সাক্ষাৎকার: ১৮.১.১৯৬৬

স্বাধীনতার পর আকরাম খান পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের চিফ অর্গানাইজার হলেন এবং নিজের মতো করে লীগকে সংগঠিত করার চেষ্টা করতে লাগলেন। যে তরুণ মুসলিম লীগ কর্মীরা পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ সংগঠিত করেছিলেন তাঁরা এবং মুসলিম লীগ ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের কর্মীরা লীগের নূতন সাংগঠনিক কর্মসূচীতে অংশ নিতে ইচ্ছুক ছিলেন কিন্তু মুসলিম লীগ কর্মী ও সদস্যদের নূতন রিক্রুটমেন্টের ব্যাপারে আকরাম খান একেবারে অনিচ্ছুক ছিলেন। নূতন সদস্য সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় রসিদ বই তাদেরকে দিতে তিনি অস্বীকার করেন। যে সব কর্মীরা রসিদ বই চাইছিলো তারা পূর্বে ছিলো সুহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম গ্রুপের সমর্থক। সে জন্য আকরাম খান তাদেরকে খুব ভয় করতেন। তিনি মনে করেছিলেন যে, এদেরকে যদি মুসলিম লীগের সদস্য সংখ্যা বাড়াতে দেওয়া হয় তাহলে শেষ পর্যন্ত তারাই সংগঠন দখল করে বসবে। কিন্তু তার এই অস্বীকৃতি সত্ত্বেও এই সব কর্মীদের পক্ষ থেকে একটা ডেলিগেশন তাঁর সঙ্গে সাংগঠনিক কাজ ও রশিদ বই সম্পর্কে আলোচনার জন্য দেখা করে। এই ডেলিগেশনে ছিলেন সবুর খান, ফজলুল কাদের চৌধুরী, আতাউর রহমান খান, বেগম আনোয়ারা খাতুন, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, মুশতাক আহমদ, কমরুদ্দীন আহমদ। [কমরুদ্দীন আহমদ ঐ ডেলিগেশনে ছিলেন না।– ব. উ.]

আকরাম খান ডেলিগেশনটিকে বলেন যে, পাকিস্তান হাসিল হয়েছে কাজেই সেই পর্যায়ে মুসলিম লীগ সংগঠনকে এমনভাবে বাড়াবার চেষ্টা করার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই যেভাবে তারা সেটা করার চেষ্টা করেছিলো। তিনি সেই অনুযায়ী ডেলিগেশনের রসিদ বই পাওয়ার দাবী প্রত্যাখ্যান করেন।

আকরাম খানের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে আমরা ১৯৪৮ সালে জিঞ্জিরাতে একটা মিটিং করার চেষ্টা করি কিন্তু সেটা পুলিশ দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর খান সাহেব ওসমান আলীর সহায়তায় আমরা নারায়ণগঞ্জে একটা কনভেনশন করার চেষ্টা করি। ওসমান আলীকে চেয়ারম্যান করে একটা রিসেপশান কমিটি গঠন করা হয়। মিটিংটি রহমতুল্লাহ ইন্সটিটিউটে হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু মিটিং এর দিনে ইন্সটিটিউট ই পি. আর. ও পুলিশ দিয়ে ভর্তি করা হয়। এবং আমাদেরকে সেখানে মিটিং করতে দেওয়া হয় না। কোন গত্যন্তর না থাকায় শেষ পর্যন্ত মিটিংটি অনুষ্ঠিত হয় পাইকপাড়া ক্লাবে। মিটিংএ সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পাকিস্তান মুসলিম লীগের চীফ অর্গানাইজার চৌধুরী খালিকুজ্জামানের কাছে একটা ডেলিগেশন পাঠাবার জন্য। ডেলিগেশন সদস্য ঠিক করা হয় আতাউর রহমান খান, সবুর খান ও আনোয়ারা খাতুনকে। তাঁদেরকে ডেলিগেশনের অন্তর্ভুক্ত করার কারণ ছিলো এই যে তাঁরা তখন ছিলেন সিনিয়র, তুলনামূলকভাবে। তাছাড়া আরও একটা কারণ এই ছিলো যে তাঁরা নিজেদের খরচে করাচী যেতে সমর্থ ছিলেন। অধিকাংশ অন্য কর্মীরা ছিলেন বয়সে অনেক ছোট এবং আর্থিক দিক দিয়ে অসচ্ছল। তখন এমন কোন সংগঠন অথবা তহবিল বাস্তবতঃ ছিলো না যা সেই ধরনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারতো।

ডেপুটেশনটি করাচীতে খালিকুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কিন্তু তাঁকে দিয়ে রসিদ বইয়ের ব্যাপারে আকরাম খানের কাছে সুপারিশ করতে তারা ব্যর্থ হয়। খালিকুজ্জামানের ধারণা ছিলো যে, তারা সকলেই সরকার বিরোধী কাজেই মুসলিম লীগের সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক না থাকাই বাঞ্ছনীয়।

এই সময়ে পূর্ব বাঙলায় কয়েকটি উপনির্বাচন due হয়েছিলো এবং অবশেষে নূরুল আমীন নিজের জেলা টাঙ্গাইলে সেই ধরনের একটা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিলেন, ১৯৪৯ সালে।

ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের লোকরা শামসুল হককে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানোর সিদ্ধান্ত নিলো। শামসুল হক একজন নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ালেন। মুসলিম লীগ খুররম খান পন্নীকে তাদের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করলো। পূর্বে যারা সুহরাওয়ার্দী আবুল হাশিম গ্রুপে ছিলো তারা তখন একটা দলে formally সংগঠিত না থাকলেও তাদের মধ্যে একটা ঐক্য ছিলো এবং নানা ধরনের অসুবিধা সত্ত্বেও তারা দিন রাত পরিশ্রম করলো সেই উপনির্বাচনের সময়। এই কর্মীদের মধ্যে ছিলো আউয়াল, আলমাস, নারায়ণগঞ্জের শামসুজ্জোহা, শওকত, আজিজ আহমদ প্রভৃতি। আমিও ছিলাম এবং নির্বাচনের মূল দায়িত্ব আমার উপরই ছিলো।

পন্নীর প্রথম পক্ষের স্ত্রী তার বিরুদ্ধে শামসুল হকের পক্ষে কাজ করতে চেয়েছিলো কিন্তু তাতে রাজী হইনি। নির্বাচনের সময় সস্তা দরে খাদ্য, বস্ত্র ও বাড়ীর জন্য শ্লোগান দেওয়া হয়।

নির্বাচনের পর আমাকে, শামসুল হককে এবং টাঙ্গাইলের একজন স্থানীয় লোক বদিউজ্জামানকে একটা ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত থাকার জন্য গ্রেফতার করা হয়। সেই ঘটনার সঙ্গে আসলে মোহন মিঞা, শাহ আজিজুর রহমান, সোলায়মান এবং আলাউদ্দীন সহ ঢাকার কয়েকজন গুণ্ডা জড়িত ছিলো। যে পুলিশ অফিসার আমাদেরকে গ্রেফতার করেছিলো সে বললো যে, আমাদেরকে কোন জামিন দেওয়া হবে না কারণ ঢাকা থেকে সেই মর্মে নির্দেশ এসেছে। কিন্তু সে নিজে বন্ধুভাবাপন্ন ব্যক্তি ছিলো এবং সে কারণে সে গোপনে আমাদেরকে পরামর্শ দিলো একটা পাল্টা মামলা মোহন মিঞা, শাহ আজিজুর রহমান এবং অন্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করতে। সেটাই করা হলো এবং সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ অফিসারটি এস. ডি. ও. খুরশীদ আলমের কাছে গেলো। মোহন মিয়া এবং অন্যরা তখন তার বাসাতেই মেহমান হিসেবে ছিলেন রাত্রে খাওয়ার সময়। পুলিশ অফিসারটি এস. ডি. ও. কে পাল্টা মামলার বিষয়ে জানালো এবং একই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরকে গ্রেফতার করতে চাইলো। তখন এস. ডি. ও. বললেন যে তাদেরকে জামীন দেওয়া হবে। কিন্তু পুলিশ অফিসারটি তখন বললো যে অন্য পক্ষের লোকদেরকে যদি জামীন না দেওয়া হয় তাহলে মোহন মিয়া এবং অন্যদেরকেও জামীন দেওয়া যেতে পারবে না। এতে শেষ পর্যন্ত এস. ডি. ও. সকলকেই জামীন মঞ্জুর করতে রাজী হলেন। মামলা অবশ্য চলতেই থাকলো এবং প্রায় নয় মাস পর দুই পক্ষের মধ্যে একটা আপোষ রফা হলো।

নির্বাচনের পর শামসুল হক ঢাকা এলে তাঁর জন্য একটা সম্বর্ধনার ব্যবস্থা করা হলো। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ের যে সব তরুণ মুসলিম লীগ কর্মীরা তখন ঢাকায় উপস্থিত ছিলো তারা সকলেই এই সম্বর্ধনায় উপস্থিত হয়েছিলো। শামসুল ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছাবার পর তাঁকে মিছিল করে নবাবপুর রোড, ইসলামপুর ও পটুয়াটুলী হয়ে ১৫০ নং মোগলটুলীতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।

শামসুল হকের নির্বাচনের সময় মওলানা ভাসানী আসামের ধুবড়ী জেলে আটক ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি নির্বাচনে শামসুল হকের পক্ষে একটা লিফলেট ইস্যু করেন। এ কারণে শামসুল হকের বিরুদ্ধে একটা নির্বাচনী মামলা দায়ের করা হয় এবং তিনি শেষ পর্যন্ত তাতে হেরে যান। সুতরাং তিনি কোনদিনই পূর্ব বাঙলা প্রাদেশিক পরিষদে বসতে পারেন নি। শামসুল হকের নির্বাচনী মামলা পরিচালনা করেন আবদুস সালাম খান এডভোকেট। এর মধ্যে দিয়েই সালাম খান রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত হন এবং পরে বিরোধী পক্ষে যোগদান করেন।

এই সময়ে প্রাদেশিক পরিষদের মাত্র তিনজন সদস্য বিরোধী পক্ষে ছিলেন। তাঁরা হলেন আলী আহমেদ, খায়রাত হোসেন ও বেগম আনোয়ারা খাতুন। তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা তাঁদের কাছে যেতো এবং একটা নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যাপারে তাঁদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতো। এইসব মিটিংয়েই মোটামুটিভাবে সিদ্ধান্ত করা হয় মওলানা ভাসানীকে পূর্ব পাকিস্তানে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে। কিছুদিন পূর্বেই ভাসানীকে ধুবড়ী জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। তিনি ঢাকায় আসেন ১৯৪৯ সালে। তিনি আসার পর স্বামীবাগে বশিরের বাড়ী রোজ গার্ডেনে রাজনৈতিক কর্মীদের একটা মিটিং ডাকা হয়।

এই মিটিংএ উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন ভাসানী, আতাউর রহমান খান, সালাম খান, শামসুল হক, ফজলুল কাদের চৌধুরী, রফিকুল হোসেন (এখন N. D. F এ), মানিক মিঞা, খয়রাত হোসেন, আবুল কাসেম (তমদ্দুন মজলিস), ইয়ার মহম্মদ প্রভৃতি। আমিও ছিলাম। ফজলুল হক অল্প কিছুক্ষণের জন্য এসেছিলেন। কফিলুদ্দীন চৌধুরী অবজার্ভার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সুহরাওয়ার্দী সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে একেবারেই পিকচারে ছিলেন না। কয়েকদিন পর ময়মনসিংহের হাশিমুদ্দীন আহমদও যোগদান করেন।

এই সভায় মওলানা ভাসানীকে নূতন সংগঠনের সভাপতি নির্বাচন করা হয়। সংগঠনের নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। শামসুল হক সম্পাদক এবং আতাউর রহমান খান, সালাম খান ও ইয়ার মহম্মদ খান সহসভাপতি হন।

সংগঠনের একটা ম্যানিফেস্টো এবং গঠনতন্ত্র তৈরীর জন্য এই মিটিংএ একটা সাব কমিটি গঠন করা হয়। এই সাব-কমিটির সদস্য ছিলেন শামসুল হক, কমরুদ্দীন আহমদ, সালাম খান, আতাউর রহমান খান, হাশিমুদ্দীন। আমিও এই সাব-কমিটির সদস্য ছিলাম।

সাক্ষাৎকার: ২০.৯.১৯৬৯

জুন ১৯৪৯-এ মৌলানা ভাসানী থাকতেন ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে। সম্মেলনের দিন তিনেক পূর্বে আমরা খবর পেলাম যে সরকার সম্মেলনের আগেই মৌলানাকে ধরে ফেলতে পারে। এই খবর পাওয়ার পর হুমায়ুনের সাথে কথা বলে আমরা তাঁকে রোজ গার্ডেনে কয়েকদিন রাখার ব্যবস্থা করলাম। সেদিন রাত্রিতেই মৌলানা ভাসানীকে গায়ে কম্বল জড়িয়ে একটা ঘোড়ার গাড়ীতে করে আমি এবং শওকত রোজ গার্ডেনে পৌঁছে দিলাম এবং সেখানেই তিনি সম্মেলন শেষ হওয়া পর্যন্ত ছিলেন।

দোতলায় ২৩শে তারিখে কনফারেন্স হলো। ২০০/২৫০ জন লোক সমবেত হয়েছিলো। ফজলুল হক সাহেব গিয়েছিলেন খুব অল্প সময়ের জন্য। শামসুল হক লিখিত একটা কিছু পড়েছিলেন।

২৪শে তারিখে আলাউদ্দীন, ইব্রাহিম, শাহ আজিজ প্রভৃতিরা একটা ট্রাকে চড়ে আরমানীটোলা মাঠে এসে আমাদের চেয়ার টেবিল ভেঙে দিয়ে যায়। মোহন মিঞা সে সময় ট্রাকের মধ্যে বসেছিলেন।

ফেব্রুয়ারী ১৯৫২

বদরুদ্দীন উমরের লেখা ‘‌আমাদের ভাষার লড়াই’ পুস্তিকাটি আমিই দশহাজার ছাপবার ব্যবস্থা করেছিলাম। ছাপাবার পর সেটা কি ভাবে বিতরণ করা হবে এই নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো ১০৩ আগা সাদেক রোডের ছাদে। এমন সময় যে জীপটি করে কয়েকহাজার কপি পুস্তিকা নিয়ে আসা হচ্ছিলো সেটি পুলিশ আটকায় এবং সমস্ত কপি নিয়ে চলে যায়। এই দুর্যোগের ফলে সেটি বিতরণের কোন সুবন্দোবস্ত আর সম্ভব হয়নি।

[কমরুদ্দীন আহমদ এই সংগঠনের সঙ্গে কোনভাবেই সম্পর্কিত ছিলেন না। - ব. উ.]

(বদরুদ্দীন উমর কর্তৃক দুই পর্বে গৃহীত খন্দকার মোশতাকের এই সাক্ষাৎকার বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বদরুদ্দীন উমরের ‘ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ কতিপয় দলিল, দ্বিতীয় খণ্ড’ (১৯৮৫) শীর্ষক গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। সমকালীন বানান ও উমরের নোট অবিকল রাখা হয়েছে।)