কালের বিবর্তনে রুচি ও ব্যক্তিত্বের মিলমিশেলে অনন্য প্রসাধনী লিপস্টিক। এটি নারী সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে জুড়িহীন এক অনুষঙ্গ। ভিন্ন ভিন্ন দেশে, ভিন্ন সংস্কৃতিতে এর আবেদন ও উপস্থাপন ছিল এর রঙের মতোই বৈচিত্র্যময়। লিপস্টিক কেবল রঙে জৌলুসে নয়, বরং আধিপত্য বিছিয়েছে সময়ের নানা পরতে সমাজের ভিন্ন স্তরে। রঙের ঝরনা কলতান সুষমার গণ্ডি পেরিয়ে কালের প্রয়োজনে হয়ে উঠেছে এক অকাট্য সরঞ্জাম।
ইতিহাসে ষোল শতকে রানী এলিজাবেথ সিংহাসনে আরোহণের পর লিপস্টিকের জৌলুস ফিরে আসে। রানীর অনুরাগে লাল রঙ তার হারানো শওকত কিছুটা পুনরুদ্ধারে সফল হয়।
লিপস্টিকের রঙের ইন্দ্রজাল এ সুন্দরের প্রতীক আর ধর্মের প্রতিকূলতা ছাড়িয়ে বিস্তৃতি পেয়েছে যুদ্ধ, দর্শন, তথা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও। ভিক্টোরিয়ান যুগের নারীবাদের উৎপত্তির দিকে তাকালে ওপরের বক্তব্যের সত্যতা স্পষ্ট। এ সময়ে মূলত নারীরা তাদের সম-অধিকারসহ ভোটাধিকারের জন্য লড়েছিলেন এবং অবাক করার ব্যাপার এ অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতেই তারা লিপস্টিককে তাদের প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেন। ফলে সময়ের এক অগ্নিবিস্ফোরণে রাতারাতি প্রসাধনটি যেন জাদুবলে হয়ে ওঠে নারী বিদ্রোহের স্বাক্ষর।
চঞ্চুতে বাহারি রঙের ছোঁয়া নারীকে করে তোলে আস্থাশীল। তাই হয়তো সমাজের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে লিপস্টিক হতে পারে প্রতিবাদের একটি মাধ্যম। এ চিন্তার ভিত্তিতেই মঞ্চের ভেতর-বাইরে অভিনেত্রীসহ প্রগতিশীল মহলে এক হাতিয়ারস্বরূপ এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।৷তবে শতাব্দীর পালাবদলে প্রসাধনীর ব্যবহার ক্রমে নারীদের জন্য হয়ে ওঠে আধুনিক ও উন্মুক্ত, যা কিনা তথাকথিত পুরুষ শ্রেণীর মুখে সন্তুষ্টির হাসি ফুটিয়ে তোলে এ অনুমানে যে নিজের অধিকার আদায়ের বদলে নারী এখন রঙের রঙধনুতেই আবদ্ধ, কিন্তু তাদের চিন্তাকে ভুল প্রমাণিত করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি বৃদ্ধি। এ সময়ে নিজ উপার্জিত অর্থে নারী এটিকে নিজের কাছে আরো সহজলভ্য করে তুলেছিল।
১৯৩০ প্রসাধনীর ওপর ধর্মীয় চোখ রাঙানো কিছুটা স্থিত হয়ে আসার সময় নারী ভোটাধিকার লাভ করার সঙ্গে ঘরে-বাইরে কাজ করার হারও বাড়ে।৷স্বাবলম্বী অর্জনে পেশাগত কারণে নারীদের কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ততা বেড়ে চলে। এতে লিপস্টিকের চাহিদার পারদও যেন ধীরে ধীরে গগনচুম্বী হতে শুরু করে। লিপস্টিকের ছোঁয়া মানেই আভিজাত্য, সমাজের এ এলিট শ্রেণীর কাতারে নিজেকে সেঁটে নেয়ার জন্য। নারী তাই এতে আসক্ত হয়ে পড়ল আরো বেশি।
১৯৪০-এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন যোগান ঘাটতিজনিত কারণে সরবরাহে অবশ্য কিছুটা ভাটা পড়লেও পুরোপুরি লোপ পায় না। যুদ্ধকালীন সময়ে নানা কাজের জন্য ছুটে চলা নারীদের এ লিপস্টিকের ব্যবহার তাদের করে তুলত আরো সতর্ক ও দৃঢ় মনোবলের অধিকারী। এটি শুধু রঙ নয়, ছিল মূলত নারীর সামাজিক ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনতার অহম, যা কিনা যুদ্ধকালীন নারীদের আত্মবিশ্বাস ও স্থিরতার পালে প্রগতির হাওয়া লাগিয়েছিল।
উল্লেখ্য, শৌর্যবীর্য প্রকাশে নারীরা এ সময় লাল রঙের লিপস্টিকেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত, যা সাহস শক্তি জীবনের ইতিবাচকতার ইঙ্গিত বহন করত। এটিকে প্রতিহত করতেই মূলত লিপস্টিক ব্যবহারে কিছু বিধিনিষেধ আরোপিত হয়।
নাৎসি জার্মানিতে ‘উইম্যান ইন নাজি জার্মানি’ শীর্ষক ইতিহাসে প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।৷ হিটলার লিপস্টিক পছন্দ করতেন না। তবে এটা পুরোই নিষিদ্ধ ছিল এমন যুক্তিগুলোর পক্ষে শক্তিশালী ইতিহাসভিত্তিক প্রমাণ নেহাতই সীমিত। ১৯২৯-৩১ সালের ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, লিপস্টিক তথা প্রসাধনী সংস্কৃতি জার্মান পরিচয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, এমনটাই তখন মনে করা হতো।
আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বোধগম্য, লিপস্টিকের এ ছোট্ট কনটেইনারটি কেবল সৌন্দর্য সামগ্রী নয়, এটি সময়ের আবহে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও একটি মাইলফলক হিসেবে গেঁথে গিয়েছিল কালের প্রয়োজনেই।
লিপস্টিক যখন প্রাণঘাতী অস্ত্র
যুদ্ধবিগ্রহ, সামাজিক বদলের সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গেও এর রয়েছে অটুট বন্ধন। যোগসূত্র রয়েছে বিশ্বাস অবিশ্বাসের টানাপড়েনও। রয়েছে এর একটি কালো অধ্যায়ও। লিপিস্টিকও প্রাণঘাতী হয়। এটি প্রমাণ করতেই ঠাণ্ডা যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের গোয়েন্দা বাহিনী কেজিবি তাদের এজেন্ট দিয়ে তৈরি করেছিল লিপস্টিকের আদলে ক্ষুদ্র পিস্তল, যাকে বলা হতো ‘দ্য কিস অব ডেথ’। এটি ছিল একটি সিঙ্গেল-শট, ৪ দশমিক ৫ মিলিমিটারের পিস্তল, যা লিপস্টিকের খাপের ভেতরে লুকানো থাকত। এ আবিষ্কার প্রাথমিক ধরনের স্বল্পপাল্লার ইমপ্রোভাইজড ফায়ারআর্ম বা জিপ গান। অন্যান্য অনেক জিপ গানের মতোই কিস অব ডেথের কার্যপদ্ধতিও একই রকম ছিল। টিউবটি ব্যারেলের কাজ করত এবং লিপস্টিকের ডগায় একটি মাত্র বুলেট লুকানো থাকত। টিউবের নিচের অংশ ঘুরিয়ে দিলে একটি ছোট হাতুড়ি (হ্যামার) সে বুলেটের প্রাইমারে আঘাত করত, যা ফায়ারিং পিনের মতো কাজ করে গুলিটি ছোড়া হতো। কিস অব ডেথ সহজে বহনযোগ্য হিসেবে নকশা করা হয়েছিল। যাতে কেজিবি এটি পশ্চিম জার্মান সীমান্ত পেরিয়ে শত্রুর ওপর ব্যবহার করতে পারে। কিস অব ডেথের একটি মডেল বর্তমানে ওয়াশিংটন ডিসির ‘ইন্টারন্যাশনাল স্পাই মিউজিয়াম’-এ সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রতিবাদে লিপস্টিক
লিপস্টিক অবলীলায় রূপান্তর হয়েছে প্রতিবাদের জাঁদরেল৷ চিহ্ন হিসেবে। ১৯৬৯ সালের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি Lipstick (Ascending) on catetpillar Tracks নামক ভাস্কর্যটির কথা অনেকেই জানে। ভাস্কর্যটিতে এক বিশাল লাল লিপস্টিককে যুদ্ধের ট্যাংকের ওপর বসানো হয়েছিল, যা পরিগণিত হয় যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদের শক্তিশালী চিহ্ন হিসেবে। আবার ইংরেজিতে লেখা সে প্রবাদ ‘Putting lipstick on a pig’-এর কথা আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই? যা রাজনৈতিক তর্ক এবং সংবাদমাধ্যমে আজও ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এটি খারাপ কিছুকে সাজিয়ে ভালো দেখানোর প্রচেষ্টাকে বোঝায়। সঙ্গে এটির আবেদন সাধারণ জনগণ ও রাজনীতিবিদদের মাঝে তৎকালীন আবহে বহুল ব্যবহার হয়েছে।
আজ এ একবিংশ শতাব্দীর ফলকে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজ প্রতিবিম্ব দেখে সত্যি হতবাক না হয়ে উপায় নেই যে সে সময়ে লিপস্টিকের এ খুদে প্যাকেজিং সৌন্দর্যের ধারকের পরিচয় পেছনে ফেলে কী দারুণভাবে সমাজে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নকে প্রতিফলিত করেছিল! সঙ্গে বৃহত্তর সমাজের প্রতি ছুঁড়ে দিয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা।
তাই একে কেবল সুন্দরের বিকাশ ঘটানোর অনুষঙ্গ বললে মস্ত বড় ভুলই হবে। রঙবেরঙের বাহারি এ মনকাড়া বর্ণের জাদুকর তার বর্ণিল জাদুর আবেশ ছড়িয়েছে নারীর বাহ্যিক হতে আত্মিক মাধুর্য বিকশিত করে নেয়ার যজ্ঞে। কেবল কামনা আর কোমলতা নয় বরং ইতিহাস, বিজ্ঞান, অর্থনীতিসহ যুদ্ধ, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক তর্কেও লিপস্টিক সমুজ্জ্বল এক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক।
সোনিয়া তাসনিম: লেখক





