বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঘাটাল মহকুমার অন্তর্গত একটি সুপ্রাচীন নগরী চন্দ্রকোনা।৷ এ নগরীতে রাজধানী করে গড়ে উঠেছিল চন্দ্রকোনা রাজ্য;৷ মল্ল, কেতু, ভান প্রমুখ রাজবংশ শতাব্দীকাল ধরে স্বাধীনভাবে এ রাজ্য শাসন করেছেন।৷ চন্দ্রকোনা শহরের বিভিন্ন প্রাচীন মঠ, মন্দির, গড়, দুর্গ, পরিখার ধ্বংসাবশেষ এখনো সে সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অনেক মন্দির থানার কারণে একসময় এ শহরকে ‘মন্দিরের শহরও’ বলা হতো।
চন্দ্রকোনায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিখদের একটি অস্থল (শিখদের উপাসনালয়) রয়েছে এখানে, যা ‘নানক সঙ্গত’ বা ‘নানক অস্থল’ নামে পরিচিত।৷ চন্দ্রকোনা-২ ব্লকের অন্তর্গত কুয়াপুর ৩ নং গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার রামগড় মৌজায় সরযূ নদীর তীরে এ অস্থল বা আখড়াটি অবস্থিত।৷ ‘নানক প্রকাশ’ নামক গুরুমুখী ভাষায় রচিত গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, গুরু নানকজি যখন পদব্রজে বালা ও মর্দানা নামক দুই অন্তরঙ্গ অনুচরকে নিয়ে পুরী যাচ্ছিলেন, তখন এ চন্দ্রকোনা শহরে তিনি দিন-রাত্রি অবস্থান করেছিলেন।
ষোল শতকের একদম গোড়ায় গুরু নানক যখন পদব্রজে এ পথ দিয়ে চলেছেন, তখন চন্দ্রকোনায় রাজত্ব করছিলেন কেতুবংশীয় শেষ রাজা দ্বিতীয় চন্দ্রকেতু। কথিত আছে, গুরুর আগমনের খবর শুনে চন্দ্রকোনারাজ তার সঙ্গে দেখা করেন এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থান করার জন্য অনুরোধ করেন। চন্দ্রকোনার ঐতিহাসিক রঘুনাথগড় ও রামগড়ের মধ্যবর্তী সরযূ নদীর তীরবর্তী মনোরম স্থানটিই (বর্তমানে ‘নানক সঙ্গত’ বা ‘নানক অস্থল’ যেখানে অবস্থিত) গুরু নানকের পছন্দ হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়।৷ এ নির্জন মনোরম স্থানটিতেই গুরু নানক একটি বেল গাছের নিচে তিনদিন রাত্রিবাস করেন। স্থানটি পরবর্তী সময়ে ‘নানকভিটা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।৷ জনশ্রুতি আছে, চন্দ্রকেতু (দ্বিতীয়) নিঃসন্তান ছিলেন, নানকজির আশীর্বাদেই তিনি পুত্রসন্তান লাভ করেন৷। এ প্রসঙ্গে আরেকটি জনশ্রুতিরও উল্লেখ আছে। চন্দ্রকেতুর একটি মেয়ে ছিল,৷ গুরু নানকের আশীর্বাদে সে পুত্রসন্তানে পরিণত হয়।৷ দ্বিতীয় জনশ্রুতিটি অস্থলের ভেতরে একটি ফলকে বাংলা, ইংরেজি ও গুরুমুখী ভাষায় লেখা আছে৷। অবশ্য এ জনশ্রুতির সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়।৷ ত্রয়োদশী থেকে পূর্ণিমা—এ তিনদিন চন্দ্রকোনায় থাকার পর নানকজি মেদিনীপুর হয়ে পুরীর পথে রওনা দিয়েছিলেন। সময়কাল ১৫১০ খ্রিস্টাব্দের জুনে।
কথিত আছে, পাঞ্জাব থেকে পুরী যাওয়ার পথে গুরু নানকজি যেসব স্থানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন, সেসব স্থানে পরবর্তীকালে তার পুত্র শ্রীচন্দ্র জি একটি করে উদাসীন মঠ বা আখড়া স্থাপন করেছিলেন। সম্ভবত চন্দ্রকোনার ‘নানক ভিটাতে’ তিনিই ‘উদাসীন মঠটি’ প্রথম স্থাপনা করেছিলেন।
এ ঘটনার প্রায় বেশ কয়েক দশক পর ১৫৮৯ খ্রি. শিখ সম্প্রদায়ের উদাসীন শাখার বৈশাখী দাস উদাসীন নামে এক সিদ্ধ পুরুষ নানকের স্মৃতিবিজড়িত এ স্থানে আসেন এবং কুটির নির্মাণ করে সাধন ভজন করতে থাকেন। তৎকালীন চন্দ্রকোনারাজও একে সমাদরে স্থান এবং ওই পবিত্র স্থানের ওপর মঠ নির্মাণ করে দেন। মঠের পরিচালনা ও দেখভালের জন্য প্রচুর নিষ্কর ভূসম্পত্তিও দান করেন বলে৷ কথিত আছে। এ সিদ্ধ পুরুষ জীবিত অবস্থায় যোগাসনে বসে নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেন এবং এ সমাধির ওপরই তার সমাধি মন্দির গঠিত হয়েছিল, যা এখনো অটুট।৷ দক্ষিণমুখী এ সমাধি মন্দিরটি মাকড়া পাথরের তৈরি, আটচালা রীতির। জানা যায়, বৈশাখী দাস উদাসীন খুবই জনদরদি ছিলেন এবং জনগণের কাছে তিনি ‘বৈশাখী বাবা’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।

ফলকে লেখা আছে গুরু নানকের উপস্থিতির কথা ছবি: লেখক
বহুকাল পরে ব্রিটিশ রাজত্বের প্রথম দিকে বাবা রামদাস উদাসীন নামে এক কঠোর তপস্বী মোহন্তের নাম পাওয়া যায়, যিনি গ্ৰীষ্মের প্রখর রোদ মাথায় নিয়ে পাঁচটি জ্বলন্ত ধুনির মাঝখানে বসে পঞ্চতপাসাধন করতেন। মেদিনীপুর জমিদারির তৎকালীন এক ইংরেজ ম্যানেজার সাহেব স্বচক্ষে এ যোগী পুরুষের কৃচ্ছ্রসাধনা দেখে অভিভূত হন। তিনি পাশের বগড়ী পরগনার (বর্তমান গড়বেতা থানা) কাদড়া, কড়শা, লোছনগড় ও মঠের নিকটবর্তী রামগড় মৌজায় অনেক ভূসম্পত্তি দেবোত্তর করে দেন। উল্লেখ্য, এর আগে বর্ধমান রাজারাও চন্দ্রকোনা পরগনার শনপুর মৌজা, চন্দ্রকোনা শহরের নিকটবর্তী বিভিন্ন মৌজার অনেক ভূসম্পত্তি দেবোত্তর করে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে নাড়াজোল রাজারাও কুঁয়াপুর, রাধাবল্লভপুরসহ চন্দ্রকোনার নিকটবর্তী একাধিক অঞ্চলের অনেক ভূসম্পত্তি মঠে দান করেছিলেন। এভাবে বিভিন্ন রাজার দ্বারা বিভিন্ন সময়ে অস্থলের ভূসম্পত্তি বর্ধিত হলেও মোহন্তরা প্রকৃতই উদাসীন ছিল। তাদের এ উদাসীনতার সুযোগে কয়েকজন অসৎ কর্মচারী দ্বারা সেসব সম্পত্তির অধিকাংশই বেহাত হয়ে যায়। বর্তমানে মঠের কাছে অবস্থিত খুব সামান্য পরিমাণ জমির আয়ে এবং ভক্তদের দানে সেবা পূজা হয়ে আসছে।
গুরু নানকজির জ্যেষ্ঠ পুত্র চাঁদজী শিষ্য পরম্পরার ওপর উদাসীন শাখা টিকে রয়েছে। শিখ সম্প্রদায়ের শাখা হলেও উদাসীনরা ‘গ্ৰন্থসাহেব’-এর পূজা করেন না, বরং বিষ্ণু, রাম সীতা, রাধাকৃষ্ণ, শিব, হনুমান প্রমুখ হিন্দু দেব-দেবী এবং চাঁদজির পূজা করেন। প্রতিদিন নিত্যসেবা ও হরিনাম ছাড়াও বার্ষিক নানা পালাপার্বণ যেমন বসুধারা, ঝুলন, উত্থান একাদশী, জন্মাষ্টমী, শ্রীরাম নবমী পালন করা হয়। ঝুলন পূর্ণিমা থেকে এক মাসব্যাপী অখণ্ড হরিনাম ও পালা সংকীর্তন অনুষ্ঠিত হয়।
উদাসীন সম্প্রদায়ের মতো শিখ ধর্মের আর একটি শাখা হলো ‘আকালী’ সম্প্রদায়। এরা ধর্মীয় ও সামরিক বিষয়ে নিজেদের যোদ্ধারূপে পরিচয় দিত। এরা গুরু নানকসহ দশজন শিখ গুরুর আদর্শ মেনে চলতেন এবং ‘গ্রন্থসাহেব’কে আরাধনা করতেন। ১৯২০ সালে ‘আকালী আন্দোলন’ (গুরুদুয়ারা সংস্কার আন্দোলন)-এর মাধ্যমে ভারতে এদের প্রভাব বাড়ে। এ আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল গুরুদুয়ারাগুলোর দুর্নীতিগ্ৰস্ত ও অশিক্ষিত মোহন্তদের উচ্ছেদ ঘটিয়ে সেগুলো ‘শিখ গুরুদুয়ারা প্রবন্ধক কমিটি’র নিয়ন্ত্রণে আনা। একই সঙ্গে এ আন্দোলন ছিল ব্রিটিশ সরকারবিরোধীও। অবশেষে ১৯২৫ সালে ‘শিখ গুরুদুয়ারা বিল’ পাসের মাধ্যমে এ আন্দোলনের অবসান ঘটে। চন্দ্রকোনার উদাসীন অস্থলটি অবশ্য তখনো শিখ কমিটির নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এখানে সংসারত্যাগী উদাসীন সন্তরা তখনো নিভৃতে কৃচ্ছ্রসাধনে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন।
অনেক পরে ১৯৮৪ খ্রি. ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার দুই বিশ্বস্ত শিখ দেহরক্ষী দ্বারা খুন হলে ভারতে শিখ সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক অত্যাচার শুরু হয়েছিল। এ সময় খড়্গপুরসহ পাশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিখরা আত্মরক্ষা ও আত্মগোপনের জন্য চন্দ্রকোনার এ উদাসীন মঠে আসতে থাকেন। এ মঠের তৎকালীন মোহন্ত বাবা শরণ দাস উদাসীন এসব শিখকে আশ্রয় দেন। এ নির্জন মঠে বসবাসের জন্য তেমন কোনো বাড়ি সে সময় না থাকায় শিখরা শরণ দাস বাবার কাছে এখানে দালানবাড়ি নির্মাণ করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। এরপর মহারাজের অনুমতিতে শিখরা ১৯৮৬ খ্রি, প্রথম এখানে পাকা বাড়ি তৈরি করেন এবং পরে তার সংখ্যা বাড়তে থাকে। রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি অর্ডিন্যান্স জারি করে ঘোষণা করেন, যেসব গুরুদুয়ারায় শিখ ধর্মের ঝাণ্ডা ও গ্ৰন্থসাহেব থাকবে, সেখানে কোনো অপারেশন বা সেখানে তল্লাশি চালিয়ে অত্যাচার করা হবে না।
ভারত সরকারের এ ঘোষণা অনুযায়ী চন্দ্রকোনার উদাসীন মঠে আশ্রিত শিখরা শরণ দাস বাবার অজ্ঞাতে ‘উদাসীন ঝাণ্ডা’কে নামিয়ে ‘শিখ ঝাণ্ডা’ তুলে দেন। খড়্গপুরের বাসিন্দা খেয়াল সিং এ কাজে নেতৃত্ব দেন বলে জানা যায়। আসলে তৎকালীন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শিখরা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য এমন মিথ্যার আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে মনে হয়। উদাসীন ও শিখ ঝাণ্ডার মধ্যে বিশেষ তফাত না থাকায় মঠের উদাসীনদের কারো নজরে আসেনি। যা-ই হোক, এর কয়েক বছর পর শরণ দাস বাবার এক শিষ্য এখানে এসে বিষয়টি লক্ষ করেন এবং দুই পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হয়। অবশেষে উদাসীন সম্প্রদায়ের আর একটি নতুন ঝাণ্ডা টাঙানো হয়।
এভাবে তখন থেকেই দুই সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অবস্থানে অস্থলটি সমৃদ্ধ হতে থাকে। যদিও মনে রাখতে হবে উদাসীন সম্প্রদায়ের নিভৃতে ও নির্জনতায় থেকে সাধন ভজনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করা আকালী শিখদের জন্য। বাবা শরণ দাস এ ঘটনায় মনঃক্ষুণ্ন হলেও তাকে বলতে শোনা যেত, ‘ওরা যাই করুক এখানে করছে, এখান থেকে তো কিছু নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে না। তাছাড়া নানকজির পদধূলি ধন্য এ স্থানে যদি ওরা গ্ৰন্থসাহেব পাঠ করে তাতে ক্ষতি কী! সবাই তো একই পথের পথিক। ঈশ্বরকে জানা। নিজের মধ্যে ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া।’ সেই থেকে এ মঠে আকালী শিখ সম্প্রদায় ও ভক্তদের বৈভব বাড়তে থাকে।
নানক অস্থলের আদি মন্দিরটি পূর্বমুখী ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট৷ উত্তরের কক্ষটি উদাসীন সম্প্রদায়ের, যেখানে হিন্দু দেব-দেবীরা পূজিত হচ্ছেন, তা আগেই উল্লেখ করেছি। দক্ষিণের কক্ষটিতে শিখ আকালীরা আরাধনা করে থাকেন। দক্ষিণের কক্ষটিতে একটি সুসজ্জিত কাষ্ঠাসনের ওপর একটু সুন্দর চাদরে মোড়া একটি প্রাচীন ‘গ্রন্থসাহেব’ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে গুরু নানকজিসহ কয়েকজন শিখ গুরুর তৈলচিত্র। শিখরা এদের আরাধনা করে থাকেন।
শিখ সম্প্রদায়ের দুই শাখার এমন পাশাপাশি উপাসনাস্থল ভারতের ইতিহাসে সত্যই বিরল।৷ এখানে দুই সম্প্রদায়ের সাধুসন্ত, ভক্তরা সর্বদা সম্প্রীতি, সদ্ভাব বজায় রেখেই ঈশ্বরের আরাধনা করে চলেছেন।৷
তথ্যসূত্র
১) ভগ্ন দেউলের ইতিবৃত্ত, কানাইলাল দীর্ঘাঙ্গী (পঞ্চম সংস্করণ, গ্রন্থাকার, ১৪২৬, পৃষ্ঠা: ৩৩-৩৪)
২) ঘাটালের কথা, পঞ্চানন রায় ও প্রণব রায় (বাণী সংসদ, ১৯৭৭, পৃষ্ঠা: ২৫৩)
৩) চন্দ্রকোনা: ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ডা. সুদর্শন রায় (মেদিনীপুর সাহিত্য সংসদ, ১৪১৮, পৃষ্ঠা: ৬৮-৭০)
৪) মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনায় শিখ সম্প্রদায় ঐ গুরুনানক, রাধারমণ সিংহ (‘শ্রীমোহিনী’, শারদীয়া, ১৩৭৮, পৃষ্ঠা: ৪৩-৪৪)
৫) মেদিনীপুরের উদাসীন ও শিখ সম্প্রদায়, মন্টু পান (Midnapore.in, ২০২১)
৬) ক্ষেত্র সমীক্ষা-২০.০১.২০২৫।
গণেশ দাস: শিক্ষক ও আঞ্চলিক ইতিহাস প্রেমী










