মেক্সিকোর বিপ্লব ঘটনাবহুল। এক দশক ধরে চলা সে অস্থিরতায় নানামুখী অদলবদল ঘটেছে ক্ষমতার সমীকরণে। সে সমীকরণে পড়েই জীবন সমাপ্ত হয় অনেকের। কথায় আছে, বিপ্লব তার সন্তানদের বাঁচতে দেয় না। মেক্সিকোর চেয়ে আরো বেশি করে সত্য আর কোথায় দেখা গেছে এ কথা? মেক্সিকো বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়া অধিকাংশ বিপ্লবীই মৃত্যুবরণ করেন আততায়ীর হাতে। বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বলে মনে করা হয় মাদেরো, জাপাতা, কারানজা, ভিয়া ও ওব্রেগন এ পাঁচজনকে। কাকতালীয়ভাবে তারা সবাই আততায়ীর হাতে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯১৩ সালে হুয়ের্তার বিশ্বাসঘাতকতায় মাদেরোকে হত্যা করা হয়।

ভিনুসতিয়ানো কারানজা। ছবি: টাইমটোস্ট টাইমলাইনস
জাপাতা ১৯১৯ সালের এপ্রিলে এক সেনা কর্নেলকে বিপ্লবীদের পক্ষে আনতে গিয়ে ফাঁদে পা দিয়ে প্রাণ হারান। তার দেহ তখন প্রদর্শিত হয় সবার সামনে। ১৯২০ সালে কারানজা তার সাবেক দেহরক্ষীদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হন। সে সময়ে তিনি ট্রেন নিয়ে ভেরাক্রুজের দিকে যাচ্ছিলেন। বিপ্লবী পাঞ্চো ভিয়া ১৯২০ সালের জুলাইয়ে অস্ত্র ত্যাগ করতে সম্মত হন। তবে তিন বছর তার খামারবাড়িতে কাজ করার পর তাকে সরকারের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে হত্যা করা হয়। সবিশেষ ওব্রেগনকে ১৯২৮ সালে একজন ক্রিস্টেরো বিদ্রোহী গুলি করে হত্যা করে।

১৯১৪ সালে সংঘটিত জাকাতেকেসের যুদ্ধে পাঞ্চো ভিয়া ছবি: ব্রিজম্যান ইমেজেস
মেক্সিকোর বিপ্লবের পরে এক অর্থে দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়। অনেক ঐতিহাসিক বিশ্বাস করেন মেক্সিকান বিপ্লব ওব্রেগন ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্সি গ্রহণ করার সময়েই শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবে কেউ কেউ মনে করেন বিপ্লব চলেছে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত। এ বিভ্রান্তির অংশটি হলো ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকা সাময়িক বিদ্রোহগুলো। ১৯২৬-২৯ সাল পর্যন্ত তথাকথিত ক্রিস্টেরো বিদ্রোহ হয়েছে, সে সময় প্রেসিডেন্ট প্লুতারকো এলিয়াস ক্যালেসের ধর্মবিরোধী সরকার ও ক্যাথলিক বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত হয়। ক্যালেস ১৯২৮ সালে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর একাধিক পুতুল সরকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। বিভিন্ন গোষ্ঠীকে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার অধীনে নিয়ে আসার জন্য তিনি ন্যাশনাল রেভল্যুশনারি পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে ইনস্টিটিউশনাল রেভল্যুশনারি পার্টি বা পিআরআই নামে পরিচিত হয়। কার্যত ১৯২৯ সাল থেকে পিআরআই ২০০০ সাল পর্যন্ত মেক্সিকো শাসন করে। বিরোধিতায় ১২ বছর থাকার পর ২০১২ সালে পুনর্গঠিত পিআরআই আবার ক্ষমতায় আসে এবং ২০১৮ সাল পর্যন্ত থাকে। যদিও নির্বাচনী প্রতারণা, স্বৈরাচার ও দুর্নীতির জন্য এর খ্যাতি ছিল একসময়, তবে এটি এখনো একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে।

এমিলিয়ানো জাপাতা ছবি: ফাইন আর্ট আমেরিকা
মেক্সিকো বিপ্লব যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতেও গুরত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। উইলিয়াম হাওয়ার্ড টাফট প্রশাসনের সময় মেক্সিকোয় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি লেন উইলসন বিশ্বাস করতে শুরু করেন, বিপ্লবের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি মনে করতেন ক্ষমতায় হুয়ের্তা আসলে স্থিতিশীলতায় পৌঁছবে। উইলসন ব্যক্তিগতভাবে মাদেরোর প্রতি হুয়ের্তার বিশ্বাসঘাতকতা এবং ১৯১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে হুয়ের্তাকে ক্ষমতায় আনতে সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু পরের মাসে প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ক্ষমতায় আসার পর উইলসনকে ফিরিয়ে নিয়ে হুয়ের্তার বিরোধীদের সমর্থন করতে শুরু করেন। তিনি এমনকি ইউরোপীয় অস্ত্র হুয়ের্তার কাছে পৌঁছতে না পারে, সেজন্য ভেরাক্রুজে অবরোধের নির্দেশ দেন। ১৯১৪ সালের এপ্রিলে যখন মার্কিন সৈন্যরা সেখানে অবতরণ করে, প্রায় ৯০ জন হতাহত হয়। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো গোলা ছুড়ে শহরটিকে গুঁড়িয়ে দেয়। ওই বছরের নভেম্বরে ভেরাক্রুজ থেকে অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়। তবে ১৯১৬ সালের মার্চে মার্কিন সেনারা তথাকথিত শাস্তিমূলক অভিযান হিসেবে ফের মেক্সিকোয় প্রবেশ করে। এ সময়ের লক্ষ্য ছিল বিপ্লবী নেতা ভিয়াকে ধরার কিংবা হত্যা করা। জেনারেল জন জে পার্শিং ১০ হাজারের বেশি সৈন্য নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে ভিয়াকে খুঁজে বের করতে চেষ্টা করেন। যদিও তারা বেশ কয়েকটি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল, কিন্তু ধরতে পারেনি।
মুহম্মদ আল মুখতাফি: লেখক





