গত দশকে আমেরিকার ফ্যাসিস্ট উসকানিদাতাদের বক্তৃতা ও প্রচারপত্রের প্রকৃতি ও বিষয়বস্তু খতিয়ে দেখেছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। এসব গবেষণার কিছু অংশ উপস্থাপিত হয়েছে এল লোয়েনথাল ও এন গুটারম্যানের বই Prophets of Deceit গ্রন্থে। সামগ্রিক চিত্রে দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। প্রথমত, কিছু ব্যতিক্রম উদাহরণ ছাড়া দেশের ফ্যাসিস্ট প্রচারণায় সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে খুব কমই আলোচনা থাকে। উসকানিদাতাদের অধিকাংশ বক্তব্য হয় ব্যক্তিগত আক্রমণ। তাতে কোনো যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকে না। র‌্যাবল রাউজার শব্দটি দিয়ে যদিও সাধারণ মানুষকে হেয় করা হয়। কিন্তু ফ্যাসিস্ট শাসকদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচারিত আবেগময় আক্রমণাত্মক পরিবেশকে এটা দিয়েই যথাযথভাবে প্রকাশ করা যায়। কারণ উসকানিদাতার লক্ষ্যই হলো মানুষকে র‌্যাবলে পরিণত করা। অর্থাৎ একদল মানুষ কোনো বোধগম্য রাজনৈতিক লক্ষ্য ছাড়াই সহিংসতায় লিপ্ত হবে এবং দাঙ্গার পরিবেশ তৈরি করবে। সেখানে উসকানিদাতাদের উদ্দেশ্য হলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে জনমানসকে উত্তেজিত করা। বিষয়টিকে পণ্ডিত গুস্তাভ লে বন ‘জনতার মনোবিজ্ঞান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

দ্বিতীয়ত, উসকানিদাতারা পদ্ধতিগত ও নির্ধারিত একটি কৌশল অনুসরণ করে। এটি শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের মধ্যেই নয় বরং অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু ও প্রচারণার প্রকৃতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। বহুল প্রচারিত ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে প্রাদেশিক ক্ষুদ্র উসকানিদাতাদের বক্তব্যের মধ্যে এতটাই সাদৃশ্য যে একজনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে অন্যদের বক্তব্য সম্পর্কে জানা সম্ভব। তাছাড়া বক্তৃতাগুলো এতটাই একঘেয়ে যে তাদের সীমিতসংখ্যক প্রথাগত কৌশলেরই অবিরাম পুনরাবৃত্তি ঘটে।

ফ্রয়েড এ বিষয়ে একটি তাত্ত্বিক কাঠামো দিয়েছেন তার বই ‘Group Psychology and the Analysis of the Ego-তে, যা ১৯২২ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। যদিও জার্মান ফ্যাসিবাদ তখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রয়েড বিশেষভাবে নার্সিসিজম ও ইগো সমস্যাগুলোর দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন। লে বনের মতে, জনগণ সাধারণত ব্যক্তিত্ববর্জিত, অযৌক্তিক, সহজেই প্রভাবিত ও সহিংস কর্মকাণ্ডের দিকে ঝোঁকবিশিষ্ট। কিন্তু ফ্রয়েড গণমানুষের প্রতি এমন অবজ্ঞা করতে নারাজ। তিনি বরং প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে এ ব্যক্তিরা গণমানুষে পরিণত হয়?

ফ্যাসিস্ট নেতৃত্বের একটি মৌলিক নীতি হলো প্রাথমিক লিবিডিনাল শক্তিকে অচেতন স্তরে ধরে রাখা, যাতে এ শক্তিকে রাজনৈতিক উদ্দেশে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করা যায়। ফ্যাসিবাদের লিবিডিনাল কাঠামো ও ফ্যাসিস্টের পুরো কৌশলই কর্তৃত্ববাদী। এর মাধ্যমে ব্যক্তিদের অবনমন ঘটিয়ে তাদের একটি গোষ্ঠীর সাধারণ সদস্যে পরিণত করা হয়। ফ্যাসিস্ট প্রচারণার ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার অর্থাৎ ক্রমাগত নাম ও তথাকথিত মহান ব্যক্তিদের প্রচার করার মূল কারণ, সেখানে বাস্তব কারণগুলোর আলোচনা নেই। এক সর্বশক্তিমান ও অবাধ্য পিতৃসত্তার প্রতিচ্ছবি, যেটি ব্যক্তিগত পিতাকে ছাড়িয়ে একটি ‘গোষ্ঠী-ইগো’তে পরিণত হওয়ার উপযোগী। মনোভাবটি ফ্যাসিস্ট অনুসারীর মধ্যে যত বেশি রাজনৈতিক আচরণ তার নিজের ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর যৌক্তিক স্বার্থের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, ততই প্রয়োজনীয় হয়।

ফ্যাসিস্ট সমাজে সাধারণত মানুষের মধ্যে একটি শক্তিশালী আত্মরক্ষামূলক ইগো থাকে, কিন্তু তারা প্রায়ই নিজেদের ইগো দাবি পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতা তাদের মধ্যে শক্তিশালী নার্সিসিস্টিক প্রবণতা তৈরি করে, যেগুলো আদর্শীকরণের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়, অর্থাৎ তাদের নার্সিসিস্টিক লিবিডো নেতার প্রতি স্থানান্তর হয়। নেতার ছবি তখন তাদের নিজেদের আদর্শের প্রতিফলন হয়ে ওঠে এবং তারা তাদের হতাশার প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ সত্তা হিসেবে দেখে। এ আদর্শীকরণের প্যাটার্নটি এক ধরনের সম্মিলিত একাত্মতা, যা বিশাল জনগণের মধ্যে কাজ করে। ফ্যাসিস্ট জনগণের সম্প্রদায় একে অন্যের ইগোতে নিজেদের চিহ্নিত করে, কারণ তারা একসঙ্গে একই আদর্শে যুক্ত হয়। নেতার ছবি তার আদিম পিতার মতো সম্মিলিত শক্তি থেকে সর্বশক্তিমান হয়ে ওঠে।

ফ্যাসিস্ট উদ্দীপক বক্তৃতাগুলোর অন্যতম লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো একটি স্পষ্ট ইতিবাচক কর্মসূচি বা প্রতিশ্রুতি না থাকা। যখন নেতা একজন সুপারম্যান হিসেবে উপস্থিত হন, তাকে একই সঙ্গে একটি সাধারণ মানুষ হিসেবেও উপস্থিত করতে হবে। অর্থাৎ নেতার ব্যক্তিত্ব এমন হতে হবে, যাকে মানুষ তাদের কাছে পরিচিত ও উপলব্ধি করতে পারে। এ দ্বৈত চরিত্র তার জনপ্রিয়তা বাড়ায়। এটি অনুসারীদের তাদের নিজস্ব আদর্শিত সত্তাকে নেতার মধ্যে প্রতিফলিত করতে দেয়। ফ্যাসিস্ট নেতার অভ্যন্তরীণ অতিরিক্ত লক্ষণ, তার অভিনেতার মতো আচরণ ও অসামাজিক সাইকোপ্যাথদের সঙ্গে সাদৃশ্য। অনুসারীদের নার্সিসিস্টিক লিবিডোর যেসব অংশ নেতার চিত্রে স্থানান্তর হয়নি এবং তাদের নিজের ইগোতে আটকে থাকে, তাদের জন্য সুপারম্যান অবশ্যই অনুসারীর মতো হতে হবে। এ কারণেই ফ্যাসিস্ট প্রচারণার একটি মূল উপকরণ হলো ‘‌মহান কিন্তু সাধারণ মানুষ’ ধারণা।

নেতারা সাধারণত মুখে মুখে চরিত্রধারী হন। তারা অবিরাম কথা বলা ও অন্যদের বোকা বানানোর প্রবণতা রাখেন। তাদের অনুসারীদের ওপর যে প্রভাব তারা বিস্তার করেন তা মূলত তাদের মৌখিক মুনশিয়ানার ওপর নির্ভরশীল। ভাষা নিজেই একটি জাদুকরী প্রভাব ফেলে। শ্রোতাদের অচেতন প্রবণতাগুলোর সঙ্গে সফলভাবে সামঞ্জস্য করতে কেবল তার নিজের অচেতন মনকে বাইরে বের করে দেন। বিশেষ চরিত্রগত সিনড্রোম তাকে সঠিকভাবে এটি করতে সক্ষম করে এবং অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে কীভাবে সচেতনভাবে ক্ষমতাটি ব্যবহার করতে হয়। শিখিয়েছে তার অযৌক্তিকতাকে যৌক্তিকভাবে কাজে লাগাতে, ঠিক যেমন একজন অভিনেতা জানে কীভাবে তার অনুভূতি ও সংবেদনশীলতা বিক্রি করতে হয়।

আগ্রাসী প্রচারণার কৌশলগুলোর মানসিক ভিত্তির সঙ্গে সংগতি আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ দ্বারা বেড়েছে। ফ্যাসিস্ট প্রচারণা এখন একটি পেশা, বলা যেতে পারে জীবিকার উপায়ে পরিণত হয়েছে। প্রচুর সময় ছিল তার বিভিন্ন আবেদনগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করার। এগুলোর কার্যকারিতা শ্রোতাদের মানসিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফ্রিজিং নামক একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আধুনিক গণমাধ্যমের কৌশলগুলোয় পর্যবেক্ষণ করা যায়। টিকে থাকা আবেদনগুলো মান নির্ধারণ করা হয়েছে, ঠিক যেমন ব্যবসায়িক প্রচারে সবচেয়ে কার্যকরী বিজ্ঞাপন স্লোগানগুলোরও মান নির্ধারণ করা হয়। যারা প্রচারণার প্রতি সংবেদনশীল, তাদের শিশুসুলভ ইচ্ছার দ্বারাই এ মান নির্ধারণীকরণ ঘটে।

নাৎসি জার্মানিতে কিছু প্রচারণামূলক শব্দ নিয়ে প্রায়ই উপহাস করা হতো। নর্ডিক জাতির ধারণা পরিহাসমূলক ক্রিয়া তৈরি করেছিল। তবু এ আবেদনগুলো কার্যকারিতা হারায়নি। তাদের কৃত্রিমতা সম্ভবত স্যাডিস্ট প্রক্রিয়ায় উপভোগ করা হয়েছে। সম্ভবত তখন এটি মনে করা হয়েছে, থার্ড রাইখে কেবল শক্তিই একজন ব্যক্তির ভাগ্য নির্ধারণ করে; যে শক্তি যুক্তি বা বস্তুনিষ্ঠতার দ্বারা বাধাগ্রস্ত নয়।

ফ্রয়েড হিপনোসিস ও গোষ্ঠী মনস্তত্ত্বের মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন, প্রথমটি দুটি মানুষের মধ্যে ঘটে বলে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। তবে নেতাদের গণমনস্তত্ত্বের অধিকারী হওয়া, তাদের কৌশলকে সুশৃঙ্খল করা, তাদের হিপনোটিক প্রভাবকে সমষ্টিগতভাবে রূপান্তর করতে সক্ষম করেছে। ‘‌জার্মানি জাগো’ এ নাৎসি যুদ্ধের স্লোগানটি এক্ষেত্রে বড় উদাহরণ। এ প্রভাবের সমষ্টীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হস্তান্তরকে আরো অপ্রত্যক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে, ফলে পারফরম্যান্সের দিক, উৎসাহী শনাক্তকরণের ভান ও গোষ্ঠী মনস্তত্ত্বের সব ঐতিহ্যবাহী গতিশক্তি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এ বৃদ্ধি সম্ভবত হিপনোসিসের অস্বস্তির হঠাৎ সচেতনতার দিকে নিয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত পতন ঘটাতে পারে। সামাজিকীকরণ হিপনোসিস নিজের মধ্যেই এমন শক্তি উৎপন্ন করে, যা প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভৌতিক অস্বস্তির অবসান ঘটাবে। পরিশেষে তাদের জাগিয়ে তুলবে, যারা তাদের চোখ বন্ধ রেখেছে, যদিও তারা আর ঘুমিয়ে নেই।

থিওডর অ্যাডোর্নোর ‘‌কালচার ইন্ডাস্ট্রি’ বইয়ের ফ্রয়েডিয়ান থিওরি অ্যান্ড প্যাটার্ন অব ফ্যাসিস্ট প্রোপাগান্ডা অধ্যায় থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন মুহম্মদ আল মুখতাফি