে প্রায় ৩৫ হাজার অদক্ষ ও বিশৃঙ্খল সৈন্য ছিল। কর্নেল জি বি ম্যালেসন ১৮৮৫ সালে লিখেছেন এ সৈন্যরা ইউরোপীয় পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত ছিল না। দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর দেশীয় রাজকুমারদের প্রধান শহরগুলোর আশপাশে দেখতে পাওয়া যায় এমন সৈন্যদের মতো ছিল। এরা অসম্পূর্ণভাবে প্রশিক্ষিত ও অসম্পূর্ণভাবে সজ্জিত ছিল। তারা ম্যাচলক, বর্শা, তলোয়ার, ধনুক ও তীর দিয়ে সজ্জিত ছিল। নবাবের প্রায় ১৫ হাজার অশ্বারোহী ছিল, যারা তুলনামূলক কিছুটা ভালোভাবে সংগঠিত। অশ্বারোহীরা মূলত পাঠান, যারা তলোয়ার ও লম্বা বর্শা নিয়ে সজ্জিত ছিল এবং বড় ঘোড়ায় চড়ত। নবাবের সেনাদের পোশাক তাদের জাতিগত বৈচিত্র্যের মতোই বিচিত্র ছিল।
১৭৪০ ও ১৭৫০-এর দশকে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সৈন্যদের ভারতে বিভিন্ন যুদ্ধে কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছিল। তারা ভারতীয় ও ব্রিটিশ উভয়ের সঙ্গেই লড়াই করেছিল। ১৭৫১-৫৪ সালের মধ্যে এ সৈন্যরা মারকুইস দে বুসি ও দে ভিনসেন্টের নেতৃত্বে লড়াই করেছিল। ১৭৫১ সালের ১৫ জানুয়ারি পন্ডিচেরিতে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্য সংখ্যা ছিল ৩০০ ইউরোপীয়, ১০০ দেশীয় সিপাহি ও টোপাসসহ ছয়টি কামান, দুটি ব্রোঞ্জ মর্টার এবং আটটি গোলাবারুদের গাড়ি। তবে পলাশী যুদ্ধে ফরাসি বাহিনীর উপস্থিতি ছিল খুবই ছোট। সেখানে ছিল মাত্র ৫০ জন ফরাসি আর্টিলারি, যারা চন্দননগরের দুর্গ থেকে পালিয়ে এসেছিল। তারা যুদ্ধ করেছে সিনফ্রের নেতৃত্বে। সঙ্গে ছিল ৫৩টি বড় বন্দুক। ছোট ফরাসি বাহিনীও তাদের নিজেদের চারটি কামান নিয়ে এসেছিল। প্রতিটি ভারতীয় কামান তার গাড়ি এবং টাম্ব্রিলসহ একটি বড় কাঠের প্লাটফর্মের ওপর স্থাপিত ছিল, যা মাটির প্রায় ছয় ফুট ওপরে ছিল এবং চাকা দিয়ে চলত, পুরো ব্যবস্থাটি চলাচল করত ৪০ বা ৫০টি সাদা বলদ দিয়ে। প্রতিটি কামানের পেছনে একটি হাতি থাকত, যা প্রয়োজন হলে তার মাথা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সাহায্য করত। ভারতীয় বাহিনীতে প্রচুর পরিমাণে রকেটও ছিল।
নবাবের সেনাবাহিনীতে হাতিও ছিল, যেগুলো চেইন মেইল ও প্লেট বর্ম দিয়ে ঢাকা ছিল। এ প্রাণীদের মুসলিম বাহিনীতে বহু শতাব্দী ধরে আক্রমণাত্মক ভূমিকার জন্য ব্যবহার করা হতো, তবে পরে তারা ক্রমে বোঝা বহনের কাজে ব্যবহার হয়েছিল। পলাশীর যুদ্ধে হাতি ব্যবহারের কোনো লিখিত বিবরণ নেই, তবে একটি সমসাময়িক হাতে রঙ করা অঙ্কনে দেখা যায় কয়েকটি হাতি যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে, যার মধ্যে একটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ক্লাইভ তার ফোর্ট উইলিয়ামের কমিটিতে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন যে তিনটি হাতি নিহত হয়েছিল। লন্ডনের টাওয়ারে অবস্থিত রয়্যাল আর্মারিতে একটি হাতির মডেল রয়েছে, যা মূল বর্ম দিয়ে ঢাকা এবং বলা হয় যে এটি ক্লাইভ পলাশীর যুদ্ধে সংগ্রহ করেছিলেন।
সাফকাত সায়েম: লেখক








