অ্যাডোর্নোকে নিয়ে বামপন্থী মহলে এক রকম অসুয়া আছে। অনেকে তার নাম শুনলেই নাক সিটকানো শুরু করেন। সাধারণত তারাই এটা করেন, যারা তার কাজ নিয়ে গভীরভাবে ওয়াকিবহাল নন। তাই অ্যাডোর্নোকে নিয়ে আলোচনার শুরুতেই তাকে নিয়ে প্রচলিত কয়েকটি ভুল ধারণা নিয়ে কথা বলতে হবে—
অ্যাডোর্নো অভিজাতপন্থী
কৌলিন্যবাদ মানে বিশেষায়িত জ্ঞানের দারোয়ান হবে সুনির্দিষ্ট কয়েকজন মানুষ। কিন্তু এমন পরিস্থিতি অ্যাডোর্নোকে প্রতিনিধিত্ব করে না। অ্যাডোর্নো সমালোচনা করেছেন কালচার ইন্ডাস্ট্রির, ব্যক্তিরুচির নয়। তিনি কালচার ইন্ডাস্ট্রির সমালোচনা করেছেন, কারণ তার মতে, এটি সাধারণ মানুষকে তার রুচির উৎকর্ষ ঘটাতে দেয় না। অ্যাডোর্নো বিশ্বাস করতেন সাধারণ মানুষের মধ্যে সৌন্দর্যবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু আমরা পুঁজিবাদের বিভিন্ন ম্যানিপুলেশনে আটকে গিয়ে সেসব আর করতে পারি না। তাই তার ভাবনা বরং অভিজাতবাদের একেবারে বিপরীত।
অ্যাডোর্নো জ্যাজ পছন্দ করতেন না
অ্যাডোর্নো জ্যাজ নিয়ে যে সমালোচনা করেছিলেন তার উৎস ছিল সংগীততত্ত্ব নিয়ে প্রশিক্ষণ। তিনি এগুলো লিখেছিলেন বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময়ে জ্যাজের অধিকতর সমৃদ্ধ স্তরে উন্নীত হওয়ার আগেই। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ১৯২০-৪০-এর দশকের মধ্যকার বেশির ভাগ জ্যাজ ছিল আধ্যাত্মিক, ব্লুজ ও সুইংয়ের মিশ্রণ। এটা তখন হয়ে উঠেছিল জনপ্রিয় ড্যান্স মিউজিক। এ সময়ে বিভিন্ন ঘরানার জনপ্রিয় সংগীত সবই জ্যাজ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। সব শ্রেণীর মানুষ জ্যাজের ভক্ত হলেও এ সময় এ সংগীত আগে থেকেই রেকর্ড কোম্পানির নির্ধারণ করা ফর্মুলা কাঠামো মেনে চলছিল। যুদ্ধের পর জ্যাজ সুইং মিউজিক থেকে আরো জটিল কাঠামোয় প্রবেশ করে, যা বেবপ ও কুল জ্যাজ নামে পরিচিত। এ পর্বে এসে অ্যাডোর্নো যে জ্যাজ নিয়ে কথা বলেছিলেন তার চেয়ে এ সংগীত আরো জটিল ও সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠে। তাই যারা বলেন কৌলিন্যভাব থেকে অ্যাডোর্নো জ্যাজ পছন্দ করতেন না, তারা তার মূল্যায়নকে আউট অব কনটেক্সটে রেখে বিবেচনা করেছেন।
অ্যাডোর্নো জ্যাজ অপছন্দ করেন, এমন দাবিই আসলে তার কৌলিন্যবাদের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে উত্থাপন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে তার মতামতগুলোকে সংগীত ও ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। মনে রাখা দরকার, অ্যাডোর্নো প্রাথমিক জীবনে তাত্ত্বিক হতে চাননি, বরং হয়ে চেয়েছিলেন পুরদস্তুর সুরকার। উচ্চ শিল্পের প্রতি তার ভালোবাসা অহংকার থেকে নয়, বরং সহজাত আবেগ থেকে এসেছে। তিনি শুধু উচ্চ শিল্পের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেননি, বরং নিজেও কিছু অ্যাভঁ-গার্দ রচনা তৈরি করেছিলেন। আধুনিক শিল্পকে তিনি সর্বোচ্চ সম্মান করতেন।
অ্যাডোর্নো পপ কালচারকে ঘৃণা করতেন
আসলে পপ কালচারের উপাদান নিয়ে থিওডর অ্যাডোর্নোর সমালোচনা খুব বেশি নেই। এমনকি সেটার মধ্য দিয়ে আনন্দ পাওয়া নিয়েও নয়। বরং তিনি সমালোচনা করেছেন সে ইন্ডাস্ট্রির, যেখান থেকে পপ কালচার সৃষ্টি হয়। সমালোচনা করেছেন কীভাবে তারা কেবল লাভের জন্যই অধিক মাত্রায় উৎপাদন ও প্রচারণা চালায়, সেটা নিয়ে। এ পদ্ধতিতে পণ্য শিল্প কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির জন্য উৎপাদন হয় না। তৈরি হয় ভোগ্যপণ্য হিসেবে। অন্য কথায় পপ কালচারের পণ্যগুলো তৈরি হয় কেবল একটা কারণেই, সেটা হলো যেন আমরা সেগুলো কিনি।
বিপ্লব নিয়ে অ্যাডোর্নোর মাথাব্যথা ছিল না
সম্ভবত ভুল ধারণাটি সবচেয়ে গুরুতর। অ্যাডোর্নোর কাজের প্রতি সম্পূর্ণ পরিচয় না থাকলেই কেবল এমন দাবি করা যেতে পারে। যদিও অ্যাডোর্নো একজন কর্মী ছিলেন না, ছিলেন মার্ক্সবাদী। তার পুরো কালচার ইন্ডাস্ট্রি রচনাটির মধ্য দিয়েই এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে যে কীভাবে সংস্কৃতি কারখানা বিপ্লবকে বাধা দেয়। ফ্যাসিবাদের বিভীষিকা থেকেই অ্যাডোর্নো বোঝার চেষ্টা করেছিলেন কীভাবে মানুষ পুঁজিবাদের দ্বারা শাসিত হয়ে পড়ে এবং এ থেকে মুক্তি পেতে কী প্রয়োজন। বাস্তবতা হলো অ্যাডোর্নোর সময় থেকে আজ পর্যন্ত বিপ্লবী প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। যেহেতু শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবের ক্ষমতা রয়েছে, অ্যাডোর্নো জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কী আমাদের থামিয়ে রেখেছে। এ অনুসন্ধানগুলো পরাজয়বাদী মনস্তত্ত্ব থেকে আসে না, বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যা আমাদের বিবেচনা করতে হবে। বামপন্থীদের শুধু বামপন্থার সফলতার দিকে নয়, এর ব্যর্থতার দিকেও তাকানো উচিত এবং কেন এখনো পুঁজিবাদ বিলুপ্ত হয়নি, তার কারণগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। অ্যাডোর্নো এ সমস্যার সমাধান খুঁজতে চেয়েছিলেন। যারা সত্যিই বিপ্লবের প্রতি যত্নশীল, অ্যাডোর্নোর বিশ্লেষণগুলোকে তাদের গুরুত্বসহকারে নেয়া উচিত।
এস এম রশিদ: লেখক

ফ্র্যাংকফুর্টে দি অ্যাডোর্নো মনুমেন্ট। ডিজাইন: ভাদিম কাখারভ, ২০০৩ ছবি: ইউনিভার্সিটি অব ফ্র্যাংকফুর্ট








