মুজিবনগর সরকার যতই বড় হতে থাকে, ততই তার মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত সরকার দুটি হুমকির সম্মুখীন হয়। প্রথমত, আওয়ামী লীগের তরুণ ছাত্রনেতারা যুদ্ধের জন্য কোনো সরকারের প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন। তাদের মতে, যুদ্ধের জন্য বিপ্লবী কমান্ড প্রতিষ্ঠা করাই যথেষ্ট। এ কমান্ড বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে কাজ করবে। এ মতের প্রবক্তা ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমেদ ও অন্যান্য ছাত্রনেতা।
দ্বিতীয় দ্বন্দ্ব দেখা দেয় মুজিবনগর সরকার ও আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে। প্রতিবিপ্লবীদের নেতৃত্বে ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। তাকে সহায়তা করছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী ও জহিরুল কাইয়ুম। মুজিবনগর সরকারের পক্ষে যে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সব সংসদ সদস্য রয়েছেন, সেটা প্রমাণ করার প্রয়োজন ছিল। তাই ভারত সরকারের সহায়তায় শিলিগুড়ির জঙ্গল অঞ্চলে ৫ জুলাই আওয়ামী লীগ দলীয় সংসসদ সদস্যদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ভারত সরকারের সমর্থন নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত সরকারকে আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন দেয়।
শিলিগুড়ি সম্মেলনের পর মুজিবনগর সরকারের প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ দূর হয়, কিন্তু ভেতরে-ভেতরে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। এ ষড়যন্ত্রের নেতা ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। তাকে সহায়তা করেন কুমিল্লার আওয়ামী লীগ নেতা জহিরুল কাইয়ুম ও পররাষ্ট্র সচিব মাহবুবুল আলম চাষী (যাকে মার্কিন সরকারের কাছে পাকিস্তানের দেশরক্ষার গোপনীয় বিষয়াদি পাচার করার অভিযোগে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়)। তাজউদ্দীন আহমদ ও ভারত সরকার প্রথম থেকেই খন্দকার মোশতাককে সন্দেহ করত। তাজউদ্দীন আহমদ খন্দকার মোশতাকের একান্ত সচিব হিসেবে কামাল সিদ্দিকীকে নিয়োগ করেন। নিয়োগের আগে তিনি খন্দকার মোশতাকের সন্দেহজনক আচরণ সম্পর্কে কামাল সিদ্দিকীকে জানান এবং খন্দকার মোশতাকের সব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাকে সরাসরি অবহিত রাখার জন্য কামাল সিদ্দিকীকে নির্দেশ দেন। কামাল সিদ্দিকী খোন্দকার মোশতাকের টেলিফোনের নিচে কয়েকটি অচেনা কাগজে টেলিফোন নম্বর দেখতে পান। টেলিফোন নম্বরগুলোকে কপি করে তিনি তাজউদ্দীন আহমদকে দেন। তাজউদ্দীন আহমদ পরে কামাল সিদ্দিকীকে জানান, টেলিফোন নম্বরগুলো কলকাতার আমেরিকান কনস্যুলেট জেনারেলের অফিসের। ভারতীয়দের তদন্তে আরো জানা যায় খন্দকার মোশতাকের পক্ষে জহিরুল কাইয়ুম মার্কিন দূতাবাসে দেখা করতে যান।
আগস্ট ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভায় সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের যে সভা অনুষ্ঠিত হবে, সে সভার জন্য বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সদস্যদের মনোনয়ন দেয়া হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন। তার সঙ্গে তার একান্ত সচিব কামাল সিদ্দিকী যাবেন কাগজপত্র নিয়ে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার একান্ত সচিবের বিশ্বসভায় অংশগ্রহণের উপযুক্ত কাপড়চোপড়ের জন্য দেড় হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হয়। কামাল সিদ্দিকী এ টাকা তুলে তার মন্ত্রীর জন্য পোশাক তৈরি করার ব্যবস্থা করেন এবং নিজে একটি স্যুট ও এক জোড়া জুতা কেনেন। তারপর হঠাৎ খন্দকার মোশতাকের নিউইয়র্ক সফর বাতিল করা হয়। জানা যায়, ভারত সরকার টের পেয়েছিল খোন্দকার মোশতাক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছেন। তার শর্ত ছিল পাকিস্তান যদি শেখ মুজিবকে ছেড়ে দেয়, তাহলে শেখ মুজিব এসে যুদ্ধ বন্ধ করে দেবেন এবং এক পাকিস্তানের কাঠামোয় সাংবিধানিক সমস্যার সমাধান করবেন। ভারত সরকার তাই খন্দকার মোশতাককে দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট দিতে অস্বীকার করেন। কামাল সিদ্দিকীরও দেশের বাইরে যাওয়া হয়নি। শীতের সময়ে মাঝেমধ্যে বাইরে গেলে আমি কামাল সিদ্দিকীর কাছ থেকে নিউইয়র্কে যাওয়ার জন্য তৈরি করা তার কোটটি ধার করতাম।
মোশতাকের সমর্থকরা যে পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতা চেষ্টা করছে, তা মোশতাকের অন্য সহকর্মীদের আচরণ থেকেও বোঝা যাচ্ছিল। তাহেরউদ্দীন ঠাকুর ছিলেন সরাইল থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য। তিনি খন্দকার মোশতাকের অনেক কাছের লোক ছিলেন। আমি কলকাতায় যোগ দেয়ার পর একদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাই। সেখানে তাহেরউদ্দীন ঠাকুরের সঙ্গে আমার দেখা হয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করতে করতে একপর্যায়ে তাহেরউদ্দীন ঠাকুর আমাকে বলেন, ‘এসডিও সাহেব, আপনারা কেন এ রাজনৈতিক বিষয়ে জড়ালেন সেটা বুঝতে পারছি না। আমরা রাজনীতিবিদরা অনেক বিষয়ে ঝগড়া করি আবার সেসব বিষয় নিয়ে আপসও করি। আমাদের জন্য কিছুই বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু আপনাদের আইনের ভিত্তিতে প্রশাসন চালাতে হয়। একবার যদি আইন ভাঙেন, তাহলে আপনাদের অবশ্যই শাস্তি হবে। সুতরাং যদি দেখা যায় কিছুদিন পর আপস করে আমরা ঘরের ছেলেরা ঘরে ফিরে গেছি, তখন কিন্তু আপনারা ফিরে যেতে পারবেন না। আপনাদের বিচার হবে।’
আকবর আলি খান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব (প্রয়াত)।
[প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আকবর আলি খানের আত্মজীবনী ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ (২০২৫) শীর্ষক গ্রন্থের অংশবিশেষ]





