যদিও এ আবিষ্কারগুলো গুরুত্বপূর্ণ নানা তথ্য সরবরাহ করেছে, তবু মানব ইতিহাসের সময়ের সঙ্গে এ তথ্যগুলোর নির্ভুল সমন্বয় করা নানা কারণেই দুরূহ ছিল। বিভিন্ন স্থানে পাওয়া জীবাশ্ম এবং বর্তমানের মানুষের ডিএনএর (DNA, ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) সিকোয়েন্স ইতিহাসের সময়ের সঙ্গে মানুষের পরিবর্তন ও পরিব্রাজনের তথ্য নির্ভুলভাবে আমাদের কাছে উন্মোচন করেছে।
ডিএনএ নামটির সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। প্রাণী, উদ্ভিদ ও অন্যান্য জীব এক বা একাধিক কোষ দিয়ে তৈরি, যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ডিএনএ। ডিএনএর সিকোয়েন্স (তথ্যের সমাহার) কেবল কোষের সব কাজের নির্দেশিকা বা ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়াল হিসেবেই কাজ করে না; এটা হাজার হাজার বছরের বিবর্তনের রেকর্ডও বহন করে। কিন্তু কীভাবে?
ডিএনএ কীভাবে ইতিহাসকে বহন করে তা বোঝার জন্য জেনেটিক মিউটেশন (ডিএনএতে স্থায়ী পরিবর্তন) সম্পর্কে বুঝতে হবে। প্রতিবার যখন মানুষের দেহের একটি কোষ নতুন দুটি কোষ তৈরির জন্য বিভক্ত হয়, তখন এটি প্রথমে তার তিন বিলিয়নের বেশি অক্ষরের নিউক্লিওটাইদের (ডিএনএর গাঠনিক একক) নির্দেশিকা বা ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়ালটির কপি তৈরি করে। ডিএনএর কপি তৈরির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দক্ষ হলেও হঠাৎ ডিএনএর এক বা একাধিক জায়গায় নানা কারণে কপি করার সময় ভুল হয়ে যায়, যাকে বলে মিউটেশন। এ পরিবর্তন যদি প্রজনন কোষে হয়, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এসব মিউটেশন ডিএনএর বিভিন্ন জায়গায় জমা হতে থাকে এবং হাজার হাজার বছরের একটি স্থায়ী ঐতিহাসিক রেকর্ড তৈরি করে। প্রতিটি মিউটেশনের নিজ নিজ উপস্থিতি এবং অন্য মিউটেশনগুলোর সঙ্গে তাদের নির্দিষ্ট সমাহার দেখে বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নির্ভুলভাবে মানব সময়ের সঙ্গে ইতিহাসের সমন্বয় করতে পারেন। এ মিউটেশনগুলো আমাদের পূর্বপুরুষরা কোথায় ভ্রমণ করেছিলেন, কখন স্থানান্তর হয়েছিলেন এবং পথে অন্য কোনো গোষ্ঠী কিংবা সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাদের আন্তঃসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল কিনা, কার সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছিল এসবের একটি প্রাচীন, কালানুক্রমিক রেকর্ড ধারণ করে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বের দুটি ভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী দুজন মানুষ যদি একই পরিবর্তন তাদের ডিএনএতে বহন করে, তাহলে এটি প্রমাণ করে যে তারা বহু বছর আগে একই পূর্বপুরুষ হতে উদ্ভূত হয়েছে। দুই বা তার অধিক নমুনার ডিএনএতে কী পরিমাণে একই এবং ভিন্ন ধরনের পরিবর্তন জমা হয়েছে, বিজ্ঞানীরা তা হিসাব করে নমুনাগুলোর মধ্যকার জেনেটিক সম্পর্ক বের করতে পারেন।
জীবাশ্ম থেকে প্রাপ্ত ডিএনএ এবং বিভিন্ন স্থানের বর্তমান জনগোষ্ঠীর ডিএনএ বিশ্লেষণ এ তথ্য প্রদান করে যে বর্তমান পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ একটি একক পূর্বপুরুষের থেকে উদ্ভূত, যা প্রায় দুই লাখ বছর আগে আফ্রিকায় প্রথমে অবস্থান করেছিল। বিশ্বব্যাপী নানা নমুনার ডিএনএতে প্রাপ্ত সিকোয়েন্স অনুযায়ী আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর পৃথিবীতে সর্বোচ্চ জিনগত বৈচিত্র্য রয়েছে। ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকায় বসবাসকারী জনসংখ্যার বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এটি নির্দেশ করে যে প্রায় ৬০-৭০ হাজার বছর আগে অল্পসংখ্যক মানুষ আফ্রিকার মূল জনগোষ্ঠী থেকে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার মিশনে বের হয়েছিল এবং ওই সময়ে মূল জনগোষ্ঠীতে উদ্ভূত মিউটেশন বা পরিবর্তনগুলোর কেবল একটি সাবসেট তারা বহন করেছিল। পরবর্তী সময়ে তাদের একটি অংশ ইউরোপের পথে ছড়িয়ে পড়ে, অন্যটি এশিয়াজুড়ে প্রসারিত হয়। পরে একই পথে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর পরিব্রাজন ও আঞ্চলিক জনসংখ্যার মধ্যে বসতি স্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গে কিছু ভৌগোলিক অঞ্চল বিশাল সাংস্কৃতিক এবং জিনগত মিলনমেলার কেন্দ্রে পরিণত হয়। আধুনিক বাংলাদেশী জিনোম (জীব কোষের সব ডিএনএকে একত্রে জিনোম বলে) এ সংমিশ্রণের একটি প্রধান উদাহরণ, যা দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও পূর্ব/দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পূর্বপুরুষদের সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে মানুষের অভিবাসন কেবল তাদের ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক পরিবর্তন করেনি; এটি তাদের ন্যাচারাল সিলেকশনের মাধ্যমে শারীরিকভাবে বিভিন্ন জলবায়ু, খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য করেছে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের অনন্য পরিবেশে বিশাল নদী, মৌসুমি বন্যা ও উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব দিয়ে গঠিত বাংলাদেশী জিনোম সংক্রামক রোগ এবং অনাহারের তীব্র বিবর্তনীয় চাপের শিকার হয়েছিল। পুনরাবৃত্ত ফসলের ব্যর্থতা এবং বিপর্যয়কর দুর্ভিক্ষ সম্ভবত একটি তুলনামূলক "মিতব্যয়ী জিনোটাইপের (ডিএনএর একটি নির্দিষ্ট ধরন) পক্ষে ছিল। এ ধরনের জিন বৈচিত্র্যযুক্ত ব্যক্তিরা যারা তাদের দেহকে ধীরে ধীরে রক্ত থেকে গ্লুকোজ/শর্করা কোষে স্থানান্তর করতে এবং অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে চর্বি (জীবদেহের দীর্ঘকালীন শক্তির উৎস) সঞ্চয় করতে পারে, তাদের পক্ষে অনাহারে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কিন্তু বর্তমানে খাদ্যের অধিকতর প্রাপ্যতা ও খাদ্যাভ্যাসে কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবারের আধিক্য এ জাতিভিত্তিক জিনগত দক্ষতার সঙ্গে মারাত্মক মেটাবলিক বিপর্যয় তৈরি করছে। এ অঞ্চলে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে এটিকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। হৃৎপিণ্ডের রক্তনালিতে চর্বি জমে ব্লক তৈরির সঙ্গেও এর সংশ্লিষ্টতা থাকা অমূলক নয়। বিশ্বব্যাপী যেখানে প্রথম হার্ট অ্যাটাক হওয়ার গড় বয়স ৬৫+ বছর, বাংলাদেশে প্রথম হার্ট অ্যাটাকের গড় বয়স প্রায় ৫২ বছর। বাংলাদেশীদের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার গড় বয়স পশ্চিমা দেশগুলোর গড়ের চেয়ে ৬-১০ বছর কম। তাই বাংলাদেশীদের জন্য এ উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ঝুঁকিগুলো মোকাবেলা করার জন্য তুলনামূলক কম বয়সেই রোগনির্ণয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা উচিত।
ডিএনএতে বিদ্যমান তথ্য বাংলাদেশীদের সঙ্গে অন্যান্য ভৌগোলিক জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ককে যেমন প্রমাণ করে, তেমনি আমাদের স্বকীয়তার প্রমাণও বহন করে। আরো গবেষণা বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর ডিএনএতে বিদ্যমান অন্যান্য তথ্য উন্মোচন করবে।
ড. আবু আশফাকুর সজীব: অধ্যাপক, জিন প্রকৌশল ও জীব প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





