প্রতিরোধ করতেই দেবতাদের মধ্য থেকে এগিয়ে আসেন মারদুক। যুদ্ধ করে তিনি তিয়ামাতকে পরাজিত করেন। তারপর তৈরি করেন আকাশ ও পৃথিবী। ক্রমে সময়, নক্ষত্র ও মানুষকেও সৃষ্টি করা হয়। এভাবে বিশৃঙ্খলার ভেতর থেকেই গঠিত হয় মহাবিশ্ব। ঠিক এমনটাই বিশ্বাস করত প্রাচীন ব্যাবিলনের মানুষ। শুধু বিশ্বাসেই আটকে ছিল, এমন না। তিয়ামাতের ওপর মারদুকের বিজয়কে উদযাপন করতে তারা পালন করত আকিতু উৎসব। ১২ দিন ধরে চলা এ উদযাপন বিশ্বাসীদের যেন ফিরিয়ে নিত পৃথিবী সৃষ্টির শুরুতে। কিংবা সেই মুহূর্তকেই বর্তমানে ফিরিয়ে আনত, যখন প্রথমবারের মতো বিশৃঙ্খলা থেকে পৃথিবী জন্ম নিল। ব্যাবিলনীয় চোখে এটাই ছিল নববর্ষ উদযাপনের আধ্যাত্মিক প্রেরণা। চমৎকৃত হওয়ার ব্যাপার হলো পৃথিবীর প্রতিটা প্রাচীন সংস্কৃতিতেই নতুন বছরকে ঘিরে কাছাকাছি পুরাণ প্রচলিত।
একজন বিশ্বাসীর কাছে সবসময় সমান নয়। একদিকে রয়েছে পবিত্র সময়; অন্যদিকে জাগতিক। ধর্মীয় ইতিহাস ও দর্শনের অন্যতম ভাষ্যকার মির্চা এলিয়াদ তার বিখ্যাত বই The Sacred and The profane বইয়ে এ বিষয়ে আলো ফেলেছেন। যাহোক, বিশ্বাসীরা নির্দিষ্ট কিছু আচারের মাধ্যমে জাগতিক সময় থেকে পবিত্র সময়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ রিচুয়ালগুলো এক ধরনের পোর্টাল হিসেবে কাজ করে তাদের জন্য। আর কোনো ধর্মীয় উৎসব একটি পবিত্র ঘটনার বাস্তবায়নকে প্রতিনিধিত্ব করে, যা পৌরাণিক অতীতে ঘটেছিল। ফলে বিশ্বাসীরা মূলত কর্মের মধ্য দিয়ে পবিত্র বলে গণ্য অতীতের কোনো কাজকেই অনুকরণ করেন। তাদের অভিধানে মহাবিশ্ব একটি জীবন্ত সত্তা। ফলে একে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়। তার মানে দুনিয়া জন্ম নেয়, বিকশিত হয় এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এখানেই নতুন বছরের অর্থবাচকতা। কারণ মহাবিশ্ব প্রতি বছর পুনর্জন্ম লাভ করে। নববর্ষ হলো পুনঃসৃষ্টির দিন। সৃষ্টিতত্ত্বের একটি পুনর্বাস্তবায়ন। এর অর্থ হলো সময়কে তার সূচনাবিন্দু থেকে আবার শুরু করা। অর্থাৎ সৃষ্টির মুহূর্তে বিদ্যমান আদিম সময়, সেই বিশুদ্ধ সময়ের পুনরুদ্ধার। এ কারণেই নববর্ষ হলো শুদ্ধীকরণের উপলক্ষ। পাপ, অসুর বা অন্তত কোনো প্রাণীকে বলি দেয়ার উপলক্ষ। কারণ এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ে সমাপ্তি এবং আরেকটির সূচনা নয়। এটি বিগত বছর এবং বিগত সময়কে বিলুপ্ত করারও বিষয়। প্রকৃতপক্ষে, আনুষ্ঠানিক শুদ্ধীকরণের অর্থ এটাই। এর মধ্য দিয়ে ব্যক্তি এবং সমগ্র সম্প্রদায়ের পাপ ও দোষগুলো বাতিল হয়ে যায়, আগুনে ভস্মীভূত হয়।
প্রাচীন সংস্কৃতির ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে এ প্রতীকবাদ নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। ধার্মিক মানুষের জন্য প্রতিটি সৃষ্টি, প্রতিটি অস্তিত্ব সময়ের মধ্যে শুরু হয়। এ কারণেই পুরাণ এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যাবিলনে আকিতু অনুষ্ঠান উদযাপন করা হতো বছরের শেষ দিনগুলোয় এবং নতুন বছরের প্রথম দিনগুলোয়। এদিন সৃষ্টির কবিতা ও এনুমা এলিশ পাঠ করা হতো। এ ধরনের আনুষ্ঠানিকতা হিট্টাইট এবং মিসরীয়দের মধ্যে দেখা যায়। নীল নদের বার্ষিক প্লাবনকে মিসরীয়রা শুধু কৃষিজ উৎপাদনের উৎস হিসেবে দেখেনি; দেখেছে মহাজাগতিক পুনর্জন্ম হিসেবে। ওসিরিসের পুরাণে দেবতা নিহত হয়ে আবার জীবিত হন। এটা এক প্রাকৃতিক চক্র। সেখানে নদীর পানি ফিরে আসা মানে ছিল বিশ্বের নতুন জীবন প্রাপ্তি। নববর্ষের আচারগুলোতে এ পুনর্জন্মকে উদযাপন করা হতো। মানুষ বিশ্বাস করত যে তারা এ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। হিট্টাইট, কানানীয় এবং অন্যান্য প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের সংস্কৃতিতেও একই প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া যায়। দেবতা ও দানবের যুদ্ধ, রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মিথের আবৃত্তি। এসব উদাহরণ মিলিয়ে নববর্ষকে দেখা যায় মহাবিশ্বের সামগ্রিক পুনর্জন্ম আকারে; যেখানে সবকিছু একসঙ্গে নতুনভাবে জন্ম লাভ করে। ফলে পুরাণের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয় আচার। ভারতীয় ঐতিহ্যে অগ্নিহোত্র বা বৃহত্তর যজ্ঞগুলোতে আগুন প্রজ্বালন মানে শুধু দেবতার উদ্দেশ্যে আহুতি দেয়া নয়; এটি সেই আদিম আগুনের পুনরাবৃত্তি, যার মাধ্যমে বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল। ঋতুচক্রের পরিবর্তনের সঙ্গে এ যজ্ঞগুলো আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ তখন সময় নিজেই পুনর্জন্ম লাভ করছে।

পৌরাণিক বিশৃঙ্খলা তিয়ামাত ও দেবতা মারদুক সূত্র: দ্য তোরাহ ডট কম
নববর্ষের আচার শুধু প্রাচীন বা তথাকথিত বহু-ঈশ্বরবাদী ধর্মেই সীমাবদ্ধ নয়; একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোতেও এর প্রভাব রয়েছে। ইহুদি ধর্মে নববর্ষ (রোশ হাশানাহ) এবং তার পরবর্তী ইয়ম কিপুরে পাপস্বীকার ও শুদ্ধীকরণের যে প্রক্রিয়া দেখা যায়, সেটিকে সময়ের পুনর্নবায়নের একটি রূপ হিসেবে পাঠ করা যায়। এখানে যদিও সরাসরি কসমোগনি পুনরাভিনয় নেই, তবু মূল ধারণা একই। অতীতের পাপ মুছে ফেলে নতুন অবস্থায় ফিরে যাওয়া। রোমান স্যাটারনালিয়া উৎসবেও একই কাঠামো দেখা যায়। সেখানে সামাজিক নিয়ম উল্টে যায়। দাসরা প্রভুর মতো আচরণ করে। শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। এটি যেন সেই আদিম অবস্থার প্রতীক, যেখানে এখনো কোনো সামাজিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ বিশৃঙ্খলার পরই আসে পুনঃপ্রতিষ্ঠা। প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজে নববর্ষ বা ঋতুচক্রের সূচনায় আগুন জ্বালানো, পুতুল পোড়ানো বা প্রতীকীভাবে শীতকে বিদায় জানানোর আচার দেখা যায়। এগুলো সবই পুরনো সময়কে ধ্বংস করার এবং নতুন সময়কে আহ্বান করার উপায়। বাংলার নববর্ষের কথাই ধরা যাক। এক্ষেত্রে সরাসরি কোনো সৃষ্টির মিথ পুনরাবৃত্তির ব্যাপার না থাকলেও ভেতরে সময়ের পুনর্নবায়ন ও অতীতের অবসানের সুস্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। পুরনো বছরের শেষে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, হিসাব-নিকাশ মিটিয়ে ফেলা, হালখাতার মাধ্যমে নতুন বাণিজ্যিক সূচনা অতীত সময়কে প্রতীকীভাবে বাতিল করার ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে নতুন পোশাক, উৎসবমুখর সমাবেশ এবং সামাজিক পুনর্মিলন একটি নতুন সূচনার আবহ তৈরি করে, সময়ের পুনর্নবায়ন ধারণার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
নওরোজ তথা পারস্যের নববর্ষকে এ কাঠামোতে রেখে পাঠ করা যায়। নওরোজে সেই দিনটিকে স্মরণ করা হয়, যেদিন বিশ্ব ও মানুষের সৃষ্টি হয়েছিল। আল বিরুনির মতে, নওরোজের দিনেই সৃষ্টির নবায়ন সম্পন্ন হয়েছিল। প্রাচীন পাহলভি পুস্তকে বলা হয়েছে, ‘ফারওয়ারদিন মাসে তথা বছরের প্রথম মাসে আহুরা মাজদা সৃষ্টির নবায়ন করেন। পৃথিবী সুরক্ষিত হয় দানবের হাত থেকে।’ কাজভিনি বলেছেন, ‘নওরোজের দিন খোদা মৃতদের মধ্যে আত্মা ফেরত দেন। তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়। ফলে এদিন পানি ঢালাও একটা আচারের অংশ হিসেবে প্রবেশ করেছে। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, প্রতিটি বিশ্বাসে সৃষ্টির সঙ্গে পানির সম্পর্ক খুবই গভীর। সেটা ব্যাবিলনীয় পুরাণ থেকে শুরু করে হিন্দু পুরাণ পর্যন্ত। পানি সৃষ্টিশীলতাকে প্রকাশ করে। ইরান ও ইরাকের মান্দাইনরাও নববর্ষকে উদযাপন করে এভাবে। তাতাররা নতুন বছরের প্রথম দিন গাছের বীজ বপন করে সৃষ্টির শুরুকে স্মরণ করে। যেন সৃষ্টির আদিতম দিনকেই স্মরণ করা হয়।
নওরোজ পারস্যের পৌরাণিক কাহিনীতে গভীরভাবে প্রোথিত। নওরোজ মূলত অন্ধকারের ওপর আলোর বিজয়। অশুভের ওপর শুভের বিজয়। শীতের ওপর বসন্তের বিজয়। পারসিক মহাকাব্য শাহনামায় মহাকবি ফেরদৌসী বর্ণনা করেছেন, পৌরাণিক রাজা জামশেদ দুষ্ট রাক্ষসদের পরাজিত করে তাদের ধনসম্পদ ও রত্নরাজি দখল করে নেন। দাস বানিয়ে ফেলেন তাদের। তার ও রাক্ষসদের যুদ্ধের পর পৃথিবী বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। গাছপালা মরে গিয়েছিল। ঝরে গিয়েছিল সমস্ত পাতা। পৃথিবী পরিণত হয়েছিল এক অন্ধকার ও প্রাণহীন স্থানে। স্বর্গে পৌঁছার জন্য জামশেদ রাক্ষসদের রত্ন দিয়ে একটি সিংহাসন তৈরি করার আদেশ দেন। সিংহাসনটি তৈরি হয়ে গেলে তিনি তাতে বসেন। রাক্ষসদের তাকে আকাশে অনেক উঁচুতে তুলে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দেন। তিনি যখন তার সিংহাসনে বসেছিলেন, তখন সূর্যের রশ্মি তাঁর সিংহাসনের রত্নগুলোতে পড়ল। আকাশ পৃথিবীর সমস্ত রঙে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। জামশেদের থেকে বিচ্ছুরিত রশ্মি পুনরুজ্জীবিত করে তুলল গাছপালাকে। পৃথিবীতে জীবন বিকশিত হতে শুরু করল। লোকেরা জামশেদকে দেখে বিস্মিত হলো এবং তাকে আরো বেশি ধনসম্পদ ও রত্ন দিয়ে আপ্লুত করল। এ উৎসবের দিনটির নাম দেয়া হয়েছিল নওরোজ এবং এটি বছরের প্রথম দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। পরে জামশেদ তার জনগণকে এক কঠোর শীত থেকে রক্ষা করেছিলেন, যা পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকে মেরে ফেলত। আখ্যানে আর্যদের নববসতি স্থাপনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সে সময় বসতিগুলো ফসলের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল ছিল। ফলস্বরূপ ঋতুচক্রের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাই বসন্ত বিষুব প্রাচীন ইরানিদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। অন্যদিকে আখ্যান যেন ব্যাবিলনীয় পুরাণে বর্ণিত তিয়ামাতের ওপর মারদুকের বিজয়কে স্মরণ করিয়ে দেয়।
সূর্যকেন্দ্রিক বর্ষগণনার ক্ষেত্রে নওরোজ আরো বেশি প্রায়োগিক হয়ে উঠে। কারণ নওরোজের দিন সূর্যের আলো নিরক্ষরেখার ওপর লম্বভাবে এসে পড়ে। দিন-রাত্রির দৈর্ঘ্য সমান হয়। প্রাচীনকাল থেকেই ইরানীয় পরিবারগুলো দিনটিকে উদযাপন করে। বিশেষ করে মিথ্রাসবাদ ও জরাথুস্ত্রবাদ তার অন্যতম উদাহরণ। মিথ্রাসবাদের অধিকাংশ উৎসবের সঙ্গে সূর্যের সংযোগ ছিল। প্রাচীন ইরানের সূর্য দেবতা মিথ্রা। অন্যদিকে জরাথুস্ত্রবাদে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবের একটি হলো নওরোজ। দিনটিকে জোরেশোরেই উদযাপন করা হয়। দ্রুজের (দুষ্ট) ওপর আশার (কল্যাণ) বিজয়ী হওয়াকে প্রতিবিম্বিত করে এদিন। আশা জরাথুস্ত্রবাদের কেন্দ্রীয় ধারণাগুলোর একটি। এটি ন্যায়, সত্য ও প্রাকৃতিক আইনের প্রতিনিধিত্ব করে; অনেকটা বৈদিক ঋত ধারণার মতো।
নওরোজ বাহাই ধর্মাবলম্বীদের জন্য পবিত্র দিনের মধ্যে একটি। বাহাই ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন। বাহাই বর্ষপঞ্জি ১৯টি মাস নিয়ে গঠিত, প্রতিটি মাসে ১৯ দিন থাকে। প্রতিটি মাস ও দিনের নামকরণ করা হয়েছে খোদার একটি গুণের নামে। প্রথম দিন এবং প্রথম মাসকে বাহা গুণ দেয়া হয়। বাহা আরবি শব্দ যার অর্থ গৌরবময়। বাহাই ধর্ম অনুসারে, নওরোজ খোদার নামের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং একটি উৎসবের দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। দিনটি প্রতিটি ধর্মীয় যুগে সময়ের নবায়নের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। নওরোজের তাৎপর্যকে বসন্ত এবং এর দ্বারা আনীত নতুন জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করা হয়। অন্য সব পবিত্র দিনের মতো, নওরোজ পালনের জন্যও নির্দিষ্ট নিয়ম খুব কমই আছে। সারা বিশ্বের বাহাইরা স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী এটিকে একটি উৎসবের দিন হিসেবে উদযাপন করে। শিয়া সাহিত্যে নওরোজ দিবস সম্পর্কে উল্লেখ আছে। বলা হয়, গাদিরের দিন মূলত নওরোজ ছিল। মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপ ও দূরপ্রাচ্য পর্যন্ত নববর্ষের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মতাত্ত্বিক ও পৌরাণিক আখ্যান।

পারসিক পুরাণের রাজা জামশেদ ছবি: নেম থ্রু দ্য এইজেস
নববর্ষের এ পুনর্নবীকরণ ধারণাটি কেবল পৌরাণিক বা আচারিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের অস্তিত্বগত অভিজ্ঞতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। মানুষ স্বভাবতই সময়ের ভার বহন করে। স্মৃতি, ব্যর্থতা, পাপ ও অনুশোচনা তার জীবনকে ক্রমাগত ঘন করে তোলে। এ সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাকে এমন এক বিন্দুর সন্ধান দেয়, যেখানে সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করা সম্ভব। নববর্ষ সেই প্রতীকী বিন্দু। এখানে নতুন মানে অস্তিত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষ নিজেকে সেই আদিম অবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করে, যেখানে এখনো কোনো দাগ পড়েনি, কোনো ইতিহাস জমাট বাঁধেনি। ফলে নববর্ষ একটি সাংস্কৃতিক ঘটনাকে অতিক্রম করে এক ধরনের নৃতাত্ত্বিক ও দার্শনিক তাৎপর্য ধারণ করে। এটি মানুষের সেই গভীর আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে সে সময়ের ধারাবাহিকতা থেকে সাময়িক মুক্তি চায় এবং এক চিরন্তন বর্তমানের অভিজ্ঞতা লাভ করতে চায়। এ অর্থে নববর্ষ কেবল উৎসব নয়; নিজের অস্তিত্বকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করার একটি সুযোগ।
পৌরাণিক আখ্যান, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক আচার মিলিয়ে নওরোজ এমন একটি মুহূর্ত নির্মাণ করে, যেখানে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, স্থবিরতা থেকে প্রাণের দিকে এবং বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলার দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি সামষ্টিক অভিজ্ঞতা সৃষ্টি হয়। নওরোজের মতো প্রতিটি নববর্ষেই প্রকৃতির পুনর্জন্ম ঘটে। গাছের নতুন পাতা, ফুলের প্রস্ফুটন পরিণত হয় পৃথিবীর আদি সৃষ্টির দৃশ্যমান পুনরাবৃত্তিতে। অর্থাৎ প্রকৃতি নিজেই সেই আদিম সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে প্রতি বছর আবার জীবন্ত করে তোলে। মানুষ আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ পুনর্নবীকরণের অংশীদার হয় মাত্র। ফলে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে গড়ে ওঠে সমান্তরাল সম্পর্ক। উভয়ই একই সঙ্গে নবায়িত হয়, একই ছন্দে লাভ করে পুনর্জীবন।
আহমেদ দীন রুমি: রিসার্চ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল








