কিন্তু বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব নৃগোষ্ঠীই কমবেশি সংকর। তদুপরি ডিএনএ বিশ্লেষণ করে আজ বিজ্ঞানীরা আমাদের জানাচ্ছেন, দুনিয়ার সব মানুষের ডিএনএ ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ প্রায় একই রকম। তবে নৃগোষ্ঠীর ইতিহাস বড়ই ‘কুৎসিত’ এবং ইউরোপকেন্দ্রিক। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আঠারো শতকের ইউরোপে নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল ‘কাল্পনিক সম্প্রদায়’ জাতীয়তাবাদ, যার ওপর ভর করে জাতিরাষ্ট্রের জয়জয়কার শুরুও হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য এর আগে যেমন ষোলো শতকের ইউরোপে নৃগোষ্ঠী বা জাতি ধারণাটি বংশ (বায়োলজিক্যাল) বোঝানোর একটি প্রধান পরিভাষা ছিল। কলম্বাস ও ভাস্কো দা গামার হাত ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শেতাঙ্গ অভিযাত্রী যখন বৈশ্বিক অন্বেষণে এবং উপনিবেশ ও সাম্রাজ্য বিস্তারে ঝাঁপিয়ে পড়ে; তখন তারা সম্মিলিতভাবে ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ডে তথা প্রাচ্যবাদের ঝকঝকে পাতায় নৃগোষ্ঠীর ধারণাকে শ্রেণীবিন্যাসের একটি কঠোর ব্যবস্থায় রূপান্তর করে। সুইডিশ পণ্ডিত কার্ল লিনিয়াসের বৈজ্ঞানিক বর্ণবাদ (১৭৩৫) এবং ফরাসি বিজ্ঞানী জর্জেস কুভিয়ের মানব শ্রেণীবিন্যাস তত্ত্ব (১৭৯৭-৯৮) ইউরোপের বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর (পর্তুগিজ, স্প্যানিশ, ইংরেজ কিংবা ফরাসি) মধ্যে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের ধারণারও জন্ম দেয়। বলা বাহুল্য, এ নৃতাত্ত্বিক বর্ণবাদকে কাজে লাগানো হয় আন্তঃমহাদেশীয় দাস ব্যবসা, উপনিবেশ ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার কাজে। ব্রিটিশরাজ তথা দক্ষিণ এশিয়ার ইংরেজ উপনিবেশে স্যার হার্বার্ট হোপ রিজলি সর্বপ্রথম নৃপরিমাপবিদ্যাকে নেটিভ বা স্থানীয় জনগণের ওপর প্রয়োগ করেন।

বাঙালি জনমানুষ সৃষ্টিতে কোন নৃগোষ্ঠী কেমন এবং কী ধরনের ভূমিকা রেখেছে তার আলোচনায় প্রথমেই যে নামটি আসবে তিনি হলেন প্রাচ্যবিদ স্যার হার্বার্ট রিজলি। তিনি সর্বপ্রথম দুটি ‘অনুকম্প’ বা অনুমান বিবেচনায় নিয়ে নৃপরিমাপ পদ্ধতি দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশে প্রয়োগ করেন। রিজলির প্রথম অনুকম্পটি ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার ধারণা। অর্থাৎ রিজলির মতে, ভৌগোলিকভাবে উপমহাদেশটি অবশিষ্ট দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন এবং এর অভ্যন্তরেও বিভিন্ন অঞ্চল, অরণ্য, পর্বত, মরুভূমি ও নদ-নদী প্রভৃতি প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক দ্বারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন। ফলে এ অঞ্চলের জনগণ কেবল বহির্বিশ্ব থেকে নয়; অভ্যন্তরীণভাবেও পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। দ্বিতীয়ত, কেবল ভৌগোলিকভাবে নয়; এখানকার জনজীবনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা প্রবলভাবে উপস্থিত ছিল। যেমন জাতিভেদ, ধর্ম ও কৌম সংগঠন প্রভৃতি সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দ্বারা এখানকার জনসমষ্টি প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছে। এ থেকে রিজলি সহজেই অনুমান করেন, জনগণের বৃহত্তর অংশ জাতিভেদ প্রথার মতো (সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো) কঠোর অনুশাসনের দ্বারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে এ অঞ্চলে অসংখ্য মানব দ্বীপমালা গঠন করেছিল। রিজলির ধারণা ছিল, দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে আন্তর্মিলন কম ঘটেছে, তাই জনগণের নৃগোষ্ঠিক উপাদানগুলোর বিশুদ্ধতাও অনেকখানি সংরক্ষিত হয়েছে। রিজলি তার নৃপরিমাপবিদ্যাগত কাজের ফলাফলের ভিত্তিতে উপমহাদেশের জনগণকে সাতটি মূল শ্রেণীতে বিভক্ত করেন। এ সাত শ্রেণী হলো তুর্কো-ইরানীয়, ইন্দো-আর্য, শক-দ্রাবিড়ীয়, আর্য-দ্রাবিড়ীয় বা হিন্দুস্তানি, মোঙ্গাল-দ্রাবিড়ীয়, মোঙ্গলীয় ও দ্রাবিড়ীয়। রিজলির মতে, বাঙালি হচ্ছে ওড়িয়া ও মোঙ্গলয়েড অসমীয়া এবং দ্রাবিড়ীয় উপাদানের বিভিন্ন অনুপাতে আন্তর্মিলনের ফসল। তার মতে, বাঙালিদের ব্রাহ্মণ-কায়স্থসহ বিভিন্ন হিন্দু জাতি ও মুসলমান জনগণ ওই নৃজাতির প্রতিনিধি।

রিজলি তার কাজের জন্য যত না প্রশংসিত হয়েছেন, নিন্দিত হয়েছেন অনেক বেশি। তবে অনেকে তার সমালোচনা করলেও পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ রিজলির ধারণাকে সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি রিজলির তত্ত্ব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কিছু বিচ্যুতি সত্ত্বেও এসব উপাত্ত নির্ভরশীল ও নিরাপদে ব্যবহারযোগ্য। রিজলির ধারণা ছিল হিন্দুদের মধ্যে জাতিভেদ প্রথার মূলে রয়েছে বর্ণ বৈষম্য অর্থাৎ নৃগোষ্ঠীগত পার্থক্য। এ ধারণার কারণে রিজলির অনুমিতি হলো ‘তথাকথিত’ উচ্চবর্ণের জনগোষ্ঠীর কতিপয় ‘উচ্চবর্ণ জ্ঞাপক অবয়ব বা বৈশিষ্ট্য’ রয়েছে, যা তাদের নিম্নবর্ণের জনগণ থেকে পৃথক করেছে। তার ধারণায় আর্য বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ দীর্ঘ দেহ, দীর্ঘ উন্নত নাসিকা, হালকা গাত্রবর্ণ, দীর্ঘ শিরাকার, তরঙ্গায়িত বা সোজা মসৃণ চুল ইত্যাদি উচ্চবর্ণেও প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে পরবর্তীকালে একাধিক গবেষক দেখিয়েছেন, রিজলি উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের যেসব উপাত্ত পরিমাপ করে নৃগোষ্ঠীগত পার্থক্য দেখিয়েছেন বা উভয়ের মধ্যে পার্থক্যের যে দেয়াল তুলেছেন; প্রকৃতপক্ষে এসব ব্যবধান খুবই কম, অনেকটা কৃত্রিম।

গুজরাট, মহারাষ্ট্রসহ পশ্চিম ভারতীয় জনগণের সঙ্গে পূর্বাঞ্চলীয় অর্থাৎ ওড়িশা, বাংলাদেশ (বৃহত্তর বাংলা) ও আসামের জনগণের রয়েছে তাৎপর্যময় নৃগোষ্ঠিক সাদৃশ্য। অর্থাৎ উভয় অঞ্চলের জনে রয়েছে বিপুল সংখ্যায় বিস্তৃত ও মধ্যম শিরস্ক জনের উপস্থিতি। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রিজলির সংকর তত্ত্বকে পরিত্যাগ করে রামপ্রসাদ চন্দ অন্য একটি তত্ত্বের অবতারণা করেছেন। তার মতে, উপমহাদেশের এক প্রান্তে অর্থাৎ গুজরাটি ও মারাঠি এবং অন্য প্রান্তে বাঙালি ও ওড়িয়াদের মধ্যে নৃগোষ্ঠিক সাদৃশ্য ইঙ্গিত দেয় এ দুই অঞ্চলের জনগণ একই নৃগোষ্ঠীর অন্তর্গত কোনো আদি জন থেকে উদ্ভূত। চন্দের মতে, এ আদি জন হলো চৈনিক তুর্কিস্থান ও পামির এলাকা থেকে আগত আর্য ভাষাভাষী ‘হোমো-আলপিনাস’ জনগোষ্ঠী। এদের নৃগোষ্ঠিক বৈশিষ্ট্য অনেকটা আলপাইন নৃজাতি রূপের মতো অর্থাৎ শিরাকার প্রশস্ত, নাসিকা দীর্ঘ সরল থেকে কজ্বাকৃতি, কেশের বিন্যাস তরঙ্গায়িত বা কোঁকড়ানো, রঙ কালো থেকে বাদামি, চোখ কালো থেকে ধূসর, গাত্রবর্ণ হালকা বাদামি থেকে গোলাপি আভাযুক্ত ও উচ্চতা মধ্যম।

রিজলির মতে, বাংলায় অতি প্রাচীনকালে একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মোঙ্গলীয় বৈশিষ্ট্যের জন এবং বিপুলসংখ্যক দ্রাবিড়ীয় জনের আগমন ঘটেছে। এ দুই ভিন্ন সংস্কৃতি এবং ভাষার ধারক ও বাহক জনগোষ্ঠী তাদের কৌম এবং সব ধরনের সামাজিক সংগঠনের প্রতিবন্ধকতা ও বিছিন্নতাকে ভেঙেচুরে অবাধে আন্তর্মিলিত হয়ে ‘প্রোটো-বাঙালি জন’ সৃষ্টি করেছে। যা-ই হোক, রিজলির তত্ত্ব অনুযায়ী বাঙালি, ওড়িয়া ও সমতলবাসী জাতির জনগণ কেবল মোঙ্গলয়েড ও দ্রাবিড়ীয় উপাদানের মিশ্রণে গড়ে উঠেছে এ ধারণার পেছনেও ঐতিহাসিক বড় কোনো প্রমাণ নেই। কারণ বাঙালির সমাজ সংগঠন, ভাষা ও সংস্কৃতিতে দ্রাবিড়ীয় প্রভাব ও মোঙ্গলীয় প্রভাব অপেক্ষাকৃত কম, বলা চলে প্রায় অনুপস্থিত বা থাকলে তা প্রান্তিক। ফলে মোঙ্গলীয় কিছু উপাদানের লক্ষণ কীভাবে বাঙালি জনে অনুপ্রবেশ করেছে, তা এখনো আণুবীক্ষণিক গভীর গবেষণার বিষয়।

হাটন-গুহের শ্রেণীবিন্যাস

রিজলির শ্রেণীকরণের সমালোচনা, নতুন তথ্য যেমন নব্যপ্রস্তর যুগের ও পরবর্তীকালের বেশকিছু অশ্মীভূত নরকঙ্কাল বা তার অবশেষের আবিষ্কার, সর্বোপরি নতুন করে নৃসমীক্ষা চালানোর ভিত্তিতে প্রাপ্ত ফলাফলের আলোকে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের নতুন করে শ্রেণীকরণের প্রয়োজন অনুভূত হয়। কাজটি করেন জেএইচ হাটন এবং বিরজাশঙ্কর গুহ এ তত্ত্বকে আরো পরিমার্জিত করেন। এগুলো হলো— (১) মধ্যমদেহী বিস্তৃত-মধ্যম শিরস্ক উপাদান: আর্মেনীয় বা আলপাইন জাতির জনগণ এসব বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। গুহের মতে, গুজvরাটের ‘নগরব্রাহ্মণ’ এ জাতিরূপের নিকটতম প্রতিনিধি। তার মতে, বাঙালি, অসমীয়া, ওড়িয়া মহারাষ্ট্রীয় ও গুজরাটি জনগণের মধ্যে এ উপাদানের আধিক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। (২) দীর্ঘদেহী ও দীর্ঘ শিরস্ক উপাদান: এ ধরনের বৈশিষ্ট্যধারী জনকেই চলিতভাবে ‘নর্ডিক’ বা ‘ইন্দো-আর্য’ বলা হয়। (৩) হ্রস্বদেহী, দীর্ঘ শিরস্ক ও কোঁকড়ানো কালো চুল, প্রশস্ত নাক ইত্যাদি উপাদান: এ বৈশিষ্ট্যধারী জনকেই অস্ট্রালয়েড নাম দেয়া হয়েছে। (৪) নেগ্রিটো উপাদান: আন্দামান ও নিকোবরের আদিবাসীরা এর নিকটতম প্রতিনিধি। (৫) বিস্তৃত শিরস্ক মোঙ্গলীয় উপাদান: কাশ্মীর থেকে হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে ও তার পাদদেশ ধরে আসাম উপত্যকা হয়ে বর্মা পর্যন্ত কমবেশি এ জাতিরূপের জন দৃষ্ট হয়। যেমন ভুটিয়া, চাকমা ও অন্যান্য বর্মি জন এ গোত্রের। (৬) দীর্ঘ শিরস্ক মোঙ্গলীয় উপাদান: আসাম উপত্যকায় অঙ্গামি নাগাদের মধ্যে এ উপাদান দেখা যায়।

নৃবিজ্ঞানী জেএইচ হাটনের মতে, ভারতবর্ষের আদিম জন হলো ‘নেগ্রিটো’, যাদের দেখা এ উপমহাদেশে বর্তমানে নেই, যদিও এর রেশ দক্ষিণ ভারতে ও আসামে খুঁজে পাওয়া যায়। হাটনের ধারণায় উপমহাদেশে প্রবেশ করেছে আদি-ভূমধ্য নৃগোষ্ঠীর জন; এদের ছিল এক ধরনের পরস্পরসংলগ্ন ভাষা, যেখান থেকে ‘অস্ট্রো-এশিয়াটিক’ ভাষা জন্মলাভ করেছে। হাটনের মতে, এরপর আসে ‘পরবর্তী ‘ভূমধ্য নৃগোষ্ঠী’র একটি বিপুল জনতরঙ্গ, যারা সম্ভবত সিন্ধু সভ্যতার নির্মাণকারী। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে আগমন ঘটে আরো একটি বিপুল জনধারা, যারা সাংস্কৃতিকভাবে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের অন্তর্গত। প্রায় একই সময়ে পূর্বদিকে দক্ষিণ মোঙ্গলীয় শাখার বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বঙ্গোপসাগর ও ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, যার কিছু প্রভাব উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে তথা বাংলাদেশেও অনুভূত হয়। হাটনের মতে, সর্বশেষ ১৫০০-২০০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দের কোনো এক সময় দীর্ঘ শিরস্ক ‘ইন্দো-আর্য’ নৃগোষ্ঠীর জনগণ ব্যাপকভাবে উপমহাদেশে প্রবেশ করে নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

অনেকে আজকাল মনে করেন, বাঙালি জাতি সৃষ্টিতে দ্রাবিড়, অস্ট্রিক ও মোঙ্গলীয় উপাদানই অনেক বেশি ক্রিয়াশীল ছিল। তবে অধিকাংশ গবেষক ও পণ্ডিতের মতে, বাঙালি সমাজ, সংস্কৃতি নির্মাণে ইন্দো-ভূমধ্য নৃগোষ্ঠী ও ইন্দো-আর্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এ প্রসঙ্গে এটাও বলা রাখা ভালো, প্রাচীন ভারতের দ্রাবিড়ীয় সংস্কৃতি ও ভাষা কোনো দিক দিয়েই ইন্দো-আর্য ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে পশ্চাৎপদ ছিল না। অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। যা-ই হোক, বাংলাদেশ তথা বৃহত্তর বাংলার জনগণের মূল উপাদান যদি দ্রাবিড়ীয় হতো, তাহলে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি অনেকটাই হতো দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার অনুরূপ। তার অর্থ অবশ্য এই নয় যে দ্রাবিড়ীয় প্রভাব বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে একদম পড়েনি। ভাষা পণ্ডিতরা বাংলা শব্দভাণ্ডারে কিছু দ্রাবিড় শব্দ এবং বাক্য গঠনে দ্রাবিড় শৈলী আবিষ্কার করেছেন। তবে এ দ্রাবিড়ীয় প্রভাব কতটা সরাসরি আর কতটা সংস্কৃত ভাষার মধ্য দিয়ে এসেছে, তার পরিমাণগত অনুপাত অদ্যাবধি নির্ণয় করা হয়নি। সুতরাং ভাষার বিচারেও বাংলার মূল উপাদান এসেছে ইন্দো-আর্যভাষী জনগণ থেকে। যদিও প্রাচীন বাংলার জনমানুষ যে দ্রাবিড়ভাষী জনগণের সংস্পর্শে এসেছিল তার প্রমাণ ভাষা ও সংস্কৃতিতে যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাঙালি জনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দ্রাবিড়ীয় উপাদান। বর্তমানে বাংলায় দ্রাবিড় ভাষার প্রতিনিধি হলো ওরাঁও জাতি।

বাংলাদেশী জন নির্মাণে অস্ট্রালয়েড উপাদানেরও কিছু অবদান রয়েছে, যা ভাষার দিক থেকেও সমর্থিত হয়েছে। বাংলা ভাষায় বেশকিছু শব্দকে ‘অস্ট্রিক’ মূলগত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে বাক্য গঠন রীতিতে এ ভাষার অবদান কতটুকু এবং এখানকার সংস্কৃতিতে এ জনগণের সাংস্কৃতিক প্রভাব কতখানি তা সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ববিদরা ক্রমে উদ্ঘাটন করেছেন। মধ্যভারতের ‘কোল-মুন্ডা’ ভাষা থেকে শুরু করে আসাম উপত্যকার খাসি ভাষা, বর্মার ওয়া-ওরিয়াং ভাষা, মালয় উপদ্বীপে প্রচলিত সাকাই ও সেমাং এবং ফিলিপিন, সামোয়ান, বালি, জাভা প্রভৃতি ভাষা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং একই পরিবারের ভুক্ত বলে ভাষাবিদরা প্রমাণ করেছেন। এ ভাষা পরিবারেরই অন্তর্ভুক্ত হলো ‘কোল-মুন্ডা’ ও ‘অস্ট্রো-এশিয়াটিক’ ভাষা। সিলভ্যাঁ লেভির মতে, প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে দ্রাবিড়ীয় ও ইন্দো-আর্য সভ্যতা-সংস্কৃতি বিকাশের আগে যে সভ্যতা-সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছিল, তা ছিল ‘অস্ট্রো-এশিয়াটিক’। বর্তমানে বাংলাদেশে সাঁওতাল ও মুন্ডা জাতি প্রাচীন অস্ট্রো-এশিয়াটিকভাষীর আধুনিক প্রতিনিধি। ‘চীনা-তিব্বতীয়-বর্মী’ ভাষাগোষ্ঠীর ভুক্ত আসাম শাখার বড়-কাছারি, গারো, ত্রিপুরা, মণিপুরি ভাষাগুলো বাংলাদেশের ময়মনসিংহে গারো, সিলেটে মণিপুরি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে টিপরা জনগণ এখনো ব্যবহার করে। এসব ভাষাভাষী জনগণ ও তাদের সংস্কৃতি বাঙালি জন ও ভাষায় কত অবদান রেখেছে তার জন্য ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন। কারণ নৃপরিমিতিক গবেষণার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতেই কেবল বলা চলবে বাঙালি জন সৃষ্টিতে মোঙ্গলয়েড উপাদানের পরিমাণবাচক অনুপাত কতটুকু।

উপরিউক্ত আলোচনার ভিত্তিতে অন্তত এটা বলা চলে, জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাভাষী জন মোটামুটি সমরূপ ও সমস্বত্ব। সাদা চোখেই এটি ধরা পড়বে, বাংলাদেশের মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক নৃগোষ্ঠীগত কোনো পার্থক্য নেই। কাজেই বাঙালি মুসলমান নৃগোষ্ঠীর দিক থেকে একটি স্বতন্ত্র নৃজাতিরূপ এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবু এ কথা অনস্বীকার্য যে বাঙালি মুসলিম জনে এসে মিলিত হয়েছে আরো কিছু অতিরিক্ত উপাদান।

সপ্তম-অষ্টম শতাব্দী থেকেই মুসলিম বণিক ও সুফি-দরবেশরা সাদকাঁও (চাটগাঁও বা চট্টগ্রাম) বন্দর হয়ে সুদূর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গিয়েছেন এবং কেউবা বাংলায় থেকে গেছেন। বাংলাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় তেরো শতকের গোড়ার দিকে, তখন থেকেই তুর্কি, পারসিক, মোঙ্গল প্রভৃতি মধ্য এশীয় উপাদান কখনো অভিযানকারী, কখনো পেশাজীবী (মুন্সি), কখনো ভাগ্যান্বেষী, কখনো ব্যবসায়ীরূপে বাংলায় এসেছে, অভিবাসন করেছে এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আন্তর্মিলিত হয়েছে, গড়ে তুলেছে স্থায়ী আবাস, এ দেশকে গ্রহণ করেছে আপন মাতৃভূমিরূপে। বাংলা অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে ইবনে বতুতা এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, এ অঞ্চলের মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর সুফি-দরবেশদের অনেক প্রভাব ছিল। হজরত শাহজালাল নামক এক সাধক পুরুষ জগৎশ্রেষ্ঠ সুফি সিলেটে এসেছিলেন একমুঠি মাটি নিয়ে, যার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল মক্কার পবিত্র ভূমির। এ জঙ্গল, টিলা ও পাহাড়ি এলাকায় স্থানীয় অধিবাসীরা তার হাত ধরেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং এ অঞ্চলে এক গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল, যা সত্যিকার অর্থে ওই অঞ্চলে নতুন জন সৃষ্টিতে অবদান রেখেছিল।

তবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে এসব বহিরাগত উপাদান নিজেরা নৃগোষ্ঠিক দিক থেকে অমিশ্রিত ও বিশুদ্ধ এক একটি জাতিরূপ। মুসলমানদের মধ্যে তুর্কি বৈশিষ্ট্য যেমন রয়েছে, তেমনি আছে কিছু মোঙ্গলীয় বৈশিষ্ট্য। মোঙ্গলদের যে শাখা মোগল সাম্রাজ্য স্থাপন করেছে, তারা ইতিহাসে চুগতাই মোগল নামে পরিচিত এবং মোঙ্গলয়েড নৃগোষ্ঠীভুক্ত একটি মিশ্র জন। মধ্য এশিয়ায় স্মরণাতীত কাল থেকেই তুর্কিদের সঙ্গে মোঙ্গলদের নানা জনগোষ্ঠীর ঘটেছে অবাধ সংমিশ্রণ। মুসলিম শাসনের সঙ্গে বাংলাদেশে ‘হাবশী’ নামে পরিচিত সুদানীয় নিগ্রো উপাদানের সামান্য অনুপ্রবেশও ঘটেছে। তবে বাংলাদেশে এসব বৈদেশিক উপাদান গণহারে ও বিপুল স্রোতে প্রবেশ করেনি যে ভূমিপুত্র জনের নৃগোষ্ঠিক আদল পুরোটা পরিবর্তন করে দিতে সক্ষম ছিল। তথাপি দীর্ঘ গড়নের শক্ত সামর্থ্য চেহারার অধিকারী কোনো কোনো বাঙালি মুসলমানকে যেমন ভিড়ের মধ্যে চিনে নিতে অসুবিধে হয় না, তেমনি নিগ্রোপম কোঁকড়ানো চুলের মানুষকেও কালেভদ্রে বাঙালি জনে দেখা যায়। এরা যে যথাক্রমে তুর্কি ও নিগ্রোয়েড পূর্বপুরুষের বংশগতি উপাদান এখনো শরীরে বহন করে চলেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাঙালি মুসলমান জনকে আমরা তিনটি উপাদানে গড়ে ওঠা জন হিসেবে গণ্য করতে পারি, (১) বৈদেশিক উপাদান— (২) স্থানীয় ধর্মান্তরিত উপাদান ও (৩) উভয়ের মধ্যে সংমিশ্রিত উপাদান। ১৮৭২ সালের প্রথম আদমশুমারি পূর্ব বাংলার প্রধান জেলাগুলোর পেশাভিত্তিক ও কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার একটি জটিল কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ এক ছবি তুলে ধরেছিল। ওই আদমশুমারি থেকে জানা যায়, একমাত্র সিলেটেই লাখেরাজদের জন্য ব্যাপক ভূমিস্বত্ব ছিল, যারা ধর্মীয় কারণে খাজনামুক্ত জমির অধিকারী ছিলেন। সংখ্যায় এর পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৮৮৫। অন্যদিকে পূর্ব বাংলার বাকি প্রধান পাঁচটি জেলা যথাক্রমে ঢাকা, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে মাত্র ৪০০ লাখেরাজ সম্পত্তি ছিল। সিলেটে উনিশ শতকের শেষে এসেও আদমশুমারিতে দেখা যে ফারসি শিক্ষায় শিক্ষিত অনেকেই ছিলেন ঐতিহ্যগতভাবে লাখেরাজ সম্পত্তির মালিক। এরা ছিলেন পেশায় আরবি, ফারসি জানা মুনশি। সিলেটের মৌলভীবাজার জেলায় এ রকম একজন লাখেরাজ সম্পত্তির মালিক মুনশি রসুল বক্তর সন্ধান পাওয়া যায়, যিনি ১৬৯০ সালে এসেছিলেন ইরাক থেকে।

এসব উপাদানের আনুপাতিক পরিমাণ আজ নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। কারণ কালের অপ্রতিহত গতিতে, বাংলাদেশের পরিবেশে, যাপিত জীবনে, খাদ্যাভ্যাসে এবং সর্বোপরি অবিমিশ্রিত ও অবাধ আন্তর্মিলনে বাঙালি মুসলিম জন একটি সমরূপী সমস্বত্ব জন হিসেবে গড়ে উঠেছে, যাকে তার প্রতিবেশী অন্য সামাজিক জন থেকে পৃথক করা যায় না। সুতরাং এটা বলা চলে, ইতিহাস ও সময়ের পথ ধরে বাংলাদেশী জনগোষ্ঠী একটি সমরূপী সমস্বত্ব জন হিসেবে গড়ে উঠেছে। সুদীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ও বিচিত্র জনস্রোত এসে মিশেছে পূর্ব বাংলা তথা বর্তমান বাংলাদেশের জনসমুদ্রে, আত্তীকৃত হয়েছে, বেড়ে উঠেছে এখানকার শ্যামল মাটিতে এবং গড়ে তুলেছে একটি নতুন জাতিসত্তা।

ড. আশফাক হোসেন: লেখক, গবেষক ও অধ্যাপক

চেয়ারম্যান, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়