মৈমনসিংহ গীতিকা বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি লোকসংস্কৃতির অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। এটি ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রাচীন পালাগানের সংকলন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীনেশ চন্দ্র সেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা থেকে স্থানীয় সংগ্রাহকের সহায়তায় এ গীতিকা সংগ্রহ ও সম্পাদনা করেন। এরপর ১৯২৩ সালে মৈমনসিংহ গীতিকা নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। এর শিল্পগুণ ও বিষয়বস্তু বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রশংসিত হয়; কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও অভিভূত হয়ে মতামত ব্যক্ত করেন। এর কাহিনী-আখ্যান মানুষের মন জয় করে এবং আজও তা জনপ্রিয়।
মৈমনসিংহ গীতিকায় ১০টি গীতিকা স্থান পেয়েছে। এগুলো হলো মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতী, কমলা, দেওয়ান ভাবনা, দস্যু কেনারামের পালা, রূপবতী, কঙ্ক ও লীলা, কাজলরেখা ও দেওয়ানা মদিনা।
উল্লেখ্য, পূর্ববঙ্গ থেকে মৈমনসিংহ গীতিকার পালাগুলো সংগ্রহ করেছিলেন নেত্রকোনার চন্দ্রকুমার দে (১৮৮৯-১৯৪৬ খ্রি.)। গুরুত্বপূর্ণ এ মহৎ কাজে পরামর্শ দিয়ে চন্দ্রকুমার দেকে সহায়তা করেন দীনেশচন্দ্র সেন। সংগ্রহের পরে পালাগুলোর ঘটনার কোনো কোনো জায়গায় অবশ্য অসামঞ্জস্য দেখা যায়। দীনেশচন্দ্র সেগুলো সম্পাদনা করে ঠিক করেন। গাথাগুলোর টীকা ও ভূমিকাও লেখেন তিনি। এছাড়া প্রতিটি পালা ঘটনা অনুযায়ী কয়েকটি ভাগ করেন। পালায় ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দগুলোর অর্থ লিখে দেন কিশোরগঞ্জের সুরেশচন্দ্র ধর।
মৈয়মনসিংহ গীতিকার অন্যতম একটি গীতিকা হলো কাজলরেখা। এর কাহিনীর গভীরতা জনমনে দাগ কাটে আজও। কাজলরেখা যখন নিজের দাসীর বিশ্বাসঘাতকতায় রানীর বদলে হয়ে যান দাসী, তখন কে রানী কে দাসী তা প্রমাণে ব্যক্তিত্ব ও কার্যগুণ মুখ্য হয়ে ওঠে। রাজা তার বন্ধুকে প্রাসাদে নিমন্ত্রণ করেন। এ উপলক্ষে প্রথমে রান্নাবান্না করার দায়িত্ব পড়ে নকল রানী ওরফে কঙ্কন দাসীর ওপর। নকল রানী বানাল চালতার অম্বল, ডেউয়ার ঝাল ও আলবণে কচুশাক। রাজা এসব খেয়ে লজ্জিত হলেন। পরদিন দাসীর পালা অর্থাৎ প্রকৃত রানী কাজলরেখার রান্না করার পালা। কাজলরেখা যত্ন ও মমতায় রান্না করে পিঠাসহ মুখরোচক বাহারি খাবার। মৈয়মনসিংহ গীতিকায় উল্লেখ:
...জোরা কইতর রান্ধে মাছ নানা জাতি।
পায়েস পরমান্ন রান্ধে সুন্দর যুবতী।।
নানা জাতি পিঠা করে গন্ধে আমোদিত।
চন্দ্রপুলি পিঠা করে কন্যা চন্দের আকিবৃত।
... ক্ষীরপলি করে কন্যা ক্ষীরেতে ভরিয়া।
রসাল করিল তায় চিনির ভাজ দিয়া।।
পিঠা ও বাহারি রান্না দেখে এবং খেয়ে রাজা মুগ্ধ হন। বুঝে যান, কাজলরেখা কোনো দাসী নয়, সে সম্ভ্রান্ত কোনো বংশের মেয়ে এবং নানা গুণে গুণান্বিত।
কাজলরেখার এ কাহিনী রূপকথাধর্মী। এর বিষয়বস্তু প্রাচীন। তবে মৈমনসিংহ গীতিকার রচয়িতাদের কাল, কাব্যের জীবনকথা, আর্থসামাজিক অবস্থার চিত্র এবং ভাষার ধরন ইত্যাদি ব্যাখ্যা করে গীতিকাগুলো মধ্যযুগে রচিত হয় বলে ধারণা করা হয়।
তথ্যসূত্র
১। দীনেশচন্দ্র সেন রায়বাহাদুর, মৈমনসিংহ গীতিকা, ঢাকা: বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক ফোরাম, প্রথম বাংলাদেশ সংস্করণ ১৯৯৫, পৃ. ৪২০।
২। সিরাজুল ইসলাম (সম্পা.), বাংলাপিডিয়া, খণ্ড-১১, ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০১১, পৃ. ৩৭৪।
৩। তারিক মনজুর, যেভাবে সংগ্রহ করা হলো ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ শীর্ষক নিবন্ধ, প্রথম আলো, ২০ মে ২০২৩।
নীরব হাসান: লেখক ও প্রাবন্ধিক





