মানব সভ্যতার শুরু থেকেই রসুন মানুষের খাদ্যের অংশ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে বলে ধারণা করা হয়। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে গুহাবাসের সময়কার ভুক্ত রসুনের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিসরের একটি সমাধি প্রাচীরের ওপর রসুন অঙ্কিত দৃশ্য পাওয়া গেছে। ১৯১১ সালে মিসরের প্রাচীন সমাধি এল মাহাসনা খননকালে সেখানে প্রত্নতত্ত্ববিদরা মাটির তৈরি রসুনের মূর্তি পেয়েছিলেন; এটি সম্ভবত ৩৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের বলে ধারণা করা হয়।

সুমেরীয়রা প্রথম রসুনকে লিখিত রূপে উল্লেখ করে। প্রায় ২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে তারা বিভিন্ন কিউনিফর্ম ট্যাবলেটে (মাটি বা পাথরে লেখা নথি) রসুনকে মসলার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ২৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লেখা ট্যাবলেট অনুযায়ী, সুমেরীয়দের খাদ্যতালিকায় শস্য, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, লিক, শসা, শালগম, লেটুস, সরিষা এবং ৫০টির বেশি মাছের উল্লেখ ছিল।

সুমেরিয়ার ফার্মাকোপিয়ায় (চিকিৎসা গ্রন্থ) তালিকাভুক্ত ২৫০টি ঔষধি উদ্ভিদের মধ্যে অন্যতম ছিল রসুন। এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ফার্মাকোপিয়া হিসেবে স্বীকৃত। এ গ্রন্থের নথি রাজা আশুরবানিপালের (৬৮৮-৬২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) লাইব্রেরিতে পাওয়া গেছে। ডিকশনারি অব অ্যাসিরিয়ান বোটানি অনুযায়ী, সুমেরীয়রা দাঁতের ব্যথা নিরাময়ের জন্যও রসুন ব্যবহার করতেন।

গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডটাস লিখেছেন, প্রায় ২৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গিজার চিওপস পিরামিডের শ্রমিকদের প্রধানত রসুন ও পেঁয়াজ খাওয়ানো হতো। রসুন ও পেঁয়াজ প্রাচীন মিসরে সাধারণ মানুষের জন্য একমাত্র মসলা ছিল। তখন দারুচিনি, পুদিনা ইত্যাদি ব্যয়বহুল মসলা শুধু ফারাও, পুরোহিত ও ধনীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

হিব্রু জাতি

হিব্রুরা মিসরের শ্রমিকদের মতোই প্রায় প্রতিদিন রসুন খেত। বাইবেলে উল্লেখ আছে, প্রায় ৪০০ বছরের সময়ে যখন ইসরায়েলিরা মিসরের দাস ছিল, তখন রসুন ও পেঁয়াজ তাদের খাদ্যের অপরিহার্য অংশ ছিল। নাম্বারস গ্রন্থে বলা হয়েছে, প্রায় ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দাসদের মিসর থেকে বের করার পরে তারা অভিযোগ করেছিল যে তারা ‘মাছ, শসা, তরমুজ, পেঁয়াজ ও রসুন’-এর অভাববোধ করছে।

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে তালমুদ সংস্করণগুলোয় রসুন ব্যবহার সম্পর্কে নির্দেশনা আছে, যা পুষ্টি, স্বাস্থ্যবিধি, চিকিৎসা এবং রোগ সম্পর্কিত অন্যান্য পরামর্শের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। তালমুদ অনুযায়ী, রসুন খেলে শরীরকে উষ্ণ রাখে, মুখ উজ্জ্বল করে, পরজীবী মারে, ঈর্ষা দূর করে এবং প্রেম উদ্দীপিত করে। এছাড়া রসুন শুক্রবার খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে, ‘যাতে দম্পতিরা একে অন্যকে ভালোভাবে জানতে পারে।’ (প্রাচীন হিব্রু প্রথায় শুক্রবার ছিল দাম্পত্যকালের রাত)

গ্রিস ও রোম

রসুনের অংবিশেষ গ্রিসের ক্রেট দ্বীপের নক্সোস প্রাসাদ থেকে পাওয়া গেছে। এটি প্রায় ১৮৫০-১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের শেষ মাইনিয়ান যুগের এবং গ্রিসের স্বর্ণযুগের প্রায় এক হাজার বছর আগের। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার শুরুতে রসুনকে প্রশংসা ও ঘৃণার মিশ্রণ হিসেবে দেখা হতো। সে সময় রসুনকে সামরিক খাদ্য হিসেবে ধরা হতো, যা যোদ্ধাদের সাহস বাড়ানোর জন্য খাওয়ানো হতো। এ বিশ্বাস থেকে গ্রিক প্রবাদ ‘রসুন বা শিম কখনো খাওয়া যাবে না’ উদ্ভূত হয়েছে। এর অর্থ হলো ‘যুদ্ধ এবং আইনের ঝামেলা এড়িয়ে চলো।’ রসুন ক্রীড়াবিদদের প্রতিযোগিতার আগে খাওয়ানো হতো। প্রথম অলিম্পিক খেলায় এটি উদ্দীপক খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়।

রোমান সামরিক বাহিনীও গ্রিকদের মতো সেনাদের রসুন খাওয়াত। রসুনকে যুদ্ধের দেবতা মারসের সবজি হিসেবে ধরা হতো। যুদ্ধে যাওয়া বা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার আগে রসুন খাওয়ার প্রচলন ছিল। বলা হতো, ‘নাবিকেরা দিকনির্দেশক যন্ত্র (কম্পাস) ছাড়া সমুদ্রে যেতে রাজি, কিন্তু রসুন ছাড়া নয়।’

উচ্চবিত্ত রোমানরাও শ্রমিক ও দাসদের খাদ্য রেশনে রসুন দিত, কারণ তারা বিশ্বাস করত রসুন শ্রমশক্তি বাড়ায়। কবি ভার্জিল লিখেছেন, ‘ফসল কাটার শ্রমিকদের শক্তি বজায় রাখতে রসুন অপরিহার্য।’ তবে রোমের অভিজাত শ্রেণী রসুনকে নিচু রুচির মানুষদের খাবার মনে করত এবং এর গন্ধকে অশালীনতার চিহ্ন বলত। বিখ্যাত রন্ধনশিল্পী অ্যালেক্সিস সোয়ার উল্লেখ করেন, ‘রসুন ছিল কৃষক শ্রেণীর ওষুধ, বিশেষত উষ্ণ অঞ্চলে, যেখানে কাজে যাওয়ার আগে এটি খাওয়া হতো।’

ভারত ও চীন

ভারতে প্রাচীনকালে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতির বিকাশ ঘটে—আয়ুর্বেদিক, ইউনানি ও তিব্বি। এ তিন ব্যবস্থায়ই চিকিৎসার জন্য ব্যাপকভাবে উদ্ভিদ ব্যবহার করা হতো। সেখানে রসুন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। চরক সংহিতা, যা প্রথম খ্রিস্টাব্দের একটি প্রাচীন চিকিৎসা পাণ্ডুলিপি, সেখানে ভারতীয় চিকিৎসকদের হৃদরোগ ও বাতরোগ প্রতিরোধে রসুন ও পেঁয়াজ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

রসুনের উপকারিতা আরো বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে আরেকটি দলিলে—বাওয়ার পাণ্ডুলিপিতে। ধারণা করা হয় এটি প্রায় ৩৫০ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা লিখেছিলেন। এটি বার্চ গাছের ছালে সংস্কৃত লিপিতে লেখা ছিল। দলিলটি তুর্কিস্তানের মিনগাই ধ্বংসাবশেষের কাছে আবিষ্কৃত হয় এবং ব্রিটিশ অফিসার হ্যামিল্টন বাওয়ার ১৮৯০ সালে এটি ক্রয় করেন। বাওয়ার পাণ্ডুলিপিতে কাশি ও সর্দিসহ বিভিন্ন রোগের উপশমে রসুন ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে।

মার্কো পোলো (প্রখ্যাত ইতালীয় পর্যটক ও বণিক) চীনের সিচুয়ান উপত্যকা দিয়ে যাওয়ার সময় রসুন সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন। তার ‘ট্র্যাভেল’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন যে চীনারা তাদের ভেড়ার মাংস, গরুর মাংস, মহিষ ও পাখির মাংস কাঁচা খেতেন। তারা মাংস ছোট ছোট করে কেটে রসুনের সসে মিশিয়ে সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে ফেলত।

চীনে রসুনের ইতিহাস প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ সাল পর্যন্ত পাওয়া যায়। প্রাচীন চীনে রান্নার শিল্প ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। দক্ষ রাঁধুনিরা সমাজে উচ্চ মর্যাদা পেতেন এবং রসুন ছিল তাদের প্রধান উপাদান। প্রায় সব খাবারেই ব্যবহার হতো। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সালের চীনা রেকর্ডে উল্লেখ আছে, রসুন খাদ্য সংরক্ষণের উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার হতো।

এশিয়া মাইনর ও ইরান

রসুন স্কিথিয়ানদের খাদ্যের অংশ ছিল। স্কিথিয়ানরা খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর দিকে কাস্পিয়ান ও ব্ল্যাক সাগর অঞ্চলজুড়ে মধ্য এশিয়ার ভূমিতে বসবাস করত। গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডটাসের মতে, তারা ছিল যাযাবর ও বণিক। বলা হয়, তারা রসুনের পাশাপাশি টুনা মাছ, স্টারজিয়ন, পেঁয়াজ ও শিম অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বিনিময় করত। প্রাচীন পারস্য সংস্কৃতিতে রসুনের গুরুত্ব খুব বেশি ছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় জরথুস্ট্রের (খ্রিস্টপূর্ব ৬২৮–৫৫১) লেখায়। তার তালিকাভুক্ত ১০ হাজার ঔষধি উদ্ভিদের মধ্যে রসুনও একটি।

প্রাচীন লেখাগুলোয় দেখা যায়, ইরানে রসুন সাধারণভাবে চাষ করা হতো। তেহরানে এটিকে বলা হতো তুখম-ই-তাররাহ এবং হজমশক্তি বাড়ানোর ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হতো।

[সুসান ময়ার্সের গারলিক ইন হেলথ, হিস্ট্রি অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড কুইজিন শীর্ষক গ্রন্থ থেকে অনূদিত]

অনুবাদ: নীরব হাসান