সে সময় চা-বাগান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ইউরোপীয় ব্যবস্থাপক বা মালিকদের চা ‘‌প্লান্টার’ বা ‘‌চা-কর’ বলা হতো। তৎকালীন সিলেট ও আসাম অঞ্চলে ঔপনিবেশিক আধিপত্যের প্রতীক ছিলেন এ চা-কররা। এদের পরিচিতি আছে ‘বাগান ব্যবস্থাপক’ কিংবা ‘‌সাহেব’ নামেও। আবার সাহিত্যে তারা চা-কর নামেও খ্যাত হয়েছেন। টি প্লান্টার বা চা-করদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত আসাম ও সিলেটে রেলপথের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। তৎকালীন সময়ে উৎপাদিত চা দ্রুত সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর জন্য এ রেলপথের বিশেষ প্রয়োজনীতা দেখা দেয়।

দিনাক সোহানী কবির তার ‘‌পূর্ববাংলার রেলওয়ের ইতিহাস ১৮৬২-১৯৪৭’ গ্রন্থে জানাচ্ছেন—

সে সময় সিলেট থেকে কলকাতা পৌঁছাতে সময় লাগত প্রায় ১৩ দিন। কর্তৃপক্ষ উপলব্ধি করল যে, যদি এ অঞ্চলে রেললাইন স্থাপন করা যায়, তাহলে ২৪ ঘণ্টায় সিলেট থেকে কলকাতা যাওয়া যাবে। তাছাড়া সিলেট এবং আসাম অঞ্চলে যে বিপুল পরিমাণ চা উৎপাদন হয় তাও অতি সহজে বাজারজাত করা যাবে। চা মূলত কলকাতা বন্দর দিয়ে বিদেশে রপ্তানি হত। চা-বাগানগুলি থেকে সহজে ও কম সময়ে রপ্তানির তাগিদে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের চিন্তাভাবনা আরম্ভ করে সরকার।

প্রাক রেল যুগে এ অঞ্চলে কোনো উন্নত ধরনের রাস্তাঘাটের অস্তিত্ব ছিল না। নৌযান ও গরুর গাড়ি ছাড়া যাতায়াতের আর তেমন মাধ্যম ছিল না।

এ অঞ্চলে রেললাইন নির্মাণের সরকারি উদ্যোগের কথা জানা যায় তৎকালীন ডেপুটি কালেক্টর ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নবীন চন্দ্রের আত্মজীবনী থেকে। তিনি রেলপূর্ব যাতায়াত ব্যবস্থার বর্ণনায় উল্লেখ করেন—

গোযান এ অঞ্চলে একমাত্র চলার বাহন মাত্র ছিল। তাও খুব কষ্টকরভাবে চলা হত। তাই তিনি নিজের জন্য কবি কল্পনা খাটাইয়া একখানি চাটাইয়ের পাল্কী প্রস্তুত করেন।"নবীনবাবুর পালকির বর্ণনা ছিল এরূপ,"চারিদিকে চাটাইয়ের বেড়া, তাহাতে গবাক্ষ ও দ্বার এবং গবাক্ষে নীলবর্ণের পর্দা। জলপথেও চলিবার একমাত্র উপায় কোঁদা; আমি বলিতাম ‘‌কুন্দননন্দিনী’। একটিমাত্র বৃক্ষ কুঁদিয়া এই নৌকা প্রস্তুত। তাহার উপর বাঁশের ‘‌ছপ্পর’। উহাতে চলা একপ্রকার সিন্দুকের মধ্যে চলা।"

তার এ কল্পনাসৃষ্ট বাহন দুটি লোকের এত দৃষ্টি আকর্ষণ করে যে নবীনবাবুর ভাষায়,"আমার দুই বংশ নির্ম্মিত কাব্যের দ্বারা আমি এ অঞ্চলে অমরতা লাভ করিয়াছিলাম।"ডিআর লায়েল চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার হয়ে আসলে নবীনবাবু এই রেললাইন নির্মাণের জন্য তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কেউ কেউ লায়েল ও নবীনবাবুর এ প্রচেষ্টাকে হাসিঠাট্টা করে বলতে থাকেন, লায়েল সাহেব ও নবীনবাবু রেলওয়ে এনে ফেলবেন।

ব্রিটিশ বণিকরা চা-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অবশেষে ১৮৯২ সালে ‘‌আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে’ কোম্পানি গঠিত হয়।

আসাম থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের ফলে চা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার লাভ করে। রেলপথগুলো নির্মাণ করা হয় চা-বাগানের পাশ দিয়েই। চা-বাগানের আশপাশে গড়ে ওঠে শ্রীমঙ্গল, শমসের নগর, লাংগাই, চারগোলার মতো উল্লেখযোগ্য রেলস্টেশন।

রেলপথের পাশাপাশি চা-বাগানের অভ্যন্তরে কারখানার কাঁচামাল ও প্রক্রিয়াজাত চা পাতা বহনের জন্য প্লান্টাররা নিজস্ব উদ্যোগে ছোট ‘‌ট্রলি রোড’ বা ন্যারোগেজ রেললাইন তৈরি করতেন। এগুলো সরাসরি মূল রেলওয়ে স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত থাকত।

চা-শিল্পের বিকাশে সিলেট অঞ্চলে লাতুর রুটের অবদান ছিল অনন্য। কুলাউড়া, জুড়ী, দক্ষিণভাগ, কাঁঠালতলি, বড়লেখা, মুড়াউল ও শাহবাজপুর (লাতু) এ মোট সাতটি স্টেশন নিয়ে গড়ে উঠেছিল লাতুর রুট।

সিলেট অঞ্চলের চা-বাণিজ্যকে আরো গতিশীল করতে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের কুলাউড়া জংশন থেকে একটি লাইন দক্ষিণ-পশ্চিম দিক দিয়ে সিলেট শহরে প্রবেশ করে। প্রথমে লাইনটি ১৯১২ সালের ১৬ এপ্রিল কুলাউড়া থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ ঘাট পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়। পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে অর্থাৎ ১৯১৬ সালের মধ্যে সিলেট সদরসহ জেলার বিরাট অংশে রেলগাড়ি চলাচল শুরু হয়।

সময়ের আবর্তে এ আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কেবল স্মৃতি হয়েই আছে। শতবর্ষী ফেঞ্চুগঞ্জ রেলস্টেশনটিও যেন সেই সময়েরই সাক্ষ্য দিচ্ছে। পূর্ববঙ্গ রেলপথের প্রচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত ‘‌বাংলায় ভ্রমণ’ নামক গ্রন্থে ফেঞ্চুগঞ্জকে একটি ‘‌প্রসিদ্ধ কারবারের স্থান’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সিলেট জেলার প্রাচীন রেলস্টেশনটি এখন প্রয়োজন ফুরিয়েছে। নেই টিকিট কাটার তাড়া কিংবা ভিড়ভাট্টা, নেই হকারের হাঁকডাক। প্রিয়জনকে বিদায় জানানোর ক্ষণ আর ফিরে আসার অপেক্ষার মুহূর্তগুলোও হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে।

একসময় যেখানে ট্রেনের হুইসেল, হকারদের হাঁকডাক আর যাত্রীদের পদচারণায় সবসময় মুখরিত থাকত, আজ তার অনেকগুলোই শান্ত আর পরিত্যক্ত। জং ধরা সিগন্যাল পোস্ট আর অতিকায় শিরিষের ছায়ায় সেই পুরনো স্মৃতির গল্পরা আজও ফিসফিস করে। এসব গান-গল্পে জুড়ে আছেন টি প্লান্টার সাহেবরা।

তারই সন্ধান মেলে মুকুন্দদাস ভট্টাচার্যের ‘‌বরাক উপত্যকার লোকনৃত্য’ গ্রন্থে। জানা যায় এ অঞ্চলের প্রাচীন এক চা-বাগান পালৈরবন্দ, ওই বাগানের মালিক ছিলেন এক ইংরেজ সাহেব, যার সঙ্গে ভারতের বড় লাটের আত্মীয়তা ছিল। সেই সাহেব একবার অ্যারোপ্লেন চড়ে শিলচরের মাটিতে অবতরণ করেছিলেন। অ্যারোপ্লেনটি পরে আর ফিরে যেতে পারেনি, অকেজো হয়ে পড়েছিল। বহু মানুষ এটি দেখে যেতেন আর গ্রামে ফিরে নানা গান রচনা করতেন আর কল্পকাহিনী বলতেন। তেমনই এক গান—

‘‌কুবাই তনে আইল পাখি/ কুবাই যাইবঅরে চলিয়া/ সাদা সাহেব নামছে দেখ/ ইংরাজি মাতিয়া, ইংরাজি মাতিয়া।’

রেলগাড়ি দেখা নিয়ে একটি গানের কথা ছিল এমন—

কী আচানক দেইখ্যা আইলাম সই রেলর সড়ক দিয়া/ (এলো) দেইখ্যা আইলাম রেলঅর কারবার নয়নঅ ভরিয়া/ মাটির উপর পাত বসাইছেগো পাথর লোহা দিয়া/ তার উপরে চলে গো গাড়ি হুঙ্কার ধূমা ছাড়িয়া।

শিশির কুমার নাথ: ঐতিহ্য-সংগ্রাহক